ইতিকাফ : আল্লাহর প্রিয় বান্দা হবার অন্যতম মাধ্যম

মুফতি নূর মুহাম্মদ রাহমানী

আমলের বসন্তকাল রমজানুল মুবারকের দ্বিতীয় দশক প্রায় শেষ দিকে। আর কদিন পরেই শুরু হবে রমজানের শেষ দশক। ২০ রমজানের পর থেকে এ মাসের শেষ দিন পর্যন্ত একটি বিশেষ ইবাদত রয়েছে। দিনের পুরো সময় মসজিদে অবস্থান এবং ইবাদত-বন্দেগিতে কাটানোর এই ইবাদতের নাম ইতিকাফ।

ইতিকাফ মাহে রমজানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। অন্যান্য করণীয় ইবাদত শেষে একজন রোজাদারের গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো ইতিকাফ করা। সিয়াম সাধনা মানুষকে ত্যাগ ও কৃচ্ছ্রটা সাধনের শিক্ষা দেয়। আর ইতিকাফ দুনিয়া ত্যাগের প্রবণতা শিক্ষা দেয়। আর আল্লাহর সাথে সম্পর্ক সৃষ্টি করে দেয় এবং স্বল্প সময়ের মধ্যে আল্লাহর সাথে বান্দার সম্পর্ক জুড়ে দেয়। ফলে মানুষের মধ্যে আল্লাহর ভালোবাসার সৃষ্টি হয়।

নবীজি (সা.) ইতিকাফের প্রতি খুব গুরুত্ব দিতেন। হজরত আবু হুরাইরা (রা.) বলেন, রাসূলে কারীম (সা.) প্রতি রমজান মাসের শেষ দশদিন ইতিকাফ করতেন। তারপর যখন সেই বছরটি এলো যে বছর তিনি ইন্তেকাল করেন। সে বছর তিনি বিশ দিন ইতিকাফ করেন। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ২৪৫৮)

ইতিকাফ অর্থ একাগ্রতার সাথে অবস্থান করা। ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায় ইতিকাফ হলো মহা প্রভু আল্লাহ পাকের নৈকট্য লাভের আশায় রোজার সাথে মসজিদে নিজেকে নিবদ্ধ রাখা।

ইতিকাফের উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি। এজন্য ইতিকাফকারী একাগ্রচিত্তে নির্জনে বসে নফল নামাজ আদায় করে। তওবা-ইস্তিগফার করে। কুরআন তিলাওয়াত করে। জিকির-আযকার, তাসবিহ-তাহলিল আদায়ে সময় ব্যয় করে।

ইতিকাফের ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমরা যখন মসজিদগুলোর ইতিকাফ অবস্থায় থাকবে তখন আপন স্ত্রীদের সাথে সহবাস করো না। এগুলো হলো আল্লাহ পাকের অলঙ্ঘনীয় বিধান। তাই এ সবের নিকটেও যেও না। এভাবেই আল্লাহ পাক মানুষের কল্যাণে তাঁর নির্দেশাবলী সুস্পষ্টরূপে বর্ণনা করে থাকেন। সম্ভবত তারা মুত্তাকী হবে।’ (সূরা বাকারা, আয়াত : ১৮৭)

ইতিকাফের ফজিলত:

হজরত আলী বিন হুসাইন (রা.) নিজ পিতা থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলে কারীম (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি রমজানে দশ দিন ইতিকাফ করলো সে যেন দুই হজ ও দুই উমরা পালন করলো।’ (বাইহাকি, দুররে মানসুর)

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইতিকাফকারী সম্পর্কে বলেছেন, সে ব্যক্তি গোনাহসমূহ হতে বিরত থাকে এবং তার জন্যে নেকিসমূহ লেখা হয় ঐ ব্যক্তির ন্যায় যে বাইরে থেকে যাবতীয় নেক কাজ করে।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ১৭৮১)

ইতিকাফের গুরুত্ব:

রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ করতে হয়। আর এই শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে লাইলাতুল কদরও আছে। যে রাতটি তালাশ করা এবং এই রাতে নামাজ, জিকির-আযকার, ইবাদত করার তাকিদ দেয়া হয়েছে। এ কারণে নবীজি (সা.) শেষ দশকে ইবাদতের জন্য নিজেও কোমর বেঁধে নিতেন এবং পরিবার-পরিজনকেও তাকিদ দিতেন।

হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যখন রমজানের শেষ ১০ রাত আসতো, তখন নবী কারীম (সা.) কোমরে কাপড় বেঁধে নেমে পড়তেন (বেশি বেশি ইবাদতের প্রস্তুতি নিতেন) এবং রাত জেগে থাকতেন। আর পরিবার-পরিজনকেও তিনি জাগিয়ে দিতেন।’ (সহিহ বুখারী, হাদিস : ১০৫৩)

তিন ধরণের ইতিকাফ রয়েছে। ১. ওয়াজিব ইতিকাফ, আর তা হলো মান্নতের ইতিকাফ। এ ইতিকাফের জন্য রোজা রাখাও আবশ্যক। ২. সুন্নত ইতিকাফ, এটিই রমজানুল মুবারকের শেষ দশকের ইতিকাফ। এই ইতিকাফ সুন্নতে মুয়াক্কাদা আলাল কিফায়া। অর্থাৎ মহল্লার মসজিদে এক দুজন ইতিকাফ করলে বাকি পুরা মহল্লাবাসীর পক্ষ থেকে জিম্মাদারি আদায় হয়ে যাবে। আর যদি কেউ আদায় না করে তাহলে মহল্লার সব মানুষ সুন্নতে মুয়াক্কাদা পরিত্যাগ করার কারণে গোনাহগার হবে। এই ইতিকাফের জন্যও রোজা রাখা শর্ত। ৩. মুস্তাহাব ইতিকাফ, এই ইতিকাফের জন্য রোজা রাখা শর্ত নয়। পুরা এক দিন অবস্থান করাও শর্ত নয়; বরং যতটুকু সময় ইচ্ছা সুযোগ অনুসারে ইতিকাফ করার অবকাশ রয়েছে।

ইতিকাফের শর্ত:

১. যে মসজিদে ইতিকাফ করা হবে সে মসজিদে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাতের সাথে হতে হবে।

২. ইতিকাফের নিয়তে অবস্থান করা।

৩. মহিলারা পিরিয়ড এবং প্রসব পরবর্তী ¯স্রাব থেকে পবিত্র হওয়া।

৪. অবশ্যই রোজা রাখা।

৫. জ্ঞানী এবং প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া। অপ্রাপ্তবয়স্ক হলে যদি বুঝমান হয় তবে ইতিকাফ করতে পারে। মহিলারাও ইতিকাফ করতে পারে। (ইলমুল ফিকহ ৩/৬৪)

শেষ কথা: ইতিকাফ করার মাধ্যমে মহান আল্লাহর একান্ত সান্নিধ্য লাভের সুযোগ পাওয়া যায়। তাই সবার উচিত যথানিয়মে ইতিকাফ করা।

 

লেখক: মুহাদ্দিস জামিয়া আরাবিয়া দারুল উলূম বাগে জান্নাত।

2 thoughts on “ইতিকাফ : আল্লাহর প্রিয় বান্দা হবার অন্যতম মাধ্যম

  1. আস্সালামু আলাইকুম, ইতিকাফ কী বাসায় করা যাবে???যদি কোন বোন করতে চান!

Leave a Reply

Your email address will not be published.

%d bloggers like this: