টকশোতে এনায়েতুল্লাহ আব্বাসী যে প্রশ্নগুলোর উত্তর দেননি : উত্তর ও খণ্ডন

মুফতি আব্দুল্লাহ মায়মুন

এ লেখায় প্রথমেই শিরোনামটি লক্ষণীয়। বলা হয়েছে ‘দেন নি’, ‘দিতে পারেন নি’ বলা হয় নি। নিশ্চয় ‘দেন নি’ আর ‘দিতে পারেন নি’র মধ্যে পার্থক্য আছে। কিছুদিন আগে ড. এনায়েতুল্লাহ আব্বাসী ও শাহরিয়ার কবিরের মধ্যে এক ডিবেট হয়। এতে ড. আব্বাসীর পক্ষ থেকে শাহরিয়ার কবির কর্তৃক উত্থাপিত বেশ কিছু সংশয়ের নিরসন এবং অভিযোগের খন্ডন করা হয় নি।

ড. মাওলানা এনায়েতুল্লাহ আব্বাসী হয়তো সময়ের স্বল্পতায় অথবা কথার মোড় অন্যদিকে ঘুরে যাওয়ায় জন্যে উত্তর দিতে পারেন নি। কিন্তু এ সব সংশয়ের নিরসন এবং অভিযোগের খন্ডন করা অবশ্যই প্রয়োজন। তাই এ লেখায় উত্তর না পাওয়া সে প্রশ্নগুলোর উত্তর দেয়ার চেষ্টা করা হলো। উত্তরগুলো ড. আব্বাসীর আলোচনার পরিপূরক হিসেবেও ধরতে পারেন।

(ইউটিউবে face the people’র আপলোডকৃত ভিডিও অনুযায়ী সুত্র দেওয়া হয়েছে।)
.
১- (মিনিট: ১০) শুরুতেই শাহরিয়ার কবির দাবি করেছেন, সিলেটের হযরত শাহ জালাল হচ্ছেন মাওলানা জালালুদ্দিন রুমী রাহ’র মুরীদ।

খন্ডন-
হযরত জালালুদ্দীন রুমী রাহ. ১২০৩ /১২০৬ সালে বর্তমান আফগানিস্তানের বলখ শহরে জন্ম গ্রহণ করেন। আর ১২৭৩ সালে বর্তমান তুরস্কের কুনিয়া শহরে ইন্তেকাল করেন। অপরদিকে হযরত শাহ জালাল রাহ. এর জন্ম ১২৭১ সালে ইয়েমেনের কুনিয়াতে। আর তিনি ১৩৪৬ সালে বাংলাদেশের সিলেটে ইন্তেকাল করেন। এখানে লক্ষ্যণীয় ব্যাপার হলো, হযরত শাহ জালাল রাহ. এর দু’বছর বয়সেই মাওলানা রুমীর ইন্তেকাল হয়ে যায়। একজন মানুষ দু’বছর বয়সে কীভাবে অন্যের মুরিদ হতে পারে?

হযরত শাহ জালাল রাহ.’র সঙ্গে দিল্লীর নিযামুদ্দীন আউলিয়া রাহ.‘র সাক্ষাৎ হলেও মাওলানা রুমীর সঙ্গে সাক্ষাতের কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। ২০০৭ সালে সিলেটের দরগাহ মাদরাসায় পড়াকালে সিলেট বেতারকেন্দ্রে পাঠ করার জন্যে জামেয়ার বর্তমান নায়েবে মুহতামিম উস্তাদে মুহতারাম হাফিয মাওলানা আসআদুদ্দীনের নির্দেশে হযরত শাহ জালাল রাহ.’র জীবনের ওপর একটি প্রবন্ধ লিখি। ওই সময়েই হযরত শাহ জালাল রাহ. সম্পর্কে পূর্ণ জানার সুযোগ হয়। এছাড়াও যদি কেউ তার সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা নিতে চান, তাহলে বাংলা উইকিপিডিয়ায় হযরত শাহ জালাল লিখে সার্চ দিতে পারেন।

উল্লেখ্য, হযরত শাহ জালাল রাহ. সিলেটে তথাকথিত সুফিবাদের দাওয়াত নিয়ে আসেন নি, তিনি সিলেটবিজেতা সিপাহসালার সৈয়দ নাসিরুদ্দীন রাহ.’র সঙ্গে তরবারী নিয়ে জিহাদে এসেছিলেন। এখনো তার ব্যবহৃত তরবারী সিলেটের দরগা মসজিদের দক্ষিণে মাদরাসা বিল্ডিংয়ের পিছনে মুফতি বাড়ীতে আছে। কেউ দেখতে চাইলে দেখতে পারেন।

২- (মিনিট: ১৬) মওদুদী সাহেব সম্পর্কে বলতে গিয়ে সঞ্চালক সাইফুর সাগর বলেছেন, মওদুদির অথরিটি একেবারে ইসলাম বিরোধী কিনা?

নিরসন-
জনাব আবুল আলা মওদুদীর সম্পর্কে নানা জন নানা কথা বলেন, এরমধ্যে অতিসংক্ষেপে অল্প কথায় চমৎকার কথা বলেছেন, বাংলাদেশ খতমে নবুওত আন্দোলনের প্রাণভোমরা খতীব উবায়দুল হক রাহ.। নব্বই দশকে যখন তিনি তাহাফফুজে খতমে নবুওত আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন; তখন জনৈক সাংবাদিক তাঁকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘আপনারা জামায়াতে ইসলামীকে গোমরাহ বলেন, তাহলে জামায়াতকে কাফের ঘোষণা করার দাবি জানাচ্ছেন না কেনো?’

জবাবে তিনি বলেছিলেন, ‘জামায়াত এবং কাদিয়ানি উভয়েই ইসলামের ক্ষতি করেছে। তবে কাদিয়ানি কেটে দিয়েছে ইসলামের মাথা। আর জামায়াত কেটেছে লেজ। সে হিসেবে আমরা কাদিয়ানিকে কাফির বলি। জামায়াতকে কাফির বলি না।’-(‘আকাশছোঁয়া মিনার’ , ঢাকা আজিমপুর মাদরাসা থেকে জুবাইর আশরাফ সম্পাদনায় প্রকাশিত)

৩- (মিনিট: ৪৩) শাহরিয়ার কবির বলেছেন, পাকিস্তান সরকার ১৯৫২ সালে কাদিয়ানি বিরোধী আন্দোলনের পর ১৫ জন ইসলামি স্কলারকে ডেকেছিল, ইসলাম ও মুসলমান নিয়ে প্রশ্ন করেছিল। তখন পনের জনের পনের জন পনের রকম উত্তর দিয়েছিলেন।

খন্ডন-
শাহরিয়ার কবির কিন্তু উক্ত ভিডিওয়ের ৩৭ মিনিটে স্বীকার করেছেন,  ‘ধর্মনিরপেক্ষতার সংজ্ঞার মধ্যে বিভিন্ন বিপরীত মত আছে।’ যে অভিযোগে তিনি ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অনীহা প্রকাশ করলেন; সে একই অভিযোগতো ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের মধ্যে বিদ্যমান। তাহলে তিনি কোন যুক্তিতে এ মতবাদ গ্রহণ করলেন!

ইসলামি খিলাফার দীর্ঘ তেরশত বছরের ইতিহাসে বিশ্ববাসীকে বেশ কিছু রত্ন উপহার দিয়েছে। দ্বিতীয় খলীফা উমর বিন খাত্তাব রা., উমর বিন আব্দুল আযীয রাহ., খলীফা হারুনুর রশীদ, খলীফা মামুনুর রশীদ, সুলতান মুহাম্মদ আল-ফাতেহ, সুলতান সুলেমান এবং উপমহাদেশে সুলতান শামসুদ্দীন আলতামাশ, সুলতান নাসিরুদ্দিন মাহমুদ, সম্রাট আওরঙ্গজেব আর বাংলাদেশে সুলতান গিয়াসুদ্দীন আযম শাহ, সুলতান আলাউদ্দীন হোসেন শাহ এবং শায়েস্তা খাঁর মত শাসক। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ কি তার প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত এরকম কাউকে উপহার দিতে পেরেছে? কীসের সঙ্গে কীসের তুলনা! এ যেনো আতরের সঙ্গে ইতরের তুলনা।

৪- (মিনিট ১:১৫) শাহরিয়ার কবির বলেছেন, শায়খুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক বলেছেন, ‘ইসলাম নামক বৃক্ষের গোড়ায় পানি নয় রক্ত দিতে হবে’! ইসলাম কি ড্রাকুলা ধর্ম? রক্ত পান করে ইসলামকে জীবিত হতে হবে?
.
নিরসন-
এ কথা বলা যদি শায়খুল হাদীস সাহেব রাহ.’র অপরাধ হয়ে থাকে; তাহলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৭ মার্চের ভাষণে বলেছিলেন, ‘রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেবো; তবুও এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো, ইনশাআল্লাহ।’ এখানে তিনি কি স্বাধীনতার মহান অর্জন পাওয়ার জন্যে রক্তপাতের দিকে অনুপ্রাণিত করেন নি? স্বাধীনতা কি ড্রাকুলা যে রক্তপান করে জীবিত করতে হবে?

অথচ আমরা দেখেছি, রক্তপাত ছাড়াই ১৯৪৭সালে ভারত এবং পাকিস্তান নামক দুটি রাষ্ট্র সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া আফ্রিকা মহাদেশেও অনেক দেশ রক্তপাত ছাড়াই স্বাধীন হয়েছে। এখানে শায়খুল হাদীস রাহি. এবং বঙ্গবন্ধুর লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ভিন্ন হলেও সুর ছিলো অভিন্ন। তাহলে একজনেরটা দোষ আর অন্যজনেরটা গুণ হবে কেনো! এটা কি দ্বৈতনীতি নয়!

৫-(মিনিট ১:১৮) শাহরিয়ার কবির বলেছেন, (আমাদের মোল্লারা) রামুর মত ঘটনা ঘটাবেন, নাসিরনগরের মতো ঘটনা ঘটাবেন।
.
অপনোদন-
বাংলাদেশের কোথাও ভিন্ন ধর্মের উপসনালয়গুলোতে আলেমদের নেতৃত্বে এবং এমনকি নির্দেশেও হামলা হয় নি। বিশ্বাস না হলে গুগলে ‘রামুর বৌদ্ধবিহারে হামলা’ এবং ‘নাসিরনগরে হামলা’ লিখে সার্চ দেন। দেখুন, সেখানে অভিযুক্তদের মধ্যে কোনো আলেমের নাম খুঁজে পান কিনা? তাহলে কি এটা আলেমদের ওপর ডাহামিথ্যে অপবাদ নয়?

আসল পার্থক্য হচ্ছে, ইসলামি জযবা এবং ইসলামি আদর্শের মধ্যে। সাধারণ মুসলিমদের মধ্যে ইসলামি জযবার ব্যাপক উপস্থিতি হলেও ইসলামি আদর্শের উপস্থিতি খুবই নগন্য। এজন্যে সাধারণ মুসলিমের নেতৃত্বে যে আন্দোলন হয় তারমধ্যে বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ির মাত্রা ব্যাপক উপস্থিতি থাকে। কিন্তু আলেমরা ইসলামি জযবা বুকে নিয়ে ইসলামি আদর্শ ধারণ করে যে কোনো সিদ্ধান্ত নেন। এজন্যে এগুলো ভারসাম্যপূর্ণ আন্দোলন হয়। যার জন্যে আলেমরা এসব কাজের নেতৃত্ব দেন না।

৬- (মিনিট ১:১১) শাহরিয়ার কবির বলেছেন, হলি আর্টিজেনে যারা হামলা করেছে তারা আহমদ শফীর ওয়াজ শুনে এটা করেছে।

অপনোদন-
এটা একটা ডাহা ও ভুয়া মিথ্যা কথা। আমি নিজে কারাগারে দেখেছি, আইএস বা নব্য জেএমবির অধিকাংশ হচ্ছে সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত। এদের মেজায চরম উগ্র। দ্বীনী জ্ঞান খুবই কম। অধিকাংশই ভালোভাবে কুরআনও পড়তে পারে না।

বগুড়া কারাগারে আমার সঙ্গে শিয়া মসজিদে হামলার আসামি, জাপানি নাগরিক হোশিও কোনিও হত্যার দন্ডপ্রাপ্ত ফাঁসির আসামি এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রেজাউল করিমের হত্যাকারী আসামির সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছে এবং হলি আর্টিজেন বেকারিতে হামলার ফাঁসির রায়প্রাপ্ত আসামিকে ভালোভাবে চিনে এমন ব্যক্তিদের সঙ্গেও কথা হয়েছে। এদের কেউই কওমি মাদরাসাপড়ুয়া নয়। এরা লা মাযহাবি, এদের অনেকেই হেফাজতে ইসলাম ও তালেবানকে মুরতাদ মনে করে। এছাড়া যারা এদেরকে কাফির মনে না করে তাদেরকেও কাফির মনে করে!

তাহলে তারা কীভাবে আল্লামা আহমদ শফী রাহ.’র কথায় হামলা করবে? যাকে তারা মুসলমানই মনে করে না। তাদের কথা কীভাবে মানবে? যেহেতু ব্লগারদের ওপর হামলা নিয়ে আব্বাসী সাহেব উত্তর দিয়েছেন। তাই সে প্রসঙ্গে আর যাচ্ছি না।

৭- ( মিনিট ১:১৩ ) শাহরিয়ার কবির বলেছেন, আমরা (বাঙালিরা) পাঁচ হাজার বছরের একটি প্রাচীন জাতি। আমাদের ঐতিহ্য ও সভ্যতা আছে।

খন্ডন-
এটা আমরাও বলি, যে জাতির আছে এত হাজার বছরের ইতিহাস; সে জাতির ইতিহাসকে মূল্যায়ন না করে কেনো পশ্চিমা থেকে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদকে আমদানি করা হয়েছে! অথচ এই ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের শুরু হয়েছে ১৮৫১ সাল থেকে; যা এখনো ২০০ বছরও পেরোয় নি। সুতরাং এ স্বল্প বয়স্ক বহিরাগত মতবাদ কেনো এদেশের জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে। যাদের আছে হাজার বছরের ইতিহাস, যারা সর্বদা ধর্মানুরাগী। সুতরাং এদেশের ৯০% মানুষের অনুভূতিতে কীভাবে অন্যদের অপরিচিত মতবাদে চাপিয়ে দেওয়া হবে!

2 thoughts on “টকশোতে এনায়েতুল্লাহ আব্বাসী যে প্রশ্নগুলোর উত্তর দেননি : উত্তর ও খণ্ডন

  1. জামায়াতে ইসলামী ইসলামের লেজ কেটেছে। এগুলো ভিক্তিহীন বানায়োট আর প্রতিহিংসাপরায়ণ লোকদের কথা। জামায়াতে ইসলামী এমন সংগঠন যারা আজীবন ইসলামের লেজ নয় পা থেকে মাথা পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আর তথাকথিত আসলে হকের অনুসারীরা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত লেজ নিয়ে পড়ে আছে। তারা পূর্ণাঙ্গ ইসলাম প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী নন। আর ইসলামী রাজনীতিকেতো ফেতনা আর ক্ষমতার লোভ বলে একেবারে এড়িয়ে যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

%d bloggers like this: