বাড়ছে মুদ্রাস্ফীতি, কমছে টাকার মান : জমানো টাকার হিসেব নিয়েছেন তো?

কাইসার আহমেদ
————————–

আপনার হাতে যত টাকা আছে ৯ বছর পর সে টাকার অর্ধেক বাতাসে উড়ে যাবে। এখন যদি আপনার কাছে ১০ লক্ষ টাকা থাকে তাহলে আনুমানিক ৯ বছর পরে তা হয়ে যাবে ৫ লক্ষ টাকা। অবাক হচ্ছেন?

২০২১ জুড়ে পুরো বছরে আপনার সামগ্রিক যত খরচ হয়েছে, বা মাসিক যত খরচ হয়েছে সেটার আনুমানিক সংখ্যা তো আপনার জানা আছে। তাই না? ধরুন, ৩৬৫ দিনের খাবার, বাসা ভাড়া, যাতায়াত, শিক্ষা, মেডিকেল ও অন্যান্য যা কিছু আপনি ভোগ করেছেন সেটা টাকার সংখ্যায় হল ৩,০০,০০০ (তিন লক্ষ) টাকা। এবার আনুমানিক হিসেব করে নিন যে আপনি সপ্তাহে কয় দিন মাংস খেয়েছেন, মাছ খেয়েছেন, কেমন মানের বাসায় ভাড়া থেকেছেন, কোন স্তরের স্কুলে সন্তানকে পড়িয়েছেন, কয়টা ও কেমন মানের জামা কিনেছেন, কেমন মেডিকেল ট্রিটমেন্ট নিয়েছেন, কেমন গেজেট বা সামগ্রী কিনেছেন, কোথায় ও কেমন ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার করেছেন।

এখন আসুন ২০২২ সালে। আপনি ২০২১ এ যা যা কিনেছেন, খেয়েছেন, ব্যবহার করেছেন, সে একই রকম সবকিছু ভোগ করার জন্য, একই রকম জীবন অতিবাহিত করার জন্য ২০২২ সালে আপনার লাগবে ৩,২২,৫০০ টাকা। অর্থাৎ ভোগ ও পণ্যের উপযোগিতা বাড়বে না, একই রকম সবকিছু পেতে আপনাকে অতিরিক্ত ২২,৫০০ টাকা বেশি খরচ করতে হবে।
অবাক হচ্ছেন? ভাবছেন আমি ভুল কিছু বলছি?

অর্থনীতি বিষয়কে জটিল মনে করে আমাদের মধ্যে অধিকাংশ এই বিষয়ে লেখা পড়তে চায় না। স্কিপ করে চলে যায়। মাথা খাঁটাতে চায় না। কিন্তু আমি চাই বিষয় গুলো খুব সহজে সোজা বাংলায় তুলে ধরতে। আমি চাই মানুষ সঠিকটা জানুক। কত বড় প্রতারণা হচ্ছে তা বুঝুক। স্যালারির নামে ইনক্রিমেন্ট, ও ফিক্সড ডিপোজিটের নামে অতিরিক্ত মুনাফা! (সুদ) যে একটি বড় প্রতারণা তা বুঝুক। ধীরে ধীরে পড়ুন, প্রয়োজনে কয়েকবার পড়ুন কিন্তু বুঝার চেষ্টা করুন। (আর হারাম জিনিসে যে কোন কল্যাণ নেই, সেটাও মাথায় ঢুকুক)

এক বছরে আমেরিকায় মুদ্রাস্ফীতির হার ৭.৫% বেড়েছে। এটা ৪০ বছরের সর্বোচ্চ।

সাধারণ মানুষের কাছে অর্থনীতির এই তথ্য কোনো অর্থ বহন করে না। তারা কেবল শোনে। ভাবে ওহ বড় কিছু হয়েছে মেবি। যাকগে।

সাধারণকে বুঝানোর জন্যই আমি উপরে দুটি উদাহরণ দিয়েছি। এবার সেটা আরেকটু বুঝা যাক।

মুদ্রাস্ফীতি বাড়া মানে হল জীবনযাত্রার খরচ বাড়া। একই জীবনযাত্রার খরচ (কস্ট্‌ অফ লিভিং) এক বছর আগে যা ছিল এখন সেটা বেড়ে গেছে। কত বেড়েছে? শতকরা যত আনুপাতিক হারে মুদ্রাস্ফীতি হয়েছে তত অনুপাতেই বেড়েছে। এক বছর আগে যে জীবনযাত্রা নির্বাহ করতে আপনার যা খরচ হয়েছে এখন তা করতে আপনাকে ৭.৫% বেশি টাকা খরচ করতে হবে। (৩,০০,০০০*৭.৫%= ২২,৫০০ টাকা)

এবার ভাবুন আপনার মাসিক বেতন ২৫,০০০ টাকা। বছরে আপনাকে একবার ইনক্রিমেন্ট দেয়া হচ্ছে ধরুন ১০০০ টাকা। (অর্থাৎ আপনার বেতন ৪% হারে বাড়ে)। ২০২২ এ বেতন ১ হাজার বাড়ায় বছর জুড়ে আপনার ইনকাম হবে ৩,১২,০০০ টাকা। ওয়েট। কিন্তু ২০২২ এ একই রকম জীবনযাত্রা বজায় রাখতে আপনাকে খরচ করতে হবে ৩,২২,৫০০ টাকা। অর্থাৎ ইনক্রিমেন্ট পেয়ে আপনার খুশি হবার কোনো কারণ নেই। আপনি এই স্যালারি দিয়ে আগের বছরের মত ফুর্তি করতে পারবেন না। তবে খুশি হতে পারেন কেননা বাংলাদেশের স্যালারি ইনক্রিমেন্টের এভারেজ হল ২%। আর আপনি পাচ্ছেন ৪%। বন্ধুদের ট্রিট দেয়া যেতে পারে।

৭.৫% এই তথ্য আমাদের আরেকটি ভয়াবহ মেসেজ দেয়। সেটা হল যদি এই অনুপাত বজায় থাকে তাহলে আনুমানিক ৯ বছর ৪ মাস পর আমাদের টাকা অর্ধেক হয়ে যাবে। (রুল অফ সেভেন্টি- ৭০/৭.৫= ৯.৩৩)। মানে আজ আমার হাতে ১০ লক্ষ টাকা থাকলে, সাড়ে নয় বছর পর আমি এই একই টাকা দিয়ে আজকের অর্ধেক পণ্যদ্রব্য কিনতে পারব।

এবার আসুন সুদের ক্ষেত্রে। ধরুন আপনি টাকার ক্ষয় রোধ করতে ব্যাংকে (ডিপোজিটে) টাকা রাখলেন। বাংলাদেশে হলে ৬% ও আমেরিকায় হলে ১% সুদ পাবেন। আপনি তিন লক্ষ টাকা রাখলে তাতে বাৎসরিক ৬% এ সুদ আসবে ১৮০০০ টাকা। কিন্তু মুদ্রাস্ফীতির হার অনুযায়ী টাকা হওয়া উচিত ৩,২২,৫০০ টাকা। যতি তা নাহয় তবে মুদ্রার ক্ষয় রোধ হয়নি। এক বছর আগে ৩ লক্ষ টাকা দিয়ে যে জীবন লিড করতে পারতেন, এক বছর পর সুদ সহ ৩,১৮,০০০ টাকা বের করে ঐ একই রকম জীবন লিড করতে পারবেন না।

তিন লক্ষ টাকা ব্যাংকে ডিপোজিট রাখলে ৬% হারে সুদ যোগ হলে আনুমানিক ১১ বছর ৮ মাস পরে আপনার টাকা ডাবল হয়ে যাবে। কিন্তু টাকার মান ধরে রাখতে ঠিক ৯ বছর ৪ মাসে আপনার টাকা ডবল হতে হবে, অন্যথায় আপনার লস হবে। অর্থাৎ সারা বছর আল্লাহর সাথে যুদ্ধে করেও (নাউযুবিল্লাহ), নিজ টাকার মান রক্ষা করতে পারবেন না। (শুধু উদাহরণ হিসেবে সুদের কথা উল্লেখ করা হল। সুদ কিন্তু টোটালি হারাম)

সর্বশেষ আরেকটি তথ্য দিই, এক জরিপ মোতাবেক আনুমানিক ১০ বছর কর্ম জীবন অতিবাহিত করার পর একজনের বেতন তার জীবনে পাওয়া প্রথম বেতনের ডাবল হয়। অর্থাৎ আপনার চাকরি জীবন ২৫ হাজার টাকা দিয়ে শুরু হলে ১০ বছর পর আপনার বেতন ৫০ হাজার হবে। এটা বাংলাদেশের এভারেজ।

অথচ, আমরা উপরে দেখেছি মুদ্রাস্ফীতির কারণে আপনি যে জীবন যাত্রা নির্বাহ করছেন ৯ বছর পর সেই একই মানের জীবন যাত্রা নির্বাহ করতে আপনার আজকের অংকের ডাবল অংক টাকা গুনতে হবে। অতএব, আপনি আজ যে ভাবে থাকছেন, খাচ্ছেন, ঘুরছেন, ভোগ করছেন, ৯-১০ বছর পর আপনি একই রকম খাবেন, পরবেন, ঘুরবেন, ভোগ করবেন। তাই আপনার স্যালারি ২৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার হলে তাতে খুশি হবার কোনো কারণ নেই। মোটকথা আপনার স্যালারি বাড়ছে না, আপনার জীবন যাত্রার মান যাতে না কমে সেটা শুধু এনশিওর করা হচ্ছে।

এই মুদ্রাস্ফীতির জালের মাধ্যমে আপনাকে পার্মানেন্টের জন্য হাই লেভেলে যাওয়া থেকে আটকে রাখা হয়। রিচরা পারমানেন্টলি রিচ থাকে পোররা পারমানেন্টলি পোর থাকে। হ্যাঁ মাঝখানে যদি কেউ ব্যবসা করে বিশেষ লাভ পেয়ে যায় তাহলে সে নিজ লেভেলকে পরিবর্তন করতে পারে, নতুবা লেভেল থেকে পরে যায়। কেননা প্রতি বছর মানুষের সার্বিক চাহিদা ও জীবনযাত্রা এক থাকে না। বিয়ে, সন্তান, শিক্ষা, মেডিকেল ইত্যাদির প্রয়োজন বছরের পর বছর বাড়ে ফলে আপনার ইনকাম দিয়ে বর্তমান লেভেলে টিকে থাকতেই হিমশিম খেতে হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

%d bloggers like this: