কুরআনের আয়াত বানিয়ে শ্রোতাদের বোকা বানাচ্ছেন এক ভণ্ড আলেম! প্রতিরোধ করুন

ভণ্ড কুরআনের আয়াত বানিয়ে শ্রোতাদের বোকা বানাচ্ছেন কথিত মাওলানা!

ড. আবদুস সালাম আজাদী


আমি সাধারণত কারো নাম ধরে নেতিবাচক কিছু লিখি না, সম্ভব হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে সংশোধনের চেষ্টা করি, সম্ভব না হলে আমার সীমিত জ্ঞানের আলোকে ভুল তথ্য পেলে তা সংশোধনের চেষ্টা করি।

কিন্তু আজকে আমি হয়ত আমার চিরাচরিত নিয়ম খানিকটা ভাঙবো। এবং তা ভাঙা আমার জন্য ফরজ মনে করেই করছি।
এক বোন এবং আমার খুব ঘনিষ্ঠ একজন নিচের ভিডিওটা পাঠিয়ে এই সম্পর্কে আমার বক্তব্য জানতে চাইলেন।

এই বক্তার নাম হলো সাইয়েদ নজরুল ইসলাম। এখন তিনি ডক্টর লেখেন। আগে তিনি বলতেন মদীনা বিশ্ববিদ্যালয় পড়েছেন। এখন বলছেন আল আযহার পড়েছেন। এক বক্তৃতায় বলেছেন, কারী আব্দুল বাসিত নাকি তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তার দাবি ২২ হাজার হাদিসের হাফিজ তিনি। তার দাবী অনুযায়ী ৬ বছরে তিনি কুরআনের হাফিজ হয়েছেন মাত্র ৬ মাস পড়ে। তার আম্মা নাকি ছিলেন কুরআনের হাফিজ, গোপালগঞ্জের মেয়ে ও দাওরাহ পাশ করা আলিমা।

তার দাবি মতে তিনি হজ্জ করেছেন ৩৪ বার, উমরাহসহ হজ্জ হয়েছে ৮০/৯০ বার।

এই ভিডিওতে তার দাবি অনুযায়ী তার বয়স হয়েছে ৮৭ বছর। তার ফুফু বেঁচে ছিলেন ১৪৫ বছর।

ভিডিওটা আমি প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত শুনতে পারিনি, ২২ মিন ৪২ সেকেন্ড পর্যন্ত শুনে আমি রাগে থরথর করে কেঁপেছি। আমার বিশ্বাস যে নাস্তিকরা যা না করতে পেরেছে, তার চেয়ে বেশি ক্ষতি করছে এই সব ভণ্ড লোকেরা ।

কারণ নাস্তিকেরা আমাদের সমাজে তিনটা কাজ করেছেঃ
১. তারা কিছু শয়তানের চেলাদের আরও বড় শয়তান হতে সাহায্য করেছে।
২. তারা কিছু মুনাফিকদেরকে দ্বীনের ব্যাপারে সন্দিহান করেছে।
৩. কিন্তু তারা সকল মত ও পথের সঠিক উলামা ও জন সাধারণকে ইসলামের ব্যাপারে ঐক্যের মঞ্চে এনেছে। যা দ্বীনের জন্য আরো উপকার ই প্রমাণিত হয়েছে। ফলে দেশ থেকে পালানো ছাড়া দেশের সরকার ও তাদের রক্ষা করতে পারেনি।

কিন্তু এই তথাকথিত এসব মাওলানা দ্বীনের মূলে আঘাত করে মানুষকে শেষ করে যাচ্ছে এবং ইসলামের ব্যাপারে তরুণ প্রজন্মে দ্বিধান্বিত করে দিচ্ছে।

আমি তার সম্পর্কে লিখছি, কারণ ইসলামের ইতিহাসে এতো বড় দাজ্জাল ও কাযযাব তথা মহামিথ্যুক আজও কেউ এসেছে বলে শুনিনি। প্রায় ২৩ মিনিট আলোচনায় আমি অনেক অনেক মারাত্মক বিষয় পেয়েছি যা আলোচনা করলে অনেক লম্বা হয়ে যাবে আর্টিকেল।

তার গর্ব অহংকার, টিটকারি ফাজলামো, যৌন সুড়সুড়ি ও গালাগালি নিয়ে কথা না-ই বললাম। তার ইতিহাসের মিথ্যাচার সম্পর্কে না-ই তুলে ধরলাম। তার বিভিন্ন বিষয়ে মূর্খতা নিয়ে না হয় অন্য কেউ কলম ধরবেন। কিন্তু আমি তার কুরআন বানিয়ে মানুষকে প্রতারণার কথাটা আজ শুধু জানাতে চাই। তিনি শত শত ওয়াজ মাহফিলে হাজার হাজার মানুষের সামনে এই ভাবে প্রতারণা করে যাচ্ছেন।

আশ্চর্য আমরা যখন বাংলাদেশে ছিলাম, দেখেছি কোন মাহফিলে এতো বোকা বানানো আলিম পাওয়া যেতো না। মাহফিলে কেউ না কেউ হাফিজ বা আলিম বা দ্বীনের সমঝদার থাকতোই। তাদের প্রতিবাদের কাছে এই ধরনের দাজ্জালরা পালাতো। কিন্তু আজ একি শুনছি?!

আমি আজকে আপনাদের শুধু তার কুরআন বানিয়ে বলার দুঃসাহসিকতাকে তুলে ধরছি। তিনি ঐ আয়াতগুলো বানিয়েছেন এবং তিলাওয়াত করেছেন কারিয়ানা সুরে ও স্বরে। কথিত আয়াতগুলো পড়ে হাউ মাউ করে কেঁদেছেন। এক পর্যায়ে একটা বানানো আয়াত পড়ে চিৎকার করে বলেছেন, ঐটা যদি তিনি মক্কা মদীনায় পড়তেন বা মিশরে পড়তেন তাহলে নাকি মানুষ কেঁদে জারজার হয়ে যেতো।

তিনি যে আরবী বাক্য গুলো আয়াতের মত পড়ে কুরআনের আয়াত বুঝিয়েছেন তার পাঠোদ্ধার করে আমি নিচে লিখছি।

১. ومن يخرج من بينهك….. ومن يخرج من بيتك ورسوله ثم أقتلنها وأنها لكبيرة
এটা নাকি কুরআনের আয়াত। এটা কারিয়ানা সুর দিয়ে পড়ে বলেছেন, ‘কুরআন কিভাবে পড়তে হয় এই বুড়োর দিকে তাকা’। অথচ এটা কুরআনের কোন আয়াত নয়। বানানো আরবি, যার অর্থ করা যায় না। করা গেলেও অর্থ বোধক হয় না। এর শাব্দিক অর্থ হলোঃ যে তোমার ঘর ও রাসুল হতে বের হয়েছে, তারপর তাকে (স্ত্রীবাচক সর্বনাম) আমি হত্যা করবো। আর নিশ্চয় এটা অনেক বড়।

২. এরপর এই বক্তা আমাদের নবীর সা. হিজরতের সময় আবু বকর ছাড়া আর কেউ ছিলো না সে সম্পর্কে আরেকটা আয়াত বানান। তাহলো,
ولا دد تلا دل بك، صدورِكم، فلا تقمه في شيئا وجدلا، والله يؤتي من يشاء والله ذو فضل عظيم
তথাকথিত আয়াতটা সুন্দর সুর দিয়ে পড়ে বললেন: ‘আমার ঠোঁটের দিকে দেখে নে, কিভাবে কুরআন পড়তে হয়’।

এই বাক্যটা কুরআন নয়, শেষের দুইটা বাক্যখণ্ড কুরআনের আয়াত থেকে কেটে নেয়া যেটা সুরা আল ইমরানে ১৭৪ নং আয়াতে আছে। কিন্তু প্রথম কয়েকটা শব্দ আরবি ভাষার-ই না। পরের ‘সুদুরিকুম’-এর কোন অর্থ এখানে হয় না। তার পরের বাক্যের আরবির কোন অর্থ হয় না। পরে কুরআনের আয়াত কেটে যা আনা হয়েছে। তাহলো, ‘আল্লাহ যাকে ইচ্ছা দেন, আল্লাহ মহান কৃপার অধিকারী।’ এইভাবে ভুল আরবি বানায়ে তিনি কুরআন বলে চালিয়ে দিলেন।

৩. বক্তা ভালো সন্তান হতে ভালো মায়ের দরকারের উপর আরেকটা কুরআনের আয়াত বানালেন। সুর করে কারিয়ানা ঢঙে পড়েন। বলেন,
فلا تقم دخبسي ولا مُقَلَّدْنَهُ يؤذرونهم بالله ما كانوا يحذرون
এরপরে উদ্ধত হয়ে বললেন, ইনশাআল্লাহ, কুরআন তো আমার দেখা লাগবে না, কুরআন আমি উল্টোভাবেই পড়তে পারি, সদরভাবেও পড়তে পারি। হেসে বললেন, তরজমাসহ। (৬ : ৫৮ মিনিট)

উল্লেখ্য শেষের ‘মা কানু ইয়াহযারুন’ সুরার কাসাসের ৬ নম্বর আয়াতের শেষাংশ। কিন্তু প্রথম তিনি যা বলেছেন তা অর্থপূর্ণ বাক্য নয়। এরপরেও তিনি দাবি করলেন এটা কুরআন এবং গর্বে ফেটে পড়লেন।

৪. আরো একটা আয়াত বানালেনঃ
فلما تقم تو كم فيه شيئا، واتخذ من دونه شيئا

এর আরবিটাও ভীষণ রকমের দুর্বল। ফালাম্মা অর্থ যখন, কিন্তু তুক্বিম তু কুম এর কোন অর্থ হয় না। “তুক্বিম” মানে তুমি অবস্থান করো। তুকুমের কোন অর্থ নেই। শাইয়ান এর অর্থ কোন কিছুই। এর পরে বাক্যটার অর্থ সে ইহার পরে কিছু গ্রহণ করলো। এরও কোন অর্থ নেই।

৫. হিজরতের আগে আমাদের নবী সা.-কে মারার পরিকল্পনার ব্যাপারে একটা আয়াত তিনি বানালেন; বানানো আয়াতটা শেষ করতে পরলেন না। সভাপতির হাত ধরে কেঁদে জারেজার হলেন। সেই বানানো আয়াতটা হলো,

صلَّتْكَ عَلَى فيك، سنلتقي في عذرة، ولئن أبنت تكون من دونه شيئا والله يوتي

বোঝা গেছে এরপরে তিনি আর বানাতে পারেননি। কারণ অনেক বেশি কান্নায় তিনি ভেঙে পড়েছেন। এই আরবি বাক্যটার অর্থ করলে যে কি দাঁড়াবে আল্লাহ মা’লুম! মনে হচ্ছে কয়েকটি আরবি শব্দ ছাড়া বাক্য তৈরির জ্ঞান খুব কম। এর অর্থ মোটা মুটি এমন হতে পারে সে তোমার মধ্যে উপরে মেয়েটা সালাত পড়েছে, আমরা গোবরের মধ্যে সাক্ষাত করবো। যদি আমি প্রকাশ করি, তাহলে তারপরে কিছু হবে, আল্লাহ দেন ………

৬. নজদের ওহাবিরা নাকি নবী সা.-কে মারার জন্য সিদ্ধান্ত দিলো। এ সম্পর্কে তিনি আয়াত বানালেনঃ
لأقتلن بأيديهم فألقيهم إلى الدنيا
এর অর্থ কিছুটা এমন হবে আমি তাদের হাত দিয়ে হত্যা করবো, ফলে তাকে দুনিয়ায় ফেলায়ে দেবো।

এই ধরনের আরবি বানিয়ে কুরআনের আয়াত বলে চালিয়ে দেয় যে বাংলাদেশে, সেখানে আমার বন্ধু ড. মানযুরে এলাহী, ড. আবু বকর যাকারিয়া, ড. সাইফুল্লাহসহ শত শত আরবিবিদ ডক্টররা এখন বাস করেন ভাবতেই পারছি না।

৭. হিজরতের সময় আবু বকর রা. আমাদের নবীর সা. সাথে যে যাবেন, সে সম্পর্কেও তার বানানো আয়াত আছে। আবু বকর নাকি বলেছিলেন,
أنتم خيرها منكم، وعزيزي منه، ففيهم نزلا

এর অর্থও যে কি, কারণ ক্লাস ফাইভ সিক্সের ছেলে-মেয়েরাও এমন বাক্য বানাতে পারে! টেনে টুনে এর অর্থ করা যায়, ‘আপনি এদের মধ্যে উত্তম আপনার চেয়ে। অতএব তাদের মধ্যে মেহমান’।

অথচ তিনি এর অনুবাদ করলেন, আবু বকর বলছেন, হুজুর মক্কা শরিফের মধ্যে আমি একজন হালকা পাতলা খাটো মানুষ, আমাকে মানুষ সবচাইতে খাঁটো মানুষ বলে, আমার স্বাস্থ্য বেশি মোটা না। আপনি যদি আমাকে আপনার বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করে নেন, কেউ যদি না যায়, আমি আবু বকর আপনার সাথে থাকতে রাজি আছি।

এরপর আবারও তার বানানো কুরআন পড়লেন,
أنبت فيها رسمكم منهم، فسيكفيكهم الله
এর অর্থ কিছুটা এমন হবে, তার মধ্যে তাদের হতে আপনার ছবি জন্ম নিলো, কাজেই আল্লাহ আপনার জন্যই যথেষ্ট।

জানি না এসব আরবি সে কেন বানায়। কেন বা মানুষকে এভাবে ধোঁকা দিচ্ছে। এই সব মাহফিলে কি আরবি জানা কেউ থাকে না?

৮. কুরআন বানানো তার এগিয়ে যাচ্ছে,
فتلقى أذنت له من شركة منها والله ذو فضل العظيم

শেষের অংশটুকু ভুল হলেও কুরআনের একটা আয়াতের অংশ হিসেবে পাওয়া যায়। কিন্তু প্রথমে কী যে বলেছেন তিনি!! অর্থহীন বক্তব্য। এই বানানো আয়াত তেলাওয়াতের পরে অনেক গর্ব করলেন বক্তা। এরপর আরেকটা আয়াত, যা শুনলে মুসায়লামা কাযযাব নামক ভণ্ড নবীর বানানো কুরআনের চেয়ে জঘন্য মনে হয়। কারিয়ানা করে পড়ছেন,
وتايدنا يعذرا لكم فيك ذرية طيبة احذروها وما كانوا يحذرون.
শেষের অংশটুকু কুরআনের একটা আয়াতের শেষের কথা। প্রথম দিকে যা বলা হয়েছে তা নিরর্থক বক্তব্য।

৯. তার বানানো আরেকটা আয়াত শুনুন:
فلا تماركم ذاتكم القلوب ويستحجلون شيئا ويخابرونهم بغو جدلا

বানানো এই আয়াতটা পড়ে যে কি কান্না তিনি করলেন শুনে দেখেন। অথচ আয়াত দূরে থাকুক এই রকম কোন আরবি বাক্য হতে পারে বলে আমার মনে হয় না।

১০. আরো একটা বানানো আয়াত দিয়ে আমি আজকে এখানে শেষ করতে চাই। তিনি বলেছেন,
بالغب تعجل لنا بينها وبينهما….. وأن أخرجتكم منه شيئا والله يحب المحسنين
তার বানানো এই আয়াতের প্রথম অংশের কোন অর্থ হয় না। দ্বিতীয় অংশের অর্থ এমন হয়, আর তোমাদের সেখান থেকে বের করে দেয়া কিছু একটা হবে, আল্লাহ মুহসিনিনদের ভালোবাসেন।

এই শেষের এই কথাটা والله يحب المحسنين কুরআনের একটা অংশ। বাকিগুলো সব তার বানানো কুরআন।

বিশ্বাস করুন! এরপর তার বাকি ভিডিও শোনার ইচ্ছা আমার হয়নি। আপনারা তাকে পাগল বলে আমাকে হয়তো সময় নষ্ট কেন করেছি সেজন্য ধরতে পারেন। কিন্তু তার ভিডিওগুলো ইউটিউবে দেখেন। কত মানুষ তা দেখে প্রতারিত হয়েছে দেখেন। তার উপর করা ভূয়সী প্রশংসাগুলো পড়ে সিদ্ধান্ত দেন কি বলবেন।

বাংলার জামিনে থাকা উলামায়ে কিরামের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। দৃষ্টি আকর্ষণ করছি বাংলাদেশ সরকারের। কারণ এক ভিডিওতে তিনি প্রধানমন্ত্রীকে নিজের আত্মীয় বলে পরিচয় দিয়েছেন।


3 COMMENTS

আপনার মন্তব্য