বিশেষ নেকী অর্জনের কিছু আমল

মুহাম্মদ আমিনুল হক সুনামগঞ্জী


ফরজ আমল তো অপরিহার্য, তা আদায় করতেই হবে এবং ছাওয়াবও লাভ হবে আশাতীত। অবশ্য ফরজ আমল নিয়মের চেয়ে বেশী করার জো নেই। কিন্তু কিছু মুস্তাহাব ও নফল আমল এমন রয়েছে যে, অল্প মেহনতে অনেক নেকী অর্জন করা যায় এবং এগুলোর কোন কোনটা অনেক বেশী বেশী আদায় করে অর্জন নেকী অর্জন সম্ভব।
এ ধরনের কিছু ফজীলতপূর্ণ আমলের বর্ণনা সম্বলিত রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর হাদীস-বাণী নিম্নে পেশ করা হলো, যাতে অবসরে ন্কেী অর্জনের প্রত্যাশীগণ সময়কে ভালো কাজে লাগিয়ে অতীব লাভবান হতে পারেন :
হাদীস নং ১ :

হযরত আবু হুরাইরা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, “উজু করার সময় ‘ بِسْمِ اللهِ وَالْحَمْدُ لِلهِ (বিসমিল্লাহি ওয়াল-হামদুলিল্লাহ)’ বলে শুরু করো। এর বরকতে যতক্ষণ উজু থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত নেক আমল লেখার কাজে নিয়োজিত ফেরেশতাগণ তোমার আমলনামায় নেকী লিখতে থাকবেন।” (মা‘আরিফুল হাদীস, ৩য় খণ্ড, ১২১ পৃষ্ঠা)

হাদীস নং ২ :

রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, “মিসওয়াকসহ উজু করে দুই রাক‘আত নামায আদায় করা মিসওয়াকবিহীন সত্তুর রাক‘আত নামাযের চেয়ে উত্তম।” (বাইহাকী শরীফ, হাদীস নং ২১৮)
উজুর সময় মিসওয়াক করা সুন্নাত। তবে সে সময় মিসওয়াক কাছে না থাকলে, উক্ত ফজীলত লাভের নিয়তে আঙ্গুল দিয়ে মিসওয়াক করবে। এতেও আশা করা যায়, সুন্নাত আদায় হবে। (ফাতাওয়া আলমগীরী)
হাদীস নং ৩ :

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, হযরত রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, “জামা‘আতের সাথে নামায আদায় করার দ্বারা একা নামায আদায় করার চেয়ে সাতাশ গুণ বেশী সাওয়াব পাওয়া যায়।” (সহীহ বুখারী)
আবার ফরজ নামায ওয়াক্তী মসজিদে আদায় করা সাতাশ গুণ বেশী এবং জামে মসজিদে আদায় করা পাঁচশত গুণ বেশী ছাওয়াব বলে অন্য হাদীসে রয়েছে। অবশ্য পুরুষদের জন্য মসজিদে নামায জামা‘আতের সাথে ফরজ নামায আদায় করা ওয়াজিব এবং মহিলাদের জন্য মসজিদে না গিয়ে ঘরে নামায আদায় করা কর্তব্য। আর এতে মহিলাগণ মসজিদে না গিয়েও বেশী ছাওয়াব লাভ করবেন এভাবে যে, তারা বাড়ীর ভিতরের যত গহিনের কুঠরীতে সংগোপনে নামায পড়বেন, তারা ততবেশী ফজীলত লাভ করবেন বলে অপর হাদীসে রয়েছে।
হাদীস নং ৪ :

হযরত উসমান বিন আফফান (রা.) বর্ণনা করেন, নবী কারীম (সা.) ইরশাদ করেছেন, “যারা ইশার নামায জামা‘আতের সাথে আদায় করে, তারা যেন অর্ধেক রাত্রি দাঁড়িয়ে ইবাদত করল। অতঃপর যারা ফজরের নামায জামা‘আতের সাথে আদায় করল, তারা যেন (অবশিষ্ট অর্ধেক রাত্রি নামায আদায়ের ছাওয়াব লাভ করে) সমগ্র রাত্রিই ইবাদতে কাটিয়ে দিল।” (সহীহ মুসলিম, ১ম খণ্ড, কিতাবুস সালাহ)
হাদীস নং ৫ :

হযরত আউস ইবনে আউস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলে কারীম (সা.) ইরশাদ করেছেন, “যে ব্যক্তি অন্যদিনের তুলনায় জুমু‘আর দিন ফজরের সময় ঘুম থেকে আগে উঠবে, জুমু‘আর জন্য গোসল করবে, উত্তম ও পরিষ্কার পোশাক পরবে, খুশবু ব্যবহার করবে, আযানের পূর্বে পায়ে হেঁটে মসজিদে যাবে, ইমাম সাহেবের কাছাকাছি বসবে, মনোযোগ সহকারে খুৎবাহ শ্রবণ করবে এবং খুৎবার সময় অহেতুক কথা ও বাজে কাজ করবে না, তার প্রতি কদমে একবছর নফল রোযা ও একবছর নফল নামাযের ছাওয়াব আল্লাহ তা‘আলা দান করবেন।” (মিশকাতুল মাসাবীহ)
হাদীস নং ৬ :

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, নবী কারীম (সা.) ইরশাদ করেছেন, “যে ব্যক্তি কুরআনের একটি অক্ষর পাঠ করলো, তার বিনিময়ে সে একটি নেকী লাভ করল এবং এই একটি নেকী দশটি নেকীর সমতুল্য।” অন্যত্র আরো বলেন, “আমি বলছি না যে, আলিফ-লাম-মীম মিলে একটি হরফ। বরং আলিফ একটি হরফ, লাম একটি হরফ এবং মীম একটি হরফ।” (তিরমিযী শরীফ)

অর্থাৎ শুধু আলিফ লাম মীম-এতটুকু তিলাওয়াত করলেই ত্রিশ নেকী হয়ে যায়। এভাবে কুরআন তিলাওয়াতে অনেক নেকী লাভ করবে।
হাদীস নং ৭ :

হযরত আবু যর (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন–“হে আবু যর! তুমি যদি সকাল বেলা কুরআন শরীফ থেকে একটি আয়াত শিক্ষা করো, তবে তা একশত রাক‘আত নফল নামায পড়া থেকে উত্তম হবে। আর যদি ইলমের একটি অধ্যায় শিক্ষা করো, চাই এ সময় এর উপর আমল করা হোক বা না হোক, তবে তা হাজার রাক‘আত নফল নামায পড়া থেকে উত্তম হবে।” (সুনানে ইবনে মাজাহ)
হাদীস নং ৮ :

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, “যখন কোন নেককার সন্তান তার মাতা-পিতার প্রতি রহমতের দৃষ্টিতে তাকায়, তখন আল্লাহ তা‘আলা তার প্রতিটি দৃষ্টির বিনিময়ে তার আমলনামায় একটি মকবুল হজ্ব লিপিবদ্ধ করেন।” সাহাবীগণ আরজ করলেন, যদি সে দৈনিক একশতবার দৃষ্টি করে (তাতে কি একশত হজ্বের ছাওয়াব পাবে)? নবীজী (সা.) বললেন, হ্যাঁ। আল্লাহ তা‘আলা অতি মহান, অতি পবিত্র।” (সুনানে বাইহাকী)
হাদীস নং ৯ :

হযরত মা‘কাল বিন ইয়াসার (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, “যে ব্যক্তি সকালে তিনবার ‘আ‘উযুবিল্লাহিস সামী‘ইল ‘আলীমি মিনাশ শাইত্বনির রজীম’ পাঠ করার পর সূরাহ হাশরের শেষ তিন আয়াত পাঠ করবে, তার জন্য আল্লাহ তা‘আলা সত্তর হাজার ফেরেশতা নিযুক্ত করবেন। সন্ধ্যা পর্যন্ত তাঁরা তার জন্য দু‘আয়ে মাগফিরাত করবে। সেদিন সে মারা গেলে শহীদের মৃত্যু হাসিল হবে। যে ব্যক্তি সন্ধ্যায় এভাবে পাঠ করবে, সেও সকাল পর্যন্ত এই মর্তবা লাভ করবে। অর্থাৎ সত্তর হাজার ফেরেশতা তার জন্য সকাল পর্যন্ত রহমতের দু‘আ করতে থাকবেন এবং ওই রাত্রে সে মারা গেলে শহীদের মৃত্যু হাসিল হবে।” (জামি‘ তিরমিযী)
এ ধরনের ফজীলতময় আমলের আরো বহু হাদীস রয়েছে। এ সকল হাদীসের ওপর আমল করলে তেমন কষ্ট হয় না, অথচ নেকী অর্জিত হয় অনেক। তাই আমাদের সময় ও সুযোগকে কাজে লাগিয়ে এসকল হাদীসের উপর আমল করে বেশী বেশী নেকী অর্জন করা প্রয়োজন।

আপনার মন্তব্য