ছোঁয়াচে রোগ সংক্রান্ত আকিদা : করোনা ভাইরাস যেন আমাদের ঈমানকে নষ্ট না করে

মুফতী আবুল হাসান শামসাবাদী

হাদীস শরীফে হযরত আবূ হুরাইরা (রা.) হতে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন–
لاَ عَدْوَى وَلاَ طِيَرَةَ وَلاَ هَامَةَ وَلاَ صَفَرَ، وَفِرَّ مِنَ الْمَجْذُومِ كَمَا تَفِرُّ مِنَ الأَسَدِ
“কোন রোগের সংক্রমণ বলতে কিছু নেই, কোন কুলক্ষণ বলতে কিছু নেই এবং কোন পেঁচার ডাকে ও সফর মাসে কোন অশুভতা নেই। আর কুষ্ঠ রোগী থেকে পলায়ন করো সেভাবে যেভাবে সিংহ থেকে পলায়ন কর।”

(সহীহুল বুখারী, হাদীস নং ৫৭০৭)

এ হাদীসের প্রথমাংশ দ্বারা জানা যাচ্ছে–“সংক্রামক রোগ” বা “ছোঁয়াচে রোগ” বলতে কিছু নেই। অর্থাৎ স্বয়ংক্রিয়ভাবে কোন রোগের এ ক্ষমতা নেই যে, কাউকে সংক্রমণ করবে।

তবে মহান আল্লাহর হুকুম হলে, কোন রোগীর সংস্পর্শের দ্বারা সেই রোগ কারো মধ্যে নতুন করে পয়দা হতে পারে। এ ভিত্তিতে لا عَدْوَى “কোন রোগের সংক্রমণ বলতে কিছু নেই”-এর অর্থ হলো–স্বয়ংক্রিয়ভাবে কোন রোগ সংক্রামক বা ছোঁয়াচে হতে পারে না।

এভাবে এ হাদীসে জাহিলী যুগের সেই বিশ্বাসকে অপনোদন করা হয়েছে যা সেই যুগে লোকেরা বিশ্বাস করতো যে, রোগীর সংস্পর্শে এ রোগ তার নিজস্ব ক্রিয়াতে অন্যের মধ্যে ছড়িয়ে থাকে। অথচ এরূপে কোন রোগ কারো মধ্যে সংক্রমণের ক্ষমতাকে বিশ্বাস করা শিরক ও কুফরী বিশ্বাস। সেই কুফরী বিশ্বাসকে এ হাদীসে বাতিল করা হয়েছে। এ হাদীসের এরূপ ব্যাখ্যা করে “আস-সুনানুল কাবীর” কিতাবে ইমামুল হাদীস আল্লামা আবু বকর বাইহাকী (রহ.) উক্ত হাদীসের অধ্যায়ের শিরোনাম দিয়ে বলেন–
باب‏:‏ لاَ عَدْوَى عَلَى الْوَجْهِ الَّذِى كَانُوا فِى الْجَاهِلِيَّةِ يَعْتَقِدُونَهُ مِنْ إِضَافَةِ الْفِعْلِ إِلَى غَيْرِ اللَّهِ تَعَالَى
“এ বিষয়ের অধ্যায় যে, কোন রোগের সংক্রমণ বলতে কিছু নেই–এ নাকচকরণ সেই সূরতের ভিত্তিতে যা জাহিলী যুগে মানুষ বিশ্বাস করতো তথা রোগ হওয়ার সম্বন্ধকে গাইরুল্লাহর দিকে করা। এ ভিত্তিতেই রোগের কোনরূপ সংক্রমণের ক্ষমতাকে নাকচ করা হয়েছে।”

(দ্রষ্টব্য : আস-সুনানুল কাবীর, ১৫৮ পৃষ্ঠা)

অপরদিকে মহান আল্লাহর হুকুম হলে কোন রোগীর সংস্পর্শের দ্বারা অন্যের মধ্যে সেই রোগ পয়দা হতে পারে বিধায় এরূপ রোগী থেকে অন্যদের দূরে থাকতে বলা হয়েছে। যেমন, সেরকম একটি রোগ হলো কুষ্ঠরোগ। তাই উক্ত হাদীসের শেষাংশে সিংহকে ভয় করে তাত্থেকে দূরে থাকার ন্যায় কুষ্ঠরোগীদের থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অধিকন্তু এক্ষেত্রে ঈমানের এ সুরক্ষা উদ্দেশ্য, যাতে কুষ্ঠরোগীর সংস্পর্শে গিয়ে কারো কুষ্ঠরোগ হলে সে সেই রোগকে স্বয়ংক্রিয় সংক্রামক বলে বিশ্বাস করে তার ঈমানকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে।

বলা বাহুল্য, কোন রোগের নিজস্ব বা স্বয়ংক্রিয় কোন ক্ষমতা নেই অন্য কারো মধ্যে সংক্রমণের। বরং সব রোগই মহান আল্লাহই দিয়ে থাকেন বা তাঁর হুকুমে কারো মধ্যে সেই রোগ পয়দা হয়ে থাকে। সেই হিসেবে কোন রোগীর সংস্পর্শের কারণে আল্লাহর হুকুম হলে, সেই রোগ অন্যের মধ্যে পয়দা হতে পারে। তেমনি মহান আল্লাহ কর্তৃক রোগ দেয়ার ফয়সালা না হলে, কোন ব্যক্তি কোন কুষ্ঠরোগীর সংস্পর্শে থাকার পরও সেই রোগ কোনক্রমেই তার মধ্যে পয়দা হবে না।

এক্ষেত্রে কারো মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, অনেক সময় দেখা যায়, কোন সুস্থ ব্যক্তি খুঁজলি-পাঁচড়ায় আক্রান্ত কারো সাথে থাকলে, তারও সেরূপ খুঁজলি-পাঁচড়া হয়। তা কীরূপে হয়? এ সম্পর্কে হাদীস শরীফে রয়েছে–
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ حِينَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَا عَدْوَى وَلَا صَفَرَ وَلَا هَامَةَ فَقَالَ أَعْرَابِيٌّ يَا رَسُولَ اللَّهِ فَمَا بَالُ الْإِبِلِ تَكُونُ فِي الرَّمْلِ كَأَنَّهَا الظِّبَاءُ فَيَجِيءُ الْبَعِيرُ الْأَجْرَبُ فَيَدْخُلُ فِيهَا فَيُجْرِبُهَا كُلَّهَا قَالَ فَمَنْ أَعْدَى الْأَوَّلَ
হযরত আবূ হুরাইরা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন–“রোগের সংক্রমণ বলতে কিছু নেই, সফর মাসের কোন অশুভতা নেই এবং পেঁচার ডাকে কোন অমঙ্গল নেই”, তখন জনৈক গ্রাম্য ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! তাতে সেই উটপালের অবস্থা কী–যে কোনও বালুকাময় প্রান্তরে অবস্থান করে এ অবস্থায় যে, যেন তা সুস্থ-সবল হরিণ, অতঃপর খুঁজলি-পাঁচড়ায় আক্রান্ত উটকে আনা হয় এবং সেটা সেখানে প্রবেশ করে, তারপর সেটা সব উটকে খুঁজলি-পাঁচড়ায় আক্রান্ত করে?” তার উত্তরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন–“তাহলে প্রথমটাকে কে সংক্রমণ করলো?”

(সহীহু মুসলিম, হাদীস নং ২২২০)

অর্থাৎ সেই অবস্থায় প্রথম উটটিকে যেমন আল্লাহ তা‘আলা কোনকিছুর সংক্রমণ ব্যতিরেকে নতুনভাবে রোগাক্রান্ত করেছেন, ঠিক তেমনি পরেরগুলোও আল্লাহ তা‘আলারই হুকুমে রোগাক্রান্ত হয়েছে। তা কারো সংক্রমণের কারণে হয়নি।

সুতরাং বুঝা গেলো–কোন রোগের স্বয়ংক্রিয় সংক্রমণ দ্বারা কারো সেই রোগ হতে পারে না। যদি সে রকম কিছু দেখা যায়, তা আসলে মহান আল্লাহর হুকুমে সেই রোগ তার মধ্যে নতুনভাবে তৈরি হয়েছে–যেমনভাবে মহান আল্লাহর হুকুমে সেই রোগ নতুনভাবে প্রথমজনের মধ্যে তৈরি হয়েছে। এ বিষয়টিকে প্রত্যেক মুমিনের এরূপেই বিশ্বাস করতে হবে।

কিন্তু সেই প্রকৃত বাস্তবতাকে সম্যকরূপে উপলব্ধি না করে শুধু বাহ্যিক অবস্থা দেখে কেউ হয়তো মনে করতে পারে যে, সেই রোগীর সংস্পর্শের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার মধ্যে সেই রোগ সংক্রামিত হয়েছে এবং এভাবে সে তার ঈমানকে ক্ষতিগ্রস্ত করে ফেলতে পারে। এ জন্য এ ধরনের পরীক্ষায় অবতীর্ণ
হওয়া থেকে নিজেকে দূরে রাখার জন্য হাদীস শরীফে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ সম্পর্কে হাদীস শরীফে রয়েছে–
عَنْ أَبِى هُرَيْرَةَ رضي الله عنه أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ‏:‏ لاَ يُورِدُ مُمْرِضٌ عَلَى مُصِحٍّ‏.‏
হযরত আবূ হুরাইরা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন–“রোগগ্রস্ত উট যেন সুস্থ উটের উপরে উপনীত না হয়।”

(সহীহু মুসলিম, হাদীস নং ৫৯০৫)

এ হাদীসে ঈমানের সুরক্ষার জন্য সেরূপ পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে নিষেধ করা হয়েছে যে, কেউ তার সুস্থ জন্তুকে কোন রোগাক্রান্ত জন্তুর সাথে রাখবে। কেননা, এতে সেই সুস্থ জন্তু রোগাক্রান্ত হলে হয়তো তার মনে কোনভাবে এ ধারণার উদ্রেক হতে পারে যে, তার সুস্থ জন্তুকে সেই রোগাক্রান্ত জন্তুর সাথে রাখার কারণেই সেই রোগ স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার মধ্যে সংক্রামিত হয়েছে। অথচ এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল ও ঈমানের পরিপন্থী। বরং আল্লাহ তা‘আলার হুকুমেই সেই রোগ সুস্থ জন্তুর মধ্যে পয়দা হয়েছে, তা সেই রোগের নিজস্ব সংক্রমণের দ্বারা হয়নি।

এ হাদীস দ্বারা বুঝা গেলো–ঈমানের সুরক্ষার জন্য এ ব্যবস্থা অবলম্বন করা বিধেয় যে, সুস্থ ব্যক্তি একান্ত প্রয়োজন না হলে দুরারোগ্যে রোগাক্রান্ত ব্যক্তির নিকটে যাবে না। যাতে তার নিকট যাওয়ার দ্বারা সেই রোগ মহান আল্লাহর হুকুমে তার মধ্যে পয়দা হলে তাতে যেন সে বিভ্রান্তিতে পড়ে সেই রোগকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংক্রামক মনে করে ঈমানকে নষ্ট করার প্রয়াস না পায়।

এ ভিত্তিতেই একটি হাদীসে সেরূপ রোগাক্রান্ত ব্যক্তিকে মানুষের জমায়েত থেকে ফিরে তার আবাসে চলে যাওয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। উক্ত হাদীসের বিবরণ হলো–
عَنْ عَمْرِو بْنِ الشَّرِيدِ عَنْ أَبِيهِ قَالَ كَانَ فِي وَفْدِ ثَقِيفٍ رَجُلٌ مَجْذُومٌ فَأَرْسَلَ إِلَيْهِ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِنَّا قَدْ بَايَعْنَاكَ فَارْجِعْ
হযরত আমর ইবনে শারীদ স্বীয় পিতা শারীদ (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি বলেছেন, বনী সাক্বীফের প্রতিনিধি দলে একজন ব্যক্তি কুষ্ঠরোগী ছিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার নিকট সংবাদ পাঠিয়ে বললেন–“নিশ্চয়ই আমরা তোমাকে বাই‘আত করে নিয়েছি। সুতরাং তুমি ফিরে যাও।”

(সহীহু মুসলিম, হাদীস নং ২২৩১)

কিন্তু প্রয়োজন হলে কোন সুস্থ ব্যক্তির সেরূপ রোগীর নিকট যেতে কোন অসুবিধা নেই। কেননা, আল্লাহর হুকুম ছাড়া কোন রোগই কারো মধ্যে সংক্রমণ করতে পারে না–এ বিশ্বাস রাখা প্রত্যেক মুমিনের জন্য জরুরী। অধিকন্তু সেই রোগীর শুশ্রূষার জন্য অন্য কেউ না থাকলে তার জন্য তার নিকট যাওয়া এবং তার শুশ্রূষা করা আবশ্যক। তবে সেক্ষেত্রে ঈমানের সুরক্ষার জন্য তখন সে ইচ্ছা করলে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে, যেমন, মুখে মাস্ক লাগিয়ে এবং শরীরে জীবানুরোধক পোশাক পরে তার কাছে যেতে পারে। এতে আল্লাহর ‍হুকুমে সে সেই রোগে আক্রান্ত হলে, তখন সেই রোগীর সংস্পর্শের কারণে সেই রোগের সংক্রমণের শিকার হয়েছে বলে কুফরী ভাবনার পরীক্ষার মধ্যে সে পড়বে না।

আবার কেউ যদি প্রবল ঈমানের অধিকারী হয় এবং রোগীর সংস্পর্শে গিয়ে সেই রোগে আক্রান্ত হলেও ছোঁয়াচের বা সংক্রমণের কুফরী বিশ্বাসে তার আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা না থাকে, তখন কোনরূপ প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ না করেও সেরূপ রোগীর সংস্পর্শে যেতে পারে। এ হিসেবেই হাদীস শরীফে রয়েছে–
عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَخَذَ بِيَدِ مَجْذُومٍ فَأَدْخَلَهُ مَعَهُ فِي الْقَصْعَةِ ثُمَّ قَالَ كُلْ بِسْمِ اللَّهِ ثِقَةً بِاللَّهِ وَتَوَكُّلًا عَلَيْهِ
হযরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) হতে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন কুষ্ঠরোগীর হাত ধরলেন, অতঃপর তার হাতকে তার সাথে (খাবার খাওয়ানোর জন্য) স্বীয় বরতনে প্রবিষ্ট করলেন। তারপর বললেন–“আল্লাহর নামে খাও। আল্লাহর উপরে অবিচল নির্ভরতা এবং তাঁর উপরে অনড় ভরসা।”

(জামি‘উত তিরমিযী, হাদীস নং ১৮১৭/ সুনানে আবূ দাউদ, হাদীস নং ৩৯২৫)

তেমনিভাবে অপর হাদীসে এ ধরনের কুষ্ঠরোগীর নির্দ্বিধায় সুস্থ মানুষের সাথে ঘরে খাওয়া-থাকার বর্ণনা রয়েছে। সেই হাদীসটি হলো–
عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ كَانَ لَنَا مَوْلَى مَجْذُومٌ فَكَانَ يَأْكُلُ فِي صِحَافِي وَيَشْرَبُ فِي أَقْدَاحِي وَيَنَامُ عَلَى فِرَاشِي
হযরত আয়িশা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন–“আমাদের একজন আযাদকৃত গোলাম ছিলো যে কুষ্ঠরোগী ছিলো। সে আমার বরতনে খাবার খেতো, আমার গ্লাসে পানি পান করতো এবং আমার বিছানায় ঘুমাতো।”

(দ্রষ্টব্য : তুহফাতুল আহওয়াযী শারহু জামি‘ তিরমিযী, ৫ম খণ্ড, ৪৩৮ পৃষ্ঠা)

অধিকন্তু মজবুত ঈমানের অধিকারী মুসলিমদের এভাবে সে ধরনের রোগীর সংস্পর্শে গিয়ে মহান আল্লাহর প্রতি বিনয়াবনত হওয়ার জন্য বলা হয়েছে। এ সম্পর্কে হাদীস শরীফে রয়েছে–
عَنْ أَبِي ذَرٍّ قَالَ كُلْ مَعَ صَاحِبِ الْبَلَاءِ تَوَاضُعًا لِرَبِّك وَإِيمَانًا
হযরত আবু যর (রা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন–রোগ-বালাইগ্রস্ত ব্যক্তির সাথে খাও তোমার প্রতিপালকের প্রতি বিনয়াবনত হয়ে এবং তাঁর প্রতি অকুণ্ঠ ঈমান রূপে।”

(আল-জামি‘উস সগীর, হাদীস নং ৬৩৮৯)

বস্তুত এ নির্দেশনা তাদের জন্য যারা মজবুত ঈমানের অধিকারী–যাদের ঈমান ও ইয়াকীনে কোন অবস্থাতেই চিড় ধরতে পারে না এবং সর্বাবস্থায় মহান আল্লাহর হুকুমের প্রতি অবিচল আস্থা রাখতে পারে। এ মর্মে উক্ত হাদীসের ব্যাখ্যায় ফাইজুল কাদীর কিতাবে বলা হয়েছে–
فَإِنَّهُ لَا يُصِيبُكَ مِنْهُ شَيْءٌ إِلَّا بِتَقْدِيرِ اللَّهِ تَعَالَى، وَهَذَا خِطَابٌ لِمَنْ قَوِيَ يَقِينُهُ، أَمَّا مَنْ لَمْ يَصِلْ إِلَى هَذِهِ الدَّرَجَةِ فَمَأْمُورٌ بِعَدَمِ أَكْلِهِ مَعَهُ كَمَا يُفِيدُهُ خَبَرُ: (فِرِّ مِنَ الْمَجْذُومِ)
“উক্ত হাদীসে তোমাকে কুষ্ঠরোগী বা সে ধরনের রোগ-বালাইয়ে আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে মহান আল্লাহর প্রতি অকুণ্ঠ বিনয় ও ঈমান পোষণ করে খাবার খাওয়ার জন্য বলা হয়েছে এ কারণে যে, সেই রোগীর থেকে কোনকিছু তোমার নিকট মহান আল্লাহর ফয়সালা ব্যতিরেকে পৌঁছবে না। আর এ সম্বোধন ঐ ব্যক্তির জন্য যার ঈমান ও ইয়াকীন মজবুত। কিন্তু যে ব্যক্তি সেই পর্যায়ে পৌঁছতে পারে নি, তার জন্য হুকুম হলো–সে সেরূপ রোগীর সাথে খাবে না। যেমন সে ব্যাপারে অপর হাদীসে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে যে, তুমি কুষ্ঠরোগী থেকে পলায়ন করো।”

(দ্রষ্টব্য : ফাইজুল ক্বাদীর শরহু জামিউস সগীর, ৫ম খণ্ড, ৪৩ পৃষ্ঠা)

বলা বাহুল্য, আল্লাহ তা‘আলা অনেক সময় বান্দাদেরকে পরীক্ষা করার জন্য কোন রোগীর নিকটে যাওয়াকে তাদের মধ্যে সেই রোগ পয়দা হওয়ার ইল্লত বা কারণ বানাতে পারেন। যেমন, পানির সংস্পর্শে যাওয়াকে তাদের ঠাণ্ডা লাগার কারণ বানাতে পারেন। বিষয়টিকে এভাবে ব্যাখ্যা করে উপরিউক্ত হাদীসের বর্ণনায় “আস-সুনানুল কাবীর” কিতাবে আল্লামা আবু বকর বাইহাকী (রহ.) সেই হাদীসের অধ্যায়ের শিরোনামে বলেন–
باب‏:‏ لاَ يُورِدُ مُمْرِضٌ عَلَى مُصِحٍّ فَقَدْ يَجْعَلُ اللَّهُ تَعَالَى بِمَشِيئَتِهِ مُخَالَطَتَهُ إِيَّاهُ سَبَبًا لِمَرَضِهِ
“এ সম্পর্কিত অধ্যায় যে, রোগাক্রান্ত উট সুস্থ উটের উপর উপনীত হবে না; যেহেতু কখনো আল্লাহ তা‘আলা স্বীয় ইচ্ছায় অসুস্থের সাথে সুস্থের মেলামেশাকে তার সেই রোগে আক্রান্ত হওয়ার কারণ বানিয়ে থাকেন।”

(দ্রষ্টব্য : আস-সুনানুল কাবীর, ১৬৩ পৃষ্ঠা)

কিন্তু সেই অবস্থায় সেই ব্যক্তির সেই রোগে আক্রান্ত হওয়া এ কারণে নয় যে, সেই রোগটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংক্রামক বা ছোঁয়াচে। বরং সেই রোগে তার আক্রান্ত হওয়ার কারণ হলো–আল্লাহ তা‘আলা তাকে পরীক্ষা করার জন্য এ ফায়সালা করেছেন যে, উক্ত রোগীর সংস্পর্শে এসে সেও সেই রোগে আক্রান্ত হবে। এমতাবস্থায় পরীক্ষার বিষয় হলো এটা যে, সেই বান্দা কি সেই রোগে আক্রান্ত হয়ে সেই রোগকে স্বয়ংক্রিয় সংক্রামক মনে করে তার ঈমানকে নষ্ট করে, নাকি সেই রোগীর সংস্পর্শে সেই রোগ হলেও তা মহান আল্লাহর হুকুমেই হয়েছে এবং আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে ফয়সালা হিসেবে হয়েছে বলে বিশ্বাস করে সে স্বীয় ঈমানকে হিফাজত করে।

বলা বাহুল্য, এরূপ ক্ষেত্রে বান্দার এটাই কর্তব্য যে, সেই রোগীর সংস্পর্শে এসে তার রোগ হওয়ার কারণে সে সেই রোগকে স্বয়ংক্রিয় সংক্রামক বলে বিশ্বাস করবে না। বরং সেই অবস্থায়ও তা মহান আল্লাহর হুকুমেই হয়েছে বলে বিশ্বাস করবে এবং নিজের ঈমানকে অটল রাখবে।

এ জন্যই হাদীস শরীফে মহামারি কবলিত স্থানে কেউ থাকলে তাকে সেখান থেকে বের হয়ে আসতে নিষেধ করা হয়েছে এবং বাহিরের কাউকে মহামারি কবলিত স্থানে যেতে নিষেধ করা হয়েছে। এ সম্পর্কে হাদীস শরীফে রয়েছে–
عَنْ أُسَامَةَ بْنِ زَيْدٍ عنِ النَّبِيِّ ﷺ قَالَ: إذَا سمِعْتُمْ الطَّاعُونَ بِأَرْضٍ، فَلاَ تَدْخُلُوهَا، وَإذَا وقَعَ بِأَرْضٍ، وَأَنْتُمْ فِيهَا، فَلاَ تَخْرُجُوا مِنْهَا
হযরত ‍উসামা ইবনে যাইদ (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন–“যখন তোমরা শুনবে যে, কোন স্থানে প্লেগ-রোগ হয়েছে, তাহলে সেখানে প্রবেশ করো না। আর যখন কোন স্থানে সেই রোগের প্রাদুর্ভাব হয় এবং তোমরা সেখানে থাকো, তাহলে সেখান হতে বের হয়ে যেয়ো না।”

(সহীহুল বুখারী, হাদীস নং ৫৭২৮/ সহীহু মুসলিম, হাদীস নং ৫৯০৫)

এ হাদীসে মহামারি কবলিত স্থানে কেউ থাকলে তাকে সেখান থেকে বের হয়ে আসতে নিষেধ করা হয়েছে এ ঈমানী বিশ্বাসের ভিত্তিতেই যে, ছোঁয়াচে রোগ বলতে কিছু নেই। অধিকন্তু সেই নিষেধাজ্ঞার উদ্দেশ্য হলো, এমতাবস্থায় যাতে সেখান থেকে চলে আসার দ্বারা তার মনে এ বিশ্বাস স্থান না পায় যে, সে সেখানে থাকলে সেই রোগে আক্রান্ত হবে।

অপরদিকে উক্ত হাদীসে মহামারি কবলিত স্থানে কাউকে যেতে নিষেধ করা হয়েছে এ জন্য যে, যাতে সেখানে গিয়ে আল্লাহর হুকুমে সেই রোগে আক্রান্ত হলে, সে তার সেই ঈমানী পরীক্ষায় ফেল না করে এবং তার ঈমানকে নষ্ট না করে ফেলে এ কথা ভেবে যে, সেখানে যাওয়ার কারণেই তার এ রোগ হয়েছে। কেননা, ছোঁয়াচে রোগ বলতে কিছু নেই। বরং সবার সব রোগই মহান আল্লাহর হুকুমে নতুনভাবে হয়।

মোট কথা, মহান আল্লাহর হুকুম ছাড়া কারো সেই রোগ হতে পারে না। সেই ভিত্তিতে প্রথম জনের যেভাবে মহান আল্লাহর হুকুমে সেই রোগ হয়েছে, তেমনি অন্যজনেরও আল্লাহর হুকুম হলে নতুনভাবে সেই রোগ হবে। আর আল্লাহর হুকুম না হলে কিছুতেই তার সেই রোগ হবে না। এ বিশ্বাসই সকল মুমিনের অন্তরে পোষণ করতে হবে।

সাম্প্রতিক বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের প্রেক্ষাপটে এভাবে সর্বাবস্থায় ঈমান রক্ষা করে বেশী বেশী ইস্তিগফার করা আমাদের কর্তব্য। আর মহান আল্লাহর নিকট দু‘আ-প্রার্থনা ও ইবাদত-জিকিরে মশগুল থাকা উচিত।

4 thoughts on “ছোঁয়াচে রোগ সংক্রান্ত আকিদা : করোনা ভাইরাস যেন আমাদের ঈমানকে নষ্ট না করে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *