ইতিহাসের দর্পনে বুখারা শহর

যারাফশান নদীর তীরে দীর্ঘ উপত্যকায় অবস্থিত ইতিহাস প্রসিদ্ধ শহর বুখারা মধ্যএশিয়ার এক আকর্ষনীয় পর্যটন গন্তব্য। প্রাচীন এই শহরটি মুগ্ধ করে রেখেছে তার অসংখ্য পর্যটকদের। শহরটির রাস্তা ধরে যদি আপনি হেঁটে যান, তবে এই শহরটির প্রতি পদে পদে আবিষ্কার করবেন অতীত ইতিহাস বিশেষকরে ইসলামী ইতিহাস ও সংস্কৃতির বিভিন্ন নিদর্শন।

মধ্য এশিয়ার উজবেকিস্তানের অন্যান্য শহরের মতই বুখারার বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে আছে তুর্কি-ইসলামী স্থাপত্যশৈলীর বিভিন্ন নিদর্শন। বৃহদাকৃতির মসজিদ, সুউচ্চ মিনার, সরাইখানা, মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন অতীত স্থাপনা প্রকাশ করে আসছে শহরটির অতীত ইতিহাস ও সমৃদ্ধ সংস্কৃতিকে। শত শত বছর ধরে শহরটি এই অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে পরিগণিত হয়ে আসছে।

বিশ্বের প্রাচীন শহরগুলোর মধ্যে বুখারা অন্যতম একটি শহর যেখানে বিভিন্ন ধর্মের ভিন্ন ভিন্ন সম্প্রদায় পাশাপাশি সহাবস্থানে বসবাস করে আসছেন। জরত্রুস্ত, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, ইহুদি এবং মুসলমান সহ বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী সম্প্রদায়ের সহাবস্থানের এই শহরটির ইতিহাস ২৫০০ বছরেরও অধিক। ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন তুর্কি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে শহরটি ভূমিকা পালন করে।

সর্বশেষ ১৫৯৯ থেকে ১৯২০ সাল পর্যন্ত পরিচালিত বুখারা খানাতের রাজধানী মর্যাদায় শহরটি অধিষ্ঠিত ছিল। ১৯২০ সালে সোভিয়েত আগ্রাসনে বুখারা খানাতের পতন ঘটলে শহরটি তার মর্যাদা হারায় এবং এসময় শহরটি বিপুল ধ্বংসের সম্মুখীন হয়।

প্রাচীন ইতিহাস ও স্থাপত্য ছাড়াও শহরটি আরো বিভিন্ন দিক থেকে আকর্ষণের অধিকারী। ইতিহাসখ্যাত ধর্মতত্ত্ববিদ, পন্ডিতজন, দার্শনিক, কবি, বিজ্ঞানী সহ অনেক মনীষীরই জন্ম, কর্ম ও শেষ শয্যাস্থল বুখারা। ইমাম বুখারী, ইবনে সিনা, বাহাউদ্দীন নকশবন্দী সহ ইতিহাসপ্রসিদ্ধ অনেক মনীষীই এই শহরে জন্মগ্রহণ করেছেন।

‘ইসলামের গম্বুজ’ হিসেবে আখ্যায়িত বিশ্বের তিনটি শহরের মধ্যে অন্যতম একটি বুখারা। তুর্কি-ইসলামী সভ্যতার ইতিহাসে বিশেষ স্থানের অধিকারী এই শহরটিতে বিপুল স্থাপনা পরিদর্শনের জন্য সংরক্ষিত আছে। খুব কম শহরই বুখারার মত কালের করাল গ্রাসের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে। এখানে অল্প কয়েকটি স্থাপনার বিবরণ দেওয়া হল।

 

আর্ক (খান প্যালেস)

বুখারার অন্যতম প্রাচীন স্থাপত্য নিদর্শন এই স্থাপনাটি। বিশালাকার দেওয়ালের আবেষ্টনীতে দূর্গটি নির্মিত। খান প্যালেস নামেও পরিচিত দূর্গটিতে বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারীর আবাসস্থল, খানের বসবাসের প্রাসাদ, মসজিদ, কোষাগার, সৈন্যদের ব্যারাক ও কারাগারের অবস্থান রয়েছে। স্থাপনাটির বিভিন্ন স্থানের বিচিত্র নকশা পর্যটকদের আকর্ষন করবে।

 

কেলান মিনার

বুখারার অন্যতম প্রধান প্রতীক কেলান মিনার স্থানীয় এবং ভীনদেশী পর্যটকদের কাছে অন্যতম আকর্ষনীয় স্থাপত্য নিদর্শন। ৪৭ মিটার উচ্চতার এই স্থাপনাটি শহরটির উচ্চতম মিনার। পূর্বে এই মিনারটির চূড়ায় আলো রাখা হত, যাতে করে রাতের অন্ধকারে মুসাফিররা শহরটি সহজে খুঁজে পেতে পারে।

 

লাব-ই-হাওয়ায

বুখারার কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত লাব-ই-হাওয়ায স্থাপনাটি শহরটির অন্যতম প্রধান পর্যটন আকর্ষন। কমপ্লেক্সটির ভেতরে মাদ্রাসা, মসজিদ, পুকুর সহ বিভিন্ন স্থাপনা রয়েছে। কমপ্লেক্সে প্রবেশের মুখেই নাদির দিভান বে মাদ্রাসা অবস্থিত, যার দেওয়ালে অঙ্কিত কুরআনের আয়াতের ক্যালিওগ্রাফির নকশা চিত্তহরণকারী।

স্থাপনাটির আশেপাশের বিভিন্ন দোকানে উজবেক কর্মকারদের ঐতিহ্যবাহী কাজের বিভিন্ন নিদর্শন প্রদর্শন করে রাখা হয়েছে। পাশাপাশি শহরটিতে ভ্রমনের স্মারক হিসেবে সংগ্রহের জন্য বিভিন্ন দ্রব্যসামগ্রীর দোকানের অবস্থান স্থাপনাটির চারপাশে ছড়িয়ে আছে।

 

বুখারা সিনাগগ

বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন একটি সিনাগগ বা ইহুদি উপাসনালয়ের অবস্থান এই শহরে। চারশত বছরের পুরাতন এই সিনাগগটিকে কেন্দ্র করে বুখারাতে এখনও ছোট একটি ইহুদি সম্প্রদায়ের বসবাস রয়েছে।

ঐতিহাসিক রেশম সড়কের কিনারে অবস্থিত বুখারা শহরটি সারাবিশ্বের পর্যটনপ্রিয় মানুষের কাছেই আকর্ষণীয় গন্তব্য।শহরটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনা করে ১৯৯৩ সালে পুরাতন শহরটিকে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে তালিকাভুক্ত করে।

ডেইলি সাবাহ অবলম্বনে, মুহাম্মদ আল-বাহলুল

 

আপনার মন্তব্য