মানুষকে বিপথগামী করার জন্যে কুরআনে বর্ণিত শয়তানের ১৭টি কৌশল

Quran

মাওলানা আবু আব্দুল্লাহ 


 

১.শয়তান মানুষের মনে কুপ্ররোচনা সৃষ্টি করে :
يُوَسْوِسُ فِي صُدُورِ النَّاسِ
অর্থ : সে (খান্নাস হয়ে) কুমন্ত্রণা দেয় মানুষের অন্তরে। (সূরা ১১৪ নাস : আয়াত ৫)

২.সে খান্নাসি কৌশল অবলম্বন করে :
مِنْ شَرِّ الْوَسْوَسِ الْخَنَّاسِ
অর্থ : ‘আমি আশ্রয় চাই খান্নাসের কুমন্ত্রণার ক্ষতি থেকে।’ অর্থাৎ সে এতোটা বদ যে, বারবার সামনে এসে কুমন্ত্রণা দেয় এবং পিছিয়ে যায়, বারবার প্রকাশ হয়ে কুমন্ত্রণা দেয় এবং গোপন হয়ে যায়। (সূরা ১১৪ আন্ নাস : আয়াত ৪)

৩.শয়তান মানুষকে প্রতিশ্রুতি দেয় এবং মানুষের মনে মিথ্যা আশা-বাসনা সৃষ্টি করে :
يَعِدُهُمْ وَيُمَنِّيهِمْ ۖ وَمَا يَعِدُهُمُ الشَّيْطَانُ إِلَّا غُرُورًا
অর্থ : সে প্রতিশ্রুতি দেয় এবং মানুষের মনে মিথ্যা বাসনার সৃষ্টি করে। আসলে শয়তান তাদের যে ওয়াদা দেয় তা প্রতারণা মাত্র। (সূরা  আন নিসা : আয়াত ১২০)

৪.শয়তান মানুষের মন্দ কাজকে তাদের কাছে শোভনীয় ও মনোহরী (fair seeming) করে তোলে :

وَزَيَّنَ لَهُمُ الشَّيْطَانُ أَعْمَالَهُمْ فَصَدَّهُمْ عَنِ السَّبِيلِ
অর্থ : শয়তান তাদের মন্দ কাজসমূহকে তাদের দৃষ্টিতে চমৎকার ও মনোহরী করে তোলে এবং এভাবে তাদের সরল সঠিক পথ অবলম্বনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। (সূরা ২৯ আনকাবুত : আয়াত ৩৮)

৫.মানুষ যেনো দান না করে সেজন্যে শয়তান মানুষকে দারিদ্রের ভয় দেখায় এবং কার্পণ্যে উদ্বুদ্ধ করে :
اَلشَّيْطَانُ يَعِدُكُمُ الْفَقْرَ وَيَأْمُرُكُم بِالْفَحْشَاءِ
অর্থ : শয়তান তোমাদের দারিদ্র্যের ভয় দেখায় এবং কৃপণতার আদেশ করে। (সূরা ২ আল বাকারা : আয়াত ২৬৮)

৬.শয়তান মানুষকে মাদক, জুয়া, আস্তানা এবং ভাগ্য নির্ণয়ের খেলায় লিপ্ত করে :
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِّنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
অর্থ : হে ঈমানওয়ালা লোকেরা! জেনে রাখো, মদ (মাদক), জুয়া, আস্তানা (বেদী), ভাগ্য নির্ণয়ের শর -এসবই শয়তানের নোংরা কর্ম। সুতরাং তোমরা এগুলো বর্জন করো, সফলতা অর্জন করবে। (সূরা ৫ আল মায়িদা : আয়াত ৯০)

৭.শয়তান মানুষের মধ্যে পারস্পরিক শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করে :
إِنَّمَا يُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَن يُوقِعَ بَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاءَ فِي الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ وَيَصُدَّكُمْ عَن ذِكْرِ اللَّهِ وَعَنِ الصَّلَاةِ ۖ فَهَلْ أَنتُم مُّنتَهُونَ
অর্থ: শয়তান মাদক ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের মাঝে পারস্পরিক শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করতে চায় এবং আল্লাহর স্মরণ ও সালাত আদায়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে চায়। তবু কি তোমরা (এসব শয়তানি কর্ম থেকে) নিবৃত হবেনা। (সূরা ৫ আল মায়িদা : আয়াত ৯১)

৮.শয়তান সুদী কারবারে লিপ্ত করে :
الَّذِينَ يَأْكُلُونَ الرِّبَا لَا يَقُومُونَ إِلَّا كَمَا يَقُومُ الَّذِي يَتَخَبَّطُهُ الشَّيْطَانُ مِنَ الْمَسِّ
অর্থ: যারা সুদ খায়, তারা অবশ্যই ঐ ব্যক্তির মতো দাঁড়াবে, যাকে শয়তান তার স্পর্শ দ্বারা সুস্থ জ্ঞান-বুদ্ধি শূন্য করে দিয়েছে। (সূরা ২ আল বাকারা : আয়াত ২৭৫)

৯.শয়তান মানুষকে আল্লাহ সম্পর্কে বিতর্কে লিপ্ত করে :
وَمِنَ النَّاسِ مَن يُجَادِلُ فِي اللَّهِ بِغَيْرِ عِلْمٍ وَيَتَّبِعُ كُلَّ شَيْطَانٍ مَّرِيدٍ
অর্থ: কতক লোক এমন আছে যারা অজ্ঞতা নিয়ে আল্লাহ সম্পর্কে বিতর্কে লিপ্ত হয় এবং অনুসরণ করে প্রত্যেক বিদ্রোহী শয়তানের। (সূরা ২২ হজ্জ: আয়াত ৩)

১০.শয়তান মানুষকে অশ্লীল ও মন্দ কর্মে প্রলুব্ধ করে :
وَمَن يَتَّبِعْ خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ فَإِنَّهُ يَأْمُرُ بِالْفَحْشَاءِ وَالْمُنكَرِ
অর্থ: যে শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করে, সে জেনে রাখুক, শয়তান অশ্লীল ও মন্দ কর্মের আদেশ দেয় (প্রলুব্ধ করে)। (সূরা ২৪ আন নূর : আয়াত ২১)

১১.যারা হিদায়াতের পথ দেখতে পেয়েও তা পরিত্যাগ করে, শয়তান তাদের কাজকে শোভন করে দেখায় এবং তাদেরকে মিথ্যা আশা দেয় :
إِنَّ الَّذِينَ ارْتَدُّوا عَلَىٰ أَدْبَارِهِم مِّن بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُمُ الْهُدَى ۙ الشَّيْطَانُ سَوَّلَ لَهُمْ وَأَمْلَىٰ لَهُمْ
অর্থ: হিদায়াত সুস্পষ্টভাবে প্রকাশিত ও প্রমাণিত হবার পর যারা তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, শয়তান তাদেরকে তাদের এ আচরণ শোভন ও চমৎকার করে দেখায় এবং তাদেরকে মিথ্যা আশা আকাঙ্ক্ষায় লিপ্ত করে রাখে। (সূরা ৪৭ মুহাম্মদ : আয়াত ২৫)

১২.শয়তান মানুষকে কানকথায় লিপ্ত করে এবং পরস্পরের বিরুদ্ধে সন্দেহ সৃষ্টি করে দেয় :
إِنَّمَا النَّجْوَىٰ مِنَ الشَّيْطَانِ لِيَحْزُنَ الَّذِينَ آمَنُوا
অর্থ: কানাকানি ফিসফিসানি শয়তানের কাজ। সে এটা করায় মুমিনদের ব্যথিত করার জন্যে। (সূরা ৫৮ মুজাদালা : আয়াত ১০)

১৩.শয়তান মানুষের মন-মস্তিষ্কের উপর প্রভাব বিস্তার করে আল্লাহর কথা ভুলিয়ে দেয় :
اِسْتَحْوَذَ عَلَيْهِمُ الشَّيْطَانُ فَأَنسَاهُمْ ذِكْرَ اللَّهِ ۚ أُولَـٰئِكَ حِزْبُ الشَّيْطَانِ
অর্থ : শয়তান তাদের উপর প্রভাব বিস্তার করে নিয়েছে; এভাবে সে তাদের ভুলিয়ে দিয়েছে আল্লাহর কথা। মূলত এরাই শয়তানের দলের লোক। (সূরা ৫৮ মুজাদালা : আয়াত ১৯)

১৪.শয়তান মানুষকে দিয়ে অপব্যয় এবং অপচয় করায় :
إِنَّ الْمُبَذِّرِينَ كَانُوا إِخْوَانَ الشَّيَاطِينِ ۖ وَكَانَ الشَّيْطَانُ لِرَبِّهِ كَفُورًا
অর্থ: যারা অপব্যয় করে তারা শয়তানের ভাই। আর শয়তান তার প্রভুর প্রতি অতিশয় অকৃতজ্ঞ। (সূরা ১৭ ইসরা : আয়াত ২৭)

১৫.শয়তান মন্দ কাজে প্রবলভাবে প্রলুব্ধ করে :
أَلَمْ تَرَ أَنَّا أَرْسَلْنَا الشَّيَاطِينَ عَلَى الْكَافِرِينَ تَؤُزُّهُمْ أَزًّا
অর্থ: তুমি কি লক্ষ্য করোনি, আমি কাফিরদের জন্যে শয়তানদের ছেড়ে রেখেছি তাদেরকে মন্দ কাজে প্রলুব্ধ করার জন্যে? (সূরা ১৯ মরিয়ম : আয়াত ৮৩)
আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন :
فَإِذَا قَرَأْتَ الْقُرْآنَ فَاسْتَعِذْ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ
অর্থ: যখনই তুমি আল কুরআন অধ্যয়নের সংকল্প করবে, তখন ধিকৃত অভিশপ্ত শয়তান থেকে আল্লাহর আশ্রয় চেয়ে নিও। (সূরা আন নহল : আয়াত ৯৮)

১৬. শয়তান ইসলামের অনুসারীদের বিরুদ্ধে তার ভক্ত বন্ধুদের লেলিয়ে দেয়:
যেসব লোক ইসলামের প্রচলন, অনুসরণ ও বাস্তবায়নকে পছন্দ করেনা, শয়তান তাদের বন্ধু হয়ে যায়। সে তাদেরকে ইসলামের অনুসারীদের শত্রু“তা ও বিরুদ্ধাচরণে উস্কে দেয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন :
وَإِنَّ الشَّيَاطِينَ لَيُوحُونَ إِلَىٰ أَوْلِيَائِهِمْ لِيُجَادِلُوكُمْ ۖ وَإِنْ أَطَعْتُمُوهُمْ إِنَّكُمْ لَمُشْرِكُونَ
অর্থ: নিশ্চয়ই শয়তানরা তাদের বন্ধুদেরকে তোমাদের সাথে বিবাদে লিপ্ত হতে (**) অহি করে (উস্কে দেয়)। আনুগত্য করো, তবে অবশ্যই তোমরা মুশরিক হয়ে যাবে। (সূরা ৬ আল আনআম : আয়াত ১২১)
প্রত্যেক নবী ও তাঁর খাঁটি অনুসারীদের বিরুদ্ধেই জিন শয়তান ও মানুষ শয়তান দুশমনিতে লিপ্ত হয়েছে। তারা পরস্পরকে নবী ও নবীর অনুসারীদের বিরুদ্ধে দুশমনি করতে উস্কে দেয়, লেলিয়ে দেয় :
وَكَذَ‌ٰلِكَ جَعَلْنَا لِكُلِّ نَبِيٍّ عَدُوًّا شَيَاطِينَ الْإِنسِ وَالْجِنِّ يُوحِي بَعْضُهُمْ إِلَىٰ بَعْضٍ زُخْرُفَ الْقَوْلِ غُرُورًا
অর্থ: এভাবে আমরা প্রত্যেক নবীর বিরুদ্ধে মানুষ শয়তান ও জিন শয়তানদের শত্রুতা করার অবকাশ দিয়েছি। তারা পরস্পরকে মনোহরী কথা বলে প্রতারণার উদ্দেশ্যে লেলিয়ে দেয়। (সূরা ৬ আল আনআম : আয়াত ১১২)

১৭. শয়তান আল্লাহর নাফরমানি করিয়ে এবং হানাহানি বাধিয়ে দিয়ে কেটে পড়ে:
শয়তান মানুষের বন্ধু ও কল্যাণকামী সেজে মানুষকে প্ররোচনা দেয়। আর শয়তানের প্ররোচনায় প্রভাবিত হয়ে কেউ যখন আল্লাহর হুকুম অমান্য করে এবং অপরাধ সংঘটিত করে বসে, তখন শয়তান তাকে ফেলে কেটে পড়ে :
كَمَثَلِ الشَّيْطَانِ إِذْ قَالَ لِلْإِنسَانِ اكْفُرْ فَلَمَّا كَفَرَ قَالَ إِنِّي بَرِيءٌ مِّنكَ إِنِّي أَخَافُ اللَّهَ رَبَّ الْعَالَمِينَ فَكَانَ عَاقِبَتَهُمَا أَنَّهُمَا فِي النَّارِ
অর্থ: তাদের উপমা হলো শয়তান। শয়তান মানুষকে (প্ররোচনা দিয়ে) বলে : ‘কুফুরি (আল্লাহর হুকুম অমান্য) করো।’ অতঃপর সে যখন কুফুরি করে বসে, তখন শয়তান তাকে বলে : ‘তোমার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নাই, আমি তো আল্লাহ রব্বুল আলামীনকে ভয় করি।’ ফলে উভয়ের পরিণতিই হবে জাহান্নাম। (সূরা ৫৯ হাশর : আয়াত ১৬-১৭)
শয়তান কিভাবে পরস্পরের মধ্যে বিবাদ ও হানাহানি উস্কে দিয়ে কেটে পড়ে, কুরআন মজিদে আরেক স্থানে মহান আল্লাহ সেকথা এভাবে উল্লেখ করেছেন :
وَإِذْ زَيَّنَ لَهُمُ الشَّيْطَانُ أَعْمَالَهُمْ وَقَالَ لَا غَالِبَ لَكُمُ الْيَوْمَ مِنَ النَّاسِ وَإِنِّي جَارٌ لَّكُمْ ۖ فَلَمَّا تَرَاءَتِ الْفِئَتَانِ نَكَصَ عَلَىٰ عَقِبَيْهِ وَقَالَ إِنِّي بَرِيءٌ مِّنكُمْ إِنِّي أَرَىٰ مَا لَا تَرَوْنَ إِنِّي أَخَافُ اللَّهَ ۚ وَاللَّهُ شَدِيدُ الْعِقَابِ
অর্থ: স্মরণ করুন,  যখন শয়তান সুদৃশ্য করে দিল  তাদের দৃষ্টিতে তাদের কার্যকলাপকে এবং বলল যে, আজকের দিনে কোন মানুষই তোমাদের উপর বিজয়ী হতে পারবে না আর আমি হলাম তোমাদের সমর্থক, অতঃপর যখন সামনাসামনী হল উভয় বাহিনী তখন সে অতি দ্রুত পায়ে পেছনে দিকে পালিয়ে গেল এবং বলল, আমি তোমাদের সাথে না-আমি দেখছি, যা তোমরা দেখছ না; আমি ভয় করি আল্লাহকে। আর আল্লাহর আযাব অত্যন্ত কঠিন।

আল্লাহ আমাদেরকে শয়তানের কুমন্ত্রণা  থেকে বেঁচে থাকার তৌফিক দিন।

আপনার মন্তব্য