মুসলমানদের অধঃপতনের মূল কারণ

জাস্টিস আল্লামা তাকী উসমানী


মুসলমানদের অধঃপতনের মূল কারণ দুটি।

প্রথম কারণ : কুরআনে কারীম ছেড়ে দেওয়া

উম্মতে মুসলিমা কুরআনুল কারীমকে পিছে ঠেলে দিয়েছে। কুরআনুল কারীম ছেড়ে দিয়েছে। কুরআন কারীম ছেড়ে দিয়েছে মানে- (ক) তার তিলাওয়াত ছেড়ে দিয়েছে- যেভাবে তিলাওয়াত করা উচিত ছিল। (খ) এর অর্থ বোঝার চেষ্টা ছেড়ে দিয়েছে এবং (গ) এতে যেই তালীম ও শিক্ষা রয়েছে তার উপর আমল করা ছেড়ে দিয়েছে। কুরআন ছেড়ে দেওয়ার মাঝে এই তিন অর্থ নিহিত রয়েছে।

কুরআনে কারীমের তিলাওয়াত একটি স্বতন্ত্র আমল

কুরআনুল কারীমের হুকূক আদায়ের সর্বপ্রথম সিঁড়ি হচ্ছে কুরআনে কারীমের তিলাওয়াত। অর্থাৎ মুসলমান এর তিলাওয়াত করবে। যদিও কুরআনুল কারীম অবতরণের মূল উদ্দেশ্য হল- কুরআনুল কারীমের মাঝে যে তালীমাত রয়েছে সেগুলো আমলে নিয়ে আসা। কিন্তু এর প্রথম ধাপ হচ্ছে তিলাওয়াত। তিলাওয়াতে কুরআন আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে এমন মহান এক নুসখা যে, কুরআনে কারীমের শুধু তিলাওয়াতটিই একটি স্বতন্ত্র ইবাদত এবং বড় সৌভাগ্যের বিষয়। হাদীসে বলা হয়েছে- কুরআন কারীম তিলাওয়াত করলে প্রতিটি অক্ষরে দশ দশ করে নেকী পাওয়া যায়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো ব্যাখ্যা করে বলেন, আমি একথা বলি না যে, আলিফ-লাম-মীম একটি হরফ। বরং আলিফ একটি স্বতন্ত্র হরফ এবং লাম একটি স্বতন্ত্র হরফ এবং মীম একটি স্বতন্ত্র হরফ- তো শুধু আলিফ-লাম-মীম তিলাওয়াত করার মাধ্যমে ত্রিশ নেকী অর্জিত হয়ে যায়।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে এমন নুসখায়ে শেফা- যা মূলত হেদায়েতের নুসখা- দান করেছেন, যার কোনো তুলনা হয় না। ডাক্তারের নুসখা তো এমন হয় যে, ডাক্তার বলে দেন- এটা হল তোমার ব্যবস্থাপত্র। এ অনুযায়ী তুমি ওষুধ সংগ্রহ করে ব্যবহার করবে। কিন্তু এখন যদি তুমি সেই প্রেসক্রিপশন সারা দিন পড়তে থাক, তাহলে এতে কোনো ফায়দা নেই। তোমার রোগ এতটুকুও ভালো হবে না। কিন্তু এই নুসখায়ে শেফা এতটাই মুফীদ ও উপকারী যে, এর উপর আমল করা এবং এর অর্থ-মর্ম অনুধাবন করা যদিও একেকটি স্বতন্ত্র আমল এবং বড় বড় আমল। তবে এগুলোর সাথে সাথে শুধু এর তিলাওয়াতটাই একটি স্বতন্ত্র আমল।

এজন্য মুসলিম সমাজের একটা ঐতিহ্য এও ছিল যে, দৈনিক কিছু না কিছু তিলাওয়াত করা ব্যতীত পুরোটা দিন কাটিয়ে দিবে- এমন মুসলমান পাওয়া যেত না। সাধারণত ফজরের পর মুসলিম ঘরগুলো থেকে তিলাওয়াতের ধ্বনি ভেসে আসত। মুসলিম সমাজের এটা একটা বড় ইমতিয়ায ও বৈশিষ্ট্য ছিল। মুসলিম বসতিতে গেলে মানুষ বুঝে ফেলত যে, এটা মুসলিম জনপদ এবং এখানকার ঘরগুলো তিলাওয়াতে কুরআনে মুখরিত হয়ে আছে।

