আলেমদের প্রতি মুফতি শফী রহ.-এর দরদমাখা নসিহত

মুফতি মুহাম্মদ শফী উসমানি রহ.

রাজনীতি ও অর্থনীতির অঙ্গনে এবং পদ ও পদবির প্রতিযােগিতার ময়দানে যে বাড়াবাড়ি ও সীমালঙ্ন হচ্ছে তার প্রতিকার করা তাে আমাদের সাধ্যে নেই। কিন্তু দ্বীনি ও ধর্মীয় কাজে নিয়ােজিত দলগুলাের নীতি ও কর্মপন্থার যে বিরােধ তা বােধহয় দূর করা সম্ভব। কারণ, সবার লক্ষ্য অভিন্ন।

আর লক্ষ্য অর্জনে সফলতার জন্য তা অপরিহার্য। যদি আমরা ইসলামের বুনিয়াদি উসূল ও মৌলনীতি সংরক্ষণ এবং নাস্তিকতা ও ধর্মহীনতার স্রোত মােকাবেলাকে সত্যিকার অর্থে মূল লক্ষ্য মনে করি তাহলে এটিই সেই ঐক্যের বিন্দু যেখানে এসে মুসলিমদের সব ফের্কা ও দল একত্র হয়ে কাজ করতে পারে। আর তখনই এই স্রোতের বিপরীতে কোনাে বলিষ্ঠ পদক্ষেপ কার্যকর হতে পারে।

কিন্তু বাস্তব দিকে তাকালে বলতে হয়, এই মূল লক্ষ্যটিই আমাদের দৃষ্টি থেকে গায়েব হয়ে গেছে। এ কারণে আমাদের সমস্ত সামর্থ্য এবং জ্ঞান ও গবেষণার সমুদয় শক্তি নিজেদের ইখতিলাফি মাসআলায় ব্যয় হচ্ছে। ওগুলােই আমাদের ওয়াজ, জলসা, পত্রিকা ও বই-পুস্তকের আলােচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আমাদের এমন কর্মকাণ্ডে সাধারণ মানুষ এ কথা মনে করতে বাধ্য হচ্ছে যে, ইসলামধর্ম শুধু এই দুই-চার জিনিসের নাম। আরও আক্ষেপের বিষয় এই যে, ইখতিলাফি মাসআলাসমূহে যে দিকটি কেউ অবলম্বন করেছে তার বিপরীতটিকে গােমরাহি এবং ইসলামের সাথে শত্রুতা আখ্যা দিচ্ছে।

ফলে আমাদের যে শক্তি কুফর, নাস্তিকতা, ধর্মহীনতা এবং সমাজে বাড়তে থাকা বেহায়াপনার মােকাবেলায় ব্যয় হতে পারত তা এখন পারস্পরিক কলহবিবাদে ব্যয় হচ্ছে।

ইসলাম ও ঈমান আমাদের যে ময়দানে লড়াই ও আত্মত্যাগের আহ্বান জানায় সেই ময়দান শত্রুর আক্রমণের জন্য খালি পড়ে আছে। আমাদের সমাজ অপরাধ ও অন্যায়ে ভরপুর, আমলআখলাক বরবাদ, চুক্তি ও লেনদেনে ধোঁকাবাজি, সুদ, জুয়া, মদ, শূকর, অশ্লীলতা, নির্লজ্জতা ও অপরাধপ্রবণতা আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মিশে গেছে।

প্রশ্ন হলাে, আম্বিয়া কেরামের বৈধ উত্তরসূরি এবং দেশ ও ধর্মের প্রহরীদের নিজেদের মধ্যকার মতপার্থকের বেলায় যতটা সংক্ষুব্ধ হতে দেখা যায় তার অর্ধেকও কেন সেসব খােদাদ্রোহিদের বেলায় দেখা যায়?

আমাদের বাকশক্তি এবং লেখনীশক্তি যেমন শৌর্যবীর্যের সাথে নিজেদের ইখতিলাফি মাসআলায় লড়াই করে তার সামন্যতম অংশও কেন ঈমানের মৌলিক বিষয়ের উপর আনা হুমকির মােকাবেলায় ব্যয় হয় না? মুসলিমদের মুরতাদ বানানাের প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে আমরা সবাই কেন সিসাঢালা প্রাচীরের মতাে রুখে দাঁড়াই না?

সর্বোপরি আমরা এ বিষয়ে কেন চিন্তা করি না যে, নবী প্রেরণ ও কুরআন নাযিলের ওই মহান উদ্দেশ্য, যা পৃথিবীতে বিপ্লব সৃষ্টি করেছে এবং যা পরকে আপন বানিয়ে নিয়েছে, যা আদম সন্তানদের পশুত্ব থেকে মুক্ত করে মানবতার মর্যাদা দিয়েছে এবং যা সমগ্র দুনিয়াকে ইসলামের আশ্রয়কেন্দ্র বানিয়েছে তা কি শুধু এসব বিষয়ই ছিল, যার ভেতরে আমরা লিপ্ত এবং অন্যদের হেদায়েতের পথে আনার তরীকা ও পয়গম্বরসুলভ দাওয়াত দেওয়ার কি এটাই ছিল ভাষা, যা আজ আমরা অবলম্বন করেছি?

এজন্য জাতির প্রতি সংবেদনশীল ইমান ও ইসলামের উসুল ও মাকসাদসমূহের প্রতি সচেতন উলামায়ে কেরামের কাছে আমার ব্যথাভরা নিবেদন, মাসাদের গুরুত্ব ও নাযুকতাকে সামনে রেখে সবার আগে মন থেকে এই অঙ্গীকার করুন যে, নিজেদের ইলমী ও আমলী যােগ্যতা এবং কথা ও কলমের শক্তিকে বেশির থেকে বেশি ওই ময়দানে নিয়ােজিত করবেন, যার সংরক্ষণের জন্য কুরআন ও হাদীস আপনাদের ডাকছে।

১.সম্মানিত উলামা! এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিন এবং প্রতিজ্ঞা করুন যে, এ কাজের জন্য নিজের ব্যস্ততার মধ্যে থেকে বেশির থেকে বেশি সময় বের করবেন।

২. পরস্পর দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য ও ইজতিহাদি বিরােধকে কেবল নিজেদের দরস এবং লেখালেখি ও ফতােয়া পর্যন্ত সীমিত রাখবেন। আমজলসা, পত্রপত্রিকা, বিজ্ঞপ্তি, পরস্পর বিতর্ক ও ঝগড়া-বিবাদের মাধ্যমে তাকে বড় করবেন না। নবীদের মতাে দাওয়াত ও ইসলামের নীতির অধীনে কষ্টদায়ক ভাষা, নিন্দা, উপহাস, আক্রমণ ও সাংবাদিকদের মতাে বাক্যচালনা থেকে বিরত থাকবেন।

৩. সমাজে ছড়িয়ে পড়া ব্যাধিসমূহের প্রতিকারের জন্য হৃদয়গ্রাহী শিরােনামে স্নেহ ও আন্তরিকতাপূর্ণ ভাষা ও আঙ্গিকে কাজ শুরু করুন।

নাস্তিকতা ও ধর্মহীনতা এবং কুরআন-সুন্নাহর বিকৃতির মােকাবেলার জন্য পয়গম্বরদের দাওয়াতের নীতি অনুসারে প্রজ্ঞাপূর্ণ কৌশল, আন্তরিকতাপূর্ণ আলােচনা এবং হৃদয়গ্রাহী দলিল-প্রমাণের মাধ্যমে এর সঙ্গে নিজের মুখের ভাষা ও কলমের শক্তিকে ওয়াকফ করে দিন।

খুবই আফসােস হচ্ছে যে, যা কিছু বললাম আসলে সেসব বলার যােগ্য আমি নই। আলেমদের সামনে এমন দুঃসাহস দেখানােও আমার জন্য সাজে না। কিন্তু ব্যথিত অন্তরের কিছু কথা মুখে চলে এসেছে। মুহতারাম মুরুব্বিরা আশা করি আমাকে ক্ষমা করবেন। আমার বক্তব্যে যদি ভালাে কিছু থাকে তবে তাদের দায়িত্ব হলাে সেটা গ্রহণ করে নেওয়া।

আমি আশা করি যদি উলামায়ে কেরাম এদিকে একটু মনােযােগী হােন এবং কাজ শুরু করেন তবে আল্লাহ তাআলার ওয়াদা ‘أن تنصر الله ينصركم’ যদি তােমরা আল্লাহকে সাহায্য করাে তবে তিনি তােমাদের সাহায্য করবেন এর বাস্তবায়ন স্বচক্ষে দেখবেন ইনশাআল্লাহ।

সম্পাদনা : রকিব মুহাম্মদ

1 COMMENT

আপনার মন্তব্য