ইয়াওমে আরাফার রোযা বৃহস্পতিবার নাকি শুক্রবার?

মুফতী আবুল হাসান শামসাবাদী

|| ইয়াওমে আরাফার দিন নিয়ে বিভ্রান্তির নিরসন ||

হাদীস শরীফে ‘ইয়াওমে আরাফাহ’র রোযার বিশেষ ফজীলত বর্ণিত হয়েছে। এ সম্পর্কে হযরত আবু ক্বাতাদাহ (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন–

صِيَامُ يَوْمِ عَرَفَةَ أَحْتَسِبُ عَلَى اللَّهِ أَنْ يُكَفِّرَ السَّنَةَ الَّتِى قَبْلَهُ وَالسَّنَةَ الَّتِى بَعْدَهُ

“ইয়াওমে আরাফার রোযার বিষয়ে আমি আল্লাহর কাছে আশাবাদী যে, তিনি এর দ্বারা আগের এক বছরের এবং পরের এক বছরের গোনাহ মাফ করবেন।”

(সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১১৬২)

উক্ত হাদীসে বর্ণিত ‘ইয়াওমে আরাফাহ’ বা ‘আরাফাহ দিবস’ দ্বারা ৯ই যিলহজ্ব উদ্দেশ্য। এটা এ তারিখের পারিভাষিক নাম। যেহেতু ৯ই যিলহজ্বে হাজীগণ আরাফাহ ময়দানে অবস্থান করেন, তাই এ দিনটি এ নামে প্রসিদ্ধ হয়ে গিয়েছে। তেমনিভাবে ১০ই যিলহজ্ব যেহেতু হাজীগণ কুরবানী করেন, তাই এদিনকে ‘ইয়াওমুন নাহর’ বা ‘কুরবানী দিবস’ বলা হয়।

সুতরাং যেমনিভাবে যে অঞ্চলে যেদিন যিলহজ্ব-এর ১০ তারিখ হবে, সে অঞ্চলে সেদিনই ‘ইয়ামুন নাহর’ বা ‘কুরবানীর দিন’ হবে, ঠিক একইভাবে যে অঞ্চলে যেদিন যিলহজ্বের ৯ তারিখ হবে, সেই অঞ্চলে সেদিনই ‘ইয়াওমে আরাফাহ’ হবে এবং সে অঞ্চলে সেদিনই ‘ইয়াওমে আরাফাহর রোযা’ রাখতে হবে।

এ ২০২০ সনে আমাদের দেশে “ইয়াওমে আরাফার রোযা” কোন্ দিন রাখতে হবে–৩০ জুলাই বৃহস্পতিবার নাকি ৩১ জুলাই শুক্রবার? সঠিক ফাতওয়া হলো, আমাদের দেশে “ইয়াওমে আরাফার রোযা” ৩১ জুলাই শুক্রবার রাখতে হবে। যার পরদিন ১ আগস্ট এদেশে ঈদুল আজহা পালিত হবে।

অনেকে বলছেন, আমাদের দেশে ৩০ জুলাই বৃহস্পতিবার আরাফার রোযা রাখতে হবে। তাদের এ দাবী সঠিক নয়। কারণ, এদেশে ৩০ জুলাই বৃহস্পতিবার হচ্ছে ৮ যিলহজ্ব। আরাফার রোযা তো ৮ যিলহজ্বে নয়, বরং ৯ যিলহজ্বে রাখতে হবে। আর তা হলো তার পরদিন শুক্রবার।

তারা হয়তো বলতে পারেন, ৩০ জুলাই বৃহস্পতিবার সৌদী আরবে ৯ যিলহজ্ব হবে এবং এদিন সেখানে ওকূফে আরাফাত হবে। তাই সৌদী আরবের মক্কায় হাজীগণের ওকুফে আরাফাতের সাথে মিল রেখে আমাদের দেশে বৃহস্পতিবার ইয়াওমে আরাফার রোযা রাখতে হবে। কিন্তু তাদের এ চিন্তাটা ভুল।

কারণ, প্রথমত রোযা হচ্ছে ইয়াওমে আরাফায়, ইয়াওমে ওকূফে ময়দানে আরাফাতে নয়। ইয়াওমে আরাফাহ হচ্ছে যিলহজ্বের ৯ তারিখ। আর ইয়াওমে ওকূফে ময়দানে আরাফাত হচ্ছে আরাফাতের ময়দানে ‍ওকূফের দিন। হাদীসে আরাফাহ দিবসে রোযা রাখতে বলা হয়েছে, আরাফাতের ময়দানে ওকূফ করার দিবসে নয়।

বস্তুত ৯ই যিলহজ্ব রোযা রাখা হাজীদের সাথে সম্পৃক্ত কোন আমল নয়। বরং এই আমল যারা হাজী নন, তাদের জন্যে। কারণ, হাজীদের জন্যে এদিন রোযা না রাখা বাঞ্ছনীয়। তাই যেহেতু এটা হাজ্বীদের আমল নয়, অতএব, হাজ্বীদের আমলের সাথে মিলিয়ে অন্য দেশের ‘ইয়াওমে আরাফাহ’ নির্দিষ্ট করা ভুল।

মূলত ‘আরাফাহ দিবস’ এই শব্দটির কারণেই কেউ কেউ মনে করছেন, আমাদের আরাফাহর দিবসের রোযা সৌদী আরবে অবস্থানরত হাজীদের আরাফায় ওকূফের সাথে মিলিয়ে রাখতে হবে। অথচ তখন আমাদের দেশে সাধারণত ৮ যিলহজ্ব হয়। যা এদেশের জন্য আরাফাহর দিন নয়।

অপরদিকে ইসলামের বিধান অনুযায়ী, ইয়াওমে আরাফাহ বা আরাফাহর দিনের পরদিন হচ্ছে ইয়াওমুন নাহর বা কুরবানীর দিন। এক্ষেত্রে সৌদী আরবের সাথে মিলিয়ে বা হাজীগণের আরাফায় অবস্থানের দিন আমাদের দেশে ইয়াওমে আরাফাহর রোযা রাখা হলে তা আমাদের দেশের ৮ যিলহজ্বে পড়ে–যার পরদিন আমাদের দেশে কুরবানীর দিন নয়। বরং তখন আমাদের দেশে ৯ যিলহজ্ব হয়। কিন্তু এমতাবস্থায় সৌদীতে হাজীগণের আরাফায় ওকুফের দিন আমাদের দেশে ইয়াওমে আরাফার রোযা রাখা হলে তার পরদিন অর্থাৎ ৯ যিলহজ্ব এদেশে কুরবানী দিন সাব্যস্ত করতে হয়। কিন্তু তা তো কিছুতেই করা যায় না।

তাই এটাই চূড়ান্ত কথা যে, ইয়াওমে আরাফাহ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, ৯ যিলহজ্বের তারিখ। অর্থাৎ যার যার দেশের হিসেবে ৯ যিলহজ্বের তারিখই হচ্ছে সে দেশের জন্য ইয়াওমে আরাফাহ। এ সম্পর্কে বিশিষ্ট ফক্বীহ ইবনে কুদামাহ (রহ.) বলেন–

فأما يوم عرفة : فهو اليوم التاسع من ذي الحجة

“ইয়াওমে আরাফাহ দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে– যিলহজ্ব মাসের নবম দিবস।”

(আল-মুগনী, ৪র্থ খণ্ড, ৪৪২ পৃষ্ঠা)

সুতরাং বুঝা গেলো, ‘ইয়াওমে আরাফাহ’ হচ্ছে একটি পরিভাষা। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, যিলহজ্বের ৯ তারিখ। এভাবে যে অঞ্চলের ৯ তারিখই হোক, তাকে পরিভাষা হিসেবে ‘ইয়াওমে আরাফাহ’ বলা হবে। এ জন্য সকল ফকীহ ও মুহাদ্দিস তাদের কিতাবে লিখেছেন– ‘ইয়াওমে আরাফাহ’ দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে যিলহজ্বের ৯ তারিখ।

(বিস্তারিত দেখুন : তাফসীরে তাবারী, ২য় খণ্ড, ২৯৭ পৃষ্ঠা/ আল-বাহরুল মুহীত, ২য় খণ্ড, ২৭৫ পৃষ্ঠা/ লিসানুল আরব, ৪র্থ খণ্ড, ২৮৯৮ পৃষ্ঠা ইত্যাদি)

তদুপরি ইয়াওমে আরাফাহ দ্বারা ৯ই যিলহজ্ব উদ্দেশ্য হওয়া তাকবীরে তাশরীকের হাদীসের বর্ণনা দ্বারাও স্পষ্টভাবে বুঝা যায়। ‘তাকবীরে তাশরীক’ ময়দানে আরাফাহ বা উকুফে আরাফার বিশেষ আমল নয়। বরং এটা সব দেশের সব স্থানের জন্য। এটা শুরু হয় ৯ যিলহজ্ব ফজর থেকে। অথচ এ সম্পর্কে বর্ণনার হাদীসে যিলহজ্বের ৯ তারিখ বুঝাতে ‘ইয়াওমে আরাফাহ’ শব্দটিকে ব্যবহার করা হয়েছে। দেখুন, এ সম্পর্কে হাদীসে এসেছে–

عن علي رضي الله عنه : أنه كان يكبر بعد صلاة الفجر يوم عرفة، إلى صلاة العصر من آخر أيام التشريق، ويكبر بعد العصر.

“হযরত আলী (রা.) হতে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি ইয়াওমে আরাফাহ-এর ফজর থেকে আইয়্যামে তাশরীকের সর্বশেষ দিনের আসর পর্যন্ত তাকবীর বলতেন। তিনি সেদিন আসরের নামাযের পর তাকবীর বলতেন।”
(মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবাহ, হাদীস নং ৫৬৭৭, ৫৬৭৮)

এ হাদীসে বর্ণিত ‘ইয়াওমে আরাফাহ’ দ্বারা সর্বসম্মতিক্রমে যিলহজ্বের ৯ তারিখ উদ্দেশ্য এবং সেটা যে যার যার অঞ্চলের ৯ যিলহজ্বের তারিখ–এ কথা সবাই মানেন। অন্যথায় ইয়াওমে আরাফাহ দ্বারা মক্কা শরীফে হাজীগণের ওকূফ করার দিন বুঝানো হলে, আমাদের দেশে ৮ যিলহজ্ব ফজরের পর থেকেই তাকবীরে তাশরীক পড়ার কথা। কিন্তু তা কেউ বলেন না। বরং আমাদের দেশের হিসেবে ৯ যিলহজ্ব ফজর থেকে সকলে তাকবীরে তাশরীক বলা শুরু করেন। ঠিক তদ্রুপ ইয়াওমে আরাফাহ-এর রোযার হুকুম। তাই সে ক্ষেত্রেও ৯ যিলহজ্ব তারিখকেই যার যার দেশের হিসেবে ইয়াওমে আরাফাহ হিসেবে গণ্য করতে হবে।

দ্বিতীয়ত এ বিষয়ে মৌলিক তত্ত্ব অনুধাবন করা প্রয়োজন। তা হলো, সৌদী আরবের সাথে মিলিয়ে কোন আমল করতে হলে তার অনুগামী হতে হবে। এক্ষেত্রে সেই আমল আদায়ে সে দেশকে ডিঙ্গিয়ে তার আগে যাওয়া যাবে না। অন্যথায় তার অনুগামী হবে কী করে?

অথচ আমাদের দেশের সেই লোকেরা যদি সৌদী আরব বা মক্কার সাথে মিল করার জন্য বৃহস্পতিবার সুবহে সাদিকের সময় রোযা শুরু করেন, তখন দেখা যাবে যে, তারা এমন সময়ে ইয়াওমে আরাফার রোযা শুরু করলেন–যখন সৌদী আরবে ইয়াওমে আরাফার রোযা শুরু হতে আরো তিন ঘন্টা সময় বাকী রয়েছে। অর্থাৎ সৌদী আরবে আরো তিন ঘন্টা পরে ইয়াওমে আরাফার রোযা শুরু হবে। এতে তারা সৌদী আরবের আগেই সেদিনের রোযা শুরু করে দিলেন। সুতরাং তারা সৌদী আরবের অনুগামী হলেন কী করে? তারা তো ইয়াওমে আরাফাহর রোযা পালনে সৌদী আরবকে ডিঙ্গিয়ে তাদের আগে চলে গেলেন।

অপরদিকে এদেশে সেদিনকে ইয়াওমে আরাফাহ গণ্য করতে হলে, সেই তারিখের শুরু ধরতে হবে সে রাতের সন্ধ্যায় সূর্যাস্তের সময় থেকে। অথচ এদেশে যখন সন্ধ্যায় ৯ যিলহজ্ব ধরা হলো, তখন সৌদী আরবে ৮ যিলহজ্বের জোহরের সময় চলছে এবং ৯ যিলহ্জ্ব শুরু হতে আরো তিনঘন্টা সময় বাকী রয়েছে। এতে দেখা যাচ্ছে, এদেশের সেই লোকেরা সেদিন সন্ধ্যায় ৯ যিলহজ্ব শুরু করে সৌদীর ৮ যিলহজ্বের অনুগামী হলেন। ৯ যিলহজ্বের অনুগামী হলেন না। সুতরাং তাদের এ রোযা ৯ যিলহজ্ব ইয়াওমে আরাফার রোযা না হয়ে ৮ যিলহজ্বের রোযা গণ্য হবে।

তাই এদেশের অধিবাসীগণ যদি সৌদী আরবের মক্কায় হাজীগণের আরাফাহ ময়দানে ওকূফের দিনে রোযা রাখতে চান, তাহলে তাদের জন্য সৌদী আরবের মক্কার ৯ যিলহজ্বের অনুগামী হতে হবে। এ জন্য সৌদী আরবের মক্কাতে ৯ যিলহজ্ব তারিখ শুরু হওয়ার পর তার অনুগামী হয়ে তাদের রোযা শুরু করতে হবে।

এভাবে সৌদী আরবে ৮ যিলহজ্ব দিবাগত সন্ধ্যায় সূর্যাস্তের মাধ্যমে ৯ যিলহজ্ব শুরু হওয়ার পর পৃথিবীর যে এলাকায় যখনই সূর্যাস্ত হবে, তখন সেই এলাকার বা সেই দেশের অধিবাসীগণ তখন সৌদী আরবের ৯ যিলহজ্ব ইয়াওমে আরাফার অনুগামী হয়ে সুবহে সাদিক থেকে রোযা শুরু করবেন। এতে তারা সৌদী আরবের অনুগামী হয়ে সেই একই দিনে ইয়াওমে আরাফার রোযা রাখতে সক্ষম হবেন।

আর এর স্থিতিস্তাবক সময়কাল হলো–সৌদী আরবে ৮ যিলহজ্ব দিবাগত সন্ধ্যায় সূর্যাস্তের মাধ্যমে ৯ যিলহজ্ব ইয়াওমে আরাফাহ শুরু হওয়ার সময়ের ২৪ ঘন্টা সময়ের মধ্যে যে কোন দেশে সূর্যাস্ত হওয়া। এভাবে সৌদী আরবের মক্কায় ইয়াওমে আরাফাহ শুরু হওয়ার ২৪ ঘন্টা সময়ের মধ্যে পৃথিবীর যে দেশেই সূর্যাস্ত হবে, সে দেশে সেই একই দিনে ইয়াওমে আরাফাহ শুরু হওয়া ধর্তব্য করে সৌদী আরবের ইয়াওমে আরাফার একই দিন বলে গণ্য করা হবে।

কেননা, সৌরদিন ও চান্দ্রদিন ২৪ ঘন্টার আবর্তনের দ্বারা পূর্ণতা লাভ করে–যার মাধ্যমে সূর্য ও চাঁদ ২৪ ঘন্টা সময়ের মধ্যে সারা পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে থাকে। তাই এ ২৪ ঘন্টা সময় পর্যন্ত সারা পৃথিবীতে সৌদী আরবের সেই একই দিন হিসেবে গণ্য হবে। আর সেই ২৪ ঘন্টা অতিবাহিত হওয়ার পর সৌদী আরবের মক্কায় পরবর্তী দিন শুরু হবে, এতে তখন আর পূর্বের সেই দিনের অনুগামী হওয়ার সুযোগ থাকবে না। কারণ, ২৪ ঘন্টা অতিক্রান্ত হওয়ার পর সৌদী আরবে পরবর্তী দিন তথা ১০ যিলহজ্ব শুরু হবে। তাই তখন কেউ তার অনুগামী হলে সে সৌদী আরবের ১০ যিলহজ্বের অনুগামী হবে, ৯ যিলহজ্বের নয়।

সুতরাং সৌদী আরবে ৯ যিলহজ্ব শুরু হওয়ার পর অন্য দেশ তার অনুগামী হয়ে ৯ যিলহজ্ব পাওয়ার জন্য সৌদী আরবের সেই দিনের শুরু সময় তথা সন্ধ্যায় সূর্যাস্তের সময় থেকে নিয়ে ২৪ ঘন্টার ভিতরে সেই সুযোগ পাবে। এ ২৪ ঘন্টা সময়ের মধ্যে যে দেশে যখন সূর্যাস্ত হবে, তখন সেই দেশই ইয়াওমে আরাফার ক্ষেত্রে সৌদী আরবের মক্কার অনুগামী গণ্য হবে এবং তখনই সেই এলাকা বা সেই দেশের অধিবাসীগণ ইয়াওমে আরাফাহ লাভ করে সেদিন সুবহে সাদিক থেকে রোযা রাখবেন।

বস্তুত এমনি করেই আল্লাহ তা‘আলা পৃথিবীর ব্যবস্থাপনা প্রণয়ন করেছেন যে, ২৪ ঘন্টা সময়ের মধ্যে যে কোন দিন-ক্ষণ সারা পৃথিবীতে অতিক্রান্ত হয়। এ জন্য দেখা যায়, যখন কোন একদিনের ফজরের আযান মক্কায় শোনা গেলো, তখন সেই ফজরের আযান মক্কার পর একের পর এক সারা পৃথিবীতে ২৪ ঘন্টায় বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন স্থানে পর্যায়ক্রমে ধ্বনিত হতে থাকে। এভাবে ২৪ ঘন্টা সময়ে ধারাবাহিকভাবে পুরো পৃথিবীতে সেই আযান-ধ্বনি উচ্চারিত হয়। এমনি করে রামাজান, ঈদ, শবে ক্বদর প্রভৃতি সকল ইবাদত সারা পৃথিবীব্যাপী চাঁদ ও সূর্যের পরিক্রমণে ২৪ ঘন্টা যাবত উদযাপিত হয়। এতে করে পৃথিবীর সৌর দিনের বা ২৪ ঘন্টা সময়ের কোন মুহূর্ত আল্লাহর নাম উচ্চারিত হওয়া থেকে খালি থাকে না। বরং প্রতিটি মুহূর্তে পৃথিবীর কোথাও না কোথাও কোন না কোন ইবাদত-বন্দেগীতে আল্লাহর নাম উচ্চারিত হতেই থাকে।

এক্ষেত্রে বিস্ময়কর সৃষ্টিবৈচিত্র্য হলো, আল্লাহ তা‘আলা পৃথিবীর সকল দেশকে এমন কাঠামোতে সৃষ্টি করেছেন যে, এক দেশে এক ইবাদত পালিত হওয়ার পর ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় একের পর এক অন্যান্য দেশে তা পালিত হয়ে সারা সৌরদিন বা সারা চান্দ্র দিন তথা ২৪ ঘন্টা তা পৃথিবীজুড়ে পালন করা হয়ে থাকে।

কিন্তু মহান আল্লাহর এ সৃষ্টি-কুদরত উপলব্ধি না করে অনেকে সৌদী আরবের সাথে মিল করে একই সাথে সারা পৃথিবীতে রোযা, ঈদ প্রভৃতি উদযাপন করার দাবী তুলে প্রকারান্তরে তারা মহান আল্লাহর সেই সৃষ্টিনৈপুন্যকে ম্লান করে ফেলতে চান। যা কোনক্রমেই সঙ্গত নয়।

এ বিষয়টি বুঝার জন্য একটি উদাহরণ দিচ্ছি। মনে করুন, ঢাকা থেকে ট্রেন চট্টগ্রাম যাবে। এ ট্রেনের যাত্রীগণ বিভিন্ন স্থানে রয়েছেন : কেউ ঢাকা কমলাপুরে, কেউ ভৈরবে, কেউ কুমিল্লায়, কেউ ফেনীতে প্রভৃতি স্থানে। তাই সকল যাত্রী একসাথে বা একসময়ে ট্রেনে উঠতে পারবেন না। বরং ট্রেনটি যার এলাকায় যখন পৌঁছবে, তখন সেই এলাকার লোকজন ট্রেনে উঠবেন। এতে দেখা যাবে–কেউ বিকাল ৪টায় ট্রেনে উঠেছেন, কেউ বিকাল ৫টায়, কেউ সন্ধ্যা ৭টায়, আবার কেউ রাত ৮টায় ট্রেনে উঠেছেন ইত্যাদি। বিবেচনার ব্যাপার হলো, এই ট্রেনে উঠা বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন সময়ে হলেও সকলে কিন্তু একই দিনে একই ট্রেনে উঠেছেন।

ঠিক তেমনিভাবে পৃথিবীর সকল দেশের ইয়াওমে আরাফায় উঠা এক সাথে হবে না। তবে একই দিনে তথা ২৪ ঘন্টার সৌর-চান্দ্র দিনে অবশ্যই হবে। সেই সৌর-চান্দ্র একই দিনে সকল দেশ পর্যায়ক্রমে যার যার স্থানে চাঁদ পৌঁছা সাপেক্ষে ইয়াওমে আরাফাহ লাভ করবে। এ জন্য সৌদী আরবের মক্কায় ইয়াওমে আরাফাহ হওয়ার সময় থেকে সকল দেশ সৌদী আরবের মক্কার অনুগামী হয়ে অপেক্ষমান থাকবে এবং যে দেশে যখন সৌদী আরবের ৮ যিলহজ্ব দিবাগত সন্ধ্যায় সূর্যাস্তের মাধ্যমে ৯ যিলহজ্ব শুরু হওয়ার সময়ের ২৪ ঘন্টার মধ্যে সূর্যাস্ত হবে, তখন সে দেশের অধিবাসীগণ সৌদী আরবের অনুগামী হয়ে ইয়াওমে আরাফাহ লাভ করবেন এবং সেদিনই সুবহে সাদিক থেকে ইয়াওমে আরাফার রোযা পালন করবেন।

সেই ভিত্তিতেই সৌদী আরবের মক্কায় ৯ যিলহজ্ব ইয়াওমে আরাফাহ শুরু হওয়ার পর তার অনুগামী হয়ে এর ২৪ ঘন্টার মধ্যে তথা ২১ ঘন্টার মাথায় (যদিও তা সৌর বার হিসেবে শুক্রবারে পড়ে) বাংলাদেশে ৯ যিলহজ্ব বা ইয়াওমে আরাফার দিন শুরু হবে। আর এভাবেই এদেশে সৌদী আরবের একই দিনে ইয়াওমে আরাফাহর রোযা রাখা গণ্য হবে। সৌদী আরবের সাথে একই দিনে ইয়াওমে আরাফাহর রোযা পালন করার এটাই সঠিক পন্থা।

কিন্তু যারা মহান আল্লাহর এ সৃষ্টিবৈচিত্র্য অনুধাবন না করে মক্কায় হাজীগণের ওকূফকে স্থুল দৃষ্টিতে দেখে তখনই রোযা রাখা শুরু করেন, তারা মূলত সৌদী আরবের মক্কার উদ্দিষ্ট সময়কে ডিঙ্গিয়ে সৌদী আরবে ইয়াওমে আরাফার রোযা শুরু হওয়ার আগেই রোযা শুরু করে দেন–যে দিনের শুরু মূলত সৌদী আরবের ৮ যিলহজ্বের অনুগামী হওয়ার কারণে “ইয়াওমে আরাফার রোযা’ হিসেবে গণ্য হতে পারে না। বরং তা সৌদী আরবের ৮ যিলহজ্বের অনুগামী হওয়ার কারণে ৮ যিলহজ্বের রোযা হিসেবেই গণ্য হবে।

তাই ইয়াওমে আরাফাহ হিসেবে আমাদের দেশে ৯ যিলহজ্ব শুক্রবার রোযা রাখতে হবে। এ ছাড়া অন্য কোন পথ নেই।

7 thoughts on “ইয়াওমে আরাফার রোযা বৃহস্পতিবার নাকি শুক্রবার?

  1. খুবই যুক্তিপুর্ণ আলোচনা। আমার দীর্ঘ জীবনের একটা ভুলের অবসান হল। আল্লাহ হুজুরকে নেক হায়াত দান করুন। হুজুরের শেষের দিকের আলোচনা গুলো খুবই যুক্তিপুর্ণ।

  2. এই মতমতের সাথে আমি একমত । মতামতটি সঠিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: