স্বামীর আহ্বানে যখন তখন সাড়া দেয়া কি স্ত্রীর জন্য জরুরী?

বংশ পরম্পরা রক্ষা, গোনাহ থেকে হিফাজত, অর্ধেক দিন পুরো করা এবং পরস্পর সুখ দুঃখ ভাগাভাগি করা ইত্যাদি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কারণে আল্লাহ তাআলা নারী পুরুষের মাঝে বিবাহ বন্ধনের ব্যবস্থা রেখেছেন।যারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হবে, সেই স্বামী-স্ত্রীকেও আল্লাহ তা’আলা অনেক মর্যাদা দান করেছেন।

সংসার সুখময় রাখবার জন্যে স্বামী-স্ত্রী উভয়ের উপরেই বেশ কিছু হক নির্ধারণ করে দিয়েছেন এবং উভয়কেই নিজ নিজ হক পরিপূর্ণ পালনে নির্দেশ দিয়েছেন। স্ত্রীর উপর তেমনই একটি হক হল, স্বামীর যৌন তাকাজা পুরো করা।কাজেই শরীয়ত সমর্থিত কোন ওজর না থাকলে স্বামীর এই তাকাজা পূরণ করা স্ত্রীর জন্যে জরুরী।
শরয়ী কোন ওজর দেখা দিলে তখন এই কাজে বিরত থাকতে সমস্যা নেই।

*** শরয়ী ওজর তথা দৈহিক মিলনে নিষেধাজ্ঞার দুটি বড় উদাহরণ হল হায়েজ ও নেফাস। এ ২টি জারি অবস্থায় সহবাস জায়েজ নয়। বরং নিষিদ্ধ ও হারাম।

এ সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কুরআনের সূরা বাকারার ২২২ নং আয়াতে বলেছেন-

وَيَسْأَلُونَكَ عَنِ الْمَحِيضِ ۖ قُلْ هُوَ أَذًى فَاعْتَزِلُوا النِّسَاءَ فِي الْمَحِيضِ ۖ وَلَا تَقْرَبُوهُنَّ حَتَّىٰ يَطْهُرْنَ ۖ فَإِذَا تَطَهَّرْنَ فَأْتُوهُنَّ مِنْ حَيْثُ أَمَرَكُمُ اللَّهُ ۚ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ [٢:٢٢٢]

আর তারা আপনার কাছে হায়েয (ঋতু)সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলে দিন, এটা অশুচি। কাজেই তোমরা হায়েয অবস্থায় স্ত্রীগমন থেকে বিরত থাক। ততোক্ষণ পর্যন্ত তাদের নিকটবর্তী হবে না, যতক্ষণ না তারা পবিত্র হয়ে যায়। যখন তারা উত্তমরূপে পরিশুদ্ধ হয়ে যাবে, তখন তাদের কাছে গমন কর, যেভাবে আল্লাহ তোমাদেরকে হুকুম দিয়েছেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবাকারী এবং অপবিত্রতা থেকে যারা বেঁচে থাকে, তাদেরকে পছন্দ করেন। [সূরা বাকারা-২২২]

এ আয়াত দ্বারা আমরা বুঝতে পারি, হায়েজ ও নেফাস ছাড়া যেকোনো অবস্থায় সহবাস করা যাবে।

 

তবে স্ত্রীর মত স্বামীরও একটি দায়িত্ব হল, স্ত্রীকে কোনরূপ কষ্ট না দেয়া বা জোর জবরদস্তি না করা। স্বামীর ইচ্ছে জাগলেই স্ত্রীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়া গোনাহের কাজ। স্ত্রীও তো মানুষ, তার তো মানসিক প্রস্তুতির দরকার আছে। অতএব যেদিন তাকাজা পূরণের ইচ্ছে করবে, সেদিন স্বামী আগে থেকেই স্ত্রীকে জানিয়ে রাখবে। যেন স্ত্রী সমস্ত ব্যস্ততা থেকে মুক্ত হয়ে নিজেও মানসিকভাবে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিতে পারে।পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার প্রয়োজন থাকলে সেটাও করে নিতে পারে।

আর একান্তই যদি স্ত্রী মানসিকভাবে প্রস্তুত না থাকে,তবে স্বামী কর্তৃক জোর করা ঠিক হবে না। স্ত্রীর উচিত, স্বামীকে বুঝিয়ে বিরত রাখা বা ভিন্ন উপায়ে স্বামীর তাকাজা পূরণ করা। তবে, ভিন্ন উপায় অবলম্বন করতে গিয়ে কোনভাবেই শরীয়ত নিষিদ্ধ পদ্ধতিতে তাকাজা মেটানো যাবে না।
শরীয়ত নিষিদ্ধ একটি পদ্ধতি হল, পায়ুপথে সহবাস করা। স্বামীর যতই চাহিদা থাকুক, কোনভাবেই পেছনের রাস্তায় সহবাস করা যাবে না। স্বামী যদি পেছন পথে সহবাসের জন্য জোরাজুরি করেন, তবুও কোনভাবেই স্ত্রী তার ডাকে সাড়া দিবে না। এটা হারাম ও স্ত্রীর স্বাস্থ্যের জন্যেও মারাত্মক হুমকি স্বরূপ। এক্ষেত্রে স্বামীর আদেশ অমান্য করাও জায়েজ।কারণ, স্রষ্টার আদেশ অমান্য করে সৃষ্টির আদেশ পালন করা জায়েজ নয়।

এ ব্যাপারে হাদীসে উল্লেখ আছে –
عَنِ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ” مَلْعُونٌ مَنْ أَتَى امْرَأَةً فِي دُبُرِهَا “

হযরত আবূ হুরায়রা রা: থেকে বর্ণিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি স্ত্রীর পিছনের রাস্তা দিয়ে সহবাস করে উক্ত ব্যক্তি অভিশপ্ত। [মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-১০২০৬, সুনানে কুবরা লিননাসায়ী, হাদীস নং-৮৯৬৬]

 

তবে স্ত্রীদের জন্যে লক্ষ্য রাখার বিষয় যে, সাধারণ কোন কারণে স্বামীর আহবানকে প্রত্যাখ্যান না করা। সামান্য মান-অভিমান, রাগ ইত্যাদির কারণে স্বামীকে বিরত না রাখা।কারণ, প্রতিনিয়ত এমন হতে থাকলে স্ত্রীর প্রতি স্বামীর আগ্রহ নষ্ট হয়ে যেতে পারে। আর এতে যদি স্বামী গোনাহের পথে পা বাড়ায়, তাতে স্ত্রীই বরং গোনাহগার হবে।

 

মোটকথা, স্বামী যাতে গোনাহের দিকে পা না বাড়ায়, এর জন্যে যা কিছু করা দরকার, সব স্ত্রীকেই করতে হবে। নইলে সে নিজেই গোনাহগার হবে।

এ ব্যাপারে হাদীসে আছে,

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِذَا دَعَا الرَّجُلُ امْرَأَتَهُ إِلَى فِرَاشِهِ فَأَبَتْ فَبَاتَ غَضْبَانَ عَلَيْهَا لَعَنَتْهَا المَلاَئِكَةُ حَتَّى تُصْبِحَ»

আবূ হুরাইরাহ্ (রা:) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কোন লোক যদি নিজ স্ত্রীকে নিজ বিছানায় আসতে ডাকে আর সে অস্বীকার করে এবং সে ব্যক্তি স্ত্রীর উপর দুঃখ নিয়ে রাত্রি যাপন করে, তাহলে ফেরেশতাগণ এমন স্ত্রীর উপর সকাল পর্যন্ত লা‘নত দিতে থাকে। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৩২৩৭]

[অর্থাৎ স্বামী যদি রাত্রে শয়নকালে স্ত্রীকে নিজের কাছে ডাকে এবং স্ত্রী রাগ করে না আসে, আর স্বামী অসন্তুষ্ট অবস্থায় ঘুমিয়ে পড়ে, তবে সারা রাত্রি ফেরেশতাগণ ঐ স্ত্রীর উপর লা’নত করতে থাকে।
(বেহেশতী জেওর ৪র্থ খণ্ড)]

হযরত রাসূলুল্লাহ (স.) বলেছেন, “দুনিয়াতে যখন কোন স্ত্রী তার স্বামীকে বিরক্ত বা কোনরূপ কষ্ট দেয়, তখন বেহেশতের যে হুর কিয়ামতের দিন তার স্ত্রী হবে, তারা ঐ স্ত্রীকে লক্ষ্য করে বলে, ওহে হতভাগিনী! আল্লাহ তোর সর্বনাশ করুন। তুই আর তাঁকে কষ্ট দিস না। তিনি কয়েকদিন মাত্র তোর নিকট মেহমান স্বরূপ আছেন। অল্পদিন পরেই তিনি তোকে ছেড়ে আমাদের নিকট চলে আসবেন।” (বেহেশতী জেওর ৪র্থ খণ্ড)

রাসূলুল্লাহ (স.) আরও বলেছেন, “যে স্ত্রী তার স্বামীকে সন্তুষ্ট রেখে ঈমানের সাথে মরতে পারবে, সে নিঃসন্দেহে বেহেশতী হবে।”- ইবনে মাজাহ

স্বামীর আহবানে গুরুত্বারোপের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, স্বামী যদি স্ত্রীকে নিজের কাজের জন্য ডাকে,আর স্ত্রী যদি রান্নার কাজেও থাকে, তবুও তৎক্ষণাৎ স্বামীর আদেশ রক্ষা করা স্ত্রীর প্রধান কর্তব্য। (বেহেশতী জেওর ৪র্থ খণ্ড)

 

তবে যদি এমন ব্যস্ততার সময় স্বামী আহবান করেন যে, স্ত্রীর পক্ষে সর্বোচ্চ ইচ্ছা ও চেষ্টা থাকা সত্ত্বেও সাড়া দেওয়া সম্ভব হয় না, তখন কড়া ভাষা ব্যবহার বা সরাসরি প্রত্যাখ্যান না করে মিষ্টি সুরে অপেক্ষা করার জন্য বুঝিয়ে বলা যেতে পারে।

 

সর্বোপরি স্বামীদের দায়িত্ব হল, স্ত্রীর মানসিক প্রস্তুতির দিকে নজর রাখা। তার প্রফুল্লতার দিকে দৃষ্টি দেয়া। স্বামীর উপর স্ত্রীর মান-অভিমান হলে যথাসম্ভব তার অভিমান ভাঙ্গানো। মিষ্টি ব্যবহার দিয়ে বুঝিয়ে মনজয় করা। এতে করে স্ত্রীও স্বতঃস্ফূর্তভাবে খুশি মনে স্বামীর আহবানে সাড়া দেবে।ফলে মিলনটা সুখময়, শান্তি ও স্বস্তির হবে। আল্লাহ আমাদের বোঝার ও আমল করবার তাউফিক দেন।


ফতওয়া প্রদানে, মুফতি সাঈদ আল হাসান
মুঈনে মুফতি, ফতওয়া বিভাগ
মারকাযুদ দুরুস আল ইসলামিয়া, ঢাকা।

17 thoughts on “স্বামীর আহ্বানে যখন তখন সাড়া দেয়া কি স্ত্রীর জন্য জরুরী?

  1. স্ত্রী আজ এই লেখাটি পড়াবো ইনশাআল্লাহ।

  2. স্ত্রীকে আজ এই লেখাটি পড়াবো ইনশাআল্লাহ।

  3. শাইখ আল্লাহ আপনার উপর রহম করুন ।
    আমি আদনান, বয়স ২০ বছর ।
    বাড়িতে এখন বিয়ের কথা বলা অসম্ভব । কিন্তু আমি আর পারছিনা কোনোভাবেই । মাঝে মাঝে গুনাহের পথে পা বাড়াই ; উত্তেজনাবশত ভুল করে মাস্টারবেশন করে ফেলি । আমি এখন কি করবো শাইখ ? আমার কোনো কিছুই ভালো লাগছে না ।
    কোনো কাজ ঠিক মত করতে পারছি না । আপনার কাছে উপযুক্ত পরামর্শ চাইছি শাইখ ।

  4. খুব সুন্দর উপদেশ। এই কথা গুলো আমাদের মুসলিম পরিবার মেনে চললে। স্বামী এবং স্তী মধ্য ঝগড়া হবে না।

  5. বেচারিদের যদি এমন করতেই হয় তাহলে আল্লাহ এই ক্ষেত্রে একই মন মানসিকতা না দিয়ে ভিন্নতা দিল কেন নাকি এমন মনের নিয়ম মানব সৃষ্ট

  6. Valo.
    Kintu husband jokhon wife er dake sara na dey .
    Husband jokhon wife er cahida poron korte na pare tokhon ki kora ucit. ..?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *