তারাবি পড়িয়ে বিনিময় ও হাদিয়া দেয়া-নেয়া উভয়টাই নাজায়েয ও হারাম

দ্বীনী ক্ষেত্রে বিনিময়কে আমাদের দেশে অনেক সময় ‘হাদিয়া’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। সেভাবেই ইমাম সাহেবকে যে বেতন দেয়া হয়, তাকে অনেক স্থানে ‘হাদিয়া’ বলে দেয়া হয়।
সুতরাং রামাজানে তারাবীহ নামায পড়ানোর কারণে হাফেজ সাহেবগণকে ‘হাদিয়া’ হিসেবে যা কিছু দেয়া হয়, তা শরয়ী হুকুমে ‘তারাবীহের ইমামতীর বিনিময়’ হিসেবেই গণ্য হবে।
তাই তারাবীহ নামায পড়ানোর কারণে হাফেজ সাহেবগণকে মসজিদ কমিটির পক্ষ থেকে ‘বিনিময়’ উল্লেখ করে দেন অথবা ‘হাদিয়া’ উল্লেখ করে দেন, তার একই হুকুম।

এ সম্পর্কে দারুল উলূম দেওবন্দ-এর দারুল ইফতা থেকে সম্প্রতি প্রকাশিত ফাতওয়ায় বলা হয়েছে :

* তারাবীহ নামাযের ইমামতীর বিনিময় গ্রহণ করা কোনভাবেই জায়েয নয়।

* তারাবীহের বিনিময় গ্রহণ করা নিঃশর্তভাবে নাজায়েয। চাই তাকে কুরআন শরীফ খতমের বিনিময় ধরা হোক বা তারাবীহের ইমামতির বিনিময় ধরা হোক।

* বহু আকাবির মুফতীয়ানে কেরামের ফত্ওয়ায় তারাবীর ইমামতির বিনিময়কে সুস্পষ্টভাবে নাজায়েয সাব্যস্ত করা হয়েছে। যেমন– ই’লাউস সুনান-এর লেখক মাওলানা যফর আহমদ উসমানী এক প্রশ্নের জবাবে লেখেন :
والأصل فيه ما حققه ابن عابدين في رسالته شفاء العليل وبل الغليل من حرمة الإجارة …

তাঁর দীর্ঘ বক্তব্যের সারকথা হলো, তারাবীহের ইমামতির বিনিময় নেওয়া জায়েয নয়। কারণ, যে জরুরত বিবেচনা করে কুরআন শরীফের তা’লীম, ফরয নামাযের ইমামতি, আযান ইত্যাদির বিনিময় গ্রহণ করা জায়েয বলা হয়েছে, সেই জরুরত তারাবীহর জামা‘আতে সাব্যস্তই হয় না। কেননা, উল্লিখিত বিষয়গুলো হয় ফরজের অন্তর্ভুক্ত, না হয় সুন্নতে মুআক্কাদার অন্তর্ভুক্ত। আর তারাবীহের জামা‘আত ও ইমামতি সুন্নতে কেফায়াহ।
এরপর তারাবীহের ইমামতি সুন্নতে কেফায়া হওয়ার পক্ষে কিছু ইবারত দ্বারা দলীল পেশ করার পর হযরত মাওলানা যফর আহমদ উসমানী রহ. বলেন, উল্লিখিত ইবারত থেকে বোঝা গেল, তারাবীহের বিনিময় গ্রহণ করা জায়েয নয়। তা কেবল ইমামতী বিনিময়েও নয়, কেবল খতমের বিনিময়েও নয়।

* হয়তো এমন হলো যে, তারাবীহের ইমাম ও মসজিদ কর্তৃপক্ষের মাঝে তারাবীহের বিনিময়ের ব্যাপারে কোনো কথাবার্তা হয়নি। তবে ওই এলাকায় কুরআন খতমের বিনিময়ে লেনদেনের রেওয়াজ আছে। এ পরিস্থিতিতে ফিকহের প্রসিদ্ধ মূলনীতি المعروف كالمشروط (অর্থাৎ প্রচলিত বিষয় শর্ত করার মতোই হয়ে থাকে)-এর ভিত্তিতে সেই অবস্থায়ও তারাবীহ পড়িয়ে কিছু নেয়া জায়েয হবে না।…

* “সময় আটকে থাকা” (حبس وقت)-এর দোহাই দিয়েও তারাবীহের ইমামতীর বিনিময় গ্রহণ করা জায়েয হবে না। কারণ, যে সকল ইবাদতের ক্ষেত্রে ফুকাহায়ে কেরাম বিনিময় গ্রহণ করা জায়েয বলেছেন, তার মূল কারণ হলো ضياع دين তথা দ্বীন বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা। (এটাকেই জরুরত শব্দে ব্যক্ত করা হয়েছে।) حبس وقت (সময় আটকে থাকা) জায়েযের মূল কারণ নয়।

মোট কথা, কোন অবস্থাতেই তারাবীহ নামায পড়িয়ে হাদিয়া বা বিনিময় গ্রহণ করা জায়েয হবে না। তা খতমে তারাবীহ হোক বা সূরাহ তারাবীহ হোক–কোন তারাবীহের বিনিময় গ্রহণ জায়েয নয়।
(দ্রষ্টব্য : দারুল উলূম দেওবন্দ থেকে প্রকাশিত রেসালাহ -মু‘আওয়াযা আলাত-তারাবীহ : ১২-২৬ পৃষ্ঠা)

10 thoughts on “তারাবি পড়িয়ে বিনিময় ও হাদিয়া দেয়া-নেয়া উভয়টাই নাজায়েয ও হারাম

  1. মানুষ হাফেজে কুরআন দের সম্মান করে হাদিয়া দিয়ে থাকে। এ ব্যাপারে এত ফতোয়া ভেলিভারি না দিয়ে দেশের বৃহত্তর সমস্যা নিয়ে গবেষণা করলে ভালো হবে মনে করি।
    আমি আজ পর্যন্ত কোন হাফেজে কুরআন দর কষাকষি করে তারাবীহ নামায পড়িয়েছে এ রকম শুনিনি যে রকম অন্যান্য বক্তাগণ ওয়াজ মাহফিলে দর কষাকষি করে।
    শুধু হাফেজে কুরআনদের সম্মান নিয়ে টানাটানি না করার জন্য সমস্ত মুফতি সাহেবদের কাছে অনুরোধ করছি।

    1. আপমি মুফতি সাহেবকে অনুরোধ করবেন কেনো? তারাতো শরিয়ত অনুযায়ী মত দিতে বাধ্য। হাফেজে কুরআন দের সম্মান করে হাদিয়া দিতে রমাদান ছাড়া বাকি ১১ মাস অভ্যাসটা চালু রাখুন।

    2. ভাই নিয়ম তো নিয়ম। আর সবচেয়ে বড় কথা এখানে হালাল-হারামের বিষয়। আমরা একজন হাফেজে কোরআনকে পুরো বছর জুড়ে তো হাদিয়া দেই না। আমরা যদি এরকম করি প্রতি মাসে অথবা তিন মাস পরপর কিছু হাদিয়া তাদের কে বিশেষ করে আর্থিক দিক থেকে জাড়া একটু নিম্নমুখী তাদেরকে দেই তবে আর এ সমস্যা থাকে না।

  2. যাবতীয় ইবাদত যেন যথাযথভাবে আদায় হয়। ইবাদতের ক্ষেত্রে কোনো প্রকার ত্রুটি বা দুর্বলতা না থাকে। সেজন্য যেকোনো ইবাদতে ব্যতিক্রমী কিছু মনে হলে তা হক্কানী উলামাগণের নিকট থেকে জেনে শুধরে নেয়া জরুরী। আর শুধরে দেয়াও উলামাগণের ইমানী দায়িত্ব। কোরআনে কারীম হেফজ করার ‍সুযোগ পাওয়া বান্দার প্রতি আল্লাহ পাকের বিশেষ নেয়ামত সমূহের অন্যতম। হাফেজদেরকে আল্লাহতা’আলা যে নিয়ামত দান করেছেন, তার শুকরিয়া এটাই যে, তারা একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তারাবীহর নামাযে কুরআন শরীফ শুনাবেন, আর এর প্রতিদান আল্লাহর নিকট হতে পাওয়ার আশা করবেন। আল্লাহতা’য়ালাই রিজিকদাতা। তিনি সম্মানের সাথে এমন স্থান থেকে তাদের রিজিকের ব্যবস্থা করবেন, যা তারা কল্পনাও করতে পারে না। এই মহান নিয়ামতের প্রতিদান সামান্য টাকা পয়সায় হতে পারে না। তাই কোরআনে কারীমের খতম উপলক্ষে কোনো টাকা প্রদান করা এবং গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকা অবশ্য কর্তব্য। আল্লাহতা’আলা সকলকে হক্ক কথা বুঝবার তৌফিক দান করুন! আমীন।

  3. এই ক্ষেত্রে সকল মুফতি সাহেবগনই এমন অখাদ্য খাওয়া হাফেজদের গালি শুনতে হয়।

    ১. আমার এক হাফেজ বন্ধুর সাথে যখন এই মাসআলা নিয়ে আলোচনা করলাম
    তখন সে উত্তর দিতে না পেরে বললো, ” আল্লাহ তোমারে হাফেজ বানায় নাই ভালোই হইছে”

    ২. আরেক ভাই বললো “যারা হাফেজ না তারাই তারাবির টাকা নেয়াকে নাযায়েজ বা হারাম বলে। ”

    আমি বরাবরই তাদের হেদায়েতের দোয়া করি।

    হায়! যদি তারা টাকার চেয়ে শরিয়তকে প্রাধান্য দিতো !

  4. বিষয়টি নিয়ে একজন হাফেজ সাহেবের সাথে কথা বলায় তিনি মন্তব্য করলেন, ভারতের হাফেজ-আলেম সাহেবগণ ধণী মানুষ, তাদের অর্থ কড়ির প্রয়োজন হয়না। তাই তাঁরা এধরণের ফাতওয়া দিয়ে থাকেন!
    আল্লাহতা’আলা সকলকে হক্ক কথা বুঝবার এবং হারাম থেকে বেঁচে থাকার তৌফিক দান করুন! আমীন।

  5. আল্লাহ তা’য়ালা আমাদের সওয়াব অর্জন করতে গিয়ে গোনাহে লিপ্ত হওয়ার সকল পন্থা থেকে হিফাজত করুন, আমিন।

  6. আমাদের এখানে তো এগুলোর কোনো বালাই নেই হুজুর । টাকা নেওয়াটা এখন রেওয়াজে পরিণত হয়েছে । এগুলা নিয়ে আরো বেশি বেশি আলোচনা দরকার ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: