১০টি হারাম কাজ যা এখনই পরিহার আবশ্যক!

হারাম কাজ

মাওলানা সাঈদ আল হাসান
লেখক ও সম্পাদক


হারাম আরবি শব্দ যার অর্থ নিষিদ্ধ। হারাম বলা হয় এমন জিনিসকে যা কুরআন ও সুন্নাহের মাধ্যমে নিষিদ্ধ হয়েছে এবং এই নিষিদ্ধ কাজগুলো পরিহার করলে মানুষ ইহকালিন ও পরকালিন শান্তি ও মুক্তি লাভ করবে। এবং তা উপকারীও বটে। সেটা শারীরিকভাবে হোক বা মানসিকভাবে।  কাজেই হারাম বিষয়গুলো থেকে আমাদেরকে অবশ্যই দূরে থাকতে হবে। নিম্নে কিছু হারাম বিষয়ের তালিকা তুলে ধরা হলো;

১) গান শোনা: গান শোনা কবিরা গুনাহ। কিন্তু আমরা অনেকে তা মানতেই রাজি না। কিন্তু বড় বড় আলেমগণ একে হারাম বলেই সাব্যস্ত করে থাকেন। ইমাম মুহাম্মদ রহ. জামে সগীর গ্রন্থর ১৩৯ পৃষ্ঠায় বলেন, হযরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আমার উম্মত যেনো বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার থেকে মুক্ত থাকে।

বাজনাদার নুপুর ও ঘুঙুরের আওয়াজও সাহাবায়ে কেরাম বরদাশত করতেন না। তাহলে গান ও বাদ্যযন্ত্রের প্রশ্নই কি অবান্তর নয়? নাসাঈ ও সুনানে আবু দাউদে বর্ণিত আছে, একদিন হযরত আয়েশা রা.-এর নিকট বাজনাদার নুপুর পরে কোনো বালিকা আসলে আয়েশা রা. বললেন, খবরদার, তা কেটে না ফেলা পর্যন্ত আমার ঘরে প্রবেশ করবে না। অতঃপর তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যে ঘরে ঘণ্টি থাকে সেই ঘরে রহমতের ফেরেশতা প্রবেশ করে না।-সুনানে আবু দাউদ হাদীস : ৪২৩১; সুনানে নাসাঈ হাদীস : ৫২৩৭

সহীহ মুসলিমে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ঘণ্টি, বাজা, ঘুঙুর হল শয়তানের বাদ্যযন্ত্র।-সহীহ মুসলিম হাদীস : ২১১৪ মৃদু আওয়াজের ঘণ্টি-ঘুঙুরের যদি এই অবস্থা হয় তাহলে আধুনিক সুরেলা বাদ্যযন্ত্রের বিধান কী হবে তা খুব সহজেই বুঝা যায়।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও ইরশাদ করেন,আমার উম্মতের কিছু লোক মদের নাম পরিবর্তন করে তা পান করবে। আর তাদের মাথার উপর বাদ্যযন্ত্র ও গায়িকা রমনীদের গান বাজতে থাকবে। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে যমীনে ধ্বসিয়ে দিবেন এবং তাদের কতককে বানর ও শূকরে রূপান্তরিত করবেন।-সুনানে ইবনে মাজাহ হাদীস : ৪০২০;সহীহ ইবনে হিব্বান হাদীস : ৬৭৫৮।

২) নিজকে বা অন্যকে আঘাত করা: নিজের শরীরে- গায়ে আঘাত করা। দুঃখ বা কষ্ট পেলে নিজের বুকে-মুখে আঘাত করা। এটা সম্পূর্ণ হারাম। অন্যকে আঘাত করার ব্যাপারেও একই কথা। আল্লাহ বলেন,

হে ঈমানদারগণ! তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না। কেবলমাত্র তোমাদের পরস্পরের সম্মতিক্রমে যে ব্যবসা করা হয় তা বৈধ। আর তোমরা নিজেদের কাউকে হত্যা করো না। নিঃসন্দেহে আল্লাহ তা’আলা তোমাদের প্রতি দয়ালু। (সুরা নিসা-২৯)

৩) মদ ও জুয়া খাওয়া হারাম: মদ ও জুয়া ইসলামের সবচেয়ে বড় পাপগুলোর মধ্যে একটি। আল্লাহ ও তার নবী সা. আমাদের মদ খাওয়া থেকে নিষেধ করেছেন।

কুরআনে মহান আল্লাহপাক ইরশাদ করেছেন, হে ঈমানদারগণ! মদ, জুয়া, মূর্তি পূজার বেদী ও ভাগ্য নির্ণায়ক শরসমূহ এ সমস্তই হচ্ছে ঘৃণ্য শয়তানী কার্যকলাপ। এগুলো থেকে দূরে থাক, আশা করা যায় তোমরা সফলতা লাভ করবে। (সূরা- মায়েদা, আয়াত- ৯০)

হযরত আব্দুল্লাহ বিন উমর রাঃ থেকে বর্ণিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, প্রতিটি মাতাল করে দেয়া বস্তুই মদ। আর প্রতিটি মদই হারাম। [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-২০০৩, ইবনে মাজাহ, হাদীস নং-৩৩৯০, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-৪৮৩০]

৪) সুদ দেওয়া ও নেওয়া হারাম: রিবা (সুদ) ইসলামে কখনোই অনুমোদিত নয়। কেননা এটাও আল্লাহপাক হারাম করেছেন। সুদের মাধ্যমে মূলত সমাজে দরিদ্র বাড়ে।

পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহপাক ইরশাদ করেছেন, “কিন্তু যারা সুদ খায় তাদের অবস্থা হয় ঠিক সেই লোকটির মতো যাকে শয়তান স্পর্শ করে পাগল করে দিয়েছে। তাদের এই অবস্থায় উপনীত হবার কারণ হচ্ছে এই যে, তারা বলে, ব্যবসা তো সুদেরই মতো।

অথচ আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করে দিয়েছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম। কাজেই যে ব্যক্তির কাছে তার রবের পক্ষ থেকে এই নসীহত পৌঁছে যায় এবং ভবিষ্যতে সুদখোর থেকে সে বিরত হয়, সে ক্ষেত্রে যা কিছু সে খেয়েছে তাতো খেয়ে ফেলেছেই এবং এ ব্যাপারটি আল্লাহর কাছে সোপর্দ হয়ে গেছে। আর এই নির্দেশের পরও যে ব্যক্তি আবার এই কাজ করে, সে জাহান্নামের অধিবাসী। সেখানে সে থাকবে চিরকাল।” (সুরা- বাকারা, আয়াত- ২৭৫)

৫) মুসলমানকে গালি দেয়া বা হত্যা করা হারাম: কোন মুসলমানকে দেয়া জায়েজ নয়। এটি ফাসেকী। আর হত্যা তো আরও জঘন্য। বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়াতে আমরা যাকে তাকে উদ্দেশ্য করে গালির বন্যা বইয়ে দেই এটা মারাত্মক গোনাহ হচ্ছে।

বর্তমানে আলেমগণ ট্রল করাকেও হারামের তালিকায় গণনা করছেন। কারণ শরয়ী ওজর ছাড়া কোন মুসলমানের সম্মানহানী করা জায়েজ নয়। কাজেই এ থেকে বিরত থাকা কর্তব্য।

হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসঊদ রাঃ থেকে বর্ণিত। রাসূল সাঃ ইরশাদ করেছেন, মুসলমানকে গালি দেয়া ফাসেকী। আর তাকে হত্যা করা কুফরী। {বুখারী, হাদীস নং-৬০৪৪]

৬) হস্তমৈথুন করা হারাম: হস্তমৈথুন করা ইসলামে নিষিদ্ধ। হাদীসে এই ব্যাপারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা এসেছে। নিশ্চিত সম্ভাবনা থাকলেও গোনাহ থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করাটাই হল উত্তম। তখন অযু করে নামাযে দাঁড়িয়ে যাওয়া। বা এসব চিন্তা মন থেকে দূর করে মৃত্যুর কথা স্মরণ করলে এ গোনাহ থেকে বেঁচে থাকা সম্ভব।

فى كنز العمال فى سنن الأقوال والأفعال- ألا لعنة الله والملائكة والناس أجمعين على من انتقص شيئا من حقي، ………. وعلى ناكح يده، (كنز العمال فى سنن الأقوال والأفعال- تابع كتاب المواعظ والحكم، باب الترهيب الأحادي من الإكمال، فصل- الترهيب العشاري فصاعدا من الإكمال، رقم الحديث–44057)

৭) আল্লাহর নাম ছাড়া কোনো প্রাণী জবেহ করা হারাম: যে কোনো পশু জবেহ করার সময়ই আল্লাহর নাম নিতে হবে। আল্লাহর নাম না নিয়ে পশু যবেহ করলে সেটা হারাম হবে।

পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহপাক ইরশাদ করেছেন, যেসব জন্তুর উপর আল্লাহর নাম উচ্চারিত হয় নি, সেগুলো থেকে ভক্ষণ করো না; এ ভক্ষণ করা গোনাহ। নিশ্চয় শয়তানরা তাদের বন্ধুদেরকে প্রত্যাদেশ করে-যেন তারা তোমাদের সাথে তর্ক করে। যদি তোমরা তাদের আনুগত্য কর, তোমরাও মুশরেক হয়ে যাবে। {সুরা আনআম-১২১}

একটি হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো নামে যবেহ করে তার ওপর আল্লাহর লানত। (সহীহ মুসলিম)

৮) ট্যাটু লাগানো হারাম: এটা ইসলামে নিষিদ্ধ একটি বিষয়। কেননা আল্লাহপাক মানুষকে সব থেকে বেশি সুন্দর করে সৃষ্টি করেছেন। এই সৃষ্টির মধ্যে অন্য কিছু তৈরি করা এটা ইসলামে নিষিদ্ধ।

হজরত ইবনে উমার (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে নারী পরচুলা লাগিয়ে দেয় এবং যে পরচুলা লাগাতে বলে, আর যে নারী অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে উল্কি বা ট্যাটু আঁকে বা আঁকতে বলে তাদেরকে অভিশাপ করেছেন। (সহীহ বুখারী)

৯) আত্মহত্যা করা হারাম : আত্মহত্যা মহাপাপ। এ কাজ থেকে বিরত থাকতে মহান আল্লাহপাক বিশেষভাবে নির্দেশ দান করেছেন এবং আত্মহত্যার পরিণামের কথা ভাববার জন্য কঠোর ও যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির বর্ণনা দিয়ে মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন,

“আর তোমরা নিজেদের হত্যা করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের প্রতি দয়ালু। এবং যে কেউ জুলুম করে, অন্যায়ভাবে উহা (আত্মহত্যা) করবে, অবশ্য আমি তাকে অগ্নিদগ্ধ করব, আল্লাহর পক্ষে উহা সহজসাধ্য।” (সূরা-নিসা-২৯-৩০)

১০) বেগানা মেয়ের দিকে দৃষ্টিপাত ও কথাবার্তা ইত্যাদি হারাম : বেগানা অথবা গায়রে মাহরাম মেয়ের সাথে দেখা দেয়া, কথা বলা, তাকানো বা তাকে স্পর্শ বা টিজ করা ইত্যাদি সকল কাজই হারাম ও গর্হিত কর্ম।  এই হারাম কাজগুলি কতটা ব্যাপক আকার ধারণ করেছে তা স্পষ্ট। আমাদের এর থেকে বিরত থাকা কর্তব্য।

الْعَيْنَانِ زِنَاهُمَا النَّظَرُ، وَالْأُذُنَانِ زِنَاهُمَا الِاسْتِمَاعُ، وَاللِّسَانُ زِنَاهُ الْكَلَامُ، وَالْيَدُزِنَاهَا الْبَطْشُ، وَالرِّجْلُ زِنَاهَا الْخُطَا، وَالْقَلْبُ يَهْوَى وَيَتَمَنَّى، وَيُصَدِّقُ ذَلِكَ الْفَرْجُ وَيُكَذِّبُهُ

রাসূল সাঃ ইরশাদ করেন, চোখের জিনা হল [হারাম] দৃষ্টিপাত। কর্ণদ্বয়ের জিনা হল, [গায়রে মাহরামের যৌন উদ্দীপক] কথাবার্তা মনযোগ দিয়ে শোনা। জিহবার জিনা হল, [গায়রে মাহরামের সাথে সুড়সুড়িমূলক] কথোপকথন। হাতের জিনা হল, [গায়রে মাহরামকে] ধরা বা স্পর্শকরণ। পায়ের জিনা হল, [খারাপ উদ্দেশ্যে] চলা। অন্তর চায় এবং কামনা করে আর লজ্জাস্থান তাকে বাস্তবে রূপ দেয় [যদি জিনা করে] এবং মিথ্যা পরিণত করে [যদি অন্তরের চাওয়া অনুপাতে জিনা না করে]। {সহীহ মুসলিম, হাদীস নং-২৬৫৭, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং-৮৯৩২}

আপনার মন্তব্য