ইসলামের দৃষ্টিতে মাল্টিলেভেল মার্কেটিং তথা এমএলএম ব্যবসা – পর্ব ৪

মুফতি আবুল হাসান মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

আজ আমরা বেফাকের পক্ষ থেকে দেওয়া এমএলএম জায়েজ ফতোয়াটি সামনে রেখে কিছু বিশ্লেষণ পেশ করতে চাই। এতে আশা করি এমএলএম নাজায়েয হওয়ার শাখাগত কারণগুলো আপনাদের সামনে স্পষ্ট হবে।

বেফাকের তত্ত্বাবধানে মুফতী বোর্ড ঢাকার ফতোয়ায় কয়েকটি বিষয় আলোচিত হয়েছে :

১. صفقتين في صفقة । এমএলএম নাজায়েয হওয়ার বহু কারণের মধ্যে এটি অন্যতম। একে আরেক ভাষায় বলা হয় ‘বাই ওয়া শর্ত’ (একটি আকদের সাথে অন্য আরেকটি আকদ যুক্ত করা)। হাদীসে এটি নিষেধ করা হয়েছে। উক্ত ফতোয়াতে স্পষ্টভাবে লেখা আছে, এমএলএম এর মধ্যে দুটি আকদ বিদ্যমান। তা হল, الإجارة المشروطة  بالبيع অথবা البيع المشروط بالإجارة। অর্থাৎ এমএলএম হল এমন একটি বেচাকেনা, যাতে ইজারা তথা পরিবেশক হওয়ার শর্ত যুক্ত রয়েছে অথবা এমন একটি ইজারা (পরিবেশক) চুক্তি, যাতে বেচাকেনার শর্ত যুক্ত রয়েছে।

আগে এমএলএম কোম্পানিগুলো এক ফরমেই উভয় কাজ অর্থাৎ দুটি চুক্তি সম্পন্ন করত। এখন কোনো কোনো কোম্পানি আলাদা আলাদা ফরমের ব্যবস্থা করেছে। একটি পণ্য কেনার ফরম, অপরটি ডিস্ট্রিবিউটরশীপের আবেদন ফরম। এভাবে হয়ত তারা বুঝাতে চায়, এখানে পৃথক পৃথক দুটি চুক্তি হচ্ছে। অথচ সকলেই জানে যে, কার্যক্ষেত্রে একটি চুক্তির জন্য অন্যটি শর্ত (দুটি ফরম করা সত্ত্বেও)। একথা সকলেই জানে যে, শুধু পণ্য কেনার জন্য এমএলএম কোম্পানিতে কেউ যায় না। আবার পণ্য না কিনলে কোম্পানি কখনো পরিবেশক বানাবে না। আর লেনদেন বা  মুআমালায় শরীয়ত মাআনি ও মাকাসিদ তথা উদ্দেশ্য ও বাস্তবতা বিবেচনা করে থাকে। শুধু শব্দ বা আলফায এক্ষেত্রে ধর্তব্য নয়। এখানে দুইটি ফরম করে শব্দের দিক থেকে দুইটি চুক্তিকে আলাদা করার চেষ্টা করা হলেও উদ্দেশ্য তথা মাকসাদ এর দৃষ্টিকোণ থেকে দুটি অভিন্ন এবং একটির জন্য অপরটি শর্ত।

আমি এমন অনেক লোককে দেখেছি, যারা সদস্য তৈরি করতে পারে না। পরে বাধ্য হয়ে পণ্যের প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও নিজের পকেটের টাকা দিয়ে পণ্য কিনে সদস্য বানায়, এরপর বলে, এবার আপনি অন্যকে তৈরি করুন। এবং নিজে লাভ করুন আর আমাকে লাভবান হওয়ার সুযোগ দিন। সুতরাং ফরম একটা করুক, দুইটা করুক, এক কথায় বলুক, দুই কথায় বলুক আকদ একটার সাথে আরেকটা শর্তযুক্ত হচ্ছেই।

আমি বলেছিলাম, উকূদের মধ্যে মাআনী ও মাকাসিদ তথা উদ্দেশ্য ধর্তব্য। যেমন, কেউ ৩,০০০/-টাকার জিনিস ৩০০/-টাকায় বিক্রি করতে চায়। সাধারণ দৃষ্টিতে দেখলে এতে নাজায়েয কিছু নেই। কেননা তার পণ্য সে যত দামে খুশি বিক্রি করতে পারে। এতে কারো কিছু বলার নেই। কিন্তু যদি আপনি তার মাকসাদ জিজ্ঞাসা করেন এবং সে বলে, সে আমাকে ১০,০০০/- টাকা করয দিবে তাই আমার পণ্যটি কম মূল্যে বিক্রি করছি, তখন কেউ একে বৈধ বলবে না। কেননা এটা সুদের
অন্তর্ভুক্ত।

এরকম আরেকটি নজির দেখুন। হানাফী মাযহাবের বিশিষ্ট ফকীহ আবুল কাসিম মুহাম্মাদ ইবনে ইউসুফ আসসামারকান্দি (মৃত্যু : ৫৫৬ হিজরী) তার অমূল্য গ্রন্থ ‘আলমুলতাকাত ফিলফাতাওয়াল হানাফিয়্যায়’ ‘‘আলবাইয়ু বিলওয়াফা’’-এর আলোচনায় বলেছেন-

وذكر عن شيخ الإسلام عن السيد الإمام أبي شجاع والقاضي الحسن الماتريدي : أن البيع الذي سموه بيع الوفاء احتيالاً للربا رهن في الحقيقة، والمشتري مرتهن لا يملكه ولا يطلق له الانتفاع إلا بإذن البائع … وللبائع استرداده إذا قضى دينه متى شاء، لأنهم يريدون به الرهن، والعبرة للمقاصد، لا للألفاظ. اهـ

এই উসূলের ব্যাপারে আরো জানার জন্য দেখুন : ফাতাওয়ায়ে ইবনে তাইমিয়া ২৯/৩৩৬

মোটকথা এখানে উদ্দেশ্যের বিবেচনায় মাসআলার হুকুম বলা হয়েছে, শব্দের বিবেচনায় নয়।

২. বেফাকের মুফতী বোর্ড ঢাকার ফতোয়ায় আরেকটি বিষয় ছিল, ‘আলউজরাতু বিলা আমাল ওয়াল আমালু বিলা উজরা’। অর্থাৎ কর্মহীন পারিশ্রমিক ও পারিশ্রমিকহীন কর্ম। এ দুটিও শরীয়তে নিষিদ্ধ এবং ছোটখাটো নিষিদ্ধ বিষয় নয়; বরং বড় বড় নিষিদ্ধ বিষয়ের অন্তর্ভুুক্ত।

আমরা শুধু রিবা, কিমার তথা সুদ-জুয়া জাতীয় বিষয়গুলোকেই বড় করে দেখি। অন্যান্য নিষিদ্ধ বিষয়কে তেমন কিছু মনে করি না। অথচ এসব নিষিদ্ধ বিষয়গুলো অনেক ক্ষেত্রে ঐ সকল বড় বড় নিষিদ্ধ বিষয় পর্যন্ত গড়িয়ে যায়। এটি একটি তাত্ত্বিক ও গভীর বিষয়। এখন স্বল্প সময়ে বিস্তারিতভাবে বলার অবকাশ নেই। শুধু এতটুকু বলছি, মূলত প্রতিটি ফাসেদ বিষয় বড় বড় খারাবির দিকে টেনে নিয়ে যায় বলেই শরীয়ত এগুলোকে নিষেধ করেছে। গোড়া থেকেই নিষেধ করেছে। আপনি রিবান্নাসিয়ার পাশাপাশি রিবাল ফাযল হারাম হওয়ার বিষয়টি চিন্তা করলেই কিছুটা অনুধাবন করতে পারবেন।

এমএলএম-এর সাথে উপরোক্ত দুটি ফাসেদ বিষয়ের সম্পৃক্ততা

ফিকহের কিতাবে স্পষ্টভাবে বলা আছে-

جاء في تكملة رد المحتار : 7/60 : وتمامه في شرح الوهبانية : قال فيه : والأصح أنه الأجر بقدر المشقة … وفي العمادية، عن الملتقط إنما له أجر مثله بقدر مشقته وبقدر صنعته وعمله، وفي شرح التمرتاشي عن النصاب : يجب بقدر العناء والتعب، وهذا أشبه بأصول أصحابنا.

অর্থাৎ নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তি যতটুকু কাজ করবে সে অনুযায়ী পারিশ্রমিক পাবে। সহীহ মতানুযায়ী এটি ‘আলআজীরুল মুশতারাক’ বা কমিশন এজেন্টদের ব্যাপারেও প্রযোজ্য।
বিস্তারিত জানার জন্য পড়তে পারেন, শরহুল মাজাল্লাহ, আল্লামা খালেদ আতাসী রাহ. ২/৪৮৪

উল্লেখ্য, কেউ কেউ ডিস্ট্রিবিউটরদেরকে ‘আলআজীরুল মুশতারাক’ গণ্য করে বলে থাকে, কোম্পানির নির্ধারিত টার্গেট (কমপক্ষে ১০০০ পয়েন্টের পণ্য বিক্রয় করা) পুরা না করলে কমিশন পাবে না।

একথাটা সহীহ নয়। কেননা, আজীরে মুশতারাক যতটুকু কাজ করবে ততটুকুর পারিশ্রমিক হিসাব করে তাকে দিতে হবে। সুতরাং পয়েন্ট ১০০০ এর কম হলেও কাজ যেহেতু আংশিক হলেও আছে তাই সে অনুপাতে তাকে পারিশ্রমিক দিতে হবে। অন্যথায় তা ‘আলআমালু বিলা উজরা’ তথা পারিশ্রমিকবিহীন কর্মের আওতাভুক্ত হয়ে নাজায়েয হবে। অথচ এমএলএম কোম্পানিতে অনেক ক্ষেত্রে এমনটিই হয়ে থাকে। নির্ধারিত ৪ জন বা ২জন ক্রেতা না এনে যদি ৩ জন বা ১জন আনা হয় তাহলে কোনো কমিশন দেওয়া হয় না। অথচ এর দ্বারা কোম্পানি ঠিকই উপকৃত হচ্ছে। এ হল বিনা পারিশ্রমিকে কর্ম।

আর কর্মবিহীন পারিশ্রমিক হল, নেট সিস্টেমে প্রথম ২ ব্যক্তি ছাড়া পরবর্তী লোকদেরকে কোম্পানির সাথে জড়িয়ে দেওয়ার কাজটি করে তাদের সরাসরি উপরের ব্যক্তিটি, যার রেফারেন্সে তারা সদস্য হয়েছে। এটি কোনো ক্রমেই প্রথম ব্যক্তির কাজ হিসেবে ধর্তব্য হয় না। প্রথম ব্যক্তি এক্ষেত্রেও শ্রম দিলেও কোম্পানির হিসেবে তার নিজের কাজ হিসেবে গণ্য হয় না। কোম্পানি একে প্রথম ব্যক্তির কাজ হিসেবে ধরে না। এর প্রমাণ হল, যদি এটি প্রথম ব্যক্তির কাজ হত তাহলে সে প্রথম ২জনকে সংগ্রহ করে কোম্পানি থেকে যে হারে কমিশন লাভ করেছে ২য়, ৩য় স্তর থেকেও ঐ হারে কমিশন পেত। অথচ তা পায় না। বরং তাদের সরাসরি উপরের ব্যক্তিটি সে হারে পেয়ে থাকে।

অতএব ডাউন লেভেল তথা নিম্নস্তরের লোকদের জন্য আপ লেভেলের ব্যক্তিদের কমিশন গ্রহণটা বিনা কর্মে অর্থ গ্রহণ হিসাবে গণ্য। এ সম্পর্কে ‘আলআকলু বিলবাতিল’-এর আলোচনায় কথা হয়েছে।

কেউ কেউ বলে থাকে, একজন যখন আরেকজনকে নামায শিখায়। এরপর সে আরেকজনকে শিখায়। তো এক্ষেত্রে প্রথম ব্যক্তি পরবর্তীদের আমলের কারণে ছওয়াব পেতে থাকে। তদ্রূপ ডাউন লেভেলের আমলের কারণে আপ লেভেল কমিশন পেয়ে থাকে।

এটা এমএলএম ওয়ালাদের পুরাতন কথা। টংচেং-এর বিরুদ্ধে যখন মাসআলা দেওয়া হয়েছিল তখন তারা একথা বলা শুরু করে। এর জবাব হল দুনিয়ার ‘উকূদে মুআওযা’ আর আখিরাতের সদকায়ে জারিয়া এক কথা নয়। সদকায়ে জারিয়া আল্লাহ তাআলা ও বান্দার সাথে সম্পৃক্ত। তিনি বান্দাকে শুধু বিনিময় দেন না; অতিরিক্তও দেন। একটি কাজের জন্য ন্যূনতম ১০ গুণ বিনিময় দেন। এরপর তা বৃদ্ধি করতে করতে কাউকে কাউকে বে হিসাব দিয়ে দেন। কিন্তু আকদে মুআওয়াওয়াযা যেমন ক্রয়-বিক্রয় ও ইজারা ইত্যাদির মধ্যে অতিরিক্ত বলতে কিছু নেই। এখানে ‘এওয়াজ’ বা বিনিময় আসে পণ্য বা সেবার মোকাবেলায়। পণ্য বা সেবার সাথেই এটি সম্পৃক্ত হয়। পণ্য বা সেবার সাথে সম্পৃক্ত না হয়ে অতিরিক্ত কিছু হলে সেটি বাইয়ে ফাসিদ বা ইজারায়ে ফাসিদার মধ্যে পড়বে।

অতএব একজনের কাজের বিনিময়ে বহুজন পারিশ্রমিক পাওয়ার বৈধতা নেই।

৩. মুফতী বোর্ড ঢাকার ফতোয়ায় আরেকটি বিষয় ছিল ‘আলগারার’।

ইমাম সারাখসী রাহ.-এর বরাতে এর একটি সংজ্ঞা সকালে উল্লেখ করেছি। ইবনুল আছীর জাযারী রাহ.-এর আরেকটি সংজ্ঞা দিয়েছেন। তা হল-

الغرر ما له ظاهر توثره، وباطن تكرهه، فظاهره يغر المشتري وباطنه مجهول

অর্থাৎ যার এমন একটি প্রকাশ্য রূপ রয়েছে, যা দ্বারা মানুষ এর প্রতি আকৃষ্ট হয়, কিন্তু এর মধ্যে এমন অদৃশ্য কারণ রয়েছে, যে কারণে তা অস্পষ্ট। অতএব এর বাইরের রূপ ক্রেতাকে ধোঁকায় ফেলে। আর এর ভিতরের রূপ অজানা। (জামেউল উসূল ১/৫২৭)

এ সংজ্ঞাটি খুব সুন্দর। ফতোয়াটি তৈরির সময় সকলেই একে পছন্দ করেছিলেন। কেননা এটি এমএলএম-এর সাথে ভালোভাবে খাপ খায়। এমএলএম-এর প্রকাশ্যরূপ ঠিকই ক্রেতাকে ধোঁকায় ফেলে দেয় আর এর ভিতরের দিকটা অজানা। অর্থাৎ কয়জনকে ক্রেতা বানাতে পারবে, আদৌ বানাতে পারবে কি না কিছুই জানা নেই। মোদ্দাকথা, এমএলএম-এর একজন পরিবেশক ভবিষ্যতে কী কী পাবে বা আদৌ পাবে কি না তা সম্পূর্ণ অজানা ও অনিশ্চিত, যা আলগারার-এর সমার্থক।

কেউ কেউ দাবি করে থাকে যে, এখানে আলগারার থাকলেও তা পরিমাণে কম, যা নিষিদ্ধ নয়। কিন্তু এমএলএম চেনেন এম ব্যক্তিমাত্রই ববুঝবেন যে, এক্ষেত্রে যদি গারার কম হয় তবে আলগারার কাসীর বা বড় গারার পাওয়া হয়ত মুশকিলই হবে।

৪. মুফতী বোর্ড ঢাকা তো এমএলএম-এ শুবহাতুর রিবা তথা রিবার সন্দেহ-এর কথা বলেছে। কিন্তু ভারতের ফিকহ একাডেমীর সেমিনারে কেউ কেউ একে সরাসরি রিবাও বলেছেন। তারা বিষয়টিকে বিশ্লেষণ করেছেন এভাবে যে, ক্রেতা টাকা দিয়েছে তো পণ্য পেয়েই গেছে। এখন ভবিষ্যতে যে কমিশন পাবে তা সুদ হিসাবে গণ্য হবে। কেউ কেউ কিমার তথা জুয়াও বলেছেন। তা এভাবে যে, সে যে টাকা খাটিয়েছে এর এক অংশ লেগেছে পণ্যের কাজে। আরেক অংশ ভবিষ্যতে কমিশন পাওয়ার জন্য, যা অনিশ্চিত। সুতরাং তা কিমারের মধ্যেও দাখেল হয়ে যায়। তবে আমরা একে সরাসরি রিবা বা কিমার না বললেও এতে যে রিবা বা কিমারের সন্দেহ তথা গন্ধ রয়েছে তা তো বলার অপেক্ষা রাখে না।

এমএলএম-এর সপক্ষে ইদানীং কোনো কোনো মাওলানা সাহেবও বক্তব্য দিয়েছেন। কেউ কেউ বইও লিখে ফেলেছেন। তারা আজব আজব দলিলও পেশ করেছেন। কিন্তু সব কথার বা সব ধরনের লোকের কথার জবাব দেওয়া জরুরি নয়। কেননা, সবার কথার জবাব দিলে যে ফিকহ বুঝে না সে মনে করবে, আমার কথারও জবাব দেওয়া হয়। মনে হয় আমিও ফকীহ হয়ে গেছি। এরপরও মানুষ যেন বিভ্রান্তিতে না পড়ে সেজন্য কোনো কোনো কথার জবাব দেওয়া হল।

* একজন তার বইয়ে লিখেছেন, মুফতী বোর্ডের ফাতাওয়ায় আলইজারা ও আলবাইয়ের মাঝে গুলিয়ে ফেলা হয়েছে। আলগারার-এর সম্পর্ক বাইয়ের সঙ্গে, ইজারার সাথে নয়। القادر بقدرة الغير এ নীতি বাইয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, ইজারার ক্ষেত্রে নয়। ইজারা ও বাই এক নয়। ভিন্ন ভিন্ন দুটি জিনিস।

ঐ ভদ্রলোকের জানা থাকার কথা যে, ফতোয়াটি একক কোনো মুফতীর নয়; বরং একটি বোর্ডের ফতোয়া। সারাদেশের নির্ভরযোগ্য বহু মুফতী এর সমর্থন করেছেন। এক্ষেত্রে ‘তারা গুলিয়ে ফেলেছেন’ এ ধরনের কথা বলার অর্থ হল, মুফতীদের একটি বিশাল গোষ্ঠিকে জাহেল বা মূর্খ আখ্যা দেওয়া। এটি কোন পর্যায়ের ধৃষ্ঠতা তা বুঝিয়ে বলার প্রয়োজন নেই।

আর তার দাবিটিও ভুল। মূলত বাই ও ইজারা দুটোই বিক্রি। একটি হল পণ্য বিক্রি, আরেকটি হচ্ছে সেবা বিক্রি। এজন্য ইজারার সংজ্ঞা কেউ কেউ এভাবে দিয়েছেন-

الإجارة هي بيع منفعة معلومة بأجر معلوم

‘ইজারা হচ্ছে নির্ধারিত বিনিময়ে নির্ধারিত সেবা বিক্রয় করার নাম। আলমুহীতুল বুরহানীতে সুস্পষ্টভাবে ইজারাকে বাই বলা হয়েছে। (আরো দেখুন : আলআওসাত ১১/১৩১; আলমুগনী ৮/২২; আলফুরূক ৪/৩৪)

ফিকহের কিতাব খোঁজ করলে দেখবেন, ফাসেদ শর্তাবলি, আলগারার, অজানা থাকার দোষ শুধু বাই এর ক্ষেত্রে সমস্যা নয়; ইজারার ক্ষেত্রেও সমস্যা।

ফাতহুল কাদীরে (৬/৮১) কাযীখানের হাওয়ালায় বলা হয়েছে- فيه : وذكر الإمام قاضيخان : العقود التي يتعلق تمامها بالقبول أقسام ثلاثة قسم يبطل بالشرط الفاسد وجهالة البدل وهي مبادلة المال بالمال كالبيع والإجارة.

আলগারার যে ইজারার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য তার জন্য আরো পড়তে পারেন : আলগারার ওয়া আছারূহু ফিল উকূদ ৪৬৫; ফিকহুল মুআমালাতিল মালিয়াহ ১৩৯

* কেউ কেউ আলউজরাতু বিলা আমল তথা বিনা কর্মে পারিশ্রমিক বৈধ বানানোর জন্য ক্রিকেট টিমের পুরস্কারের প্রসঙ্গ টেনে এনেছেন। অর্থাৎ যারা ক্রিকেট খেলে তারা নির্ধারিত একটা বেতন পায়। এরপর টিমের জয় হলে কখনো অতিরিক্ত পুরস্কার পায়। তাদের এই অতিরিক্ত পুরস্কার বৈধ হলে এমএলএম-এর অতিরিক্ত কমিশন বৈধ হবে না কেন?

এর জবাব কী দিব! খোদ পেশাদার ক্রিকেট খেলার প্রচলিত পদ্ধতিকে কে জায়েয বলেছে তাই তো আগে দেখা প্রয়োজন। এ ধরনের ফালতু কথা বলার মতলবটা হল, সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জন। এদেশের অনেক মানুষ বুঝে বা না বুঝে খেলার ভক্ত। সুতরাং এ প্রসঙ্গে ক্রিকেটের কথা নিয়ে আসলে তা সহজেই মার্কেট পেয়ে যাবে। এ ধরনের সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জনের চিন্তা থেকেই হয়ত এমএলএম-এর মাসআলায় খেলার প্রসঙ্গ নিয়ে আসা হয়েছে।

* এখন এমএলএম ওয়ালাদের শরীয়া কাউন্সিলও আছে। তাদের শরীয়া কাউন্সিলররা এর বৈধতার পক্ষে বইও লিখেছেন এবং এর পক্ষে বিভিন্ন ‘দলিল-প্রমাণ’ পেশ করার চেষ্টা করেছেন। তাদের একটি দলিল শুনুন।

যে দলিলটি তাদের নিকট খুবই গুরুত্বপূর্ণ তা হল, ‘এমএলএম বৈধ। কারণ এটি একটি বেচাকেনা। আর কুরআন মজীদে আছে-

احل الله البيع وحرم الربا

আল্লাহ কেনাবেচাকে হালাল করেছেন আর সুদকে করেছেন হারাম।’

এর জবাব দেওয়ার দরকার আছে বলে মনে করি না। ভেবে দেখুন, কেউ যদি বলে কুরআনে পানাহার করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এর দ্বারা কি যে কোনো দ্রব্য ও পানীয় পানাহারের বৈধতা প্রমাণিত হয়? নিশ্চয়ই তারাও বলবে, হয় না। তারাও বলবে, শরীয়তে নিষিদ্ধ বস্ত্ত ছাড়া অন্যগুলো পানাহার করা যাবে। এক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। অর্থাৎ শরীয়ত কর্তৃক নিষিদ্ধ নয় এমন বেচা-কেনা হালাল।

আসলে আলবাই-এর ‘আলিফ-লাম’ হল عهد এর জন্য। অর্থাৎ সব বাই উদ্দেশ্য নয়; বরং البيع المعهود في الشرع শরীয়ত যেটাকে বৈধ বাই বলে মনে করে এখানে সেটাই উদ্দেশ্য। অন্যগুলো নয়।

এরকম দলিল আরবের মুশরিকরাও দিয়েছিল। তারা বলেছিল-انما البيع مثل الربا বেচা-কেনা আর সুদ তো একই ধরনের কারবার। কুরআন তা খন্ডন করেছে।

* আরেকটি দলিল হল মুদারাবা। অর্থাৎ এমএলএম ওয়ালারা বলতে চায়, ক্রেতা পরিবেশক থেকে যে টাকা নেওয়া হয় তা মুদারাবা হিসেবে নেওয়া হয়। এরপর যে কমিশন দেওয়া হয় সেটি এরই লভ্যাংশ।

আজকাল অনেকেই শুনে শুনে ফিকহের দু তিনটি পরিভাষা মুখস্থ করে যেখানে ইচ্ছা লাগিয়ে দেয়। সেটি
বাস্তবতার সাথে মিলুক বা না মিলুক। এধরনেরই একটি শব্দ হল, মুদারাবা।

বাস্তবে এমএলএম-এর সাথে মুদারাবার ন্যূনতম সম্পর্কও নেই। মুদারাবা হল, এক পক্ষের মূলধন আর অপর পক্ষের শ্রম বা ব্যবসা। এরপর পূর্ব চুক্তি অনুযায়ী লভ্যাংশ বণ্টন হবে। এটি শরীয়তের সবচেয়ে স্পর্শকাতর কারবার হিসেবে চিহ্নিত। এতে হিসাব পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে করতে হয়। কোন খরচটা সরাসরি ব্যবসার জন্য হয়, আর কোনটা সরাসরি ব্যবসার জন্য নয় এসব হিসাব ভিন্ন ভিন্নভাবে করতে হয়। এবং মুলধন থাকে ব্যবসায়ীর হাতে ব্যবসার জন্য আমানতস্বরূপ। সরাসরি ব্যবসার ক্ষেত্র ছাড়া অন্য কোনো খাতে তা ব্যবহার করা যায় না। মূলধনের যথাযথ হেফাযত করতে হয়। তাই এই কারবারে দাখেল হওয়ার আগে চিন্তা করা উচিত আমি তা পারব কি না। মূলধনের হেফাযত করতে পারব কি না।

এমএলএম-এর সাথে মুদারাবার কোনো মিল নেই। এখানে এক পক্ষের টাকা অন্য পক্ষের শ্রমের কোনো বিষয় নেই। লাভ-লোকসান অংশিদারিভিত্তিক কোনো চুক্তিও হয় না। অর্থদাতা কোম্পানির কোনো লোকসানের চুক্তিতেও আবদ্ধ হয় না। এটি যদি মুদারাবাই হত তাহলে টাকাটা ব্যবসায় না খাটিয়ে কমিশন বাবদ দেওয়া
হত না।

এছাড়া তাদের কথার মধ্যেই স্ব-বিরোধিতা রয়েছে। একবার বলেন, বাই। আরেকবার বলেন মুদরাবা। দুটি ভিন্ন ভিন্ন জিনিস। মুদারাবায় বেচাকেনা হয় না; বিনিয়োগ করা হয়।

* আরেকজন বলেছেন যে, পরিচয় দানকারী তথা যার মাধ্যমে সদস্য হল সে হচ্ছে কাফীল।

এর জবাব দেওয়ার প্রয়োজন নেই। কেননা যদি একথা ধরা হয় তবে কাফালাহ এর পারিশ্রমিক নেওয়া তো জায়েয নেই। সুতরাং কমিশন নেওয়াও জায়েয হতে পারে না।

আসলে কখন কী বলে পরে আর খবর থাকে না। নিজের কথায় নিজেই আটকা পড়ে যায়। সুতরাং তাদের বই অনুযায়ীই কমিশন নেওয়া বৈধ হয় না।

আসলে এ ধরনের কথাবার্তার জবাব দিতে গেলে শুধু সময়ই নষ্ট হবে। কোনো ইলমী বা দ্বীনী ফায়েদা হবে না। তাই এখানেই শেষ করছি।

এখন আমরা প্রশ্নোত্তরের দিকে যাব। আজকে আর যতটুকু সময় অবশিষ্ট রয়েছে তাতে এমএলএম বিষয়ক আপনাদের প্রশ্নাবলির জবাব দেওয়া হবে ইনশাআল্লাহ।

১ম পর্ব adarshanari.com/economics/10505

পর্ব ২ https://adarshanari.com/economics/10519/

পর্ব ৩ https://adarshanari.com/economics/10537/

পর্ব ৪ https://adarshanari.com/economics/10539/

Leave a Reply

Your email address will not be published.

%d bloggers like this: