নারীদের শিক্ষা-দীক্ষা : ইসলাম কী বলে?

মুফতী মনসূরুল হক দা.বা.

আল্লাহ তা‘আলার বিধানে মেয়েদের জাগতিক বিষয়াবলীতে সাদাসিধা থাকা এবং বেশি চতুর না হওয়া মর্যাদার বিষয়। এর ব্যতিক্রম হলে তা হবে তাদের মান-মর্যাদা ক্ষুণ্ণকারী। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে-

ان الذين يرمون المحصنت الغفلت الخ-

উক্ত আয়াতে মু‘মিন মহিলাদের গুণাবলীর অন্যতম গুণ হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। الغفلت অর্থাৎ জাগতিক বিষয়াবলীতে গাফেল বা সাদাসিধা।
তাছাড়া যে সব ত্রুটির কারণে অধিকাংশ মেয়েলোককে জাহান্নামী বলা হয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম একটি ত্রুটি হলো চালাক-চতুর হয়ে স্বামীকে বিভ্রান্তির মধ্যে ফেলা এবং তার অবাধ্য হওয়া। (বুখারী শরীফ, ১/ ৯)

আর আধুনিক শিক্ষার দ্বারা মেয়েরা খুবই দুরুস্ত ও চতুর হয়ে এ ক্ষতির মধ্যে পতিত হয়। সুতরাং, বৈষয়িক শিক্ষা নাবালেগ অবস্থায় প্রয়োজন মাফিক দেয়াই যথেষ্ট। এর থেকে বেশি তাদের জন্য শোভনীয় নয় বরং তা তাদের মর্যাদা ক্ষুণ্ণকারী।

সুতরাং, উক্ত আয়াতের আলোকে বৈষয়িক শিক্ষা যত বেশি দেয়া হবে ততই তাদের মান-মর্যাদা আল্লাহর নিকট এবং আল্লাহওয়ালাদের নিকট কমতে থাকবে। (ইসলাহে ইনকিলাবে উম্মত-১/ ৩১৪)

ইংরেজরা নারী-পুরুষ সকলের একই সিলেবাস চালু করেছে। এটা তাদের নির্বুদ্ধিতার স্পষ্ট প্রমাণ। এ ব্যাপারে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি হল, যেহেতু উভয়ের কর্মক্ষেত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন; সুতরাং প্রত্যেকের শিক্ষা কারিকুলাম এমন হবে যা তার কর্মক্ষেত্রের সাথে সংগতিপূর্ণ। আর এটাই যুক্তিযুক্ত।

হ্যাঁ, কুরআন-হাদীসের শিক্ষা অর্জন করা প্রত্যেক নর-নারীর উপর ফরয। হাদীসে ইরশাদ হয়েছে-

طلب العلم فريضة على كل مسلم

অর্থ: ইলমে দ্বীন অর্জন করা প্রত্যেক মুসলমানের উপর ফরয। (ইবনে মাজাহ, ২০)

বর্ণিত হাদীসে ইলম দ্বারা ইলমে দ্বীন বুঝানো হয়েছে- বৈষয়িক বিদ্যা নয়। কাজেই বৈষয়িক বিদ্যা তথা ব্যারিস্টার, ইঞ্জিনিয়ার ইত্যাদি হওয়ার পিছনে অযথা সময় ব্যয় না করে দ্বীনী ইলম এবং সাংসারিক বিদ্যা শিক্ষা করা মেয়েদের জন্য জরুরী, যা তার কাজে আসবে।

হাদীসে আরো ইরশাদ হয়েছে-

الدنيا كلها متاع وخير متاع الدنيا المرأة الصالحة

অর্থ: পৃথিবী পুরোটাই হল সম্পদ, আর পৃথিবীর সর্বোত্তম সম্পদ হল পুণ্যবতী মহিলা। (মুসলিম শরীফ, ১/ ৪৭৫)

এ হাদীস দ্বারা বুঝা গেল যে, প্রত্যেক পিতার দায়িত্ব হলো, তার মেয়ের দ্বীনদারী সহ সকল ক্ষেত্রে এমনভাবে গড়ে তোলা যে, পরবর্তীকালে তাকে যেন তার স্বামী দুনিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ নেয়ামত বলতে বাধ্য হয়। কাজেই উক্ত হাদীসের ভাষ্যনুযায়ী মেয়েকে ইলমে দ্বীন শিক্ষা দিয়ে পুণ্যবতী বানানো জরুরী।

কুরআন কারীমে ইরশাদ হয়েছে- وقرن فى بيوتكن

অর্থ: মহিলারা নিজ গৃহে অবস্থান করবে। উক্ত মূলনীতির আলোকে প্রতীয়মান হয় যে, মহিলারা ঘরে চার দেয়ালের ভিতরে অবস্থান করে দ্বীনী ইলম অর্জন কবে। এটাই পর্দার সহায়ক এবং নিরাপদ।

(ক) কাজেই মহিলারা নিজ গৃহে স্বীয় মাহরাম পুরুষ তথা বাপ, দাদা, চাচা, নানা, ভাই, মামা প্রমুখের নিকট থেকে ইলমে দ্বীন অর্জন করবে।

(খ) মাহরামদের মধ্যে যোগ্য আলেম ব্যক্তি পাওয়া না গেলে মহিলারা মহল্লার কোন দ্বীনদার আলেমা মহিলার কাছে গিয়ে নির্দিষ্ট সময়ে কুরআন ও ইলমে দ্বীন শিখবে এবং পড়া বা পাঠ সমাপ্ত করেই বাড়ীতে ফিরে আসবে। উক্ত বাড়ীতে পাঠ্য কার্যক্রম ব্যতীত বেশি সময় অবস্থান করবে না। এভাবে দৈনন্দিন যাওয়া আসা করে ইলমে দ্বীন অর্জন করবে।

(গ) দ্বীনদার আলেমা মহিলাও পাওয়া না গেলে স্বীয় মাহরামের সাথে, পর্দার সাথে কোন হক্কানী আলেমের নিকট গিয়ে ইলম শিখবে। অতঃপর পড়া বা সবক শেষ করে চলে আসবে। অর্থাৎ অনাবাসিকভাবে ইলমে দ্বীন ও জরুরী মাসায়িল শিক্ষা করবে।

হাদীসের বিভিন্ন কিতাবে পাওয়া যায় যে, সাহাবায়ে কিরামের রা. মহিলাগণ মাসআলা মাসায়িল জানার উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে উপস্থিত হন এবং তাদের জন্য একটি দিন নির্দিষ্ট করার আবেদন জানান। তাঁদের আবেদনের প্রেক্ষিতে তাঁদের তা‘লীম তরবিয়তের লক্ষ্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম সপ্তাহে একদিন এক বাড়ীতে নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণও করে দিয়েছিলেন। (বুখারী শরীফ,১/২০,২১)

বর্ণিত পদ্ধতিগুলোর যে কোন একটির মাধ্যমে মহিলারা ইলমে দ্বীন শিক্ষা করবে এতে আলেমগণের মতানৈক্য নেই। হাকীমুল উম্মত হযরত থানভী রহ.ও থানা ভবনে দ্বিতীয় পদ্ধতি চালু করেছিলেন। (ইসলাহে খাওয়াতীন, ৪৩৮)

তবে প্রচলিত আবাসিক মহিলা মাদরাসা যেখানে বিভিন্ন ধরনের মেয়েরা একত্রে দীর্ঘদিন বসবাস করে, যেখানে পরহেযগার দ্বীনদার মহিলা এবং পূর্ণ দ্বীনদার নয় এমন মহিলাও পরস্পর একত্রে অবস্থান করে। অথচ পুরুষ শিক্ষকগণ পর্দার কারণে তাদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে পারেন না।

অপরদিকে মহিলা শিক্ষিকাগণ মেয়েদের নিয়ন্ত্রণ করার তেমন যোগ্যতা রাখেন না। এই সুযোগে ভাল-মন্দ ঘরের মেয়েরা অবাধে আলাপ আলোচনা করে, এমনকি অশ্লীল আলোচনা করতেও তারা দ্বিধাবোধ করে না। এতে মন্দের সুহবতে ভাল ঘরের মেয়েরাও দুশ্চরিত্রা হয়ে যাওয়ার প্রবল আশংকা থাকে।

কাজেই এ ধরনের আবাসিক মহিলা মাদরাসায় বহুবিধ ক্ষতির দিক রয়েছে বিধায় মুহাক্কিক উলামায়ে কিরাম প্রচলিত আবাসিক মহিলা মাদরাসাকে পছন্দ করেন না। (ফাতাওয়ায়ে রাহীমিয়া, ৯/৪৫,আওরত কী ইসলামী যিন্দেগী, ৭০)

Leave a Reply

Your email address will not be published.

%d bloggers like this: