পুরুষ মহিলার নামাযের পার্থক্য : মহিলাদের নামাজ, সালাফ বনাম খালাফ (১ম পর্ব)

সতর্কতা : প্রবন্ধটিতে কিছু শাস্ত্রীয় কথা বার্তা রয়েছে, যা সাধারণ পাঠকদের বোঝার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে। কোথাও না বুঝলে আলেমদের শরণাপন্ন হয়ে বুঝে নিন।


মুফতি আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ


 

মহিলাদের নামাজ, পার্থক্য আছে? নাকি পুরুষের মতই?

এই বিষয়ে কিছু লেখার জন্যে বারবার তাগাদা দেয়া হয়েছিল। এই বিষয়ক একটা রেসালাহ তৈরি করতে গিয়ে অনুভব করলাম এক পর্বে শেষ করা সম্ভব না। তাই, মোট ৪ পর্বে এই বিষয়ক প্রবন্ধটি শেষ করার ইচ্ছা। ওয়ামা তাওফিকী ইল্লা বিল্লাহ!

প্রথম পর্বে কিছু উসূল বা মৌলিক নীতিমালা সংক্রান্ত আলোচনা থাকছে। কারণ এই মৌলিক নীতিমালার উপর ভর করেই তর্ক বিতর্কের ডালপালা ছড়িয়েছে।

দ্বিতীয় পর্বে নামাজের পার্থক্য সংক্রান্ত ৪ মাজহাবের দলীল ও পর্যালোচনা।

তৃতীয় পর্বে নামাজের পার্থক্য নেই মর্মে বর্তমান যামানার কিছু মুহাক্কিকদের দাবী, দলীল ও পর্যালোচনা।

চতুর্থ ও শেষ পর্বে, সালাফি আলেমদের মতামত ও অধমের কৈফিয়ত থাকবে ইনশাআল্লাহ।

 

মহিলাদের নামাজ, যেভাবে পেলাম…

উম্মাহর নারীরা আজীবন যেভাবে নামাজ পড়ে এসেছে তা শতভাগ পুরুষের মত নয়।  এভাবেই আবহমানকাল থেকে চলে আসছে।  সেই সাহাবী থেকে তাবেয়ী, তাবে তাবেয়ী ক্রমধারায় কোটি কোটি মুসলিমাহ, পুণ্যবতী নারী নামাজ পড়ে আসছেন। তারপর?

কয়েক বছর আগে, আনুমানিক ২০/৩০ বছর আগে নতুন গবেষণা বের হলো। যার বক্তব্য হচ্ছে “নারী পুরুষের নামাজের কোন পার্থক্য নেই”! গবেষণার কেন প্রয়োজন হলো? কারণ, নতুন গবেষকরা হাদিসের শুদ্ধতা ও বিশুদ্ধতা যাচাইয়ের উপর নামাজকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলেন। তারপর যখন দেখলেন, নারীদের নামাজে যে পার্থক্যগুলো মেনে নামাজ পড়া হয়, সে হাদিসগুলোর সনদ মজবুত নয়। সুতরাং তারা বললেন নামাজে কোন পার্থক্য নেই।

এখানে গোঁড়ায় কিছু প্রশ্ন আসে।  আপনারা যদি ‘তাদবীনে হাদিস’ (হাদিস সংকলনের ইতিহাস) নিয়ে পড়ে থাকেন, এই প্রশ্ন এতক্ষণে আপনার মাথায় চলে আসার কথা। আচ্ছা, হাদিসের প্রচলিত কিতাবগুলো লেখা হলো হিজরী ১৫০-২০০ বছর পর। এই হাদিস গ্রন্থগুলোর ভিত্তি করে নামাজকে পুনর্বিন্যাস যদি করা হয়, তাহলে এই গ্রন্থগুলো লেখার আগের যুগে যে সকল সাহাবী/তাবেয়ী/তাবে তাবেয়ী ছিলেন, তারা কীভাবে নামাজ পড়লেন? তখন তো এই কিতাবগুলো লেখা হয় নি। তাহলে নামাজটা শিখলেন কীভাবে? নিশ্চয় কেতাব পড়ে শিখেন নি? সাহাবীরা শিখেছেন, রাসূল সা. থেকে, তারপর তাবেয়ীরা শিখেছেন সাহাবীদের থেকে। নামাজ তো ইতোমধ্যেই পূর্ণ রূপে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছে। হাদিসের গ্রন্থগুলো লেখার আগেই। সাহাবা থেকে নিয়ে পরবর্তী ৩ প্রজন্ম নামাজ শিখেছে “তা’আমুল ও তাওয়ারুছ” এর মাধ্যমে।

যদি মনে করা হয়, ইমাম বুখারীর বুখারী লেখার আগে কেও সহীহভাবে নামাজ পড়তে পারেন নি। মনগড়া নামাজ পড়েছেন, সুতরাং বোখারী লেখার পর সে নামাজকে বদলানো জরুরী। তাহলে ৪ মাজহাব ও লা মাজহাব এর সবারই একমত হওয়া উচিত, প্রচলিত হাদিসগ্রন্থগুলোর উপর ভিত্তি করে নামাজকে পুনর্বিন্যাস বা শুদ্ধিকরণ জরুরী।

কিন্তু যদি এর বিপরীত হয়, অর্থাৎ সাহাবারা নামাজ শিখেছেন রাসূল সা. থেকে। তারপর তারা বিভিন্ন অঞ্চলে ইসলামের দাওয়াত নিয়ে ছড়িয়ে পড়েছেন। সেখানে তারা নামাজ শিখিয়েছেন। তাদের থেকে তাদের ছাত্ররা.. এভাবে যুগ পরম্পরা। সুতরাং তাদের নামাজ ভুল হয় নি। কারণ তাদের নামাজ ছিল রাসূল সা. এরই নামাজ। উত্তর যদি এটা হয়, তাহলে প্রশ্ন হবে, এই নামাজ তো সাহাবাদের নামাজই ছিল। প্রচলিত কিতাবের আলোকে নামাজকে পুনর্বিন্যাস বা পুনরায় তাহকীক এর কি প্রয়োজন আছে?

প্রসঙ্গত না বললেই নয়, পূর্বসূরিদের বহু কিতাব এমন আছে যে এখনো ছাপার হরফে আসে নাই। অনেক পাণ্ডুলিপি আছে যা উদঘাটন করা হয় নাই। আমি যতদূর জানি, শায়খ আব্দুল মালিক হাফিজাহুল্লাহ ‘তাহকীকু তুরাছ’ বিষয়ে কাজ করছেন। হানাফী মাজহাবের প্রাণকেন্দ্র ছিল বাগদাদ নগরী। সেই বাগদাদ যখন তাতারিদের দ্বারা আক্রান্ত হলো, তখন পুরো নগরীর কিতাবগুলো পানিতে ডুবিয়ে দিল। ঐতিহাসিকদের মতে, কিতাবের পানিতে নদীর পানি স্ফীত হয়ে উঠেছিল। ‘রিসালাতুল মুস্তাতরাফা’ গ্রন্থটির নাম হয়ত শুনেছেন। এটি অনেকটা গ্রন্থপরিচিতি বা গ্রন্থসূচী জাতীয় কিতাব। সেখানে এমন হাজারো কিতাবের নাম পাবেন যা আজকের যুগে অনুপস্থিত। ইমাম আবু ইউসুফ রহ. ২০০ খণ্ডের একটি গ্রন্থ লিখেছেন। অথচ সেই গ্রন্থ আজকে নেই। এই কথা বলছি এই কারণে, অনেক আমল যা রাসূল সা. এর যুগ থেকে ক্রমধারায় প্রচলিত। যেমন মাথায় টুপি পরা। কিন্তু প্রচলিত হাদিস গ্রন্থে সহীহ সূত্রে তা বর্ণিত নয়। তাই দেখা যায়, হাল আমলের প্রচলিত কিতাবসর্বস্ব কিছু গবেষক টুপি পরার সুন্নাহ হওয়াকে অস্বীকার করেছেন। অবশ্য পরবর্তীতে শায়খ আব্দুল মালেক হাফিজাহুল্লাহ একাধিক সহীহ সনদ দিতে টুপির সুন্নাহকে প্রমাণ করেছেন। কোন আমল যখন রাসূল সা. এর যুগ থেকে ধারাবাহিক চলে আসে, যেটাকে “আমালে মুতাওয়ারাসাহ বা সুন্নাতে মুতাওয়ারাসাহ” বলা হয়। সেটাকে প্রচলিত কিতাব নির্ভর গবেষণায় উড়িয়ে দেয়ার প্রবণতা অযৌক্তিক বলে মনে হয়।

 

আমলে মুতাওয়াতির / মুতাওয়ারাসাহ কী?

ইসলামের ব্যবহারিক অধিকাংশ আমল রাসূল স. থেকে সাহাবীগণ শিখেছেন। সাহাবীদের থেকে তাবেয়ীগণ, তাবেয়ীদের থেকে তাবে তাবয়ীগণ এবং তাদের থেকে পরবর্তীগণ শিখেছেন।  একে পরিভাষায় আমলে মুতাওয়ারিসা বলে।

খবরে ওয়াহিদ অর্থাৎ কোন হাদিস যদি এমন হয়, যা কেবল একজনের সূত্রে বর্ণিত হয়েছে।  আর উক্ত সনদের সবাই নির্দিষ্ট মানদণ্ডে উত্তীর্ণ। তাহলে সেটাকে গ্রহণ করা হয়। যদিও বর্ণনাকারী মাত্র একজন। তাহলে হাজার হাজার লোক দ্বারা প্রত্যহ পালিত আমলের ধারা কি একক রাবী বর্ণিত হাদীসের তুলনায় শক্তিশালী নয়? সালাফে সালেহীন থেকে প্রমাণিত, তারা আমলে মুতাওয়ারিসকে খাবরে ওয়াহেদ সূত্রে বর্ণিত হাদীসের উপর প্রাধান্য দিতেন। অনেক ইমাম নিজে সহীহ সনদে হাদীস বর্ণনা করার পরও এর উপর আমল করতেন না। হাদীসটি রাসূল স. থেকে প্রচলিত আমলের বিপরীত হওয়ার কারণে।

ইমাম মালিক রহ. তার মুয়াত্তায় সহীহ সনদে অনেক হাদীস এনেছেন। কিন্তু মদীনাবাসীর আমল বিপরীত হওয়ার কারণে তিনি হাদীসগুলো পরিত্যাগ করে রাসূল স. থেকে প্রচলিত আমলকে প্রাধান্য দিয়েছেন। এমনকি মালেকী মাজহাবে অন্যতম একটি দলিল হলো আমলে মুতাওয়ারিস বা মদীনাবাসীর আমল।

এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে শায়খ মুহাম্মাদ আওয়ামা হাফিজাহুল্লাহ রচিত “” আসারুল হাদীসিশ্ শরীফ ফী ইখতিলাফি আইম্মাতিল ফুক্বহা”” দেখুন। এছাড়াও আল্লামা হায়দার হাসান খান টুংকী রহ. এর লিখিত অনবদ্য দুটি রেসালাহ, ‘আত তায়ামুল’ ও “উসুলুত তাওয়ারুছ”, শায়খ আব্দুর রশীদ নোমানী রহ. এর কিতাব ‘আল ইমামু ইবনু মাজাহ ও কিতাবুহুস সুনান’ অধ্যয়ন করা যেতে পারে।

বর্তমানে অধিকাংশ অস্থিরতার মূল হল, সালাফের নীতি থেকে সরে যাওয়া। আমলে মুতাওয়ারিসের বিপরীতে খবরে ওয়াহিদকে প্রাধান্য দেয়া। একদিন ড. মানজুরে এলাহী দা.বা. এর সাথে কথা হচ্ছিল। তিনি বললেন, ‘বর্তমান যামানার ইলমী অঙ্গনে সবচেয়ে বড় ফেতনা হচ্ছে সালাফে সালেহীন এর অনুসৃত পথ থেকে সরে গিয়ে নতুন নতুন ব্যাখ্যা হাজির করা।’

 জয়ীফ বা দুর্বল হাদিস কি আদৌ গ্রহণযোগ্য নয়?

আমাদের মধ্যে যারা উলুমুল হাদিস পড়েন নি। কেবল আলেমদের বয়ান বা শায়েখদের লেকচার শুনেছেন। তাদের মধ্যে একটা বড় মিসকনসেপশন হচ্ছে, তারা ধারণা করেন হাদিস সহীহ মানে হচ্ছে এটা আমলযোগ্য হওয়া।  আর জয়ীফ মানে হচ্ছে এটা পরিত্যাজ্য হওয়া।
কিন্তু বাস্তবতা তা না। সহীহ /জয়ীফ/ হাসান/ মুরসাল/ মুতাবে/ শাওয়াহেদ ইত্যাদি শাস্ত্রীয় পরিভাষা। কখনো একটা হাদিসের সূত্র শাস্ত্রীয় নীতিমালায় উত্তীর্ণ হলে সে হাদিস (কথা/কাজ/সম্মতির বিবরণ) সনদগত দিকে দিয়ে সহীহ হতে পারে, কিন্তু তার উপর আমল করা যাবে না।  কেন? কারণ হাদিসের বিধান রহিত হয়ে গিয়েছে। এমনিভাবে একটা হাদিস এর সূত্র দুর্বল, কিন্তু সেটার উপর উম্মাহর ধারাবাহিক আমল চলে আসছে সাহাবীদের যুগ থেকেই। সে সূত্র যখন গ্রন্থিত হয়, তখন শাস্ত্রীয়ভাবে দুর্বল হলেও সেটা গ্রহণযোগ্য। এই প্রকারের জয়ীফের ক্ষেত্রে সূত্রগত দুর্বলতা কোন প্রভাব ফেলে না। এইটুকু পড়ে নিশ্চয় আপনাদের অবাক লাগছে। কারণ আপনারা যা ভেবে আসছেন, তার সাথে মিলছে না। তাহলে আসুন হাদিসবেত্তাদের কিছু শাস্ত্রীয় পর্যালোচনা জেনে নেই।

জয়ীফ হাদিস গ্রহণের ক্ষেত্রে শাস্ত্রজ্ঞদের মতামত —

বিধি-বিধানের ক্ষেত্রে মুহাদ্দিসগণ জয়ীফকে দুভাগে ভাগ করেছেন।

এক. এমন জয়ীফ হাদীস, যার সমর্থনে কোন শরয়ী দলিল নেই, বরং এর বক্তব্য শরীয়তের দৃষ্টিতে আপত্তিজনক। এ ধরণের জয়ীফ হাদীস আমলযোগ্য নয়।
দুই. সনদের বিবেচনায় হাদীসটি জয়ীফ বটে, তবে এর সমর্থনে শরয়ী দলিল প্রমাণ আছে, সাহাবী ও তাবেয়ীগণের যুগ থেকে এ হাদীস অনুসারে আমল চলে আসছে। এমন জয়ীফ হাদীস শুধু আমলযোগ্যই নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে তা মুতাওয়াতির বা অসংখ্য সূত্রে বর্ণিত হাদীসের মানোত্তীর্ণ। এটাকে বলা হয় ‘জয়ীফ মুতালাক্কা বিল কাবুল’!

১- এ বিষয়ে ইমাম যারকাশী রহঃ তাঁর হাদীস শাস্ত্রের মূলনীতি বিষয়ক গ্রন্থ ‘আননুকাত’ এ বলেছেন,
ﺇﻥ ﺍﻟﺤﺪﻳﺚ ﺍﻟﻀﻌﻴﻒ ﺇﺫﺍ ﺗﻠﻘﺘﻪ ﺍﻷﻣﺔ ﺑﺎﻟﻘﺒﻮﻝ ﻋﻤﻞ ﺑﻪ ﻋﻠﻰ ﺍﻟﺼﺤﻴﺢ ﺣﺘﻰ ﻳﻨﺰﻝ ﻣﻨﺰﻟﺔ ﺍﻟﻤﺘﻮﺍﺗﺮ
অর্থ, জয়ীফ হাদীসকে যখন উম্মাহ ব্যাপকভাবে গ্রহণ করে নেয়, তখন সঠিক মতানুসারে সেই হাদীসটি আমলযোগ্য হয়, এমনকি তা মুতাওয়াতির হাদীসের মানে পৌছে যায়।
(আননুকাতঃ ১/৩৯০)

২- একই বিষয়ে হাফেজ শামসুদ্দীন আসসাখাবী রহঃও তাঁর ‘ফাতহুল মুগীছ’ গ্রন্থে লিখেছেন,
ﻭﻛﺬﺍ ﺇﺫﺍ ﺗﻠﻘﺖ ﺍﻷﻣﻪ ﺍﻟﻀﻌﻴﻒ ﺑﺎﻟﻘﺒﻮﻝ ﻳﻌﻤﻞ ﺑﻪ ﻋﻠﻰﺍﻟﺼﺤﻴﺢ ﺣﺘﻰ ﺃﻧﻪ ﻳﻨﺰﻝ ﻣﻨﺰﻟﺔ ﺍﻟﻤﺘﻮﺍﺗﺮ ﻓﻲ ﺃﻧﻪ ﻳﻨﺴﺦﺍﻟﻤﻘﻄﻮﻉ ﺑﻪ ﻭﻟﻬﺬﺍ ﻗﺎﻝ ﺍﻟﺸﺎﻓﻌﻲ ﺭﺣﻤﻪ ﺍﻟﻠﻪ ﻓﻲ ﺣﺪﻳﺚﻻ ﻭﺻﻴﺔ ﻟﻮﺍﺭﺙ ﺇﻧﻪ ﻻ ﻳﺜﺒﺘﻪ ﺃﻫﻞ ﺍﻟﺤﺪﻳﺚ ﻭﻟﻜﻦ ﺍﻟﻌﺎﻣﺔ ﺗﻠﻘﺘﻪ ﺑﺎﻟﻘﺒﻮﻝ ﻭﻋﻤﻠﻮﺍ ﺑﻪ ﺣﺘﻰ ﺟﻌﻠﻮﻩ ﻧﺎﺳﺨﺎ ﻵﻳﺔ ﺍﻟﻮﺻﻴﺔ
অর্থ, উম্মাহ যখন জয়ীফ হাদীসকে ব্যাপকহারে গ্রহণ করে নেয়, তখন সহীহ মত অনুসারে সেটি আমলযোগ্য হয়, এমনকি তার দ্বারা অকাট্য বিধান রহিত হওয়ার ক্ষেত্রে সেটি মুতাওয়াতির দলীলের মানোত্তীর্ণ হয়। এ কারণেই ইমাম শাফেয়ী র.‘উত্তরাধিকারীর জন্যে কোন ওসিয়ত নেই’ হাদীসটি সম্পর্কে বলেছেন, হাদীস বিশারদগণ এটিকে সহীহ মনে না করলেও ব্যাপকহারে আলেমগণ এটি গ্রহণ করে নিয়েছেন, এ অনুযায়ী আমল করেছেন, এমনকি তারা এটিকে ওসিয়ত সম্পর্কিত আয়াতটির বিধান রহিতকারী আখ্যা দিয়েছেন।
(ফাতহুল মুগীছঃ ১/ ৩৩৩)

৩- হাফেজ ইবনে হাজার রহঃ লিখেন, যে হাদিস অনুযায়ী আমল করা উম্মতের কাছে গৃহীত হয়েছে এবং যে বিষয় অনুযায়ী আমল করার প্রতি উম্মতের ইজমা চলে আসছে,নিঃসন্দেহে তা গ্রহণ করার ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক কারণ ও বিভিন্ন সনদে বর্ণিত হাদিস অপেক্ষাও শক্তিশালী।
(আন-নুকাত আলা কিতাবি ইবনে ছালাহ/আসকালানী ১/৪৯৪)

৪- হাফেজ ইবনু কায়্যিমিল জাওযিয়াহ রহঃ একটি জয়ীফ হাদীস সম্পর্কে বলেছেন,
ﻓﻬﺬﺍ ﺍﻟﺤﺪﻳﺚ ﻭﺇﻥ ﻟﻢ ﻳﺜﺒﺖ ﻓﺎﺗﺼﺎﻝ ﺍﻟﻌﻤﻞ ﺑﻪ ﻓﻲ ﺳﺎﺋﺮﺍﻷﻣﺼﺎﺭ ﻭﺍﻷﻋﺼﺎﺭ ﻣﻦ ﻏﻴﺮ ﺇﻧﻜﺎﺭ ﻛﺎﻑ ﻓﻲ ﺍﻟﻌﻤﻞ ﺑﻪ
অর্থাৎ এ হাদীসটি প্রমাণিত না হলে ও বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন শহরে কোন রূপ আপত্তি ছাড়া এ অনুযায়ী আমল চালু থাকাই হাদীসটি আমলযোগ্য হওয়ার জন্যে যথেষ্ট।
(আর-রূহ লিল ইবনে কাইযুমঃ ১৬)
(জয়ীফ হাদীস সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন আব্দুল হাই লখনবী রহঃ এর লিখিত কিতাব আল-আমলু বিল হাদীসিস যয়ীফাহ ও শায়েখ সাইদ মামদুহ এর ‘আততারীফু বি আউহামিন’। )

৫- ইমাম মালেক বলেন, ‘কোন হাদিস মদীনাবাসীর নিকট মাশহুর হয়ে গেলে তখন সেটা সনদগত হুকুমের ঊর্ধ্বে চলে যায়।
আল আজভিবাতুল ফাদিলাহ- শায়খ আবু গুদ্দাহর তালীক ২২৭-২৩৮ , আল হাদিসুস সহীহ ওয়া মানহাজুল উলামায়িল মুসলিমিন ফিত তাসহীহ- শায়খ আব্দুল কারীম ইসমাইল সাব্বাহ- ২১৫

৬- খতীবে বাগদাদী রাহ. লিখেন, “যখন উম্মাহ ধারাবাহিকভাবে কোন আমলকে গ্রহণ করে নেয়, তখন সেটার শুদ্ধতার জন্যে সনদ খোজার প্রয়োজন হয় না। অর্থাৎ সনদের মানগত শুদ্ধতার ঊর্ধ্বে চলে যায়।
আল ফাকীহ ওয়াল মুতাফাক্কীহ- ১/১৯০
আল কিফায়াহ- ৫১

৭- ইমাম আহমদ বিন হামবলকে একটা হাদিস সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো “আপনি এই হাদিস গ্রহণ করলেন, অথচ এই হাদিসটিকে আপনি জয়ীফ বলে থাকেন।” ইমাম আহমদ উত্তরে বললেন, “হ্যাঁ! হাদিসটি জয়ীফ। কিন্তু এর উপর আমল করা হয়”!!
(আল উ’দ্দাতু ফি উসুলিল ফিকহ লি আবি ইয়া’লা আল ফাররা ৩/৯৩৮-৯৩৯)

৮- পূর্বসূরিদের কিতাব যাদের মোতালায়ার সুযোগ হয়েছে তারা এই বাক্যগুলোর সাথে পরিচিত হয়ে থাকবেন নিশ্চয়,
تلقّته الأمّة بالقبول/ والعمل عليه عند أهل العلم”
ঘাটতে গিয়ে সালাফি শায়েখ, রাবী আল মাদখালী হাফি. এর একটা রেসালাহ পেয়ে গেলাম। তিনি সেখানে মুতালাক্কা বিল কবুল সম্পর্কে লিখেছেন।
والحديث الضعيف إذا تلقته الأمة بالقبول ينجبر ويجب العمل به؛لأن الأمة لا تجتمع على ضلالة .
مثل يعني الماء الذي تقع فيه النجاسة هل ينجس أو لا ؟ إذا تغير طعمه أو لونه أو ريحه كثيرا كان أو قليلا فهو نجس بإجماع الأمّة.
অর্থাৎ, জয়ীফ হাদিসকে যখন উম্মাহ আমল করে তখন সেটার উপর আমল করা ওয়াজিব হয়ে যায়। ‘কারণ উম্মাহ কোন ভুলের উপর একমত হতে পারে না।’ ( এটি হাদিসের অংশ)

তিনি এর উদাহরণ স্বরূপ আবু উমামার হাদিসটি উল্লেখ করেন, “যখন পানিতে নাপাক পতিত হয় আর পানির স্বাদ, রঙ, ঘ্রাণ বদলে যায়, সে পানি বেশি হোক বা অল্প, উম্মাহর এজমা অনুযায়ী তা নাপাক বলে গণ্য হবে। যদিও হাদিসটি জয়ীফ!

জয়ীফ হাদিস যখন উম্মাহর আলেমদের নিকট সর্বতোভাবে গৃহীত হয়ে যায়, তখন সেটার সনদগত দুর্বলতা বিবেচ্য হয় না। এই বিষয়ে সম্পূর্ণ একটা গ্রন্থ লেখা সম্ভব।  বিস্তারিত দেখুন, আন নুকাত লি ইবনে হাজার- ১/৪৯৪, আত তায়াক্কুবাত আলাল মাউযুয়াত লিস সুয়ুতী ১২; তাদরিবুর রাবী ৬৭, ফাতহুল মুগীছ ১২০-১২১, ফাতহুল কাদীর ৩/১৪৩, আল বুরহান ফি উছূলিল ফিক্বহ,আবুল মা’আলী আল জুয়াইনী ,ফাছলুন ফি তাক্বাসীমুল খাবর ১/৩৭৯; আল বায়েসুল হাসীস ফী ইখতেসারে উলূমুল হাদিস,ইমাম ইবনু কাসীর-সংকলক শায়খ আহমাদ শাকের পৃঃ১২৭-১২৮; তাওজীহুন নাজার ইলা উছূলিল আছার ১/২১৩ ইত্যাদি।

এই আলোচনার করার উদ্দেশ্য হলো, নারীদের নামাজের পার্থক্য সংবলিত কিছু হাদিসকে জয়ীফ বলে উম্মাহর হাজার বৎসর যাবত চলে আসা আমালে মুতাওয়ারাসাহকে অস্বীকার করা হয়েছে।  অথচ এই নামাজের পার্থক্য রাসূল সা. এর যামানা থেকেই ক্রমধারায় চলে আসছে। ১৫০ হিজরীর মধ্যে লেখা অনেক কিতাবে “নারীদের নামাজের পার্থক্য” শিরোনামে হাদিসও বর্ণিত হয়েছে।

 

আগামী পর্বে ইনশা আল্লাহ, নারীদের নামাজের পার্থক্য এর দলীলগুলো নিয়ে আলোচনা হবে!


 

২য় পর্বের লিংক https://adarshanari.com/ibadaat/namaz/8197/

৩য় পর্বের লিংক https://adarshanari.com/ibadaat/namaz/8203/

৪র্থ পর্বের লিংক https://adarshanari.com/ibadaat/namaz/8209/

৫ম পর্বের লিংক https://adarshanari.com/ibadaat/namaz/8214/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: