ক্বারী সিদ্দীক আল মিনশাবি : অনন্য তিলাওয়াতের মাধ্যমে আজও অমর যিনি

বেলায়েত হুসাইন

পরিচয়:

শায়েখ সিদ্দীক আল-মিনশাবি মিসরের একজন কোরআন গবেষক ও বিখ্যাত কারি হিসেবে সুপরিচিত। মনকাড়া তিলাওয়াতের জন্য অসংখ্য মানুষের হৃদয়ে তার স্থান।

জন্ম:

আজ থেকে প্রায় একশ’ বছর আগে ১৯১৯ মতান্তরে ১৯২০ সালের ২০ জানুয়ারি মিসরের রাজধানী কায়রোর দক্ষিণাঞ্চলীয় সাওহাজ জেলার অন্তর্গত মিনশাহ নামক এলাকার বাওয়ারেক গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। এখানের মিনশাহ থেকেই তার নামের শেষে ‘মিনশাবি’ উপাধি যুক্ত করা হয়।

শিক্ষাগ্রহণ:

মাত্র ৮ বছর বয়সেই পবিত্র কোরআনুল কারীমের হিফজ সম্পন্ন করেন। হিফজ সমাপ্ত করে উলুমুল কোরআন বিষয়ে পারদর্শিতা অর্জনে ভর্তি হন মিসরের জামিয়াতুল আজহারে ( আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়)।

তার ভাগ্য খুব সুপ্রসন্ন ছিলো- তৎকালীন জগদ্বিখ্যাত দুই আলেম শায়েখ মুহাম্মদ আবুল আলা এবং শায়েখ মুহাম্মদ সায়ুদীকে আল আজহারে উস্তাদ হিসেবে পেয়ে যান এবং উভয়ের সান্নিধ্যে থেকে উলুমুল কোরআন বিষয়ে গভীর পাণ্ডিত্য অর্জন করেন।

জীবনের বাঁক:

পড়াশোনা সমাপ্তির পরে অল্পদিনেই কারি সিদ্দীক আল-মিনশাবির সুনাম-সুখ্যাতি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আলোচিত হতে শুরু হয়। যদিও নাম-যশ-খ্যাতির কোন লোভ তার ছিলোনা; নিভৃতে কোরআনের খেদমত করে জীবন কাটিয়ে দেয়াই ছিলো তার আমৃত্যু ভাবনা।

জীবনযাপন:

বিপুল যশখ্যাতির অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও লৌকিকতা বিবর্জিত অতি সাধারণ জীবন যাপন পছন্দ করতেন তিনি- একবারের ঘটনা- তখন মিসরের প্রেসিডেন্ট জামাল আব্দুন নাসির, তিনিও কারি মিনশাবির শুহরত ও সুখ্যাতির কথা জানেন। আগ্রহ হয় সরকারি একটি অনুষ্ঠানে তাকে দিয়ে কোরআন তিলাওয়াত করানোর, এও জানতেন যে, তিনি সাধারণত এসব অনুষ্ঠানে তিলাওয়াত করতে পছন্দ করেননা। প্রেসিডেন্ট সংকল্প করেন যেভাবেই হোক- জোর করে হলেও তাকে অনুষ্ঠানে আনবেন- এজন্য এক মন্ত্রীকে কারি সাহেবের নিকট পাঠান।

মন্ত্রী কিছুটা অনুগ্রহের সুরে সিদ্দীক আল মিনশাবিকে জানালেন, অনেক বড় মর্যাদা তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। প্রেসিডেন্টের অনুষ্ঠানে কোরআনুল কারীম তিলাওয়াতের সুযোগ এসেছে তার।

এ কথা শোনামাত্রই তিনি রাগতস্বরে জবাব দিলেন, এটা কি খোদ প্রেসিডেন্ট আব্দুন নাসিরের জন্য সৌভাগ্য নয় যে, সে কারি সিদ্দীক আল-মিনশাবির কণ্ঠে পবিত্র কোরআনের তিলাওয়াত শ্রবণ করবেন?

আত্মমর্যাদা:

সিদ্দীক আল-মিনশাবির জীবনের মূল দর্শন ছিলো- ‘কারিয়ুল কুরআন লা ইয়ুহান’ অর্থাৎ কোরআনুল কারীমের কারি কখনো অবনত হবেন না।
মিসরের রাষ্ট্রীয় রেডিও তাকে একবার একটি ইন্টার্ভিউ এর জন্য স্টুডিওতে আমন্ত্রণ জানায়। সেখানে যেতেও তিনি অস্বীকৃতি জানান এবং বলেন, আমি রেডিওতে পড়তে চাই না। যশ-খ্যাতির কোন লোভ আমার নেই। আমি চাই না, শুধু আমার জন্য রেডিও কর্তৃপক্ষ কোন প্রোগ্রামের আয়োজন করুক।

এভাবেই কারি সিদ্দীক আল-মিনশাবি রহ. নিজ আত্মমর্যাদাকে সবসময় সমুন্নত রাখতে চেষ্টা করেছেন আর মৃত্যু পর্যন্ত নিজ আদর্শের উপর এভাবেই অবিচল থেকেছেন।

এ ঘটনার বেশ কিছুদিন পর মিসরের জাতীয় বেতার ভবন কারি সিদ্দীক আল-মিনশাবির কণ্ঠে ৩০ পারা কোরআন তেলাওয়াত রেকর্ড করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। বেতারের মহাপরিচালক তার নিকট দূত মারফত এ সংক্রান্ত একটি অনুরোধপত্র প্রেরণ করেন। অনুরোধপত্রে তিনি লিখেন, আসন্ন পবিত্র রমজানে ঘরে বসে আপনি যে তিলাওয়াত করবেন- আপনার সম্মতি থাকলে- আমরা তা রেকর্ড করতে চাই। কারি সাহেব সম্মত হলেন। মাসব্যাপী তার কণ্ঠে রেকর্ড হলো ৩০ পারা পবিত্র কোরআনুল কারীম।

তার বিদায়ের দীর্ঘ অর্ধ শতাব্দী পরে আজও সেই রেকর্ডকৃত তিলাওয়াতের মাধ্যমে কোরআনের অগণিত শিক্ষার্থী ও হাফেজগণ প্রতিনিয়ত উপকৃত হচ্ছে, আর
শুধু মিসর নয় বরং গোটা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে কান পাতলেই শোনা যায় কারি সিদ্দীক আল মিনশাবির সাবলীল তিলাওয়াত-ধ্বনি।

আমাদের বাংলাদেশেও কারি সিদ্দীক আল-মিনশাবির আলাদা কদর ও গুরুত্ব লক্ষ্য করা যায়। তার সুমধুর ও মনকাড়া তিলাওয়াত সবাইকে মুগ্ধ করে। সবার হৃদয় ছুঁয়ে যায়।

তার তিলাওয়াতের অনন্যতা:

বিশেষজ্ঞদের মতে, তার তিলাওয়াতের মূল বৈশিষ্ট্য হলো- মাখরাজের পূর্ণ অনুস্মরণ, স্পষ্ট উচ্চারণ ও খোলা আওয়াজ। এই স্বতন্ত্র গুণাবলীর কারণেই তিনি সর্বজনপ্রিয় ও বিশ্ববিখ্যাত হতে পেরেছেন।

তার সময়ের কোরআনুল কারীমের বিশিষ্ট আলেম মুহাম্মদ মুতাওয়াল্লি বলতেন, কেউ যদি খুশুখুজু ও মনভুলানো কোরআন তিলাওয়াত শুনতে চায়, সে যেন সিদ্দীক আল মিনশাবির তিলাওয়াত শ্রবণ করে।

শায়েখ মুতাওয়াল্লি মিনশাবি সম্পর্কে এও বলতেন, তিনি ও তার ৪ বন্ধু (১, মাহমুদ খলিল ২, মুস্তফা ইসমাইল ৩, আবুল বাসেত আবদুস সামাদ ৪, মাহমুদ আলি আল-বান্না) এমন একটি কিশতীতে আরোহণ করেছেন এবং এমন মহাসমুদ্রে কিশতীর পাল তুলেছেন যার কোন কিনারা নেই। কেয়ামত পর্যন্ত এই কিশতী ভাসতে থাকবে আর মানুষ এর দ্বারা উপকৃত হতে থাকবে চিরকাল।

বিদেশ সফর:

বহির্বিশ্ব যখন সিদ্দীক আল মিনশাবির বিস্ময়কর প্রতিভার কথা জানতে পারে, তখন আর তার পক্ষে ঘরে থাকা সম্ভব হয়নি। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বড় বড় সেমিনারে তিলাওয়াতের আমন্ত্রণ আসতে থাকে। তিনি সেসব আমন্ত্রণ গ্রহণ করেন এবং পবিত্র শহর আল কুদস ( জেরুজালেম) এর আল আকসা, কুয়েত, লিবিয়া, আলজেরিয়া, ইরাক, সৌদি আরব এবং বৃটেনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কুরআন তিলাওয়াতের সৌভাগ্য লাভ করেন।

পুরস্কার লাভ:

জীবনে তিনি অসংখ্য পুরস্কার ও হাদিয়া জিতেছেন। সিরিয়া এবং ইন্দোনেশিয়া তাকে বিশেষ সম্মাননা স্মারক প্রদান করে।

স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি:

তার দুই জন স্ত্রী ও সর্বোমোট ৮ জন পুত্র ও ৪ জন কন্যা সন্তান ছিলো।

ইন্তেকাল:

১৯৬৬ সালে তার কণ্ঠনালীতে ইসোপাজিয়াল ভাইরাস (টিউমার জাতীয় ব্যাধি) ধরা পড়ে- এই পরিস্থিতিতেও তিনি কোরআনের তিলাওয়াত ছাড়তে পারেননি।অবশেষে ১৯৬৯ সালের ২০ এপ্রিল কোরআনের মহান খাদেম সিদ্দীক আল মিনশাবি এই দুরারোগ্য ব্যাধিতে ভুগেই ইন্তেকাল করেন। ইন্তেকালের পর মিসর তাকে প্রথম শ্রেণীর জাতীয় পণ্ডিত এবং শাস্ত্রকার ঘোষণা করে।

অনুভূতি:

কারি সিদ্দীক আল মিনশাবি ৫০ বছর পূর্বে মৃত্যুবরণ করলেও তার অনিন্দ্য সুন্দর তিলাওয়াত আজও পৃথিবীর দিকে দিকে ধ্বনিত হয়। আর তিনিও তার এই অনন্য তিলাওয়াতের মাধ্যমে অসংখ্য কোরআন-প্রেমিকের অন্তরে অমর হয়ে আছেন। থাকবেন।

সূত্র: আল-জাজিরা ও উইকিপিডিয়া

One thought on “ক্বারী সিদ্দীক আল মিনশাবি : অনন্য তিলাওয়াতের মাধ্যমে আজও অমর যিনি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: