দুঃখভরা জীবনে…

আলেমা নূরুন্নাহার


একদিন বিকাল বেলা। বাসার গেটে খটখট আওয়াজ হচ্ছে। গেট খুলে দেখি, একজন ভিক্ষুক মহিলা। একেবারে জীর্ণশীর্ণ। সে সময় বৃষ্টি শুরু হলো। তাকে ভিতরে এসে বসতে বললাম।
মহিলাটি ভিতরে এসে বসলেন। ইতোমধ্যে বৃষ্টি আরো বেড়ে গেল। তাই মহিলাটি সহসা ফিরে যেতে পারলেন না।
তখন আমি তার কাছে বসে তার জীবনের কূশলাদি জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, শুনবেন আমার কাহিনী? তাহলে শুনেন। তারপর মহিলাটি বলতে লাগলেন;
আমার জীবন বড়ই দুঃখের। আমার বিয়ার অনেক বৎসর পর্যন্ত আমার কোনো সন্তান হয় না। আমার স্বামী ছিলেন দিনমজুর। তিনি সন্তান না হওয়ার কারণে আমাকে নানা কথা কইতেন।
পরিশেষে আল্লাহর কাছে অনেক চাইতে চাইতে একটি পোলা দেন। তারে নিয়া কত স্বপ্ন দেখি, কত আশা নিয়া বড় করতে থাকি।
পোলার বয়স যখন দশ বৎসর, তখন ওর বাবা মারা যায়। আমার চারিদিকে আঁধার নাইমা আসে। আমি বাসায় কাজ নিই। পোলা বড় করতে থাকি।
ছেলে যখন বড় হয়, তখন বিয়া করাই। ঘরে বউ আসে। কয়দিন ভালই যায়। পরে বউ আমার লগে হিংসা শুরু করে।
বউ ও পোলায় একসাথে খায়। আমারে পরে একলা খাইতে দেয়। ওরা খায় মাছ-গোশত, কিন্তু আমার ভাগ্যে তা জুটে না। আমারে দেয় শুকনা মরিচ, নয়তো কোনো ভর্তা বা শুধু কিছু তরকারী। একবার ভাত দিলে আর চাইয়া খাইতে পারি না। একদিনও ভাত খাইয়া পেট ভরে না। পোলারেও বলতে পারি না। শুধু চোখের পানি ফেলে সহ্য করি। পোলা-ও আমার কোন খবর নেয় না।
কয়েকদিন পর আমার একটা নাতি হয়। আমি কী যে খুশি হই! কিন্তু বউ নাতিরে আমার কোলে নিতে দেয় না। একটু আদর করতে দেয় না। কাছেও যাইতে দেয় না।
একদিন আমি বারান্দায় বইসা পান খাইতাছি। শুনি, ঘরে বউ পোলারে কয়, ছেলে বড় হইতাছে, খরচ বাড়তাছে। তার উপর তোমার একার কামাই। আবার তোমার মা-ও আছে। বোঝ। তোমার মা না থাকলে তো খরচটা একটু কমতো। এইভাবে কয়দিন যাইবো? আমাগো একটা ভবিষ্যৎ আছে না?
পোলায় কয়, তুমি কি কও? মায় এখন বুড়া মানুষ; কই যাইবো; কে খাওয়াইবো? বউ কয়, তোমার মাতো মানুষের কাছে চাইয়া খাইতে পারে। পোলায় কয়, তুমি এইটা কি কইতাছো, মায় আমারে কত কষ্ট কইরা বড় করছে, তারে আমি কেমনে ফালায়া দেই?
তখন বউ কয়, তাইলে তুমি তোমার মায়রে নিয়া থাক। আমি আমার পোলা নিয়া বাপের বাড়ি চইলা যামু। উত্তরে পোলায় কয়, তুমি যাইও না, মারে দেখি, কী করতে পারি।
পরদিন সকালে পোলায় আমারে চইলা যাইতে বলে। আমি কই, বাবা! আমি কই যামু? পোলায় কয়, জানি না। শুধু জানি, চইলা যাইবা। আমাগো আর জ্বালাইওয়া। আমাগো একটা ভবিষ্যৎ আছে না? আমি যেন বাড়ি আইসা তোমারে না দেখি।
পোলা চইলা যাইতেই বউ আমার কাপড়-চোপড় বাহিরে ফালায় দেয়। আমার কাছে মনে হয়, যেন আকাশ আমার মাথায় ভাইঙ্গা পড়ল। কত অনুনয়-বিনয় করলাম, মানলো না।
শেষ পর্যন্ত আমি বাড়ি থেকে বের হয়ে যাই। কই যামু, কার কাছে গিয়া কি করমু, শরীরে তেমন শক্তিও নাই। এই চিন্তা করি আর রাস্তায় হাঁটি।
পরে একটা বস্তিতে গিয়া উঠি। ঐখানে থাকি, মানুষের দুয়ারে দুইটা চাইয়া খাই।
কয়েকদিন পর পোলার কথা মনে হইল। পোলারে অনেক দেখতে মন চায়। মনটা জানি কমন করে। তখন আমি বাড়ির দিকে যাই। যাইয়া দেখি, আমাগো বাড়ীর উঠানে অনেক মানুষের ভীড়। মানুষ দেইখা আমার পরানটা উইরা যায়। না জানি আমার ধনডার কিছু হইছে কিনা। সামনে যাইয়া দেখি, আমার পোলার লাশ। সারা শরীর রক্তে ভিজা। ট্রাকে এক্সিডেন্ট হইছে। নাতিটা লাশের উপর পইড়া কানতাছে। বউটা সামনে খারায়া রইছে।
আমি পোলার লাশ দেইখা নিজেকে ঠিক রাখতে পারলাম না। কাইন্দা তার লাশকে জড়ায়া ধরলাম। কিন্তু বউ আমারে লাশ ধরতে দেয় না। আমি কান্দি আর ভাবি, দুনিয়াতে আমার আর কেহ রইল না।
পরে নাতির লেইগা অনেক মায়া লাগে। তাই মাঝে মাঝে দেখতে যাই। দূর থেকে দেইখা চইলা আসি। বউ আমার কাছে যাইতে দেয় না।
কয়দিন পরে যাইয়া দেখি, অনেক মানুষ ভিড় হইয়া রইছে। নাতিটা কানতাছে। সামনে যাই, নাতি আমারে জড়ায়া ধরে। ওর মায় ওরে ঘুমে থুইয়া আরেক ব্যাটার সাথে চইলা গেছে। ঘরে কিছু থুইয়া যায় নাই।
আমি নাতিটারে সাথে কইরা নিয়া আসি। চিন্তা করি, ওরে কিভাবে বড় করমু। ওর বয়স তখন ৮ বৎসর। পরে পাশের মসজিদের ইমাম সাহেব ওরে একটা এতিমখানায় ভর্তি কইরা দেয়।
ও এখন মাদ্রাসায় থাকে, কুরআন পরে। মাঝে মাঝে আমার কাছে আসে। আমি আগের মত দিন চালাই। তয় কয় পয়সা জমায়া রাখি, ও আসলে ভাল-মন্দ খাওয়াই। যাওয়ার সময় কিছু টাকা হাতে দিয়া দেই।
কয়েক মাস পর ওর মা ওরে নিতে আইছিল। ঐ জামাই নাকি ওরে তালাক দিয়া দিছে। কিন্তু নাতি ওর লগে যায় নাই। কোনদিন যাইবো না কইছে। আমার লগে থাকবো।
ওর মা এখন ইট ভাঙ্গে। দোয়া কইরো বোন, পোলাটা বড় কইরা পাইলাম শুধু কষ্ট। এখন নাতিটা বড় করতাছি একটু সুখের আশায়। আল্লাহ জানে, এই সুখ আমার কপালে আছে কিনা?
তার কথা শুনতে শুনতে আমার খেয়াল হয়নি, কখন মাগরিবের সময় হয়ে গেলো। ততক্ষণে বৃষ্টি থেমে গেছে।
মহিলাটিকে কিছু খেতে দিলাম। এরপর তাঁকে দ্বীনের কথা বুঝালাম যে, দুনিয়ার জীবনে এত কষ্ট করেও পরকালে যাতে জাহান্নামে আজাবে পড়তে না হয়, বরং জান্নাতে সুখের জীবন লাভ হয়, সে জন্য দ্বীনের উপরে চলা এবং নিয়মিত নামায-রোযা করা কর্তব্য। তিনি আমার কথা মেনে নিয়েছেন।
তারপর তিনি আমাকে দু‘আ করে বিদায় নিয়ে চলে গেলেন। আমি তার পথের দিকে চেয়ে থাকি আর ভাবি, মানুষকে দেখলে বুঝা যায় না, তার জীবনে কত দুঃখ! মাকে কষ্ট দিয়ে নিশ্চয়ই তার ছেলে ও বউ কোন সুখ পায়নি। তদুপরি মহিলাটি সারা জীবন কষ্টই করলেন, অথচ মুখে কত হাসি! এ হাসি যেন পরকালে অটুট থাকে। আমীন।

এটাও পড়তে পারেন  প্রিয়নবী (সা.) এর পাঁচ নাম

 

মন্তব্য যুক্ত করুন