মাহে রমযান : যাকাত আদায়ের উত্তম সময়

মাওলানা মুহাম্মদ ওলীউর রহমান
———————————-

রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস মাহে রমাযান। তাক্বওয়া বা খোদাভীতি অর্জনের এই মাসে যে কোন আমলের সওয়াব অন্য মাসের তুলনায় বহুগুণে বর্ধিত করে দেয়া হয়। এ মাসে একটি নফল এবাদত করলে একটি ফরজের সমান সওয়াব প্রদান করা হয় এবং একটি ফরজ আদায় করলে সত্তরটি ফরজ আদায় করার সমান সওয়াব প্রদান করা হয়। অর্থাৎ যে কোন আমলের সওয়াব রমজান মাসে বহুগুণে বৃদ্ধি করে দেওয়া হয়। একারণে কেউ যদি এই মাসে ফরজ যাকাত আদায় করে তাহলে অন্য মাসের তুলনায় বহুগুণ বেশি সওয়াব লাভ করবে। এছাড়া যাকাতের হিসাব যেহেতু চন্দ্র বর্ষের সাথেই করতে হয়, কারণ সৌরবর্ষের সাথে যদি যাকাতের হিসাব করা যায় তাহলে বছরের হিসাব থেকে ১১দিন কমে যাবে, যে ১১ দিনের যাকাত দেওয়া হবে না। কারণ চন্দ্র বর্ষ হলো ৩৫৪ দিনে আর সৌর বর্ষ হলো ৩৬৫ দিনে। সুতরাং যাদের উপর যাকাত ফরজ তাদের জন্য রমযান মাস একটি উত্তম সময় যাকাত আদায় করার। তাছাড়া বর্তমান সময় একটি কঠিন সময়, করোনা ভাইরাসের মহামারি চলছে দেশে। তাই অন্য সময়ের তুলনায় এ সময় যাকাত আদায়ের বেশি দাবি রাখে।

যাকাতের প্রয়োজনীয়তা

মহাগ্রন্থ আল-কোরআন হচ্ছে মানব জাতির জন্য পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান, মানব জীবনের সকল প্রকার সমস্যার কাঙ্ক্ষিত সমাধান রয়েছে পবিত্র কোরআনে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ইসলামের যে ব্যবস্থাপনা রয়েছে তা অত্যন্ত উন্নয়নধর্মী, শোষণ ও বৈষম্যমুক্ত। দারিদ্র্য সমস্যার স্থায়ী সমাধান ও অসহায়-বি ত মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বিধান কল্পে ইসলামী শরিয়তে রয়েছ যাকাত, ফিতরা, উশর ও অন্যান্য সাদাকাতের ব্যবস্থা।

এই ব্যবস্থা দরিদ্র মানুষের প্রতি ধনিদের অনুকম্পা বা অনুগ্রহ নয় বরং এসব হচ্ছে বিত্তবানদের সম্পদে বিত্তহীনদের অধিকার। এই ব্যবস্থাপনায় রয়েছে সমাজে পারস্পরিক মমত্ববোধ সৃষ্টি ও ভ্রাতৃত্ব বন্ধন প্রতিষ্ঠার এক উত্তম নমুনা। পবিত্র কোরআনে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে যাকাত প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

কোথাও আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের সাথে সাথেই আবার কোথাও পরকালের সাথে, কখনো স্বতন্ত্রভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। ২৮ স্থানে নামাজের পাশাপাশি যাকাত প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

আল্লাহ পাক বলেন, ‘তোমরা নামাজ কায়েম কর, যাকাত প্রদান কর এবং রুকুকারীদের সাথে রুকু কর।’ (সূরা বাকারা, আয়াত-৪৩) অন্যত্র আল্লাহ পাক বলেন, ‘আর আমার অনুগ্রহ প্রতিটি বস্তুকে ঘিরে রেখেছে, যারা আল্লাহকে ভয় করে, যাকাত প্রদান করে এবং আমার আয়াতসমূহের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে আমি এটাকে তাদের জন্য লিখে রাখব।’ (সূরা আ’রাফ-১৫৬)

আধুনিক বিশ্বে এ যাবত যত অর্থনৈতিক মতবাদ গড়ে উঠেছে কোনটাই বিশ্ববাসীর অর্থনৈতিক নিরাপত্তার দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে নাই। বরং কেউ সম্পদ উপার্জনের ক্ষেত্রে ব্যক্তি মালিকানাকে সম্পূর্ণরূপে খর্ব করে সমাজের মুষ্টিমেয় লোকের হাতে সম্পদ কুক্ষিগত করে রাখার পথ সুগম করে দিয়েছে।

পুঁজিবাদের সুদভিত্তিক অর্থব্যবস্থার কারণে সমাজের ধনীরা আরও ধনী হচ্ছে এবং দরিদ্র শ্রেণির লোকেরা দিন দিন নিমজ্জিত হচ্ছে দারিদ্র্যতার অতল গহ্বরে। একমাত্র ইসলামী অর্থনীতিতেই রয়েছে দারিদ্র্য সমস্যার স্থায়ী সমাধান, অসহায়, বি ত মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তির পথ। ইসলামী অর্থনীতির মেরুদণ্ড হচ্ছে যাকাত। এখানে সুদকে হারাম ঘোষণা করে প্রত্যেক ধনবান ব্যক্তির উপর যাকাত ফরজ করা হয়েছে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে- ‘তাদের (বিত্তবানদের) সম্পদে প্রার্থী ও সর্বহারাদের নির্দিষ্ট অংশ রয়েছে।’ (যারিয়াত-১৯)

যাকাতের সংজ্ঞা

যাকাত ইসলামের প স্তম্ভের মধ্যে একটি। যাকাত আরবী শব্দ। এর মূল ধাতু হচ্ছে যাকয়ুন। এর চারটি অর্থ রয়েছে। যেমন- ১. পবিত্রতা ২.বৃদ্ধি পাওয়া ৩. প্রশংসা ৪. প্রাচুর্যতা। শরিয়তের পরিভাষায় যাকাত বলা হয়- সম্পদশালীদের উপর আল্লাহর নির্ধারিত সেই অংশ যা আদায় করা ওয়াজিব।

যাকাতের মাধ্যমে সম্পদ বৃদ্ধি পায়, পবিত্র হয় এবং অন্য দিকে দারিদ্র্য সমস্যা দূর করে। দ্বিতীয় হিজরীতে যাকাত ফরজ হয় এবং নবম হিজরীতে যাকাত ইসলামী রাষ্ট্রের রাজস্বকর হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।

যে সকল সম্পদের উপর যাকাত ফরয

চার প্রকার সম্পদের উপর যাকাত ফরজ। যেমন- ১. স্বর্ণ-রূপা ও নগদ অর্থ, ২. বাণিজ্যিক পণ্য, ৩. মাঠে বিচরণকারী গবাদি পশু, ৪. জমিতে উৎপাদিত শস্য ও ফলমূল।

কি পরিমাণ সম্পদ এবং কাদের উপর যাকাত ফরজ

প্রত্যেক ধনবান ব্যক্তি বা নেসাব পরিমাণ সম্পদের অধিকারী ব্যক্তির উপর যাকাত ফরজ। সাড়ে সাত তোলা (৮৫ গ্রাম) সোনা বা সাড়ে বায়ান্ন তোলা (৫৯৫ গ্রাম) রূপা অথবা তার সমমূল্যের সম্পদকে নেসাব বলা হয়।

এই পরিমাণ সম্পদ যখন কোন ব্যক্তির জীবন ধারণের অত্যাবশ্যকীয় উপকরণাদির অতিরিক্ত হবে এবং পূর্ণ এক বছর সে ঐ সম্পদের মালিক থাকবে, তখন তার উপর যাকাত ফরজ হবে। স্বর্ণ-রূপা ও নগদ অর্থ ও ব্যবসায় নিয়োজিত পণ্যের বছরান্তে ৪০ ভাগের এক ভাগ বা শতকরা ২.৫% যাকাত বাবত আদায় করতে হবে।

সোনার নেসাব অনুযায়ী সোনার যাকাত এবং রূপার নেসাব অনুযায়ী রূপার যাকাত আদায় করতে হবে। নগদ টাকা এবং ব্যবসায় নিয়োজিত পণ্যের যাকাত রূপার নেসাবের হিসাবে আদায় করতে হবে। অর্থাৎ নগদ টাকা বা ব্যবসায় নিয়োজিত পণ্যের যাকাত আদায় করার সময় সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপার মূল্যকে পরিমাণ ধার্য করতে হবে।

গৃহপালিত পশুর যাকাত

গৃহপালিত পশু ও নির্দিষ্ট সংখ্যায় পৌছলে যাকাত দিতে হয়। চারণভূমিতে বিচরণশীল ৩০টি গরু অথবা মহিষের জন্য ১ বছর বয়সের ১টি গরু অথবা মহিষের বাচ্চা যাকাত দিতে হবে। অনুরূপ ৪০ থেকে ১২০টি ছাগলের জন্য বছরে ১টি ছাগল যাকাত দিতে হবে।

৩০ টির কমে গরু অথবা মহিষে এবং ৪০টির কমে ছাগলে যাকাত নেই। তবে ব্যবসার উদ্দেশ্যে যদি ক্রয় করে রাখা হয় তাহলে ব্যবসায় পণ্য হিসাবে বিবেচিত হয়ে এগুলোর মূল্যের উপর যাকাত আসবে।

উশর তথা উৎপাদিত শস্য ও ফল মূলের যাকাত

উশর তথা ফল ফসলের যাকাত আমাদের দেশে খুব কমই আদায় করা হয় এবং এর আলোচনা ও কম হয়। যার দরুন এ সম্পর্কে অনেকে জানেইনা যে, উৎপাদিত ফসলেরও যাকাত আদায় করতে হয়।

উশর এর অর্থ হলো এক দশমাংশ। জমি থেকে উৎপন্ন সকল প্রকার শস্য, শাকসবজি ও ফলের এক দশমাংশ যাকাত বাবত আদায় করাকে উশর বলে। সকল প্রকার শস্য, শাকসবজি ও ফলের উপর যাকাত প্রযোজ্য। কারো কারো মতে কেবল গোলাজাত শস্য বা ফসল ছাড়া অন্য ফসলের উপর যাকাত নেই। জমির ফসল আহরণের সাথে সাথে উশর পরিশোধ করতে হয়। এক্ষেত্রে বৎসর অতিক্রান্ত হওয়া প্রয়োজন নেই। বৎসরে একাধিকবার ফসল আসলে একাধিক বার উশর আদায় করতে হবে।

শস্য ও ফলমূলের নেসাব

যেসব জমিতে সেচ প্রয়োজন হয় না, অর্থাৎ ফসল উৎপাদনের জন্য পানি সিঞ্চন করতে হয় না বরং প্রাকৃতিকভাবে নদী বা বৃষ্টির পানি দ্বারাই ফসল ফলানো হয়, এরকম জমি থেকে আহরিত ফসলের দশ ভাগের একভাগ আর যে জমিতে সেচের প্রয়োজন হয়, অর্থাৎ পানি সিঞ্চন ন করে ফসল উৎপাদন করতে হয় এ-রকম জমি থেকে উৎপাদিত ফসলের বিশ ভাগের এক ভাগ যাকাত বাবত আদায় করতে হবে।

বিশ ভাগের এক ভাগকে বলা হয় নিসফে উশর। অবশ্য এ থেকে চাষ, কর্তন, মাড়াই ইত্যাদির খরচ বাদ যাবে। ফসলের নেসাবের পরিমাণ হলো ৫ ওয়াসাক। অর্থাৎ কেউ যদি ৫ ওয়াসাক তথা আনুমানিক ২৫ মন শস্য পায় তাহলে সে উশর বা নিসফে উশর আদায় করতে হবে। তবে ইমাম আযম আবু হানিফা (রহ.) এর মতে, ৫ ওয়াসক হওয়া জরুরী নয় বরং ফসল পৌনে দুই সেরের বেশি হলেই উশর আদায় করতে হবে। (দুররুল মুখতার, ২য় খণ্ড)

অত্যাবশ্যকীয় সম্পদ তথা যে সম্পদের উপর যাকাত নেই

অত্যাবশ্যকীয় সম্পদ বা উপকরণ হলো- বসবাস, ব্যবহার ও উৎপাদনের কাজে বা ভাড়ায় নিয়োজিত ঘর, বাড়ি, দোকান কোঠা, স্থায়ী সম্পত্তি, দালান কোঠা, পেশাগত সামগ্রী, কারখানার যন্ত্রপাতি, যোগাযোগের বাহন ইত্যাদির উপর যাকাত আসেনা। তবে এসব থেকে ভাড়া বাবত অর্জিত আয় অন্য যাকাত যোগ্য সম্পদের সাথে যুক্ত করে ২.৫% হারে যাকাত আদায় করতে হবে।

ব্যবসার উদ্দেশ্যে ক্রয় করে রাখা জমি, দালান ও দোকান ঘর, এপার্টমেন্ট, গাড়ি, যন্ত্রপাতি ইত্যাদির মূল্যের উপর যাকাত ধার্য হবে। ঘরের আসবাব পত্র, তৈজসপত্র, খাদ্যদ্রব্য, পোশাক পরিচ্ছদ, নিজের ও নিজের উপর সরাসরি নির্ভরশীল আত্মীয় স্বজনদের দৈনন্দিন খরচের উপর যাকাত আসে না।

যাকাতের পাওনাদার

যাকাতের প্রকৃত পাওনাদার কারা এবং কোন কোন ক্ষেত্রে যাকাতের অর্থ ব্যয় করতে হবে। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে- যাকাত হল কেবল ফকির, মিসকিন, যাকাত আদায়কারী ও যাদের চিত্তাকর্ষণ প্রয়োজন তাদের হক এবং তা দাসমুক্তির জন্য, ঋণগ্রস্তদের জন্য, আল্লাহর পথে জেহাদকারীদের জন্য এবং মুসাফিরদের জন্য।

এই হল আল্লাহর নির্ধারিত বিধান। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়। (আত্তাওবা-৬১)

মাওলানা আব্দুর রহীম (র.) এই আয়াতের ব্যাখ্যায় যাকাতের অর্থ ব্যয় করার ১০টি খাতের উল্লেখ করেছেন। যেমন-

১. বেকারত্বের দূরীকরণ,

২. শ্রমজীবীদের আর্থিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা,

৩. দুর্বল, অসহায় এবং পঙ্গু, অন্ধ অসহায় পথ শিশু এই শ্রেণির মানুষের সামাজিক পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা।

৪.যাকাত আদায় ও বন্টনকারীদের আর্থিক প্রয়োজন মেটানো,

৫. নওমুসলিমদের আর্থিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা,

৬. দাসপ্রথার অবসান,

৭. ঋণগ্রস্তদের ঋণ মুক্তির ব্যবস্থা করা,

৮. সুদমুক্ত ঋণ দানের ব্যবস্থা করা,

৯. ইসলামের প্রচার ও প্রসারের ব্যবস্থা করা,

১০. নিঃস্ব পথিকের গন্তব্যে পৌছার ব্যবস্থা করা।

দেশ ও জাতির এই ক্রান্তিকালে অসহায় ও দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানো প্রতিটি বিত্তবান মানুষের নৈতিক ও মানবিক দায়িত্ব। যাকাত আদায়ের মাধ্যমে সম্পদ কমে না বরং সম্পদ পবিত্র হয় এবং সম্পদে বরকত হয়। যাকাতের মাধ্যমে সমাজে শান্তি ও ভ্রাতৃত্ব সৃষ্টি হয়, বৈষম্য দূরীভূত হয়।

সুতরাং দেশের চলমান করোনা সংকটের সময় যে বিশাল জনশক্তি অভাব-অনটন ও দুঃখময় পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন এ অবস্থায় যাকাত, উশর, ফিতরা আদায়সহ অসহায় মানুষের প্রতি সহযোগিতার হাত প্রসারিত করা অত্যন্ত প্রয়োজন। প্রয়োজন ছিল রাষ্ট্রীয়ভাবে যাকাত আদায়ের ব্যবস্থা করা।

ধর্মমন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে যাকাত সংগ্রহ করে সুষ্ঠুভাবে দেশের অসহায়, দুঃস্থ, পীড়িত, করোনা সংকটের কারণে চরম বিপদগ্রস্ত ও অভাবী মানুষের কল্যাণে ব্যয় করা হলে অবশ্যই দেশের জন্য তা মঙ্গলকর হতো।

লেখক: পেশ ইমাম ও খতীব, পূর্বভাটপাড়া জামে মসজিদ, ইসলামপুর, সিলেট।

বি: দ্র:

মাসিক আদর্শ নারী পরিচালিত মাদরাসা খাতুনে জান্নাত (রা।) এর লিল্লাহ বোর্ডিং এ যাকাত ফেতরা গ্রহণ করা হচ্ছে। আগ্রহীগণ এই পেইজে মেসেজ দিতে পারেন। https://www.facebook.com/MadrasaKhatuneJannat/

অথবা মেইল করতে পারেন saidalhasan01@gmail.com

যেকোনো প্রয়োজনে যোগাযোগ +8801911300457

Leave a Reply

Your email address will not be published.

%d bloggers like this: