হুরমতে মুসাহারাত সংক্রান্ত কিছু গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা ও শর্তসমূহ

—————–
মুফতি সাঈদ আল হাসান
——————-

সমাজে এমন কিছু জিনিস প্রচলিত আছে যা আমাদের অজান্তেই দুনিয়া ও আখেরাত বরবাদ করে চলেছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে হুরমতে মুসাহারাত। চলুন, এ সংক্রান্ত কিছু মাসআলা জেনে নেয়া যাক-

মাসআলা – ১
ইসলামী বিধান মতে, নিজ কন্যার সাথে যিনা করলে বা কামভাব নিয়ে উত্তেজনার সাথে আবরণ ছাড়া স্পর্শ করলে নিজ স্ত্রী তথা ওই মেয়ের মায়ের সাথে স্পর্শকারীর বৈবাহিক সম্পর্ক সম্পূর্ণ ভেঙ্গে যায় এবং স্ত্রী তার জন্যে চিরতরে হারাম হয়ে যায়।
তাই কন্যা বালেগা হবার নিকটবর্তী (সাধারণত ৮+ বছর) হয়ে গেলে তাকে স্পর্শ করার ক্ষেত্রে পিতার এবং ছেলে বালেগ (সাধারণত ১১+ বছর) হয়ে গেলে তাকে স্পর্শ করার ক্ষেত্রে মায়ের খুবই সর্তক থাকা উচিৎ।

মাসআলা – ২
১ নং মাসআলাটি ছিল পিতা-মাতার দিক থেকে। একই কাজ যদি সন্তানের দিক থেকে হয় তবুও পিতা মাতার বিবাহ ভেঙ্গে পরস্পর চিরতরে হারাম হয়ে যাবে। কাজেই মা-কে স্পর্শ করার ক্ষেত্রে পুত্র ও বাবাকে স্পর্শ করার ক্ষেত্রে কন্যার খুব সতর্কতা আবশ্যক।

মাসআলা – ৩
উপরোক্ত দুটি মাসআলার মতই শ্বশুর কর্তৃক পুত্রবধূ এবং শাশুড়ি কর্তৃক জামাইকে স্পর্শ করার বিধান। অর্থাৎ শর্তগুলি পাওয়া গেলে স্বামী স্ত্রী পরস্পর হারাম হয়ে যাবে।

মাসআলা – ৪
যদি কোন পুরুষ কোন মহিলার সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হয় অথবা কামভাব নিয়ে আবরণহীন তাকে স্পর্শ করে অথবা কামভাব সহকারে মহিলার লজ্জাস্থানের খানিকটা ভিতরাংশে তাকায় অথবা নারী পুরুষের লজ্জাস্থানে তাকায় তাহলে ঐ পুরুষের জন্য ওই মহিলার মা এবং মেয়ে সম্পূর্ণ হারাম হয়ে যায়। আর যদি সেই ব্যক্তি পূর্ব থেকেই ঐ মহিলার মেয়েকে বিবাহ করে থাকে, তাহলে তার সেই স্ত্রী চিরতরের জন্য হারাম হয়ে যাবে।

মাসআলা – ৫
হুরমতে মুসাহারার দ্বারা অটোমেটিক বৈবাহিক সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে স্বামী স্ত্রী পরস্পর হারাম হয়ে যায়।
আর এই হারামটা সারা জীবনের জন্য বহাল থাকে। অর্থাৎ পুনরায় বিবাহের কোন উপায় আর থাকে না। কাজেই তালাকের কোন ব্যাপার স্যাপার এখানে নেই।
—————-

হুরমতে মুসাহারাত সাব্যস্ত হবার জন্য কয়েকটি শর্ত রয়েছে।

শর্তগুলো হল,

১–

সরাসরি খালি গায়ে বা এমন কাপড়ের উপর দিয়ে স্পর্শ করে, যা এতটাই পাতলা যে, শরীরের উষ্ণতা অনুভব হয়। যদি এমন মোটা কাপড় পরিধান করে থাকে যে, শরীরের উষ্ণতা অনুভূত না হয়, তাহলে নিষিদ্ধতা সাব্যস্ত হবে না।

فى الدر المختار- أو لمس ) ولو بحائل لا يمنع الحرارة

وقال ابن عبدين– ( قوله : بحائل لا يمنع الحرارة ) أي ولو بحائل إلخ ، فلو كان مانعا لا تثبت الحرمة ، كذا في أكثر الكتب (الفتاوى الشامية، كتاب النكاح، فصل فى المحرمات-3/107-108)

২–

স্পর্শ করলে পুরুষ মহিলা যেকোন একজনের উত্তেজনা অনুভুত হওয়া।

পুরুষের উত্তেজনা অনুভূত হওয়ার লক্ষণ হল গোপনাঙ্গ দাঁড়িয়ে যাওয়া, আর পূর্ব থেকে দাঁড়িয়ে থাকলে স্পর্শ করার পর উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়া।

وفى رد المحتار- قوله (بشهوة) اي ولو من احدهما،

وفى الدر المختار- وحدها فيهما تحرك آلته أو زيادته به يفتى

وفي امرأة ونحو شيخ كبير تحرك قلبه أو زيادته (الفتاوى الشامية، كتاب النكاح، فصل فى المحرمات-4/107-109)

৩–

স্পর্শ করার সময় উত্তেজিত হতে হবে। যদি স্পর্শ করার সময় কেউ উত্তেজিত না হয়, তাহলেও নিষিদ্ধতা প্রমাণিত হবে না। সেই সাথে স্পর্শ করার আগে বা শেষে, হাত ছেড়ে দেওয়ার আগে বা পর যদি উত্তেজনা অনুভূত হয় তাহলেও নিষিদ্ধতার সাব্যস্ত হবে না।

وفى الدر المختار- والعبرة للشهوة عند المس والنظر لا بعدهما

وفى رد المحتار- ( قوله : والعبرة إلخ ) قال في الفتح : وقوله : بشهوة في موضع الحال ، فيفيد اشتراط الشهوة حال المس ، فلو مس بغير شهوة ، ثم اشتهى عن ذلك المس لا تحرم عليه (رد المحتار-كتاب النكاح، فصل فى المحرمات-4/108)

৪–

স্পর্শ করার পর উদ্ভূত উত্তেজনা স্থীর হওয়ার পূর্বেই বীর্যপাত না হতে হবে। যদি উত্তেজনা হওয়ার সাথে সাথেই বীর্যপাত হয়ে যায়, তাহলেও নিষিদ্ধতা সাব্যস্ত হবে না।

وفى الدر المختار- هذا إذا لم ينزل فلو أنزل مع مس أو نظر فلا حرمة به بفتى

وفى رد المحتار- قوله : فلا حرمة ) لأنه بالإنزال تبين أنه غير مفض إلى الوطء هداية .

قال في العناية : ومعنى قولهم إنه لا يوجب الحرمة بالإنزال أن الحرمة عند ابتداء المس بشهوة كان حكمها موقوفا إلى أن يتبين بالإنزال ، فإن أنزل لم تثبت ، وإلا ثبت(الفتاوى الشامية، كتاب النكاح، فصل فى المحرمات-4/109

৫–

মহিলার বয়স ৯ বছর থেকে কম না হতে হবে। আর পুরুষের বয়স ১২ বছর থেকে কম না হতে হবে।  {হুরমতে মুসাহারাত-১৯}

উপরোক্ত ৫টি শর্ত পাওয়া গেলে হুরমতে মুসাহারাত সাব্যস্ত হয়ে যাবে।

وكذا المقبلات، أو الممسوسات بشهوة لأصوله، أو فروعه (رد المحتار-4/100)

لأن حرمة المصاهرة إذا ثبتت لا تسقط أبدا (رد المحتار-4/109)

18 thoughts on “হুরমতে মুসাহারাত সংক্রান্ত কিছু গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা ও শর্তসমূহ

      1. একটি মাসআলা জানতে চাই। আমি একটি সরকারি অফিসে চাকুরি করি। আমি অফিস সময়ে আমার ব্যক্তিগত কোন কাজ করলে মনে হয় যেন আমার কাজটা জায়েয হচ্ছে না। যেমন অফিস সময়ে ব্যাংক থেকে টাকা উঠালে আমার মনে হয় টাকাগুলো হারাম হয়ে যাবে ইত্যাদি। উক্ত সময়ে কেনাকাটা করলে জিনিসগুলো যায়েজ হবে না ইত্যাদি। আমার ধারণা কি ঠিক? আমি মানসিক শুচিবায়ু রোগী।

        1. মানুষ বৈধ কোন কাজ করলে ওটা কোন কারণ ছাড়াই অবৈধ হয়ে যায় না। কাজেই অফিস সময়ে ব্যক্তিগত কাজ করার দ্বারা আপনার ওই কাজটা হারাম হয়ে যাবে না। এটি আপনার মানসিক সমস্যা বলেই মনে হচ্ছে।
          তবে অফিস সময়ে প্রয়োজন ছাড়া ব্যক্তিগত কাজ করা এক প্রকারের দায়িত্বহীনতা বলা চলে। এ ব্যাপারে সতর্কতা কাম্য।

      2. আমার উপরোক্ত প্রশ্নোত্তরটি দিলে অনেক উপকার হতো। ধন্যবাদ।

  1. আসসালামু আলাইকুম হুজুর কাউকে সালাম দিতে চাইলে তাকে কোন কোন অবস্থায় দেখলে সালাম দেওয়া যাবে না? আরেকটি বিষয় হলো রাস্তাঘাটে কত কাগজপত্র পড়ে থাকে যার উপরে বাংলায় বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম এবং সংক্ষেপে 786 এর মানে অনেকে বলে বিসমিল্লাহ, লেখা থাকে উক্ত কাগজ পাড়া দিলে গুনা হবে?

    1. খাওয়া ও ইস্তেঞ্জা অবস্থায় সালাম দেয়া যাবে না।
      বাংলা বিসমিল্লাহ বা ৭৮৯ এগুলা আসল বিস্মিল্লাহের হুকুমে নয়। তবে কাগজ সম্মানিত বস্তু। ইচ্ছে কৃত পা মাড়ানো উচিৎ নয়।

        1. সালাম দেয়া যাবে না বলতে এখানে জায়েজ নেই বলা হয় নি। অনুত্তম বলা হয়েছে।

          আহারকারী অন্যকে সালাম দিতে পারবে। এ সময় অন্যকে সালাম দেওয়া নিষিদ্ধ নয়। তদ্রুপ আহারকারীকেও সালাম দেওয়া বৈধ। তবে এ সময় সালামের উত্তর দেওয়া যদি তার কষ্ট বা বিরক্তির কারণ হয় তাহলে সালাম দেওয়া থেকে বিরত থাকবে। কেননা, এমন হলে সে অবস্থায় সালাম দেওয়া অনুত্তম।

          -(রদ্দুল মুহতার ১/৬১৭, ৬/৪১৫; আলমাজমূ’ ৪/৪৬৯; ফাতহুল বারী ১১/১৯-২১)

  2. অসাধারনভাবে বুঝিয়ে লিখেছেন ভাইয়া। খুব ভালো লাগলো। আল্লাহ আপনার ভালো করুক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *