নির্বাচন ও ভোট বিষয়ে শরয়ী দৃষ্টিকোণ

মুফতি ইহসানুল হক চৌধুরী


 

প্রথমেই জেনে নিতে হবে, গণতন্ত্র ইসলাম সম্মত নয়। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে কখনোই পরিপূর্ণ ইসলাম প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।

কিন্তু যেহেতু আমাদের দেশের অবস্থা এমন দাঁড়িয়ে গেছে যে, হুট করেই আমরা এ ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে পারছি না। তাই এ ব্যাপারে চেষ্টা ও ফিকির সর্বদা করা উচিত। কিন্তু সেই সাথে গণতন্ত্র ইসলাম সম্মত নয় বলে হাত গুটিয়ে বসে থাকার দ্বারা যদি ইসলাম বিরোধী শক্তি ক্ষমতায় আসে। আর ইসলামের আরো বেশি ক্ষতি করতে শুরু করে দেয়। তাহলে এভাবে হাত গুটিয়ে বসে থাকা ব্যক্তি আরো বেশি মারাত্মক গোনাহগার হবে।

ভোট দেয়া জরুরী

প্রত্যেক ব্যক্তির স্বীয় সাধ্যানুযায়ী গোনাহ ও জুলুমকে রুখে দেয়ার তাকীদ কুরআনও হাদীসে এসেছে। তাই জাতিকে জুলুম ও নিপীড়ণ থেকে বাঁচাতে, সেই সাথে ইসলাম ও মুসলমানদের জালিম ও ইসলাদ্রোহীর হাত থেকে রক্ষা করতে ভোট প্রদান করা আবশ্যক। কারণ এর দ্বারা অন্তত কিছু হলেও তুলনামূলক ভাল ব্যক্তিকে নির্বাচিত করে বাতিল শক্তিকে রুখে দেয়া সম্ভবপর হয়ে থাকে। জুলুম ও ইসলাম বিদ্বেষী কাজ থেকে একদম হাত গুটিয়ে বসে থাকার ব্যাপারে হাদীসে কঠোর হুশিয়ারী উচ্চারিত হয়েছে। যেমন-

وَإِنَّا سَمِعْنَا النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «إِنَّ النَّاسَ إِذَا رَأَوُا الظَّالِمَ فَلَمْ يَأْخُذُوا عَلَى يَدَيْهِ، أَوْشَكَ أَنْ يَعُمَّهُمُ اللَّهُ بِعِقَابٍ»

হযরত আবু বকর রাঃ থেকে বর্ণিত। রাসূল সাঃ ইরশাদ করেছেন। যদি লোকেরা জালিম ব্যক্তিকে দেখেও তাকে বাঁধা না দেয়, তাহলে আল্লাহ তাআলা তাদের সবার উপর আযাব নাজিল করে দিতে পারেন। {সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং-৪৩৩৮, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-৫৩, সুনানে তিরমিজী, [বাশশার] হাদীস নং-২১৬৮, সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস নং-৩০৫}

নিজের চোখের সামনে জালিম ও ইসলাম বিদ্বেষী নির্বাচিত হয়ে এসে জুলুমের ষ্টীমরোলার মুসলমানদের উপর চালালে, ইসলামের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে, যে ব্যক্তি নির্বিকার বসে থেকে, মাজলুমের সহায়তা করে জালিমের প্রতি অনাস্থা প্রকাশ না করে থাকে, উক্ত ব্যক্তি কিয়ামতের দিন আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের দরবারে লাঞ্ছিত হবে।

হাদীসে ইরশাদ হচ্ছে-

عَنْ أَبِي أُمَامَةَ بْنِ سَهْلِ بْنِ حُنَيْفٍ، عَنْ أَبِيهِ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّهُ قَالَ: «مَنْ أُذِلَّ عِنْدَهُ مُؤْمِنٌ فَلَمْ يَنْصُرْهُ، وَهُوَ يقَدِرُ عَلَى أَنْ يَنْصُرَهُ أَذَلَّهُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ عَلَى رُءُوسِ الْخَلَائِقِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ»

রাসূল সাঃ ইরশাদ করেছেনঃ যে ব্যক্তির সামনে কোন মুমিনকে অপমান করা হয়, অথচ তাকে সহায়তা করার ক্ষমতা উক্ত ব্যক্তির থাকা সত্বেও সে তাকে যদি সাহায্য না করে, তাহলে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা তাকে সবার সামনে লাঞ্ছিত করবেন। {মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-১৫৯৮৫, আলমুজামুল কাবীর লিততাবারানী, হাদীস নং-৫৫৫৪}

ভোট না দিয়ে বসে থাকা জায়েজ নয়

জালিম ও ইসলামদ্রোহী শক্তিকে রুখে দেয়ার শক্তি থাকা বা কর্মপদ্ধতি থাকা সত্বেও বসে থাকা জায়েজ নয়। যেমনটি উপরে বর্ণিত হাদীস দ্বারা স্পষ্ট হয়েছে। সুতরাং আমাদের দেশে যেহেতু নির্বাচনকালীন সময়ে ভোটের দ্বারাই দেশের নিয়ন্ত্রকদের জুলুম ও ইসলাম বিদ্বেষী মানসিকতা রুখে দেয়া অনেকাংশে সম্ভব হয়ে থাকে। তাই এ পদ্ধতিকে ব্যাবহার না করে বসে থাকা জায়েজ হবে না। তাই ভোট দিয়ে সাধ্যানুযায়ী বাতিল শক্তির প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করতে হবে।

وَلَا تَكْتُمُوا الشَّهَادَةَ ۚ وَمَن يَكْتُمْهَا فَإِنَّهُ آثِمٌ قَلْبُهُ ۗ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ عَلِيمٌ [٢:٢٨٣]

তোমরা সাক্ষ্য গোপন করো না। যে কেউ তা গোপন করবে, তার অন্তর পাপপূর্ণ হবে। তোমরা যা কর, আল্লাহ তাআলা সে সম্পর্কে জ্ঞাত। {সূরা বাকারা-২৮৩}

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «مَنْ كَتَمَ شَهَادَةً إِذَا دُعِيَ إِلَيْهَا فَهُوَ كَمَنْ شَهِدَ بِالزُّورِ»

হযরত আবূ হুরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত। রাসূল সাঃ ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তিকে সাক্ষ্য দেয়ার জন্য ডাকা হয়, কিন্তু সে তা দেয় না, তাহলে সে যেন অন্যায়ের পক্ষে সাক্ষ্য দিল। {মুসনাদুশ শামীন, হাদীস নং-১৯৪২, আলমুজামুল আওসাত, হাদীস নং-৪১৬৭}

عَنْ زَيْدِ بْنِ خَالِدٍ الْجُهَنِيِّ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِخَيْرِ الشُّهَدَاءِ؟ الَّذِي يَأْتِي بِشَهَادَتِهِ قَبْلَ أَنْ يُسْأَلَهَا»

হযরত জায়েদ বিন খালেদ জুহানী রাঃ থেকে বর্ণিত। রাসূল সাঃ ইরশাদ করেছেন, আমি কি তোমাদের বলবো না যে, উত্তম সাক্ষ্য কে? ঐ ব্যক্তি যে, চাওয়া ছাড়াই সাক্ষ্য দিয়ে দেয়। {সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১৭১৯, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-২১৬৮৩, সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং-৩৫৯৬}

ভোট একটি আমানত। এটাকে যথেচ্ছা প্রয়োগকারী আমানতের খেয়ানতকারী সাব্যস্ত হবে। তার জন্য রয়েছে আখেরাতে ভয়াল শাস্তি। কাউকে ভোট দেয়া কোন আবেগ বা দলীয় বিষয় নয়। বরং এটি একটি ধর্মীয় বিষয়ও। যাকে তাকে ভোট দেয়া ইসলাম সম্মত নয়। ইসলাম বিদ্বেষী, দেশ ও ইসলামের জন্য ক্ষতিকর ব্যক্তিকে ভোট দেয়া মারাত্মক গোনাহের কাজ। তাই বুঝে শুনে, চিন্তা-ভাবনা করে ভোট দিতে হবে। দলীয় আবেগ, ব্যক্তির প্রতাপ, আত্মীয় বা প্রতিবেশি হওয়া ভোট পাওয়ার যোগ্যতার অন্তর্ভূক্ত নয়। ভোট পাওয়ার যোগ্য ঐ ব্যক্তিই হবে যিনি উক্ত পদে যোগ্য। দেশ ও ইসলামের পক্ষের শক্তি। যার দ্বারা দেশের সম্পদ লুণ্ঠিত হবে না। সমাজে বিশৃংখলা ছড়িয়ে পড়বে না। যার দ্বারা ইসলাম ও মুসলমানদের ক্ষতি সাধিত হবে না। এমন ব্যক্তিকে ভোট দেয়া শরয়ী দৃষ্টিকোণ থেকে আবশ্যক। আর অযোগ্য, ইসলাম বিদ্বেষী, নাস্তিকপ্রিয়, দেশদ্রোহী, লুটতরাজকে ভোট দেয়া শরীয়ত গর্হিত কাজ। নিচে ভোট দেয়ার শরয়ী দৃষ্টিকোণ উল্লেখ করা হল।

ইসলামী শরীয়তে ভোট দেয়ার চারটি অবস্থান। যথা-

১-স্বাক্ষ্য দান।

২-ওকীল নিযুক্তকরণ বা অর্পিত দায়িত্ব পালন।

৩-সুপারিশকরণ।

৪- আমানত

সাক্ষ্যদান

কোন পদের প্রার্থীকে উক্ত পদের জন্য ভোট দেয়ার মানে হল, ভোটার এ স্বাক্ষ্য প্রদান করছে যে, প্রার্থী যে পদের আশা করছে, সে পদের উপুযুক্ত উক্ত প্রার্থী।

সুতরাং যদি উক্ত প্রার্থী প্রার্থিত পদের যোগ্য না হয়, তাহলে ভোটার মারাত্মক গোনাহগার হবে।

وَإِذَا قُلْتُمْ فَاعْدِلُوا وَلَوْ كَانَ ذَا قُرْبَىٰ ۖ [٦:١٥٢]

যখন তোমরা কথা বল, তখন সুবিচার কর, যদিও সে আত্মীয় হয়। {সূর আনআম-১৫২}

فَاجْتَنِبُوا الرِّجْسَ مِنَ الْأَوْثَانِ وَاجْتَنِبُوا قَوْلَ الزُّورِ [٢٢:٣٠]

সুতরাং তোমরা মূর্তিদের অপবিত্রতা থেকে বেঁচে থাক এবং মিথ্যা কথন থেকে দূরে সরে থাক। {সূরা হজ্ব-৩০}

عَنْ خُرَيْمِ بْنِ فَاتِكٍ، قَالَ: صَلَّى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ صَلَاةَ الصُّبْحِ، فَلَمَّا انْصَرَفَ قَامَ قَائِمًا، فَقَالَ: «عُدِلَتْ شَهَادَةُ الزُّورِ بِالْإِشْرَاكِ بِاللَّهِ» ثَلَاثَ مِرَارٍ،

হযরত খুরাইম বিন ফাতিক রাঃ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল সাঃ একদা ফজর নামায শেষে দাঁড়িয়ে তিনবার বললেন, মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া আল্লাহর সাথে শিরক সমতুল্য অপরাধ। {সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং-৩৫৯৯, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-১৭৬০৩, সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং-২৩৭২}

عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ أَبِي بَكْرَةَ، عَنْ أَبِيهِ، أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: أَلاَ أُخْبِرُكُمْ بِأَكْبَرِ الكَبَائِرِ؟ قَالُوا: بَلَى يَا رَسُولَ اللهِ، قَالَ: الإِشْرَاكُ بِاللَّهِ، وَعُقُوقُ الوَالِدَيْنِ، وَشَهَادَةُ الزُّورِ أَوْ قَوْلُ الزُّورِ

হযরত হযরত আবু বাকরা রাঃ থেকে বর্ণিত। রাসূল সাঃ ইরশাদ করেছেন, আমি কি তোমাদের সবচে’ বড় কবীরা গোনাহ সম্পর্কে বলে দিবো না? সাহাবাগণ বললেন, অবশ্যই ইয়া রাসূলাল্লাহ! তখন রাসূল সাঃ বললেন, আল্লাহ তাআলার সাথে শিরক করা, পিতা-মাতার নাফরমানী করা। আর মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া। বা মিথ্যা কথা বলা। {সুনানে তিরমিজী [বাশশার], হাদীস নং-২৩০১, সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৫৯৭৬, ৫৬৩১, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১৪৩}

ওকীল নিযুক্ত করণ বা দায়িত্বপালন

ভোটের সময় ভোটারের ভোট পুরো জাতির পক্ষ থেকে প্রতিনিধিত্ব করে থাকে। ভোটার তার ভোট দেয়ার মাধ্যমে জাতির প্রতিনিধি নির্বাচনে পুরো জাতির পক্ষ থেকে যিম্মাদার হিসেবে রায় পেশ করে থাকে। পুরো জাতির যিম্মাদার হিসেবে উক্ত রায় পেশ করার সময় যদি দলীয় সংকীর্ণতা, স্বজনপ্রীতি, দলপ্রীতি, আর কারো প্রতাপের সামনে নতি স্বীকার করে তুলনামূলক যোগ্য ও ইসলামপ্রিয় প্রার্থীকে রেখে অযোগ্য বা দেশ ও ইসলামের জন্য ক্ষতিকর প্রার্থীকে ভোট প্রদান করে, তাহলে জাতির পক্ষ থেকে অর্পিত দায়িত্ব পালনে লোকটি খেয়ানতকারীরূপে সাব্যস্ত হবে। আর যিম্মাদারের দায়িত্বে অবহেলা তথা স্বেচ্ছাচারিতার ব্যাপারে হাদীসে কঠোর হুশিয়ারী উচ্চারিত হয়েছে।

عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: وَمَنْ تَوَلَّى مِنْ أُمَرَاءِ الْمُسْلِمِينَ شَيْئًا فَاسْتَعْمَلَ عَلَيْهِمْ رَجُلًا وَهُوَ يَعْلَمُ أَنَّ فِيهِمْ مَنْ هُوَ أَوْلَى بِذَلِكَ وَأَعْلَمُ مِنْهُ بِكِتَابِ اللهِ وَسُنَّةِ رَسُولِهِ، فَقَدْ خَانَ اللهَ وَرَسُولَهُ وَجَمِيعَ الْمُؤْمِنِينَ، وَمَنْ تَرَكَ حَوَائِجَ النَّاسِ لَمْ يَنْظُرِ اللهُ فِي حَاجَتِهِ حَتَّى يَقْضِيَ حَوَائِجَهُمْ وَيُؤَدِّي إِلَيْهِمْ بِحَقِّهِمْ،

অনুবাদ- হযরত ইবনে আব্বাস রাঃ থেকে বর্ণিত। রাসূল সাঃ ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি মুসলমানদের পক্ষ থেকে কোন বিষয়ে যিম্মাদার নিযুক্ত হয়, তারপর সে তাদের উপর কোন ব্যক্তিকে [কোন কাজের] কর্মকর্তা নিযুক্ত করে, অথচ সে জানে যে, মানুষদের মধ্যে এমন ব্যক্তিও আছে, যে তার চেয়েও অধিক যোগ্য এবং কুরআনও হাদীসের অধিক জ্ঞান রাখে, তবে সে অবশ্যই আল্লাহ ও তার রাসূল এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের সাথে খেয়ানত করল। আর যে ব্যক্তি মানুষের প্রয়োজনকে পূর্ণ করল না, আল্লাহ তাআলা উক্ত ব্যক্তির প্রয়োজনও পূর্ণ করবেন না যতক্ষণ পর্যন্ত না উক্ত ব্যক্তি মানুষের প্রয়োজন পূর্ণ করে এবং তাদের হক আদায় করে দেয়। {আলমুজামুল কাবীর লিততাবারানী-১১২১৬}

সুপারিশকরণ

ভোটার তার স্বীয় ভোট কোন প্রার্থীকে দেয়ার মানে হল, ভোটার উক্ত ব্যক্তির প্রার্থিত পদের ব্যাপারে যোগ্য বলে সুপারিশ করছে। তার সাফাই গাইছে। সুতরাং প্রার্থী যদি অযোগ্য হয়, তাহলে অন্যায় কাজে সুপারিশ করার কারণে সুপারিশকারী তথা ভোটার গোনাহগার হবে। এমনকি উক্ত ভোটের কারণে নির্বাচিত হয়ে প্রার্থী যত খারাপ কাজ করবে এর গোনাহের ভাগিদারও ভোটার ব্যক্তি হবে। তাই ভেবে-চিন্তে ভোট দিতে হবে।

مَّن يَشْفَعْ شَفَاعَةً حَسَنَةً يَكُن لَّهُ نَصِيبٌ مِّنْهَا ۖ وَمَن يَشْفَعْ شَفَاعَةً سَيِّئَةً يَكُن لَّهُ كِفْلٌ مِّنْهَا ۗ وَكَانَ اللَّهُ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ مُّقِيتًا [٤:٨٥]

যে লোক সৎকাজের জন্য কোন সুপারিশ করবে, তা থেকে সেও একটি অংশ পাবে। আর যে লোক সুপারিশ করবে মন্দ কাজের জন্যে সে তার বোঝারও একটি অংশ পাবে। বস্তুতঃ আল্লাহ সর্ব বিষয়ে ক্ষমতাশীল। {সূরা নিসা-৮৫}

আমানত

ভোটারের ভোটটি একটি আমানত। পুরো জাতির পক্ষ থেকে তা সঠিক ও যোগ্য স্থানে প্রয়োগের জন্য তা সংরক্ষিত আমানত। তা অযোগ্য ও ইসলাম ব্যক্তিকে দেয়া মানে হল আমানতের খিয়ানত করা। খুবই মারাত্মক গোনাহের কাজ।

إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَنْ تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَى أَهْلِهَا

নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা আদেশ দিয়েছেন আমানতকে তার সঠিক হকদারের কাছে পৌঁছে দেয়ার। {সূরা নিসা-৮৫}

এক হাদীসে এসেছে

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «الْمُسْتَشَارُ مُؤْتَمَنٌ»

হযরত আবু হুরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত। রাসূল সাঃ ইরশাদ করেছেন, যার কাছে পরামর্শ চাওয়া হবে উক্ত ব্যক্তির বিশ্বস্ততা রক্ষা করতে হবে। {সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং-৩৭৪৫, সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং-৫১২৮}

عَنْ أَبِي ذَرٍّ، قَالَ: قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللهِ، أَلَا تَسْتَعْمِلُنِي؟ قَالَ: فَضَرَبَ بِيَدِهِ عَلَى مَنْكِبِي، ثُمَّ قَالَ: «يَا أَبَا ذَرٍّ، إِنَّكَ ضَعِيفٌ، وَإِنَّهَا أَمَانَةُ، وَإِنَّهَا يَوْمَ الْقِيَامَةِ خِزْيٌ وَنَدَامَةٌ، إِلَّا مَنْ أَخَذَهَا بِحَقِّهَا، وَأَدَّى الَّذِي عَلَيْهِ فِيهَا»

হযরত আবু জর গিফারী রাঃ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমি রাসূল সাঃ এর কাছে আরজ করলামঃ হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আমাকে কোন স্থানে হাকীম বা ওলী কেন বানিয়ে দেন না? রাসূল সাঃ [মোহাব্বতের সাথে] তার স্বীয় হাত আমার কাঁধের উপর রাখলেন। আর বললেন, আবু জর! তুমি নরম মনের মানুষ। আর এটি হল একটি বড় আমানত। [যা আদায় করা খুবই জরুরী।] নতুবা কিয়ামতের দিন তা লজ্জায় ফেলে দিবে। তবে যে ব্যক্তি এটি পরিপূর্ণভাবে গ্রহণ করতে পারে এবং তা আদায় করতে পারে তার বিষয়টি ভিন্ন। {সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-১৫২৫}

সুতরাং কাকে ভোট দিবেন?

যে ব্যক্তি যে পদের অধিক যোগ্য এবং ইসলাম ও মুসলমানদের বন্ধু, ঐ ব্যক্তি তুলনামূলক এ গুণ যার মধ্যে কম তার থেকে ভোট পাওয়ার অধিক যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন। এটাই মূলনীতি বর্তমান পরিস্থিতিতে ভোট দেয়ার। যিনি দেশ ও জাতির এবং ইসলামের জন্য অধিক উপকারী ব্যক্তি বলে সাব্যস্ত হবেন, তাকে ভোট দেয়ার দ্বারা স্বীয় দায়িত্ব আদায় হবে ইনশাআল্লাহ। বাকি সর্বদা চেষ্টা করতে হবে যেন পরিপূর্ণ ইসলামী খিলাফত কায়েম করা যায়।

ইসলামী ফিক্বহের কয়েকটি মূলনীতি এ বিষয়ে জেনে নেয়া ভাল। যেমন-

الضرورات تبيح المظورات

তীব্র প্রয়োজন নিষিদ্ধ বিষয়কে বৈধ করে দেয়। {শরহুল কাওয়ায়িদিল ফিক্বহ লিজ জারক্বা, কায়দা নং-২০}

الضرر يدفع بقد الإمكان

যথা সম্ভব ক্ষতিকর বস্তুকে বিদূরিত করা হবে। {শরহুল কাওয়ায়িদিল ফিক্বহ লিজ জারক্বা, কায়দা নং-৩০}

الضرر لا يزال بمثله

ক্ষতিকর বস্তু তার মত ক্ষতিকর বস্তু দ্বারা বিদূরিত হবে না। {শরহুল কাওয়ায়িদিল ফিক্বহ লিজ জারক্বা, কায়দা নং-২৪}

الضرر الأشد يزال بالضرر الأخف

তুলনামূলক অধিক ক্ষতিকর বস্তুকে কম ক্ষতিকর বস্তু দিয়ে হলেও বিদূরিত করা হবে। {শরহুল কাওয়ায়িদিল ফিক্বহ লিজ জারক্বা, কায়দা নং-২৬}

يتحمل الضرر الخاص لدفع ضرر عام

ব্যাপক ক্ষতি দূর করতে ব্যক্তিগত ক্ষতিকে মেনে নেয়া হবে। {শরহুল কাওয়ায়িদিল ফিক্বহ লিজ জারক্বা, কায়দা নং-২৫}

درء المفاسد اولى من جلب المنافع

উপকার অর্জনের চেয়ে ক্ষতিরোধ করা উত্তম। {শরহুল কাওয়ায়িদিল ফিক্বহ লিজ জারক্বা, কায়দা নং-২৯}

اذا تعارض مفسدتان روعى أعظمهما ضررا بإرتكاب أخفهما

যখন দুটি ক্ষতিকর বস্তু পরস্পর মুখোমুখি হবে, তখন ছোটটি মেনে বড়টিকে দূর করা হবে। {শরহুল কাওয়ায়িদিল ফিক্বহ লিজ জারক্বা, কায়দা নং-২৭}

ভোটের প্রচারণা করা

যে ব্যক্তিকে শরয়ী দৃষ্টিকোণ থেকে ভোট দেয়া জায়েজ বা উত্তম উক্ত ব্যক্তির পক্ষে ভোটের প্রচারণা করাও জায়েজ। আর যাকে ভোট দেয়া জায়েজ নয় তার পক্ষে ভোটের প্রচারণা করাও জায়েজ নয়।

وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ ۖ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ ۚ وَاتَّقُوا اللَّهَ ۖ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ [٥:٢]

সৎকর্ম ও খোদাভীতিতে একে অন্যের সাহায্য কর। পাপ ও সীমালঙ্ঘনের ব্যাপারে একে অন্যের সহায়তা করো না। আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ তা’আলা কঠোর শাস্তিদাতা। {সূরা মায়িদা-২}

তবে এক্ষেত্রে অবশ্যই লক্ষ্য করতে হবে যেন, এতে করে কারো কোন কষ্ট না হয়। এদিকে খেয়াল রাখতে হবে। সেই সাথে শরীয়তে নিষিদ্ধ এমন কোন কাজ প্রচারণায় ব্যবহার করা যাবে না। যেমন ছবিসহ পোষ্টার।

একদম প্রচন্ড প্রয়োজন ছাড়া ছবি তোলা ইসলামে বৈধ নয়। আর নির্বাচনী প্রচারণা যেহেতু নামের পরিচয় দ্বারা, সমাবেশে উপস্থিত হওয়ার দ্বারাই পূর্ণ হয়ে যাচ্ছে, তাই ছবি সাটিয়ে প্রচারণা করার কোন প্রয়োজন নেই। তাই ছবিসহ নির্বাচনী পোষ্টার করা কিছুতেই জায়েজ হবে না।

আপনার মন্তব্য