তো হযরত রাহ. বলেন- মুসলমান এই আমল ছেড়ে দিয়েছে।  দৈনিক কিছু হলেও তিলাওয়াত করার যে রুটিন মুসলিম জীবনে ছিল, অনেকেই বরং বলা যায় অধিকাংশ মুসলিমই তা ছেড়ে দিয়েছে।

তিলাওয়াত ছেড়ে দেওয়ার একটা বড় কারণ এও যে, অনেক মুসলমান তিলাওয়াতটাই শিখেনি। বড় বড় পদ ও পদবীর অধিকারী হয়ে গেছে। বড় লিডার বনে গেছে। আমীর হয়ে গেছে। সমাজের মান্যগণ্য ব্যক্তি হয়ে গেছে। এতকিছু হয়ে গেছে, কিন্তু মুসলমান কুরআন শরীফ স্বাভাবিকভাবে পড়তে শেখেনি। তাহলে তিলাওয়াত করবে কীভাবে?! বহুত আফসোসের কথা!!

একটি ভুল ধারণা

সমাজে একটি মারাত্মক ভুল ধারণা ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বলা হয়- ভাই, কুরআন তো এজন্য এসেছে যে, তুমি এটা বুঝবে এবং এর উপর আমল করবে। শুধু তিলাওয়াতে কী ফায়দা? এটা মস্ত বড় ভুল ধারণা।

আমি তো মাত্রই রাসুলুল্লাহ সা. এর হাদীস শোনালাম- কুরআন তিলাওয়াত করলে প্রতিটি হরফে দশটি করে নেকী হাসিল হয়। আর যে ব্যক্তি তিলাওয়াতই জানে না, তিলাওয়াত করার অভ্যাসই যার নেই, সে এর উপর কী আমল করবে! কুরআনের কাছে আসার প্রথম ধাপই তো হল তিলাওয়াতে কুরআন।

তো হযরত শাইখুল হিন্দ রাহ. -আল্লাহ তাআলা তাঁর মরতবা বুলন্দ করুন- বলেছেন, এই কুরআনকে ছেড়ে দেওয়া- অর্থাৎ ক. তিলাওয়াত ছেড়ে দেওয়া, খ. এর অর্থ ও মর্ম অনুধাবন করা ছেড়ে দেওয়া এবং গ. এর শিক্ষা অনুসারে আমল ছেড়ে দেওয়া- এগুলো মুসলমানদের অধঃপতনের একটা মৌলিক কারণ।

হযরত বলেন- এজন্য আমি আমার বাকি জীবন এই কুরআনের খেদমতেই ব্যয় করব, ইনশাআল্লাহ। অর্থাৎ কুরআনে কারীমের তালীম আম ও ব্যাপক থেকে ব্যাপকতর করব। এ কল্পে হযরত পুরো হিন্দুস্তান জুড়ে মক্তব প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। অনেক মক্তব প্রতিষ্ঠাও করেন, যাতে সবাই দ্বীন শিখতে পারে।

বর্তমান সময়ে মুসলমানদের হালচাল

এখন আমরা এ বিবেচনায় নিজেদের অবস্থার দিকে একটু নজর দেই- মুসলমানদের ধ্বস কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের ধ্বস নয়। নির্দিষ্ট কোনো রাজত্বের পতন নয়। পুরো মুসলিম বিশ্বের অধঃপতনের চিত্র তো আপনারা নিজ চোখেই দেখতে পাচ্ছেন- মুসলিম উম্মাহ কোন্ শিখর থেকে কোন্ অতলে চলে এসেছে। এক সময় তো ইসলামী শক্তির এরকম হালত ছিল যে, মুসলিম রাজত্বে সূর্য ডুবত না। ইন্দোনেশিয়া থেকে মারাকেশ পর্যন্ত পুরো এলাকাজুড়ে মুসলিম রাজত্ব ছিল এবং এই পুরো অঞ্চলে মাত্র একজন খলীফা ছিলেন- উসমানী সালতানাতের খলীফা। সকলে তার অধীনে কাজ করত। তার তত্ত্বাবধানেই কুরআনে কারীমের তালীম হত, হাদীসের তালীম হত, ফিকহের তালীম হত। এছাড়া আরো যত জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শাস্ত্র-বিদ্যা রয়েছে, সবকিছু শেখার ব্যবস্থা ছিল। বড় বড় আহলে ইলম ও বিজ্ঞানী সেখান থেকে তৈরি হতেন এবং সকলেই হতেন মুসলমান। হাঁ, চিন্তা-চেতনা, মন-মানসিকতা, রুচি-প্রকৃতি সার্বিকভাবেই তারা মুসলিম হতেন।

কিন্তু এখন বলুন- মুসলমানের কী অবস্থা! বাহ্যিকভাবে ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটেছে। কিন্তু মুসলমানরা ব্রিটিশদের মানসিক দাসত্ব থেকে বের হয়ে আসতে পারেনি। চিন্তা-চেতনায় এখনও তাদের গোলাম হয়ে আছে। তাদের রঙঢঙ, চলাফেরা, জীবনাচার, সভ্যতা-সংস্কৃতি গ্রহণ করাকে নিজেদের জন্য সম্মান ও সৌভাগ্যের কিছু মনে করছে। এভাবে চলতে চলতে তারা ক্ষমতায়ও চলে আসছে। কিন্তু যখন কুলহুয়াল্লাহ জিজ্ঞাসা করা হয় তখন তাদের পক্ষে আর তিলাওয়াত করা সম্ভব হয় না।

মোটকথা, অধঃপতনের মূল কারণ হচ্ছে কুরআন ছেড়ে দেওয়া।

আর যারা তিলাওয়াত করে থাকেন, চিন্তা করে দেখুন, তাদের ক’জন এমন রয়েছেন, যারা তিলাওয়াতের পাশাপাশি এর তরজমা-তাফসীরসহ অর্থ মর্ম বুঝে বুঝে পড়েছেন। ভাই, কুরআন কারীম আল্লাহ তাআলার পয়গাম নিয়ে এসেছে। আমরা আল্লাহ তাআলার বান্দা। একটু তো বুঝার চেষ্টা করি- এতে রয়েছে কী! আল্লাহ তাআলা তার বান্দাদের জন্য কী পয়গাম পাঠিয়েছেন?

মনে করুন, আপনার নিকট আপনার এক প্রিয় বন্ধু এবং যার বন্ধুত্ব আপনার নিকট খুবই গুরুত্বপূর্ণ- এমন প্রিয় বন্ধুর পক্ষ থেকে যদি আপনার নিকট ভিন ভাষায় কোনো পত্র আসে- এমন ভাষা যা আপনি জানেন না। কথার কথা ইংরেজিতে আসল, আর আপনি ইংরেজি জানেন না। কিংবা আরবীতে আসল, অথচ আপনার আরবী জানা নেই। তো এমন পত্র আসলে কি আপনি তা না বুঝে সযত্নে আলমারিতে রেখে দেবেন! অথচ আপনি জানেন আমার গুরুত্বপূর্ণ একজন আন্তরিক বন্ধু আমার নিকট পত্র মারফত কোনো জরুরি বিষয়ে অবগত করেছে। নাকি যেভাবেই হোক সেই পত্রের ভাষা আপনি উদঘাটন করেই ক্ষান্ত হবেন- আপনার প্রতি সে কী বার্তা পাঠিয়েছে। কারো মাধ্যমে তরজমা করিয়ে নিবেন কিংবা যে বুঝে তার থেকে বুঝে নিবেন; তাই না!

কিন্তু কুরআনে কারীম, যা গোটা উম্মতের জন্য আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে পয়গাম। যাতে হেদায়েতের সকল তালীম রয়েছে। সেই কুরআনে কারীম সারা জীবন আলমারীতেই থেকে যাবে। তা খুলে তিলাওয়াতও করা হবে না এবং এর অর্থ মর্ম অনুধাবনের তাওফীকও হাসিল হবে না! বলুন এর চেয়ে ক্ষতি ও দুর্গতি আর কী হতে পারে!

তো এ থেকে সবক পাওয়া যায় যে, কুরআনে কারীম তিলাওয়াতও করতে হবে এবং তিলাওয়াতের সাথে সাথে মুসলমান দৈনিক কিছু সময় এর অর্থ মর্ম বোঝার জন্য বরাদ্দ রাখবে। সে জানতে চেষ্টা করবে- আল্লাহ তাআলা তার কাছে কী পয়গাম পাঠিয়েছেন এবং সেই তালীম অনুযায়ী সে আমল করতে থাকবে।

তো হযরত বলেন- মুসলমানদের অধঃপতনের একটা বড় কারণ হল, কুরআনে কারীম ছেড়ে দেওয়া।

দ্বিতীয় কারণ : পারস্পরিক বিভক্তি

হযরত শাইখুল হিন্দ রাহ. মুসলমানদের অধঃপতনের দ্বিতীয় মৌলিক কারণ হিসেবে যেটি চিহ্নিত করেছেন, তা হল মুসলমানদের পারস্পরিক বিভক্তি ও ফেরকাবন্দী। অর্থাৎ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয়ে গ্রুপিং করা। মামুলি বিষয় নিয়ে দলে দলে বিভক্ত হয়ে পড়া।

মুসলমান এখন যেনতেন বিষয়ে দল উপদলে বিভক্ত হয়ে আছে। ফেরকাবন্দী এবং মতবিরোধের বাজার এখন খুব চাঙা। সবাই এটা মনে করে যে, একমাত্র আমিই সঠিক আর বাকি সবাই ভুল এবং সর্ববিবেচনায় ভুল। অতএব যখন সে ভুল তাই তার সাথে উঠবস, চলাফেরা, কথাবার্তা কোনো কিছুই আর চলবে না। কোনো ধরনের কোনো সম্পর্ক আর রাখা যাবে না।

মাসলাক ও মতাদর্শে ভিন্নতা থাকতে পারে। মতাদর্শের ভিন্নতার মাঝেও তো বিভিন্ন স্তর-পর্যায় রয়েছে। কারো কারো সাথে শাখাগত বিষয়ে বিভেদ থাকে। অর্থাৎ এই এতটুকুতে আমাদের মাসলাকী ইখতেলাফ। কিন্তু আমরা আমাদের সর্বশক্তি এবং চূড়ান্ত প্রতিভা শুধু এতেই অপচয় করি যে, কীভাবে অন্যের পুরো মতটাকে ভ্রান্ত ও বাতিল আখ্যা দেওয়া যায়।

গোটা উম্মতে মুসলিমা সামগ্রিকভাবে যে সকল জটিল ও কঠিন সমস্যায় জর্জরিত সেগুলো নিয়ে কখনও ভাবি না। কুফর ও ইলহাদের প্রবল ঝঞ্ঝা, যা গোটা বিশ্বকে তছনছ করে দিচ্ছে। যেখানে যেখানে মুসলিম আবাদী রয়েছে সেখানে তারা কতটা জাহালাতের শিকার হয়ে আছে! মুসলমানদের উপর কুফরী শক্তি কীভাবে চেপে আছে! কিন্তু সে সকল জটিল জটিল সমস্যা সমাধানের জন্য এরা পরস্পরে বসতে প্রস্তুত নয়।

এই দলবিভক্তি ও ফেরকাবন্দী এবং গ্রুপিং করতে করতে তো এখন অবস্থা এতটাই শোচনীয় যে, আগে তো আদর্শে আদর্শে দ্বন্দ্ব ছিল। কিন্তু এখন একই আদর্শে পরিচালিত গ্রুপের মাঝে শুধু দল বাড়ছেই। অর্থাৎ বিভক্তি তাতে আবার বিভক্তি আবার তাতে বিভক্তি- এভাবে শুধু বিভক্ত হচ্ছেই। এ একদলের সে আরেক দলের। অথচ উভয়ের মতাদর্শ ও মতবাদ এক। কিন্তু দুজন যে একসাথে মিলে বসবে এ পরিস্থিতিটুকু নেই। এ ওকে খারাপ বলে, ও একে খারাপ বলে। এভাবে শুধু বিভক্তি আর বিভক্তি চলছেই।

আমাদের এই বিভক্তি থেকে এখন দুশমনরা ফায়দা নিচ্ছে। এর ফলে মুসলমানগণ আরো অধঃপতনের স্বীকার হচ্ছে। যখনই মুসলমানদের মাঝে বিভক্তি ও ফাটল দেখা দিয়েছে তখনই দুশমনরা এর থেকে সর্বোচ্চ লাভবান হতে চেষ্টা করেছে। দুশমনরা কখনও সম্মুখ সমরে মুসলমানদের পরাজিত করতে পারেনি। যদ্দুর পরাজিত করেছে তা বিভক্তি ও ফাটল সৃষ্টি করার মাধ্যমে করেছে। আমাদের নিজেদের মাঝে গাদ্দার মুনাফেকদের মাধ্যমে করেছে। এবং মুসলিম উম্মাহকে টুকরো টুকরো করার মাধ্যমে মুসলমানদেরকে পরাস্ত করেছে ।

আমি যে আপনাদেরকে বলছিলাম- খেলাফতে উসমানিয়া পুরো পৃথিবীর অর্ধেকেরও বেশি অঞ্চলজুড়ে শাসন করছিল। এই খেলাফতকে ধ্বংস করা হয়েছে এই বিভক্তির মাধ্যমে। তারা আরবদের এই ধোঁকা দিল যে, তোমরা হলে আরব, তুর্কীদের সাথে তোমাদের থাকা উচিত নয়। আর তুর্কীদের বলল- তোমরা তো তুর্কী, কেন তোমরা আরবী ভাষা রেখেছ? এভাবে বিভক্তি সৃষ্টি করে খেলাফতকে টুকরো টুকরো করে দিয়েছে। তো এভাবে উম্মত বিভক্ত হতে থাকে আর তাদের শক্তি খর্ব হতে থাকে।

হযরত শাইখুল হিন্দ রাহ. বলেন- ইনশাআল্লাহ, এখন থেকে আমি সাধ্যমত চেষ্টা করে যাব যাতে উম্মতের মাঝে এই বিভক্তি যত কম থেকে কম হয়।

হযরত তার বাকি জীবন এর সুরাহায় প্রচেষ্টা অব্যাহতও রেখেছিলেন। কিন্তু হযরত ছিলেন পড়ন্ত বেলায় উপনীত। কিছুদিন পর হযরত দুনিয়া থেকে তাশরীফ নিয়ে যান।

মতভিন্নতাকে তার গণ্ডির ভেতর রাখুন

মনে রাখার বিষয় হল- ইখতেলাফের এবং মতভিন্নতারও বিভিন্ন পর্যায় ও স্তর থাকে।

এক. ঈমান-কুফরের ইখতেলাফ। এক্ষেত্রে কোনো আপসরফা নেই। ঈমান-কুফরের মাসআলায় কারো সাথে কোনো সমঝোতা নেই। যেমন, কাদিয়ানীরা রয়েছে। মুনকিরীনে হাদীস (হাদীস অস্বীকারকারীরা) রয়েছে। তাদের সাথে আদর্শগত এবং দৃষ্টিভঙ্গিগত কোনো আপস এবং সমঝোতা নেই।

হাঁ, তাদেরকে দাওয়াত দিতে হবে। দাওয়াত দিতে হবে নববী তরীকায়। আম্বিয়ায়ে কেরাম কখনও গালি দিতেন না। এমনকি গালির জবাবেও না। আম্বিয়ায়ে কেরাম সর্বদা মহব্বত ও ভালোবাসার সাথে নিজেদের বার্তা পৌঁছে দিতেন।

এটা আমাদের জন্য অনেক বড় সবক যে, যারা ইসলামের গণ্ডি বহির্ভূত তাদেরকেও দাওয়াত দেওয়ার সময় নববী উসূল ও তরীকা গ্রহণ করতে হবে।

اُدْعُ اِلٰی سَبِیْلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَ الْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ وَ جَادِلْهُمْ بِالَّتِیْ هِیَ اَحْسَنُ .

অর্থাৎ দাওয়াত দিতে গিয়ে যদি বিতর্কের অবস্থা সৃষ্টি হয় তাহলে তার মোকাবেলা করো উত্তম পন্থায়। গালি দিয়ে নয়। তাদেরকে গালমন্দ করে নয়। বরং ভালবাসার সাথে। যে ব্যক্তি কুফরে লিপ্ত তাকে দেখে ক্ষিপ্ত হবার নয় বরং ভীত হবার বিষয়। কারণ এ ব্যক্তি তো তার ভুল আকীদার কারণে জাহান্নামে জ্বলবে।

তো এটা হল কুফর ও ইসলামের এখতেলাফ।

দুই. আরেক ধরনের ইখতেলাফ হল, হক-বাতিলের ইখতেলাফ। কুফর ও ইসলামের ইখতেলাফ নয়। অর্থাৎ সে ইসলামের চৌহদ্দিতেই রয়েছে। তবে কিছু বাতিল ও ভ্রান্ত বিষয়ে লিপ্ত রয়েছে। তো এর সাথে মুআমালা ও আচরণ হবে ভিন্ন রকম। দলিল-প্রমাণের মাধ্যমে তার খ-ন ও প্রতিবাদ হবে। কিন্তু তার উপর বাড়াবাড়ি ও যুলুম করার কোনো সুযোগ নেই।

তিন. তৃতীয় আরেক ধরনের ইখতেলাফ হয় মতভিন্নতা বা মাযহাবগত ইখতেলাফ। হানাফী শাফেয়ী মালেকী হাম্বলী- এগুলো হল একেকটি মাযহাব। এগুলো সবগুলোই হক, কোনোটিই বাতিল ও ভ্রান্ত নয়। এজন্য তাদের উপর আপত্তি তোলাও জায়েয নেই। যেমন কোনো গায়রে শাফেয়ী ব্যক্তি যদি শাফেয়ী কোনো মুসল্লির উপর আপত্তি তুলে যে, ভাই, তুমি নামাযে কেন হাত উঠাও? কেন জোরে আমীন বল? তাহলে এভাবে তার উপর আপত্তি তোলা জায়েয হবে না। কেননা এগুলো হল মুজতাহাদ ফীহ মাসআলা। এতে কোনো মতই ভ্রান্ত বা বাতিল নয়। উভয় পদ্ধতিই সঠিক। তো এটা হল মাযহাবের এখতেলাফ।

যেখানে বিদআতের প্রচলন রয়েছে সেখানে মহব্বত, ভালবাসা এবং সম্প্রীতির মাধ্যমে ভদ্রতা ও শারাফত বজায় রেখে তাদের রদ করা চাই। কিন্তু মুজতাহাদ ফীহ মাসআলার ক্ষেত্রে যদি সুন্নত-বিদআতের ইখতেলাফের মতো আচরণ হয় যে, আমরা তাদের সাথে চলতে পারছি না, বসতে পারছি না তাহলে এটা অনেক খারাপ কথা। দ্বীনের তাকাযা ও মেযাজ এরকম নয়। যদি এমন হয় তাহলে তা হবে ফেরকাবন্দী এবং দলবাজী। তাই এ ধরনের আচরণ থেকে বেঁচে থাকা খুবই জরুরি।

হযরতের এ নসীহত এতটাই অমূল্য রতন যে, স্বর্ণাক্ষরে তা লিখে রাখা উচিত।  আমাদের অধঃপতনের দুটি কারণ- ক. কুরআন ছেড়ে দেওয়া। খ. ফেরকাবাজি করা, পরস্পরে বিভক্ত হয়ে পড়া।

আল্লাহ তাআলা আপন ফযল ও করমে আমাদেরকে হযরতের কথার উপর আমল করার তাওফীক দান করুন। আমরা যেন কুরআনে কারীমকে প্রকৃত অর্থেই সিনায় লাগাতে পারি। দিল দিয়ে তা উপলব্ধি করতে পারি। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তা বুঝবার তাওফীক দান করুন। যারা নিয়মতান্ত্রিক আলেম নই তারা অন্তত দিনের ২৪ ঘণ্টা থেকে অল্প কিছু সময় বের করে নেব এর তরজমা-তাফসীর পড়ার জন্য। উলামায়ে কেরাম অত্যন্ত সহজ, সরল ও সাবলীলভাবে সাধারণ বোধগম্য করে কুরআনে কারীমের তরজমা তাফসীর করেছেন। এরকম তাফসীর অনেক। সাবলীল তাফসীরও রয়েছে, উচ্চাঙ্গের তাফসীরও রয়েছে। সংক্ষিপ্ত তাফসীরও রয়েছে, বিস্তারিত তাফসীরও রয়েছে। সব ধরনের তাফসীর রয়েছে। কিন্তু বন্ধু, এগুলো থেকে ফায়দা তো গ্রহণ করতে হবে! তাই নারী-পুরুষ সকলে যদি এভাবে রুটিন করে নিই যে, প্রতিদিন অল্প সময়, পনের মিনিটই হোক, কুরআনে কারীম তরজমা-তাফসীরসহ পড়ব। (সাধারণ পাঠকের জন্য উপযোগী তাফসীরের মাঝে তাফসীরে ইবনে কাসীর, তাফসীরে মাআরেফুল কুরআন, তাফসীরে তাওযীহুল কুরআন, তাফসীরে উসমানী, তাফসীরে আশরাফী উল্লেখযোগ্য।)

তাফসীরসহ এজন্য পড়তে বলছি যে, অনেক সময় শুধু তরজমা পড়লে ভুল মর্ম বুঝে থাকে। এজন্য তাফসীরের সাথে পড়া চাই। তো এভাবে পড়লে ইনশাআল্লাহ অনেক ফায়দা হবে এবং কুরআনে কারীম ছেড়ে দেওয়ার কারণে আমাদের আজ যে বিপর্যয় তা অনেকাংশে দূর হবে- ইনশাআল্লাহ।

[তরজমা : আশিক বিল্লাহ তানভীর]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *