শার্ট-প্যান্ট, টাই ইত্যাদি পরা নিষেধ কেন

শার্ট-প্যান্ট, টাই ইত্যাদি পরা নিষেধ কেন

মুফতী আবুল হাসান শামসাবাদী

মুসলমানদের বেশভূষায় স্বাতন্ত্র্য শরীয়তে কাম্য এবং অমুসলিমদের ও ফাসিক-ফাজির দ্বীনবিমুখদের বেশভূষা গ্রহণে ইসলামে নিষেধাজ্ঞা এসেছে। এ সম্পর্কে মূলনীতি বর্ণনা করে হাদীসে বলা হয়েছে–
عَنْ ابْنِ عُمَرَ رضي الله عنهما قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন–“যে ব্যক্তি যে সম্প্রদায়ের সাথে সামঞ্জস্যতা রাখবে, সে তাদের অন্তর্ভুক্ত হবে।”
(সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ৪০৩১ [সহীহ হাদীস])
এ হাদীসের ব্যাখ্যায় শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন–
وَهَذَا الْحَدِيثُ أَقَلُّ أَحْوَالِهِ أَنْ يَقْتَضِيَ تَحْرِيمَ التَّشَبُّهِ بِهِمْ
“এ হাদীসে যা বুঝানো হয়েছে, তাতে কমপক্ষে এতটুকু বুঝা যায় যে, এ হাদীস বিধর্মী অথবা দ্বীনবিমুখদের সাথে বেশভূষায় সামঞ্জস্যতাকে হারাম গণ্য করছে।”
(‘আওনুল মা‘বূদ শরহে আবু দাউদ, ১৪তম খণ্ড, ৬০ ‍পৃষ্ঠা)
সেই সামঞ্জস্যতার ধরন সম্পর্কে ব্যাখ্যা করে শাইখ মোল্লা আলী ক্বারী (রহ.) স্বীয় মিরকাতুল মাফাতীহ শরহে মিশকাতুল মাসাবীহ কিতাবে বলেন–
أَيْ مَنْ شَبَّهَ نَفْسَهُ بِالْكُفَّارِ مَثَلًا مِنَ اللِّبَاسِ وَغَيْرِهِ ، أَوْ بِالْفُسَّاقِ أَوِ الْفُجَّارِ أَوْ بِأَهْلِ التَّصَوُّفِ وَالصُّلَحَاءِ الْأَبْرَارِ ( فَهُوَ مِنْهُمْ ) : أَيْ فِي الْإِثْمِ وَالْخَيْرِ
“এ হাদীসে বর্ণিত সামঞ্জস্যতার অর্থ হলো, যে ব্যক্তি নিজেকে কাফের-বেদ্বীনদের মত বানাবে যেমন, তারা যে লেবাস-পোশাক ইত্যাদি পরে থাকে তা পরিধান করবে অথবা ফাসিক-কুকর্মীদের সাথে বা বদকারদের সাথে সামঞ্জস্যতা গ্রহণ করবে, সে পাপের পথে তাদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য হবে। আর যে সুফী-বুযুর্গানে দ্বীন ও নেককার-পরহেজগারদের মতো বেশ-ভূষা গ্রহণ করবে, সে নেকের পথে তাদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত গণ্য হবে।”
(মিরকাতুল মাফাতীহ শরহে মিশকাতুল মাসাবীহ, ৭ম খণ্ড, ২৭৮২ পৃষ্ঠা)
আল্লামা কুরতুবী (রহ.) এ ব্যাপারে মুসলিম সমাজের অবস্থার হুকুম বর্ণনা করে বলেন–
لَوْ خُصَّ أَهْلُ الْفُسُوقِ وَالْمُجُونِ بِلِبَاسٍ مُنِعَ لُبْسُهُ لِغَيْرِهِمْ؛
“যদি কুকর্মকারী ও দ্বীনবিমুখদের কোন পোশাকের সাথে বিশেষভাবে সংশ্লিষ্টতা হয়, তাহলে অন্যদের জন্য সেই পোশাক পরিধান করা নিষিদ্ধ হবে।”
(আল-মাওসূ‘আতুল ফিক্বহিয়্যাহ, ১২তম খণ্ড, ১১ পৃষ্ঠা)
অবশ্য উক্ত সামঞ্জস্যতার বিষয়টি শুধু পোশাকের সাথেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং এর আওতা সুবিস্তৃত। এ প্রসঙ্গে বিশ্লেষণ করে আল্লামা যাইনুদ্দীন মুহাম্মদ আল-মুনাভী (রহ.) ফাতহুল কাদীর শরহে জামি‘উস সগীর গ্রন্থে হাদীসটির ব্যাখ্যায় বলেন–
أَيْ تَزَيَّا فِي ظَاهِرِهِ بِزِيِّهِمْ، وَفِي تَعَرُّفِهِ بِفِعْلِهِمْ، وَفِي تَخَلُّقِهِ بِخُلُقِهِمْ، وَسَارَ بِسِيرَتِهِمْ وَهَدْيِهِمْ فِي مَلْبَسِهِمْ وَبَعْضِ أَفْعَالِهِمْ
অর্থাৎ যে ব্যক্তি বাহ্যিক শরীরে বেদ্বীন-ধর্মবিমুখদের বেশভূষা গ্রহণ করবে, তাদের কাজের মাধ্যমে নিজের পরিচয় দিবে, তাদের স্বভাব-চরিত্রের দ্বারা নিজেকে গঠন করবে এবং তাদের চালচলন ও লেবাস-পোশাক এবং তাদের কোন কিছু কাজ অবলম্বন করবে, সে তাদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য হবে।”
(ফাতহুল কাদীর শরহে জামি‘উস সগীর, ৬ষ্ঠ খণ্ড, ১০৪ পৃষ্ঠা)
তবে সেই সামঞ্জস্যতার প্রশ্নে পোশাক-পরিচ্ছদের বিষয়টি উক্ত হাদীসের সাথে উল্লেখযোগ্যভাবে সংশ্লিষ্ট। এ জন্যই এ হাদীসটিকে ইমাম আবু দাউদ (রহ.) স্বীয় সুনানে আবু দাউদ হাদীসগ্রন্থে কিতাবুল লিবাস–পোশাক-পরিচ্ছদের অধ্যায়ে বর্ণনা করেছেন।
এ হাদীসের বর্ণনার আলোকে মুসলমানদের জন্য শার্ট-প্যান্ট, টাই ইত্যাদি পোশাক যা সাধারণত ওলী-বুযুর্গগণ পরেন না, বরং পূর্ণ দ্বীনদারী ও পরহেগারী যাদের ভিতরে নেই তারাই পরিধান করে থাকেন, তা পরার নিষেধাজ্ঞা প্রমাণিত হয় এবং পুরুষদের জন্য পাঞ্জাবী,জুব্বা, টুপি ইত্যাদি পোশাক যা দ্বীনদার-বুযুর্গগণ পরে থাকেন তা পরার আবশ্যকতা বুঝা যায়। এ জন্যই হযরত হাকীমুল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.)-এর বিশিষ্ট খলীফা হযরত মাওলানা হাকিম আবরারুল হক (রহ.) ‘এক মিনিট কা মাদরাসা’ বইয়ে শার্ট-প্যান্ট ইত্যাদি পরাকে কবীরা গুনাহ বলে উল্লেখ করেছেন। তেমনি জুমহুর উলামা-মাশায়িখ ও মুফতিয়ানে কিরাম শার্ট-প্যান্ট, টাই ইত্যাদি পরাকে নাজায়িয ও মাকরূহে তাহরীমী বলেন।