সহীহ জিকির ও গলত জিকির | পর্ব ১

মুফতী আবুল হাসান শামসাবাদী

লাফালাফি করে বা বাঁশে উঠে কিংবা খুব জোরে চিল্লিয়ে অথবা নেচে নেচে জিকির করা সহীহ পদ্ধতি নয়। সেটা গলত, নাজায়িয ও বিদ‘আতী তরীকা। তবে যদি কেউ নিজেকে কন্ট্রোল করতে না পেরে মাজযূব হালতে জোরে জোরে জিকির করেন কিংবা দৌড়াদৌড়ি বা লাফালাফি করেন, সেটা মা‘জুরী হালত, তার কথা ভিন্ন। অপরদিকে মাইকে প্রবল সাউন্ডে জিকির করা কিংবা সম্মিলিতভাবে সুর করে তালে তাল মিলিয়ে সজোরে জিকির করাও সুন্নাতের খিলাফ ও গলত পদ্ধতি।

খফী জিকির ও জেহের জিকিরের পক্ষাবলম্বনে মতভেদ পূর্ব থেকেই চলে আসছে। আকাবিরদের মধ্যে জিকরে সিররী ও জিকরে জেহরী উভয়রকমই আমল পাওয়া যায়।

জিকরে সিররী বা জিকরে খফী সর্বোত্তম। ইনফিরাদীভাবে নিবিষ্ট মনে কায়মনোবাক্যে একাগ্রচিত্তে জিকির করাই বাঞ্ছনীয়। তা সিররী হওয়া অধিক উত্তম। তবে বিশেষ কোন মাসলাহাতে হালকা আওয়াজে নিজে শোনার মতো করে অথবা আশপাশের কারো ইবাদত, ঘুম ইত্যাদিতে বিঘ্নতা না হওয়ার শর্তে সাধারণভাবে শব্দ করে জিকির করা জায়িয হবে।

আমাদের দেশে হক্কানী উলামায়ে কিরাম অনেকে যেমন, হাটহাজারীর আল্লামা আহমদ শফী (দা. বা.) অনেক স্থানে মানুষকে শিক্ষা দেয়ার জন্য মাহফিলে জেহেরভাবে জিকির করিয়েছেন। তিনি ঢাকা ফরিদাবাদ মাদরাসায়ও বাই‘আত করানোর পর এভাবে জিকির করিয়েছেন। তেমনি মিরপুর পল্লবীর এক মসজিদেও এভাবে জিকির করিয়েছেন। আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম।

চরমোনাই ও উজানীর জিকিরের মধ্যে অবশ্য আপত্তির বিষয় জেহের নিয়ে নয়, বরং সকলে একত্রে তাল মিলিয়ে জিকির করতে গিয়ে শব্দের অশুদ্ধ উচ্চারণ করা হয়। যেমন, সুবহানাল্লাহ’র জিকির করতে গিয়ে “হা”-এর পর যে মাদ রয়েছে সেটা উচ্চারণ করেন না এবং আল-হামদুলিল্লাহ-এর মধ্যে “আল্লাহ” শব্দটির শেষে মাদ্দে আরিজী ও “হা”-এর উচ্চারণ যথার্থভাবে হয় না। আবার লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’র উচ্চারণে “লা” শব্দটিকে যথেষ্টভাবে টেনে এবং শেষের “আল্লাহ” শব্দের উচ্চারণ যথাযথভাবে আদায় হয় না ইত্যাদি। এ বিষয়টি নিয়ে আগেও বলেছি। এটা অবশ্যই সংশোধন করা জরুরী। আবার সেখানে অনেকের অস্বাভাবিকভাবে খুব জোরে চিল্লানো ও ব্যাপকভাবে লাফালাফি করা কিংবা সম্মিলিত জিকিরে সুরের তালে তাল মেলানোর ব্যাপারটি নিয়েও আপত্তি হতে পারে। তাই সেসব নিয়েও ভাবা উচিত বলে মনে করি।

নিঃশব্দে জিকির নিয়ে যেমন দলীল রয়েছে, তেমনি সশব্দে বা জেহরী জিকিরের পক্ষেও দলীল রয়েছে। জেহরী জিকিরের অকাট্য পর্যাপ্ত দলীলের কারণে তার গুরুত্ব অনুধাবন করে আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ূতী (রহ.) এ বিষয়ে একটি দালীলিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তার নাম হচ্ছে–نتيجة الفكر في الجهر بالذكر (নাতীজাতুল ফিকরি ফিল জাহরি বিজ্ জিকরি)। সেখানে তিনি জিকরে জেহেরের পক্ষে ২৫টি দলীল বর্ণনা করেছেন এবং এ নিয়ে আরোপিত বিভিন্ন প্রশ্নের সমাধান দিয়েছেন। ইন্টারনেটে উক্ত বইয়ের পিডিএফ কপি নিম্নোক্ত লিঙ্কে পাবেন–
https://www.nafahat-tarik.com/2016/01/sufism_23.html

তেমনি এ বিষয় নিয়ে আরো অনেক মুহাক্কিক আলেম বিস্তারিত দলীল-প্রমাণ দিয়ে স্বতন্ত্র পুস্তক রচনা করেছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন আল্লামা আবদুল হাই লাখনবী (রহ.)। তার রচিত সেই পুস্তকের নাম হচ্ছে–سباحة الفكر في الجهر بالذكر (সাবাহাতুল ফিকরি ফিল জাহরি বিজ্ জিকরি)। উক্ত কিতাবকে তাহকীক-বিশ্লেষণ দ্বারা বিশেষভাবে সমৃদ্ধ করে আরব কান্ট্রিতে প্রকাশ করেছেন শাইখ আবদুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ (রহ,)। নিম্নোক্ত লিঙ্ক থেকে উক্ত কিতাব সংগ্রহ করতে পারেন–

https://www.alsufi.net/…/2094-%D8%B3%D8%A8%D8%A7%D8%AD%D8%A…

জিকরে খফীর ন্যায় জিকরে জলী বা জেহেরী জিকিরের পক্ষে পবিত্র কুরআনে ও অসংখ্য হাদীসে অকাট্য দলীল-প্রমাণাদি রয়েছে। নিম্নে সেসব দলীল পর্যায়ক্রমে আলোচনা করা হচ্ছে–

পবিত্র কুরআনে জেহেরী জিকিরের দলীল :
——————————————

পবিত্র কুরআনের সূরাহ আ‘রাফের ২০৫ নং আয়াতে সশব্দে জিকির ও নিঃশব্দে জিকির উভয় প্রকার জিকিরের নির্দেশনা রয়েছে। উক্ত আয়াতে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন–
وَاذۡکُرۡ رَّبَّکَ فِیۡ نَفۡسِکَ تَضَرُّعًا وَّخِیۡفَۃً وَّدُوۡنَ الۡجَہۡرِ مِنَ الۡقَوۡلِ بِالۡغُدُوِّ وَالۡاٰصَالِ وَلَا تَکُنۡ مِّنَ الۡغٰفِلِیۡنَ
“এবং স্বীয় পালনকর্তার জিকির করুন চুপে চুপে (নিঃশব্দে) বিনম্রভাবে ও ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে এবং খুব জোরের চেয়ে কম আওয়াজে (সশব্দে) সকালে (সূর্যোদয়ের পূর্বে) ও বিকালে (সূর্যাস্তের পূর্বে)। আর গাফেলদের অন্তর্ভুক্ত হবেন না।”
(সূরাহ আ‘রাফ, আয়াত নং ২০৫)

উক্ত আয়াতের দু’টি অংশে দু’প্রকার জিকিরের কথা বলা হয়েছে : وَاذۡکُرۡ رَّبَّکَ فِیۡ نَفۡسِکَ অংশে সিররী জিকির এবং وَّدُوۡنَ الۡجَہۡرِ مِنَ الۡقَوۡلِ অংশে জেহেরী জিকিরের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। আর تَضَرُّعًا وَّخِیۡفَۃً শব্দদ্বয় দ্বারা সেই উভয় প্রকার জিকিরই বিনম্র হয়ে ও আল্লাহভীতির সাথে করার জন্য বলা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে তাফসীরে বাগাভীতে বলা হয়েছে–এ আয়াতে প্রত্যহ সকালে ও বিকালে তথা ফজরের নামাযে ও আসরের নামাযে মহান আল্লাহর জিকির করার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং উক্ত জিকিরের পন্থা বর্ণনা করা হয়েছে। এ মর্মে এখানে জিকিরের দু’টি পন্থার কথা উল্লেখ করা হয়েছে : ১. وَاذۡکُرۡ رَّبَّکَ فِیۡ نَفۡسِکَ দ্বারা নিঃশব্দে বা মনে মনে জিকির করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ২. وَّدُوۡنَ الۡجَہۡرِ مِنَ الۡقَوۡلِ দ্বারা সশব্দে অল্প আওয়াজে জিকির করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে–যা আশপাশের মানুষেরা শুনতে পারে।
(তাফসীরে বাগাভী, সূরাহ আ‘রাফ, ২০৫ নং আয়াতের তাফসীর দ্রষ্টব্য)

অপরদিকে তাফসীরে কুরতুবীতে রয়েছে–হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর বর্ণনা মতে এখানে ফজর ও আসরের নামাযে কুরআন তিলাওয়াত সম্পর্কে বলা হয়েছে। অর্থাৎ এ আয়াতে ফজরের নামাযে কুরআন তিলাওয়াত জেহেরী বা সশব্দে করতে এবং আসরের নামাযে কুরআন তিলাওয়াত সেররী বা নিঃশব্দে করার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
(দ্রষ্টব্য : তাফসীরে কুরতুবী, ২য় খণ্ড, ২৪১ পৃষ্ঠা)

তেমনি তাফসীরে ইবনে কাছীরে আল্লামা ইবনে কাছীর (রহ.) বলেন–এ আয়াতটি মি‘রাজে পাঁচওয়াক্ত নামায ফরজ হওয়ার পূর্বে নাযিল হয়েছে। তখন এ দু’টি নামায পড়া হতো। তাই এখানে উক্ত নামাযদ্বয়ের ব্যাপারে বলা হয়েছে।
(দ্রষ্টব্য : তাফসীরে ইবনে কাছীর, ৩য় খণ্ড, ৬২৬ পৃষ্ঠা)

আরেক ব্যাখ্যায় আল্লামা ইবনে তাইমিয়া (রহ.) মাজমূউল ফাতাওয়ায় বর্ণনা করেছেন–হযরত আয়িশা (রা.) হতে বর্ণিত হয়েছে যে, এ আয়াত দু‘আর ব্যাপারে নাযিল হয়েছে। অর্থাৎ মহান আল্লাহর নিকট বিনম্র হয়ে ভয়ের সাথে চুপে চুপে অথবা অল্প আওয়াজে দু‘আ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

তাফসীরে ওয়াসীতে আল্লামা তানতাভী (রহ.) বর্ণনা করেন–এ আয়াতে কুরআন তিলাওয়াত, দু‘আ, জিকির-তাসবীহ, তাহমীদ, তাহলীল প্রভৃতির পন্থা সম্পর্কে বলা হয়েছে।
(তাফসীরে ওয়াসী, উক্ত আয়াতের তাফসীর দ্রষ্টব্য)

তেমনিভাবে কোনরূপ শর্তবিহীনভাবে জিকিরের নির্দেশনা দিয়ে পবিত্র কুরআনে সূরাহ আহযাবের ৪১ ও ৪২ নং আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন–
یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوا اذۡکُرُوا اللّٰہَ ذِکۡرًا کَثِیۡرًا وَّسَبِّحُوۡہُ بُکۡرَۃً وَّاَصِیۡلًا
“হে মুমিনগণ! তোমরা অধিক পরিমাণে আল্লাহর জিকির করো এবং সকালে ও বিকালে তাঁর তাসবীহ পড়ো।”
(সূরাহ আহযাব, আয়াত নং ৪১ ও ৪২) এ আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা বান্দাদেরকে খুব বেশী পরিমাণে জিকির করতে বলেছেন।

আল্লামা সা‘দী (রহ.) স্বীয় তাফসীরে বলেন–এখানে অধিক পরিমাণে জিকির করার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো–আল্লাহর বান্দাগণ তাঁর তাসবীহ (সুবহানাল্লাহ জিকির), তাহমীদ (আলহামদুলিল্লাহ জিকির), তাহলীল (লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ জিকির), তাকবীর (আল্লাহু আকবার জিকির) প্রভৃতি সদা-সর্বদা পাঠ করবে। বিশেষ করে সকাল-বিকালের সুন্নাত ওজীফা, পাঁচওয়াক্ত নামাযের পরের জিকির-দু‘আ এবং বিভিন্ন সময় ও প্রেক্ষাপটে মাসনূন দু‘আ-কালাম প্রভৃতি যথারীতি আদায় করবে।

তবে এ আয়াতে জিকির-তাসবীহকে কোন নির্দিষ্ট পদ্ধতির সাথে খাস করা হয়নি। তাই সেসব জিকির-আজকার নিঃশব্দেও করা যাবে এবং সশব্দে করাও যাবে আয়াতের নির্দেশের ব্যাপকতা হিসেবে। এভাবে পবিত্র কুরআনে আরো বহু আয়াত রয়েছে–যেগুলোতে শর্তহীনভাবে জিকির করার নির্দেশনা রয়েছে। সেসব ক্ষেত্রে কোন বিশেষ শর্ত না থাকার কারণে সিররী জিকির ও জেহেরী জিকির উভয় প্রকার জিকিরেরই অবকাশ রয়েছে।

সুতরাং এ আয়াতসমূহ দ্বারা মহান আল্লাহর তাসবীহ, তাহলীল, তাহমীদ ইত্যাদি জিকির করার আদব ও পদ্ধতি স্পষ্ট হয়ে যায়। এতে জিকরে খফী ও জিকরে জলী উভয় প্রকার জিকিরের বৈধতা পাওয়া যাচ্ছে। আর এ বিষয়টিও স্পষ্টভাবে বুঝা যাচ্ছে–জিকরে জলী জোরে চিৎকার করার চেয়ে কম আওয়াজে করা বাঞ্ছনীয়।

তেমনি হাদীস শরীফে জিকরে খফীর পাশাপাশি জিকরে জলী বা জেহেরী জিকিরের পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে। সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম-এর একটি হাদীসে রয়েছে–

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ ، قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : يَقُولُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ : أَنَا عِنْدَ ظَنِّ عَبْدِي بِي ، وَأَنَا مَعَهُ حِينَ يَذْكُرُنِي ، إِنْ ذَكَرَنِي فِي نَفْسِهِ ، ذَكَرْتُهُ فِي نَفْسِي ، وَإِنْ ذَكَرَنِي فِي مَلَإٍ ، ذَكَرْتُهُ فِي مَلَإٍ هُمْ خَيْرٌ مِنْهُمْ
“হযরত আবূ হুরাইরা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহ তা‘আলা (হাদীসে কুদসীতে) ইরশাদ করেন, “আমি আমার সম্পর্কে আমার বান্দার ধারণার নিকটে থাকি। আর আমি তার সাথে থাকি যখন সে আমার জিকির করে। যদি সে আমায় চুপে চুপে জিকির করে, আমি তাকে চুপে চুপে স্মরণ করি। আর যদি সে আমায় কোন জমায়েতের মধ্যে জিকির করে, তখন আমি তাকে তাদের চেয়ে উত্তম জমায়েতের মধ্যে স্মরণ করি।”
(সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৭৪০৫/ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৬৭৫)  এ হাদীসে জমায়েতে জিকির করাকে চুপে চুপে বা নিঃশব্দে জিকিরের বিপরীত পন্থারূপে উল্লেখ করা হয়েছে। সুতরাং এর দ্বারা উদ্দেশ্য হবে–জমায়েতের মধ্যে সশব্দে জিকির করা।

এ প্রসঙ্গে তাজুল মুহাাক্কিকীন আল্লামা ইবনুল জাযরী (রহ.) “মিফতাহুল হিসনিল হাসীন” গ্রন্থে বলেন–
فيه دليل على جواز الجهر بالذكر، خلافا لمن منعه
“এ হাদীসে জেহেরী জিকির জায়িয হওয়ার পক্ষে দলীল রয়েছে। আর এ হাদীস তাদের বিরুদ্ধে যায় যারা জেহেরী জিকিরকে নিষেধ করেন।”
(মিফতাহুল হিসনিল হাসীন, ১৩৭ পৃষ্ঠা)

অনুরূপভাবে এ হাদীসের ব্যাপারে আল্লামা জালালুদ্দীন সুয়ূতী (রহ,) স্বীয় “নাতীজাতুল ফিকরি ফিল জাহরি বিজ্ জিকরি” গ্রন্থে বলেন–
والذكر في الملأ لا يكون إلا عن جهر
“মজমার মধ্যে জিকির জেহের (সশব্দে উচ্চারণ) ছাড়া হতেই পারে না।”
(নাতীজাতুল ফিকরি ফিল জাহরি বিজ্ জিকরি, ২৪ পৃষ্ঠা)

সুতরাং এ হাদীস দ্বারা অকাট্যভাবে জেহেরী জিকিরের বৈধতা প্রমাণিত হচ্ছে। যা দিবালেকের ন্যায় স্পষ্ট।
তেমনিভাবে প্রসিদ্ধ হাদীসের কিতাব মুস্তাদরাকে হাকীম-এর মধ্যে জেহেরী জিকিরের মাহাত্ম্য প্রসঙ্গে فضيلة رفع الصوت بالذكر (উঁচু আওয়াজে জিকির করার ফজীলত) নামে আলাদা শিরোনাম দিয়ে বিশেষ পরিচ্ছেদ প্রণয়ন করা হয়েছে। সেখানে জেহেরী জিকিরের ফজীলত বর্ণনা করে নিম্নোক্ত হাদীস উদ্ধৃত করা হয়েছে–
عَنْ جَابِرٍ رضي الله عنه أَنَّ رَجُلًا كَانَ يَرْفَعُ صَوْتَهُ بِالذِّكْرِ، فَقَالَ رَجُلٌ: لَوْ أَنَّ هَذَا خَفَضَ مِنْ صَوْتِهِ، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «فَإِنَّهُ أَوَّاهٌ» . قَالَ: فَمَاتَ فَرَأَى رَجُلٌ نَارًا فِي قَبْرِهِ، فَأَتَاهُ فَإِذَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِيهِ وَهُوَ يَقُولُ: «هَلُمُّوا إِلَى صَاحِبَكُمْ» . فَإِذَا هُوَ الرَّجُلُ الَّذِي كَانَ يَرْفَعُ صَوْتَهُ بِالذِّكْرِ
হযরত জাবির (রা.) হতে বর্ণিত, জনৈক সাহাবী (রা.) (তাঁর নাম আবদুল্লাহ যুল বিজাদাইন আল-মুযানী) উচ্চস্বরে জিকির করতেন। তখন অন্য একজন বললেন, যদি এই লোক নীচু আওয়াজে জিকির করতেন (ভাল হতো)! তা শুনে রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, সে তো ‘আওয়্যাহ্’ (নিবেদিত জিকিরকারী)। হযরত জাবির (রা.) বলেন, এরপর সেই ব্যক্তি মারা গেলেন। তখন এক লোক তার কবরে আলো দেখতে পেলেন। তা দেখে তিনি সেখানে গেলেন। অকস্মাৎ তিনি দেখেন, স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা.) কবরের মধ্যে রয়েছেন এবং তিনি বলতেছেন, তোমাদের সাথীকে দাও। তখন দেখা গেলো যে, তিনি সেই ব্যক্তি যিনি উঁচু আওয়াজে জিকির করতেন। (তাঁর দাফনের জন্য স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা.) কবরে নেমেছেন!)
(মুস্তাদরাকে হাকিম, ১ম খণ্ড, ২৯৮ পৃষ্ঠা, হাদীস নং ১৩৬১/ অনুরূপ : সুনানে বাইহাকী–শু‘আবুল ঈমান, হাদীস নং ৫৭৮ প্রভৃতি)

অপরদিকে বিভিন্ন সময়কালীন জিকির উঁচু আওয়াজে করার জন্য শরীয়তে বিশেষভাবে নির্দেশনা এসেছে। যেমন, পাঁচওয়াক্ত নামাযের পর, ঈদুল আজহায় ঈদগাহে যাওয়া-আসার পথে, তাকবীরে তাশরীক পাঠে, হজ্বের তালবিয়া পাঠে প্রভৃতি। এ সম্পর্কে হাদীস শরীফে অসংখ্য বর্ণনা রয়েছে।

অনুরূপভাবে অনেক লোক একত্রিত হয়ে বা জিকিরের মজমা কায়িম করে জিকির করারও বিশেষ ফজীলত সম্পর্কে বহু হাদীস রয়েছে। আর সেই জিকির যে জেহেরীই হবে–তা বলাই বাহুল্য। এ ব্যাপারে পরবর্তী পোস্টে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে ইনশাআল্লাহ।

 

২ নং পর্বের লিঙ্ক  https://adarshanari.com/featured/7738/

Leave a Reply

Your email address will not be published.

%d bloggers like this: