হিন্দু থেকে মুসলমান হলেন অঞ্জুদেবী

muslima women

ভারত উপমহাদেশে ইসলাম এসেছিল ইসলামের দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমর (রা.)-এর খিলাফতকালে। সাহাবায়ে কিরামের (রা.) অক্লান্ত পরিশ্রমে মানুষ এ সত্য ধর্ম লাভ করেছে। অতঃপর তাবেয়ীদের থেকে শুরু করে অদ্যাবধি এখানে ইসলামের দাওয়াত অবিরাম চলতে থাকে। কিন্তু গত শ’দেড়েক বছর আগে বৃটিশ উপনিবেশের সময় দ্বীনের দাওয়াতে কিছুটা ভাটা পড়ে।

তথাপি আল্লাহ তা‘আলা সর্বকালে ইসলামকে বিজয়ী ধর্মরূপে প্রতিষ্ঠিত রেখেছেন তাঁর প্রিয় বান্দাগণের দাওয়াতী মেহনতের বদৌলতে। তেমনি দ্বীনের জন্য নিবেদিতপ্রাণ আল্লাহওয়ালা বুযুর্গ মাওলানা কালিম সিদ্দিকী সাহেবের মেহনতে ভারতে উচ্চমহল থেকে শুরু করে নি¤œমহল পর্যন্ত সকল পর্যায়ের মানুষ ধীরে ধীরে ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিচ্ছেন।

হযরত মাওলানা কালিম সিদ্দিকী সাহেবের মাধ্যমে ইসলামে দীক্ষিত হওয়া অনেক নও মুসলিমের সাক্ষাৎকার ছাপা হয়েছে ভারতের ফুলাত থেকে প্রকাশিত মাসিক আরমুগান পত্রিকায়। এমনি এক সাক্ষাতকার হলো নওমুসলিম মহিয়সী নারী আমেনার। যা আমার কাছে খুবই হৃদয়গ্রাহী মনে হয়েছে। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন মাওলানা কালিম সিদ্দিকীর মেয়ে সিদরাতু যাতিল ফাইজাইন। সেই সাক্ষাতকারটি অনুবাদ করে এখানে মাসিক আদর্শ নারীর পাঠক-পাঠিকাগণের নিকট তুলে ধরলাম

সিদরাহ : আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ্।
আমেনা : ওয়া ‘আলাইকুমুস সালামু ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ্।
সিদরাহ : বোন আমেনা! এটা আল্লাহ তা‘আলার একটি হিদায়াতের বিস্ময়কর নিদর্শন। তিনি আপনাকে মূর্তিপুজারী পরিবারে হিদায়াতের আলো দেখিয়েছেন। আপনার সঙ্গে সাক্ষাতের পরম আগ্রহ ছিল। আপনাকে দেখে এবং আপনার সাথে কথা বলতে পেরে খুবই ভালো লাগছে। আব্বাজান তার আলোচনায় প্রায়ই আপনার কথা বলেন।
আমেনা : (চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে) বোন সিদরাহ! কোনো সন্দেহ নেই, আমার প্রতি করুণাময় সৃষ্টিকর্তার অনুগ্রহ অনেক। তিনি অনুগ্রহ করে বিভিন্ন দুয়ারের পূজা থেকে মুক্তি দিয়েছেন। আশ্রয় দিয়েছেন তাঁর দুয়ারে। দু‘আ করুন, আল্লাহ তা‘আলা যেন আমরণ ঈমানের উপর অটল রাখেন এবং আমার প্রতি সন্তুষ্ট থাকেন।
সিদরাহ : বোন! আব্বাজান আপনাকে এখানে বিশেষভাবে এ কারণে ডেকেছেন, আমি যেন ‘আরমুগান’-এর পক্ষ থেকে আপনার সঙ্গে কিছু কথা বলি। ফুলাত থেকে ‘আরমুগান’ নামে একটি মাসিক পত্রিকা বের হয়। গত কয়েক বছর যাবত এতে নওমুসলিমদের সাক্ষাতকার ছাপা হচ্ছে। আব্বাজান আপনাকে ডেকেছেন, আমি যেন আপনার সঙ্গে আপনার ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে কথা বলি।
আমেনা : হযরত আমাকেও একথা জানিয়েছেন। বলুন, আপনি কী জানতে চান?
সিদরাহ : প্রথমেই আমি আপনার কাছে আপনার ব্যক্তিগত পরিচয় জানতে চাচ্ছি।
আমেনা : বর্তমান পৃথিবীর সবচে বড় মূর্তিপূজার দেশ হিসেবে পরিচিত ভারতের ঋষিকেশ আমার জন্মস্থান। ঋষিকেশে চারটি বড় আশ্রম আছে। এই আশ্রমগুলোর একটির প্রধান আমার আব্বা। তিনি একজন বিখ্যাত ব্যক্তি। তাকে ভারতবর্ষে শীর্ষস্থানীয় একজন প-িত হিসেবে গণ্য করা হয়।
আমার জন্ম ১৯৮৫ সালের ২০ এপ্রিল। আমার পরিবারের লোকেরা আমার নাম রেখেছিল ‘অঞ্জুদেবী’। আমার দু’জন বড় ভাই রয়েছে। আমার প্রাথমিক লেখাপড়া হয়েছে ঋষিকেশের ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে। স্কুলটি আমার আব্বার ট্রাস্টের অধীনে পরিচালিত।
হাইস্কুল পাস করার পর আমি বিজ্ঞানে ইন্টারমিডিয়েট করেছি। তারপর বিএসসি করেছি। এ বছর এমএসসি পড়ছি।
সিদরাহ : আপনার ইসলাম গ্রহণের ঘটনাটি শোনাবেন কি?
আমেনা : বোন! কী বলব, আল্লাহ তা‘আলার অশেষ রহমত ও করুণা আমাকে ঢেকে নিয়েছে। আল্লাহ তা‘আলার মহাশক্তি ও শান বর্ণনাতীত। তিনি রাতের অন্ধকার থেকে দিনকে বের করে আনেন। ঠিক এভাবেই আমাকেও মূর্তিপূজার অন্ধকার থেকে ঈমানের আলোয় নিয়ে এসেছেন।
একবার আমাদের আশ্রমে ভিন্ন একটি দুর্ঘটনা ঘটে। এক হিন্দু বোন তার যুবতী মেয়েকে নিয়ে আশ্রমে পূজা করতে যায়। আশ্রমের একজন সাধু তাকে কিছু দেয়ার কথা বলে ভেতরে নিয়ে যায়। তারপর তার সঙ্গীদের নিয়ে আগন্তুক মা ও মেয়েকে ধর্ষণ করে।
পরে বিষয়টি যখন আশ্রমে জানাজানি হয়, তখন আমিও জানতে পারি। আমি আমার আব্বাকে বলি, আপনার আশ্রম এই সাধু-সন্ন্যাসীদের-সহ জ্বালিয়ে দেয়া উচিত। বরং আমাদের-সহ আপনার জ্বলে মরা উচিত। কারণ, আপনি এই আশ্রমের নিয়ন্ত্রক।
মূলত এই ঘটনার পর থেকে আশ্রমের প্রতি আমার ঘৃণা জন্ম নেয়। আমি আশ্রমে গিয়ে পূজা করা ছেড়ে দিই।
এরপর এক রাতের ঘটনা। আমি ঘুমিয়ে আছি। স্বপ্নে দেখি, পূজা করতে আশ্রমে গিয়েছি। আর তখনই দু’জন সাধু আমার পিছু নিয়েছে। তারা আমাকে ধরে তাদের কক্ষে নিতে চাচ্ছে। আমি কোনভাবে নিজেকে ছাড়িয়ে পালাতে চেষ্টা করি। তখন তারাও আমার পিছু নেয়। এভাবে মাইলের পর মাইল আমি ছুটতে থাকি। দু’জন সাধুর একজনের নাম মহারাজ। তার বয়স পঞ্চাশ বছর। আশ্চর্য, সেও আমার পেছনে ছুটছে।
অবশেষে আমি ক্লান্তিতে প্রায় অবশ হয়ে পড়েছি। আমাকে নিশ্চিত ধরে ফেলবে এবং আমার সম্ভ্রমহানি করে ছাড়বে। এ ভয়ে আমি গুটিয়ে গিয়েছি।
আমি যখন এ অবস্থায়, ঠিক তখনই লক্ষ্য করলামÑসেখানে একটি ছোট্ট একটি মসজিদ রয়েছে। মসজিদের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন একজন মাওলানা সাহেব। তার মাথায় টুপি ও চোখে চশমা। তিনি আমাকে বললেন, বেটি! এদিকে চলে এসো। মসজিদের ভেতরে এসে পড়ো। আমি কোনো রকমে নিজেকে বাঁচিয়ে মসজিদে ঢুকে পড়লাম। তখন মাওলানা সাহেব দরজা বন্ধ করে দিলেন। এরপর তিনি আমাকে স¯েœহে বললেন, ‘বেটি! এখানে তোমার কোনো ভয় নেই। এটা তোমার ঘর। এখানে তোমার দিকে কেউ মন্দ দৃষ্টিতে তাকাতেও পারবে না।’ এ পর্যন্ত এসে ঘুম ভেঙ্গে গেল।
আমার অবস্থা তখন ভিন্ন রকম হলো। রাত তখন তিনটা। তারপর থেকে সকাল পর্যন্ত আর ঘুমাতে পারলাম না।
স্বপ্নটি আমার কাছে বাস্তব ঘটনা বলে মনে হতে লাগলো। মনে হলো, বাস্তবেই আমি এমন এক ঘটনার শিকার হয়েছি। আমার অবস্থা তখন ভয়াবহ।
সকাল দশটার দিকে মনে হলো, এই প-িতদের হাত থেকে আমার সম্ভ্রম রক্ষা পাবার নয়। আমাকে কোনো মাওলানার খুঁজে বের হতে হবে। হয়তবা ইসলামই আমার সম্ভ্রম রক্ষা করতে পারবে।
তারপর আমি নিজেকে সান্ত¦না দেয়ার চেষ্টা করলাম। ভাবলাম, এটাতো একটা স্বপ্ন মাত্র। বাস্তব তো নয়। কিন্তু পরক্ষণেই আমার কাছে মনে হচ্ছিল, ভেতর থেকে কে যেন আমাকে প্রবলভাবে ঝাঁকুনি দিচ্ছে। হোক না স্বপ্ন। এটা শত সত্যের চেয়েও সত্য।
আমি যখন এরকম একটা দ্বন্দ্বের মধ্যে ঘোরপাক খাচ্ছিলাম, তখন আমার মন বলল, আচ্ছা, আমি আমার ফোনটা ঘুরিয়ে দেখি না। যদি কোনো মুসলমানের সাথে আমার ফোনের সংযোগ হয়ে যায়, তাহলে বুঝবো, ইসলাম ধর্মেই আমার সম্ভ্রম রক্ষা পাবে। তখন আমার মুসলমান হয়ে যাওয়া উচিত হবে। আর যদি আমার ফোনের সংযোগ কোনো হিন্দুর সাথে হয়, তাহলে বুঝবোÑএটা নিছক একটা স্বপ্ন। এ সময় মনে মনে আমি আমি আমার সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করলাম। প্রার্থনা করলাম, মালিক! তুমি আমার কাছে সবকিছু পরিষ্কার করে দাও। আমাকে এই দ্বন্দ্ব থেকে উদ্ধার করো।
তারপর ফোন দিলাম। রিং হলো। রিসিভ করা মাত্র জিজ্ঞেস করলামÑআপনি কে বলছেন? ওপাশ থেকে জবাব এলো, মাহমুদ বলছি। আমি বললাম, কোথা থেকে বলছেন? তিনি বললেন, মোজাফফরনগর থেকে। বললাম, আমি মুসলমান হতে চাই।
তিনি বললেন, কেন মুসলমান হতে চান? আমি বললাম, ইসলাম সত্য ধর্ম, আমার মনে হয়, ইসলামের মধ্যেই আমার সম্ভ্রম রক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। এ জন্যই আমি মুসলমান হতে চাই।
তিনি পাল্টা প্রশ্ন করলেন, আপনি কোথা থেকে বলছেন? বললাম, ঋষিকেশ থেকে বলছি। তিনি তখন বললেন, মুসলমান হতে চাইলে ফুলাত যেতে হবে। সেখানে আমাদের মাওলানা হযরত থাকেন। তাঁর নাম মাওলানা কালিম সিদ্দিকী।
এরপর তিনি বললেন, ফুলাত হচ্ছে মোজাফফরনগরের একটি গ্রামের নাম। আপনাকে কি আমি তাঁর ফোন নাম্বার দিব? আমি বললাম, এখনই দিয়ে দিন। তিনি বললেন, এখন আমার কাছে নেই, আমি খুঁজে দেখছি। আপনি এক ঘণ্টা পর ফোন করুন।
এ সময় আমি তাকে বললাম, আচ্ছা, আমি যদি মুসলমান হই, তাহলে তো আমার পরিবারের লোকেরা আমাকে জায়গা দেবে না। তখন আমি কোথায় যাবো? তিনি বললেন, আমার স্ত্রী আছে, ঘরে লোকজন আছে, যদি আপনি মুসলমান হন, তাদের সাথে আমার এখানেই থাকতে পারবেন। আমি বললাম, এই অঙ্গীকার ভুলে যাবেন না যেন। তিনি বললেন, অবশ্যই মনে থাকবে ইনশাআল্লাহ।
আমি তখন চরম অস্থিরতায় কাঁপছি। এক ঘণ্টা অপেক্ষা করা আমার জন্য খুবই কঠিন হয়ে পড়লো। পঞ্চাশ মিনিট পার হতেই ফোন করে বসি। কিন্তু তখনও তিনি মাওলানা সাহেবের ফোন নাম্বার যোগাড় করতে পারেননি। তারপর এক ঘণ্টা পরপর ফোন করতে থাকি এবং ক্ষমা চেয়ে বলি, আমি আপনাকে পেরেশান করছি। কিন্তু কী করবো, ইসলাম গ্রহণ ছাড়া আমি থাকতে পারছি না। তিনি বললেন, আপনাকে আর ফোন করতে হবে না। সকালে আমিই আপনাকে ফোন করব।
রাতটা খুব কষ্টে পার হলো। সকাল ন’টা পর্যন্ত অপেক্ষায় থাকলাম। তারপর নিজেই ফোন করলাম। তিনি বললেন, এখনো ফোন নাম্বার সংগ্রহ করতে পারিনি। বাডুলিতে একজন লোক পাঠিয়েছি, সে ফোন নাম্বার নিয়ে এলেই আমি আপনাকে ফোন দিব।
এরপর সাড়ে এগারটায় তিনি ফোন দিলেন। ফোন বাজতেই আমি রিসিভ করলাম। তিনি আমাকে মাওলানা সাহেবের নম্বর দিলেন। তা পেয়ে আমার হাতে চাঁদ পাওয়ার মতো অবস্থা হলো।
আমি তৎক্ষণাত সেই নাম্বারে ফোন করলাম। সরাসরি মাওলানা সাহেব রিসিভ করলেন এবং বললেন, আস্সালামু আলাইকুম। আমি বললাম, জ্বি সালাম। আপনি কি মাওলানা সাহেব বলছেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ, কালিম সিদ্দিকী বলছি। বললাম, আমি মুসলমান হতে চাই। তাই আপনার ওখানে আসতে চাই। তিনি বললেন, এখানে আপনি কীভাবে আসবেন? বললাম, আমি ঋষিকেশে, আমি একাই আসতে পারবো। মাওলানা সাহেব বললেন, আপনি ফোনেই কালিমা পড়ে নিন। তিনি এও বললেন, ফোনে মুসলমান হওয়া যায়। আর যাবে না কেন, মহান সৃষ্টিকর্তা তো আপনার অন্তরের কথা সবই জানেন। তাঁকে হাজির-নাজির মনে করে কালিমা পড়ে নিন। আর শপথ করুন, আমি মুসলমান হয়ে কুরআন শরীফ এবং আল্লাহ তা‘আলার সত্য নবীর বর্ণিত পথে জীবন যাপন করবো।
আমি বললাম, তাহলে আমাকে কালিমা পড়িয়ে দিন। তখন মাওলানা সাহেব আমাকে কালিমা পড়িয়ে দিলেন এবং বললেন, হিন্দীতে এর অর্থটাও জেনে নিন। কিন্তু কথা শেষ হওয়ার আগেই ফোন কেটে গেল। ব্যালেন্স শেষ হয়ে গিয়েছিল।
আমি দ্রুত দোকানে গেলাম এবং ফোনে টাকা রিচার্জ করলাম। কিন্তু তারপর আর ফোনে মাওলানা সাহেবকে পাচ্ছি না। আমার তখন কী যে অস্থিরতা! পারলে নিজেই নিজেকে অভিশাপে জ্বালিয়ে ফেলি।
আমি স্বখেদে বলতে থাকি, অঞ্জু! তোমার মনে নিশ্চয়ই কোনো খুঁত ছিল, এজন্যই তোমার ঈমান অপূর্ণ রয়ে গেল। আমি আমার পালনকর্তার কাছে প্রার্থনা করতে লাগলাম। ডাকতে লাগলাম, হে সত্য মালিক! তুমি আমার সামনে ঈমানের প্রদীপ জ্বালিয়েছো। আমি তো অপবিত্র, ঈমানের উপযুক্ত নই। কিন্তু তুমি তো দাতা। যাকে খুশি তাকে ভিক্ষা দিতে পার। তুমি আমাকে ঈমান ভিক্ষা দাও।
তৃতীয় দিন আমি কেঁদে কেঁদে আমার মালিকের কাছে প্রার্থনা করলাম। তারপর ফোন করতেই মাওলানা সাহেবকে পেয়ে গেলাম। তাকে পেয়ে যারপরনাই খুশি হলাম এবং বললাম, মাওলানা সাহেব! আত্মার অপবিত্রতার কারণে আমার ঈমান অপূর্ণ রয়ে গিয়েছিল। মোবাইলের পয়সা শেষ হয়ে গিয়েছিল। তারপর আমি অবিরাম চেষ্টা করতে থাকি, কিন্তু আপনাকে কোনভাবেই পাচ্ছিলাম না। মাওলানা সাহেব অত্যন্ত দরদের সাথে আমাকে বললেনÑবেটি! আপনার ঈমান পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। আমিই আপনাকে ফোন করবো ভাবছিলাম, কিন্তু তখন একটি জরুরী প্রোগ্রামে যাচ্ছিলাম। আমার এক সফরসঙ্গী একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আমার সাথে কথা বলছিলেন। যে কারণে ফোন করতে পারিনি। তারপর ব্যস্ততা এতই বেশী ছিল যে, ফোন মাঝে মাঝে নামে মাত্র খুলেছি।
আমি বললাম, এবার আমাকে পুনরায় কালিমা পড়িয়ে দিন। কিন্তু এ সময় আমার ফোন আবার কেটে গেল।
আমার অবস্থা তখন ভয়াবহ। দম বন্ধ হবার উপক্রম। আমি মালিকের কাছে প্রার্থনা করতে লাগলাম, মালিক আজও কি আমার ঈমান অপূর্ণ থেকে যাবে?
ঠিক এমন সময় মাওলানা সাহেবের ফোন এলো। আনন্দিত হয়ে ফোন রিসিভ করলাম। মাওলানা সাহেব বললেন, আমিই আপনার ফোন কেটে দিয়েছি। যদি আবার পয়সা শেষ হয়ে যাওয়ার কারণে ফোন বন্ধ হয়ে যায়, তাই তা যেন না হয়। তারপর তিনি বললেন, কালিমা পড়–ন। আমি কালিমা পড়লাম। হিন্দীতে অঙ্গীকার করলাম। তিনি আমাকে কুফর, শিরকসহ সব ধরনের পাপ থেকে তাওবা করালেন। আল্লাহ ও তাঁর নবীর আনুগত্যের উপর শপথ করালেন।
তারপর মাওলানা সাহেব প্রশ্ন করলেন, আমার ফোন নাম্বার আপনাকে কে দিয়েছে? বললাম, মোজাফফরনগরের মাহমুদ সাহেব। তিনি বললেন, আপনি এখন কী করবেন? বললাম, আমি সবকিছু আগেই ভেবে রেখেছি। মাহমুদ সাহেব কথা দিয়েছেন, তিনি আমার দেখাশুনার দায়িত্ব নেবেন। মাওলানা সাহেব আমাকে অনেক দু‘আ দিলেন এবং বললেন, যেকোন সমস্যায় প্রয়োজনে আমাকে ফোন দিতে পারেন।
সিদরাহ : ইসলাম গ্রহণের পর আপনি কী করলেন? কোথায় অবস্থান নিলেন?
আমেনা : মাহমুদ সাহেবকে ফোন করলাম। বললাম, আমি তো মুসলমান হয়ে গেছি। তিনি বললেন, কিভাবে? বললাম, হযরত ফোনেই আমাকে কালিমা পড়িয়ে দিয়েছেন। আর বলেছেন, ফোনে আর সাক্ষাতে কালিমা পড়ার মাঝে কোন পার্থক্য নেই। এরপর বললাম, এখনতো আমি ঋষিকেশে থাকতে পারবো না। আমার ঈমান আমাকে রক্ষা করতে হবেÑযা এখানে থেকে সম্ভব নয়।
তিনি বললেন, বেটি! আপনি আমাদেরকে দেখেননি আর আমরাও আপনাকে দেখিনি। আপনার পরিচয় কী? আপনার বাবা কী করেন? বললাম, আমার আব্বা ঋষিকেশের একটি বড় আশ্রমের প-িত। আমি এখন এমএসসি পড়ছি।
তিনি বললেন, বেটি! আপনি অত্যন্ত বড় ঘরের মেয়ে। আমি গরীব মানুষ। আমি বললাম, আপনার ঘরে এসে আমি মজদুরি করে খাবো। তিনি বললেন, আপনি কি গোশত খান? বললাম, গোশতের প্রতি আমার এক ধরনের ভয় আছে। তবে খুব তাড়াতাড়িই খেতে শুরু করবো। তিনি বললেন, আমার একটি মুরগীর দোকান আছে। তাছাড়া আমি একজন কসাই মানুষ। আমার প্রতিদিনকার আয় একশ’ রুপি। এত অল্প রোজগারের সংসারে আপনি আমাদের সাথে কীভাবে থাকবেন? বললাম, আমিও কসাই হয়ে যাবো। তিনি বললেন, দেখুন বেটি, আপনি অত্যন্ত উঁচু বংশের মেয়ে। আপনি আমাদের সাথে থাকতে পারবেন না। আমি বললাম, দেখুন, ইসলামে অঙ্গীকার ভঙ্গ করা অপরাধ। তিনি বললেন, আমি হযরতের সাথে পরামর্শ করে আপনাকে জানাচ্ছি।
সিদরাহ : তারপর কী হলো?
আমেনা : মাহমূদ সাহেব মাওলানা কালিম সাহেবকে ফোন করলেন। বললেন, আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করা খুবই জরুরী হয়ে পড়েছে। মাওলানা সাহেব বললেন, আমার অবিরাম সফর চলছে। অন্ততঃ দুই সপ্তাহ পর ফুলাত আসবো। মাহমূদ সাহেব বললেন, আপনি যখন মুম্বাই থাকবেন, তখন আমি আপনার সঙ্গে দেখা করবো। হযরত কালিম সাহেব তখন বললেন, আপনার গ্রামের পাশে রাধোরা গ্রামে আমার প্রোগ্রাম আছে। আপনি সেখানে আসুন।
মাহমূদ সাহেব সেখানে গেলেন এবং পুরো কাহিনী খুলে বললেন। মাওলানা সাহেব বললেন, আপনার দ্বীনের কাজের বড় সুযোগ এসেছে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মেয়েটিকে নিয়ে আসুন। যদি এর জন্য পুরো পরিবারকে বিড়ম্বনায় পড়তে হয়, তবুও এমন একটা মেয়েকে হিফাজত করা উচিত। আর এও বলে দিলেন, তার নাম রাখবেন আমেনা।
তারপর মাওলানা কালিম সাহেব তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনার ঘরে কে কে আছেন? মাহমূদ সাহেব বললেন, আমার স্ত্রী আছে। আর আমার দুই ছেলে ছিলো। একজন মারা গিয়েছে। বর্তমানে একজন আছে। মাওলানা সাহেব বললেন, ছেলেটির বয়স কত? মাহমূদ সাহেব বললেন, ১৫ বছর। মাওলানা সাহেব বললেন, তাহলে যদি সম্ভব হয়, মেয়েটিকে আপনার ছেলের সাথে বিয়ে দিয়ে আপনার ঘরে রেখে দিন। এতে তার ভাল হিফাজত হবে। এরপর বিয়ে-শাদী সংক্রান্ত কাগজপত্রের জন্য কয়েকজন উকিলের ঠিকানা দিয়ে দিলেন।
এদিকে মূর্তিপূজারী পরিবেশে অবস্থান করা আমার জন্য কষ্টকর হয়ে পড়লো। এখানকার প্রতিটি মুহূর্ত আমার কাছে একেকটি মাস মনে হচ্ছিল। নিজেকে কোনভাবেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিলাম না।
দু’দিন পর ঠিকানা জোগাড় করে আমি নিজেই মাহমূদ সাহেবের ঘরে পৌঁছে গেলাম। সেখানে দু’দিন থাকলাম। তারপর ধর্ম পরিবর্তনের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র করার জন্য তিনি আমাকে নিয়ে মিরাঠে গেলেন। সাথে তার একজন মাহরাম নিলেন। যাতে আমাকে নিতে কোন অসুবিধা না হয়।
পথে হযরত মাওলানা কালিম সাহেবের সাথে সাক্ষাতের ব্যবস্থা হয়। আমার ভাগ্য খুবই ভালো ছিল, হযরত তখন ফুলাতেই ছিলেন। বোন সিদরাহ! আমি ভাষায় ব্যক্ত করতে পারবো না, হযরত কালিম সাহেবকে দেখার পর আমার অনুভূতি কী হয়েছিল! আমি শিশুর মতো হু হু করে কেঁদে ফেলেছিলাম। তার দিকে তাকিয়ে দেখছিলাম, স্বপ্নে যিনি আমাকে মসজিদে আশ্রয় দিয়েছিলেন, উনি সেই মাওলানা। সেই চশমা, সেই টুপি। আমি তখন বারবার বলতে থাকি, আপনিইতো সেই মাওলানা। তখন আমি প্রচ- আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলাম। মাওলানা সাহেব আমাকে প্রবোধ দিলেন।
সেখান থেকে আমরা মিরাঠ গেলাম। আমার ইসলাম গ্রহণ সংক্রান্ত কাগজপত্র সম্পন্ন করলাম। আলহামদুলিল্লাহ, সহজেই সব কাজ সমাধা হলো।
এরপর এক মাসের ভিতরে নামায শিখে নিলাম। প্রতিদিন ফাজায়েলে আমাল পড়তাম এবং অন্যান্য দ্বীনী বই পড়তাম।
তারপর মাওলানা কালিম সাহেবের পরামর্শ মতো মাহমূদ সাহেব তার ছেলের সাথে আমার বিয়ের ব্যবস্থা করলেন। আমি তাদের পরিবারের একজন হয়ে সেখানে বসবাসের সুযোগ পেলাম আলহামদুলিল্লাহ।
সিদরাহ : আপনি চলে আসার পর আপনার পরিবার কি আপনাকে খুঁজেননি বা তখন তাদের কী অবস্থা হয়েছিলো?
আমেনা : আমি চলে আসার পর তারা আমাকে হন্যে হয়ে খুঁজেছেন। কিন্তু কোথাও সন্ধান পাননি। শেষে থানায় ডিজি করেন এবং দূর-দূরান্তেও খোঁজ চালান।
এদিকে মাহমূদ সাহেবের এক নিকট আত্মীয় কোন এক বিষয়ে তার সাথে বিরোধ ছিল, আমার বিষয়টি সে জানতে পারে। তখন সে থানায় গিয়ে অভিযোগ করে যে, এই লোক ঋষিকেশ থেকে একটি হিন্দু মেয়েকে ভাগিয়ে নিয়ে এসেছে। সে কথা শুনে এ এলাকার থানা ঋষিকেশের থানার সাথে যোগাযোগ করে।
তারপর ঋষিকেশ থেকে পুলিশ এসে স্থানীয় পুলিশ সঙ্গে করে আমাকে ও আমার শ্বশুর মাহমূদ সাহেবকে তাদের গাড়ীতে তুলে নেয়। আমাদেরকে ঋষিকেশ নিয়ে যেতে থাকে।
জিপের পিছনে আমি ও মাহমূদ সাহেব বসা। গাড়ী যখন চলছে, তখন আমি মাহমূদ সাহেবকে বললাম, আমি ড্রাইভারকে বলেছি, ড্রাইভার গাড়ী স্লো করবে, সাথে সাথে আপনি লাফিয়ে নেমে পালিয়ে যাবেন। তিনি বললেন, তখন আপনার কী হবে? আমি বললাম, আল্লাহর উপর আস্থা রাখুন। আমার আল্লাহ আমাকে আমার আপন ঠিকানায় পৌঁছে দিবেন।
আমি ড্রাইভারকে ডাকলাম, ড্রাইভার সাহেব! একটু থামুন, একটু থামুন। ড্রাইভার গাড়ী খানিকটা স্লো করলেন। গাড়ীর গতি যখন ষাট কিলোমিটারে নেমে এলো, তখন শ্বশুর আব্বা গাড়ী থেকে লাফিয়ে পড়লেন। তিনি কিছুটা ব্যথা পেয়েছিলেন। কিন্তু পুলিশ গাড়ী থামায়নি। কারণ, গ্রামের লোকেরা পাথর হাতে পেছন থেকে পুলিশকে ধাওয়া করছিল।
সিদরাহ : তারপর কী হলো?
আমেনা : তারপর আল্লাহ আমার ঈমানের পরীক্ষা নিলেন। ফাজায়েলে আমালে লেখা সাহাবায়ে কিরামের ঘটনাগুলো আমি পূর্বেই পড়েছিলাম। এই গল্পগুলোর স্বাদ নেয়ার সুযোগ হলো।
পরিবারের লোকেরা আমাকে প্রচ- শাস্তি দিয়েছে। মহিলা পুলিশ দিয়ে নানাভাবে নির্যাতন করেছে। কিন্তু আমি তাদেরকে বারবার এ কথাই বলেছি, আমার শরীরকে কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলুন, কিন্তু আমার শরীরের রক্তের কণায় কণায় যে ঈমান প্রবেশ করেছে, তা বের করতে পারবেন না। আমার শরীর রক্তাক্ত দেখে যে কেউ কেঁদে ফেলতো। আমাকে যারা মারতো, তাদের চোখেও আমি অশ্রু দেখেছি। কিন্তু আমার কান্না পেত না। বরং আমি এক ধরনের ঈমানের স্বাদ অনুভব করতাম। আমার কাছে মনে হতো যে, আল্লাহর ভালোবাসায় আজ আমি নির্যাতিত হচ্ছি। তিনি আমাকে দেখছেন। আমার প্রতি তিনি কত যে খুশী হচ্ছেন!
আমার মা দু’বার আমার গলা টিপে ধরেছেন। আমার বড় ভাই বারবার আমার দিকে তেড়ে এসেছেন। তবে আমার দূর সম্পর্কের খালা, তার মনটাকে আল্লাহ তা‘আলা কিছুটা নরম করে দিয়েছিলেন, তিনি বারবার আমাকে তাদের হাত থেকে ছাড়ালেন।
তারা আমার বিয়ে-শাদীর ব্যাপারেও চিন্তা করতে লাগলেন। আমি তাদেরকে স্পষ্ট করে বলে দিলাম, আমার বিয়ে হয়ে গেছে। এখন আমি যার, একমাত্র সে ছাড়া আমার গায়ে আর কেউ স্পর্শ করতে পারবে না। মনে রাখুন, এটা মুসলমানের জীবন। আপনাদের আশ্রয়ে লালিত বিলাসীদের জীবন নয়।
তারপর আমি বললাম, আমি আপনাদের এই মুশরিক পরিবেশে বেঁচে থাকতে পারবো না। হয়তো আমাকে মেরে ফেলুন, না হয় এখান থেকে যেতে দিন। আমাকে যদি এখানে রাখতে চান, তাহলে একটাই পথÑআপনারা মুসলমান হয়ে যাবেন।
আমাকে মেরে মেরে তারা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। বরং তারা হেরে গেয়েছিল। আমাকে কয়েকবার বিষ পান করানোর পরিকল্পনাও করা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি।
আবার তারা কয়েকবার মাহমূদ সাহেবের কাছে ফোনও করে যে, এই মেয়েকে এসে নিয়ে যান। যখন তিনি আসার জন্য প্রস্তুত হন, তখন আবার ফোন করে নিষেধ করে দেয়।
একদিন আমার পরিবারের লোকেরা আমাকে খুব মারধর করছিল। আমার সেই খালা খুব কষ্টে আমাকে ছাড়িয়ে নিলেন। ঘরের লোকজন চলে যাবার পর খালা আমাকে বললেন, অঞ্জু! তুই যে মালিকের প্রতি ঈমান এনেছিস, তিনি যদি সত্যিই তোকে ভালোবাসেন, তাহলে তুই তাকে এই কথা কেন বলিস না, ‘হে মালিক! তুমি আমাকে এখান থেকে বের করে নাও।’ খালা একথা বলে চলে গেলেন।
আমি ঘরের দরজা বন্ধ করে উজু করলাম। তারপর দুই রাক‘আত সালাতুল হাজত নামায পড়লাম। অতঃপর প্রাণ খুলে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করলাম, ‘হে আল্লাহ! তোমার প্রতি আমার কোনো অভিযোগ নেই। কারো প্রতি আমার কোনো খেদ নেই। আমার প্রতি তোমার এই করুণা কম কোথায়! তুমি আমার মতো এক গুনাহগারকে শিরকের রাজ্যে ঈমান নসীব করেছো। আমার মতো এক দাসীকে সাহাবীগণের মতো ঈমানের জন্য কষ্ট সহ্য করার সুযোগ করে দিয়েছো। হে আল্লাহ! তুমি তো সমস্ত কষ্টকে আমার জন্য আনন্দের উপাদান বানিয়েছো। কিন্তু হে আল্লাহ! আমার খালা ভাববে, এর খোদা একে চায় না। কিংবা সে হয়তো ভাববে, আমার খোদা কিছু করতে পারে না। হে আল্লাহ! তুমি আমাকে আমার খালার মাধ্যমে আমার ঘরে পৌঁছার ব্যবস্থা করে দাও।
আল্লাহ তা‘আলা আমার দু‘আ কবূল করলেন। আমার পিতাজী কোনো কূল-কিনারা না পেয়ে আশ্রমের লোকদের সাথে পরামর্শ করলেন। তারা পরামর্শ দিল, এই মেয়ে বিধর্মী হয়ে গেছে। এখন তাকে যতই মারধর করা হবে, ততই পুরো ঋষিকেশে এটা নিয়ে সমালোচনা চলবে। তাই সবচেয়ে ভালো হয়, একে নীরবে তার স্বামীর বাড়ীতে পাঠিয়ে দেয়া হোক।
তখন আমার পিতাজী আমার শ্বশুর আব্বাকে ফোন করলেন। বললেন, আপনারা আমাদেরকে ভয় করছেন, আর আমরাও আপনাদেরকে ভয় করছি। ভালো হয় মাঝামাঝি কোন এক জায়গা ঠিক করুন। যেখানে আমরা আসবো অঞ্জুকে নিয়ে। আর আপনারা সেখানে থাকবেন। তারপর উভয় পক্ষ পরস্পর কথা বলে ঠিক করলেন, সাহারানপুর যাবেন। আব্বা তার এক পরিচিত জনের ঠিকানা দিলেন।
পরদিন সকালে আমার পিতা ও খালা আমাকে নিয়ে সাহারানপুর চলে এলেন। আমরা সেই বাসায় উঠলাম। সেখানে আমার শ্বশুর আব্বাও এলেন।
তারপর খুশি মনে আমি আমার স্বামীর বাড়ী চলে এলাম। আমি খালাকে বললাম, খালা দেখলেন, আপনার কথায় আমি আমার আল্লাহকে বললাম। আর সঙ্গে সঙ্গে তিনি আমার মুক্তির ব্যবস্থা করে দিলেন এবং আমার পিতাজীকে বাধ্য করলেন আমাকে এখানে পৌঁছে দিতে। খালা বলুন, এমন আল্লাহর প্রতি ঈমান না এনে থাকা যায়? আমার কথায় খালা খুবই আশ্চর্য হলেন।
এই সুযোগে সাহারানপুর থাকতেই আমি আমার খালাকে ঈমানের দাওয়াত দিলাম। আল্লাহর শোকর, তিনি সঙ্গে সঙ্গে রাজী হয়ে গেলেন। আমি চলতি পথেই তাকে কালিমা পড়িয়ে ইসলামে দীক্ষিত করলাম।
সিদরাহ : গ্রামে পৌঁছার পর কী হলো?
আমেনা : গ্রামের লোকেরা আমার আসার খবর আগেই জেনেছিল। পুরো গ্রামের মানুষ পথে নেমে এসেছিল। মনে হচ্ছিল, গ্রামে যেন ঈদ শুরু হয়েছে।
আমিতো তাদের সেই খুশী ও আনন্দকে অন্যভাবে গ্রহণ করেছি। আমি এর ওসীলায় তাদের মধ্যে হিদায়াতের দাওয়াত দেয়ার মনস্থ করেছি।
এ ব্যাপারে পরামর্শের জন্য আমি মাওলানা কালিম সাহেবের সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। তিনি তখন আমাকে বললেন, পুরো গ্রামের মেয়েদের মধ্যে কাজ করতে হবে। আলহামদুলিল্লাহ! গ্রামের অনেক মেয়েই আগে নামায পড়তো না, রোযা রাখতো না। দ্বীন থেকে তারা অনেক দূরে ছিল। এখন তারা নিয়মিত নামায-রোযা আদায় করছে, কুরআন পড়ছে। নফল নামায ও নফল রোযা আদায়ের চেষ্টা করছে।
তাছাড়া এখানে আমিও প্রাণ খুলে ইবাদত-বন্দেগীর সুযোগ পাচ্ছি। কুরআন শরীফ পড়ছি। পরিবারের লোকেরা আমাকে খুবই ভালোবাসে। এভাবে আলহামদুলিল্লাহ,খুব ভালো আছি।
সিদরাহ : আপনি কি গোশত খাচ্ছেন?
আমেনা : আল্লাহ তা‘আলা গোশতকে হালাল করেছেন। গোশতকে খাদ্যের রাজা বানিয়েছেন। তাই এখন গোশত আমার একটি প্রিয় খাদ্য। তাছাড়া ইসলামের কথা হলো, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যা ভালোবাসেন, তা-ই আমার পছন্দ করতে হবে। আমার প্রতি আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ যে, এখন যেই বিষয়েই আমি জানতে পারি, এটা আল্লাহ ও রাসূলের প্রিয়, তখনই সেটা আমার প্রিয় হয়ে যায়। এক সময় আমি মিষ্টি পছন্দ করতাম না। আসলে আমার রুচি বিকৃত হয়ে গিয়েছিল। ফলে কখনো আমি মিষ্টি খেতাম না। পরে জানতে পারি, এটা আমাদের রাসূল (সা.) খুব পছন্দ করতেন। তখন থেকে আমি মিষ্টিকে পছন্দ করি।
সিদরাহ : এখন আপনার পরিবারের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ আছে কি?
আমেনা : পিতাজী ও আমার বোন কথা দিয়েছেন, একবার এখানে আসবেন। তারা মাঝে মাঝে ফোন করেন, খবরাখবর নেন।
সিদরাহ : আপনি তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিয়েছেন?
আমেনা : আমি তাদের জন্য দু‘আ করছি। আমি আশা করছি, অবশ্যই তারা মুসলমান হয়ে যাবেন।
সিদরাহ : পাঠক-পাঠিকাদের জন্য কিছু বলুন।
আমেনা : আমি হযরত মাওলানা কালিম সাহেবের আলোচনায় একথা বারবার শুনেছি, আল্লাহ তা‘আলা হিদায়াতের আলো পাঠিয়ে দিয়েছেন। কাঁচা-পাকা প্রতিটি ঘরে ইসলাম পৌঁছার সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে। মুসলমান এখন যদি তাদের দায়িত্ব পালন না করে, তাহলে আল্লাহ তা‘আলা তার বান্দাদের হিদায়াতের জন্য মুসলমানের প্রতি মুহতাজ নন।
হযরত আরো বলেছেন, ঋষিকেশের ঘরে বসে আমার মুসলমান হওয়াটা মুসলমানদের জন্য একটি সংকেত। সুতরাং অন্যদের মাধ্যমে হিদায়াতের কাজ আঞ্জাম পাওয়ার আগেই মুসলমানদের উচিতÑএই দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেয়া। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের সকলকে তাঁর দ্বীনের জন্য কবূল করুন। আমীন।
সিদরাহ : আপনাকে অনেক শুকরিয়া। আপনার জীবন-কাহিনী শুনে আমাদের ঈমান তাজা হয়ে উঠেছে।
আমেনা : আপনাকেও অনেক শুকরিয়া। দু‘আ করুন, আল্লাহ যেন মৃত্যু পর্যন্ত ঈমানের ওপর প্রতিষ্ঠিত রাখেন। আল্লাহুম্মা আমীন।

1 COMMENT

আপনার মন্তব্য