মোবাইল ফোন সম্পর্কিত জরুরী মাসআলা – ৩

পূর্ব প্রকাশিতের পর

মাওলানা মুহাম্মাদ ইয়াহইয়া


২১. পিকচার ম্যাসেজ

প্রশ্ন :

পিকচার ম্যাসেজের মাধ্যমে যেমনিভাবে বিভিন্ন চিত্র, ফুল ইত্যাদি কাঙ্ক্ষিত নাম্বারে পাঠানো যায়। তদ্রূপ মোবাইলে ধারণকৃত মানুষ বা প্রাণীয় ছবিও পাঠানো যায়। ছবির এই ব্যবহার জায়েয কি না?

উত্তর :

এসএমএস মাধ্যমে প্রাণীর ছবি ছাড়া অন্য কিছু পাঠাতে কোন অসুবিধা নেই। কিন্তু মানুষ বা কোন প্রাণীর ছবি পাঠানো জায়েয হবে না। কেননা এক্ষেত্রে প্রয়োজন ছাড়া ছবির ব্যবহার হচ্ছে। আর ছবিটি যদি কোন গায়রে মাহরাম মহিলার হয় তবে তো পর্দার হুকুম লঙ্ঘন করার গুনাহ হবে। এ ধরনের ছবি যার কাছে পাঠানো হচ্ছে সেও দেখে, আশপাশের অন্য পুরুষরাও দেখে। এতে ব্যাপকভাবে পর্দা লঙ্ঘনের গুনাহ হয়। তাই এ থেকে বিরত থাকা জরুরি। তবে জরুরতের সময় জায়েয। যেমন শরীয়তসম্মত বিশেষ প্রয়োজনে কারো ফটোর জরুরত হলে মোবাইলের মাধ্যমে অন্যত্র ছবি পাঠানো যাবে। প্রাপক মোবাইলের এই ছবি প্রিন্ট করে নিজ কাজে লাগাতে পারবে। তবে এক্ষেত্রেও এর ব্যবহার জরুরত পর্যন্তই সীমাবদ্ধ হওয়া কর্তব্য। -সহীহ মুসলিম ২/২০০; আলমাদখাল ১/২৭৩

২২. মিস্ডকল

প্রশ্ন :

মোবাইল ব্যবহারকারীর অনেকেই প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে মিস্ডকল দেয়। এতে অনেক ক্ষেত্রে যাকে মিস্ডকল দেওয়া হচ্ছে সে বিরক্ত হয়। এছাড়া এতে অনর্থক নেটওয়ার্ক ব্যস্ত রাখা হয়। গ্রামীণ ফোন কোম্পানি মিস্ডকলকে নিরুৎসাহিত করার জন্য একবার মিস্ডকলকে বিনষ্টকারী পোকার সাথে তুলনা করে একটি বিজ্ঞাপনচিত্র দিয়েছিল। মোটকথা প্রয়োজনে ও অপ্রয়োজনে মিস্ডকল দেওয়া জায়েয কি না?

উত্তর :

বিনা প্রয়োজনে মিস্ডকল দিলে অনর্থক নেটওয়ার্ক ব্যস্ত রাখা হয়। ফলে প্রয়োজনীয় কথার জন্য অনেকের সংযোগ পেতে কষ্ট হয়। বিনা প্রয়োজনে মিস্ডকল দিয়ে নেটওয়ার্ক ব্যস্ত রাখার কোন বৈধতা নেই। এতে মোবাইল কোম্পানীরও কোন উপকার নেই বরং এতে তাদের ক্ষতি হয়। এছাড়া বিনা প্রয়োজনে এ মিস্ডকল দেওয়ার দ্বারা যাকে মিস্ডকল দেওয়া হচ্ছে তাকে বিরক্ত করা হয়। তার একাগ্রতা বা কাজে ব্যাঘাত ঘটে। এসবই মিস্ডকলের ক্ষতি। এসব কারণে বিনা প্রয়োজনে মিস্ডকল দেওয়া গুনাহ।

তবে প্রয়োজনে মিস্ডকলের ব্যবহার বৈধ। যেমন কারো সাথে পূর্বেই কথা থাকল যে, তুমি প্রস্তুত হলে কিংবা অমুক স্থানে পৌঁছলে কিংবা অমুক জিনিস পেলে অথবা অমুক ব্যক্তি আসলে আমাকে মিস্ডকল দিবে। এসব ক্ষেত্রে মিস্ডকল দেয়ার দ্বারা কিছুটা উপকার পাওয়া যায়। তদ্রূপ আত্মীয়-স্বজন কিংবা কম আয়ের লোকদের সহযোগিতা কামনার্থে অনেকেই বলে থাকে, তুমি আমাকে শুধু মিস্ডকল দিলেই আমি ব্যাক করব। তোমার কল করার প্রয়োজন নেই।’ তুমি কল করে টাকা খরচ কর না ইত্যাদি। এসবই মিস্ডকলের বৈধ ক্ষেত্র। এককথায় যে ক্ষেত্রে প্রয়োজনে মিস্ডকল করা হয় আর এর কারণে যাকে মিস্ডকল করা হচ্ছে তার অসন্তুষ্টি বা কষ্টের কারণ না হয় সেক্ষেত্রে এতে কোন অসুবিধা নেই।

২৩. মোবাইলে কে আগে সালাম দেবে

প্রশ্ন :

মোবাইলে কোন পক্ষ আগে সালাম দিবে এ নিয়ে দুধরনের মতামত শোনা যায়। কেউ বলেন, যে ব্যক্তি রিং করবে সে আগে সালাম দিবে। আবার কেউ বলেন, যে রিসিভ করবে সে সালাম দিবে। জানতে চাই শরীয়তের দলীলের আলোকে কোনটি সঠিক? মহিলার সাথে কথা বললে সালাম দেওয়া যাবে কি না? কোন বড় ও শ্রদ্ধেয় ব্যক্তির সাথে কথা বলার সময় যে ছোট সেই কি শুধু সালাম বলবে?

উত্তর :

‘আসসালামু কবলাল কালাম’এর ভিত্তিতে যে ব্যক্তি আগে কথা বলবে সেই সালাম দিবে। সাধারণত যে রিসিভ করে সেই যেহেতু আগে কথা বলে থাকে তাই সে কথা শুরু করার আগে সালাম দিবে। কারণ রিসিভ করার পর কথা না বললে অনেক সময় রিসিভ হয়েছে কি না তা বুঝা যায় না। তাই রিসিভকারী সাধারণত আগে কথা বলে থাকে।

অবশ্য কখনো রিসিভকারী যদি রিসিভ করে কথা না বলে বা কোন কারণে কলকারী কথা শুনতে না পায় অথবা বুঝতে না পারে তখন কলকারী আগে কথা বলে থাকে। এক্ষেত্রে যেহেতু কলকারী আগে কথা বলছে তাই কথা শুরুর আগে সে সালাম দিবে, এমনকি হ্যালো বলার আগে সালাম বলবে।

২৪. গায়রে মাহরাম মহিলার সাথে মোবাইলে সালাম আদান-প্রদান

গায়রে মাহরাম মহিলার সাথে প্রয়োজনে পর্দায় থেকে কথা বলা জায়েয। (যদি ফেতনার আশংকা না থাকে।) তাই মোবাইলে মহিলার সাথে কথা বলতে হলেও সালাম দিয়েই কথা শুরু করবে।

যে আগে কথা বলবে সে সালাম দিবে। মহিলা আগে কথা বললে সে আগে সালাম দিবে। আর পুরুষ আগে কথা বললে সে সালাম দিবে।

যার নাম্বারে কল করা হচ্ছে তিনি যদি বড় ও সম্মানী ব্যক্তি হন তখন তিনি সালাম দিলে এ সালামের উত্তর দেওয়া হয় না। বরং কলকারী উল্টো তাকে সালাম দেয়। এটা ভুল নিয়ম। তাই বড় ও সম্মানী ব্যক্তি রিসিভ করে সালাম দিলে অপর প্রান্ত থেকে এর শুধু উত্তরই দিবে। পাল্টা সালাম দিবে না। -সুনানে তিরমিযী ২-৯৯

২৫. আগে হ্যালো না আগে সালাম

প্রশ্ন :

ফোনে অনেকে আগে হ্যালো বলে এরপর সালাম বলে। এটি কি ঠিক নিয়ম?

উত্তর :

এ নিয়ম সুন্নত পরিপন্থী। কারণ, সুন্নাত নিয়ম হল,…….সবধরনের কথার আগে সালামের ব্যবহার হবে। এমনকি হ্যালো বলার আগেও। তাই হ্যালো বলে সালাম বলা ঠিক নয়। বরং আগে সালাম বলবে। এটিই সুন্নত। -জামে তিরমিযী ২/৯৯, রদ্দুল মুহতার ৫/৮৬, ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/৩২৫

২৬. উভয় পক্ষের সালাম মুখোমুখি হলে

প্রশ্ন :

অনেক সময় দেখা যায় উভয় পক্ষ থেকেই সালাম দেয়া হয়। এক্ষেত্রে কি করণীয়?

উত্তর :

যদি রিসিভকারী এবং কলকারী উভয়ে একই সাথে সালাম বলে তবে প্রত্যেককেই উত্তর দিতে হবে। কিন্তু কেউ যদি আগে সালাম দিয়ে দেয় তাহলে অপর পক্ষের জন্য উত্তর দেওয়া নির্ধারিত। সে ভুলে বা ইচ্ছাকৃত পাল্টা সালাম দিলে দ্বিতীয় ব্যক্তির সালাম উত্তর হিসাবে ধর্তব্য হবে।

-ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/৩২৫, রদ্দুল মুহতার ৬/৪৯৬, শরহুল মুহাযযাব ৪/৪৬৩

২৭. মসজিদে মোবাইলের ব্যবহার

প্রশ্ন :

মসজিদের ভিতরে থেকে মোবাইলে কথাবার্তা বলা যাবে কি না? কী ধরনের কথাবার্তা বলা যাবে?

উত্তর :

মসজিদ আল্লাহ তাআলার ঘর। এখানে অন্য ইবাদতকারীর ক্ষতি করে বৈধ কথাবার্তাও নাজায়েয। অবশ্য ইবাদতের উদ্দেশ্যে এসে অন্য ইবাদতকারীর ক্ষতি না হয় এভাবে বৈধ কথাবার্তা বলার অবকাশ আছে। তবে মসজিদে অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা না বলাই উচিত। আর মসজিদে প্রবেশের আগেই রিংটোন বন্ধ করে দেয়াই আদব। বিশেষ করে কেউ ইবাদতে মগ্ন থাকলে বা জামাতের সময় হলে এ বিষয়ে যত্নবান হওয়া খুবই জরুরী।

-আল মাসনূ ফী মাআরিফাতিল হাদীসিল মাওজু’ ৯২, আলমুহাল্লা-৩/১৬০, শরহুল মুনইয়াহ ৬১০, ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/৩২১,ফাতহুল বারী ১/৬৫৩, এলামুস সাজিদ ০৩২৬

২৮. এতেকাফে মোবাইলের ব্যবহার

প্রশ্ন :

ইতিকাফ অবস্থায় মোবাইল রাখা যাবে কি না? ইতিকাফ অবস্থায় মোবাইলে কথাবার্তা বলার হুকুম কী?

উত্তর :

ইতিকাফকারীর জন্য পূর্ণ সময় বাইরের সকল ঝামেলা থেকে মুক্ত থেকে ইবাদতে নিমগ্ন থাকা এবং আল্লাহমুখী হয়ে থাকাই কাম্য। তাই অধিক প্রয়োজন ছাড়া ইতিকাফ অবস্থায় মোবাইলের ব্যবহার না করাই শ্রেয়। আর অন্য কোন মুসল্লি বা ইবাদতকারীর ক্ষতি না করে মোবাইলে প্রয়োজনীয় কথাবার্তা বলতে পারবে। -আল বাহরুর রায়েক ২/৩০৪, ফাতাওয়া তাতারখানিয়া ২/৪১২

২৯. ভুল নাম্বারে ফ্লেক্সি হলে টাকা কে দিবে?

প্রশ্ন :

ফ্ল্যাক্সিলোডে ভুল হলে কোনো কোনো সময় অন্যের মোবাইলে টাকা চলে যায়। এক্ষেত্রে এর ক্ষতিপূরণ কে দিবে? অনেক দোকানীকে এ টাকা জোরপূর্বক ফ্লেক্সি করতে আসা গ্রাহক থেকে আদায় করতে দেখা যায়। এটা জায়েয কি না?

উত্তর :

যে নাম্বারে ফ্লেক্সি করা হবে সে নাম্বারেই টাকা জমা হবে। ভুল নাম্বারে করা হলে ভুল নাম্বারে যাবে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে টাকা উদ্ধার না করা গেলে দেখতে হবে ভুল কার থেকে হয়েছে। সাধারণত ফ্লেক্সিকারী গ্রাহকের নাম্বার ভিন্ন খাতায় প্রথমে নোট করা হয়। সেটা কখনো দোকানী নিজে লিখে কখনো গ্রাহকের হাতে লেখায়। দোকানী লিখলে গ্রাহকের জন্য ঐ লিখা মিলিয়ে নেওয়া কর্তব্য। এরপর খাতার নোটকৃত নাম্বারে ফ্লেক্সি না করে ভুলে অন্য নাম্বারে করলে এর ক্ষতি দোকানীর নিজেরই। এ বাবদ গ্রাহক থেকে কিছুই নিতে পারবে না। হাঁ, গ্রাহক যদি স্বেচ্ছায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে কিছু দিতে চায় তবে তা নিতে বাধা নেই।

আর খাতায় যা নোট করা হয়েছে দোকানী যদি সে নাম্বারেই ফ্লেক্সি করে থাকে তবে এ ভুলের ক্ষতিপূরণ গ্রাহককে দিতে হবে। অবশ্য দোকানী খাতায় ভুল নাম্বার নোট করেছে এ কথা প্রমাণিত হলে এ ভুলের দায়দায়িত্ব দোকানীর, গ্রাহকের নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: