ভরণপোষণই যথেষ্ট না : স্ত্রীর মানসিক বিনোদনের ব্যবস্থা করাও স্বামীর জন্যে আবশ্যক

স্ত্রীর মানসিক বিনোদনের ব্যবস্থা করা স্বামীর দায়িত্ব

আলেমা মাহবুবা আক্তার জান্নাত


স্বামীর উপর স্ত্রীর অর্থনৈতিক তথা খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থানের অধিকারের পাশাপাশি আরও কিছু অধিকার রয়েছে, যেগুলো অপূর্ণ থেকে গেলে স্বামী-স্ত্রীর মাঝে দূরত্ব সৃষ্টি হতে পারে বা বৈবাহিক সম্পর্কের স্থায়িত্ব হুমকির মুখে পড়তে পারে। স্ত্রীর মানসিক বিনোদন তার অন্যতম। একজন স্ত্রী তার স্বামীর কাছ থেকে শুধু ভরণ-পোষণে তুষ্ট থাকতে পারে না। বরং স্বামীর কাছে তার আরও কিছু চাওয়া-পাওয়া আছে। সেগুলো সে পূর্ণভাবে পেতে চায়। কোনো স্ত্রী যদি সত্যিকার অর্থে স্বামীভক্ত হয়, তাহলে সে তার স্বামীকে মনে প্রাণে ভালোবাসে, স্বামীকে নিয়ে সে তার স্বপ্নের সৌধ নির্মাণ করে। সে ক্ষেত্রে স্ত্রীও চায় তার স্বামী তাকে ভালোবাসুক, তার প্রতি আলাদাভাবে খেয়াল করুক, তাকে কেয়ার করুক, তাকে গুরুত্ব দিক, তার সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলুক এবং আবেগপূর্ণ আচরণ করুক।

স্বামীভক্ত কোনো স্ত্রী যদি তার স্বামীর কাছ থেকে এসব অধিকার না পায় অথবা কোনো কারণে সে তা থেকে বঞ্চিত হয়, তখন সে মারাত্মকভাবে অপমান বোধ করে এবং মানসিকভাবে আহত হয়। স্বামী-স্ত্রীর ভালোবাসাপূর্ণ সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার কিংবা হালকা হওয়ার এটাও একটি কারণ। অনেক স্বামী আছেন, স্ত্রীর এসব বিষয়ের প্রতি খেয়াল করেন না; বরং তারা ভরণ-পোষণটাকেই বড় কিছু মনে করেন। তাদের ধারণা, স্ত্রীর খরচ বহন করা, তার ভাত-কাপড়ের ব্যবস্থা করা, তাকে বাসস্থান দেয়া হলেই তার প্রতি সবটুকু দায়িত্ব পালন হয়ে যায়। তারা নিজেদের বিনোদনের জন্য বন্ধু-বান্ধবদের সাথে বিনোদন ও নিয়মিত সময় কাটান। কিন্তু স্ত্রীর মানসিক প্রত্যাশার ব্যাপারটার প্রতি একদম খেয়াল করেন না। এটা স্ত্রীদের প্রতি একপ্রকার জুলুম।

স্ত্রীদের বিনোদনের সুযোগ করে দেয়া, তার মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি লক্ষ রাখা স্বামীর উপর স্ত্রীর হক বা অধিকার। ইসলামি শরিয়ত স্ত্রীর মানসিক বিনোদনের প্রতি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। স্ত্রীর ভরণপোষণ যেমন স্বামীর দায়িত্বে, তেমনি তার মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি খেয়াল রাখাও তার দায়িত্বে। তাই স্ত্রীদের বিনোদনের জন্য প্রয়োজনীয় বিনোদন আয়োজনের ব্যবস্থা করে দেয়াও স্বামীর নৈতিক দায়িত্ব। বিবাহের দ্বারা জৈবিক চাহিদা পূরণ হয় ঠিক তবে বিবাহটা শুধু জৈবিক ও বৈষয়িক চাহিদার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং বিবাহের প্রধান উদ্দেশ্য হলো, স্বামী-স্ত্রী উভয়ের মাঝে ভালোবাসাপূর্ণ ও আবেগময় পারিবারিক একটা ব্যবস্থা ও সম্প্রীতি গড়ে ওঠা।

কুরআনে কারীমের একাধিক আয়াতের মাধ্যমে এ বিষয়টি বুঝে আসে। যেমন, সুরা রূমের ২১ নং আয়াতে বলা হয়েছে-

وَمِنْ ءَايَـٰتِهِۦٓ أَنْ خَلَقَ لَكُم مِّنْ أَنفُسِكُمْ أَزْوَ‌ٰجًۭا لِّتَسْكُنُوٓا۟ إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُم مَّوَدَّةًۭ وَرَحْمَةً ۚ إِنَّ فِى ذَ‌ٰلِكَ لَءَايَـٰتٍۢ لِّقَوْمٍۢ يَتَفَكَّرُونَ [٣٠:٢١]

‘আর আরেক নিদর্শন এই যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের সঙ্গিনীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তিতে থাকতে পার এবং তিনি তোমাদের মাঝে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয় এতে চিন্তাশীল লোকদের জন্য নিদর্শনাবলী রয়েছে’। [সুরা রুম : ২১]

এই আয়াত থেকে একথা স্পষ্ট বুঝে আসে যে, স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বৈবাহিক সম্পর্কের মূল ভিত্তি হলো শান্তি, স্বস্তি, দয়া ও ভালোবাসা। হাদিস শরিফে আছে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘যদি কোনো স্বামী স্ত্রীর দিকে দয়া ও ভালোবাসার দৃষ্টিতে তাকায় তাহলে আল্লাহ তাআলা তার দিকে দয়া ও রহমতের দৃষ্টি নিয়ে তাকান’। এই হাদিস দ্বারা বুঝা যায় যে, স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা তাদের প্রতি রহম করা ইসলামি শরিয়তের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আর এ বিষয়গুলো সম্পূর্ণই মানসিক উপাদান, বৈষয়িক উপাদান নয়। এই বিষয়গুলোর অনুপস্থিতিতে বৈবাহিক জীবন অর্থহীন হয়ে পড়ে। দাম্পত্য জীবন রসকষহীন বোঝাতে পরিণত হয়। বিবাহটা জাস্ট দৈহিক চাহিদা পূরণের উপকরণ হয়ে যায়। তাই ইসলাম স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক আবেগ ভালোবাসা কেন্দ্রিক চাহিদাগুলোর প্রতি যত্নবান হতে নির্দেশ দিয়েছে।

স্ত্রীর মানসিকতার প্রতি লক্ষ্য রাখা আদর্শ স্বামীর একান্ত দায়িত্ব। যেমন, স্ত্রী কোনো কাজ করতে পছন্দ করলে তাকে সে কাজ করতে সুযোগ করে দেয়া, প্রতিদিন কিছু সময় স্ত্রীর সাথে হাসি মজাক করা, তাকে নিয়ে বাড়ির ছাদে বা ঘরের আঙ্গিনায় পায়চারি করা, তাকে সমুদ্র সৈকত, চিড়িয়াখানা, জাদুঘর বা কোনো দর্শনীয় স্থানে নিয়ে যাওয়া অথবা বিদেশ ভ্রমণের সময় স্ত্রীকে সঙ্গী করা। দু’জন মিলে একসাথে প্রাকৃতিক দৃশ্য যেমন, পূর্ণিমার চাঁদ, জ্যোৎস্না রাত, সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত ইত্যাদি উপভোগ করা। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে স্ত্রীর সাথে বৈধ কোনো খেলাধুলা করা ইত্যাদি।

হাদিস শরিফে আছে, তিন ধরণের খেলাধুলা বৈধ: তীর নিক্ষেপণ, ঘোড় প্রতিযোগিতা, স্ত্রীর সাথে খেলাধুলা’। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার স্ত্রীর সঙ্গে খেলাধুলা করতেন। হাদিস শরিফে আছে, ‘রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আয়েশা রা. এর সাথে দৌড় প্রতিযোগিতা করেছেন’। আয়েশাকে নিয়ে মসজিদে তিনি আবিসিনিয়দের খেলা দেখিয়েছেন। তিনি বলেছেন- ‘সে ব্যক্তি পূর্ণ মুমিন যার চরিত্র সুন্দর। তোমাদের মধ্যে সে-ই উত্তম যে তার স্ত্রীর কাছে উত্তম’। [রিয়াদুস সালিহীন ১/১৯৭]

প্রত্যেক স্ত্রীই তার স্বামীর কাছে ভালোবাসা চায়। স্বামীদের উচিত, স্ত্রীদের ভালোবাসা ও তাদের প্রতি দয়া প্রদর্শন করা। অনেক স্বামী আছে, স্ত্রীদের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করতে পারে না। অথচ স্ত্রীরা স্বামীদের কাছ থেকে ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ চায়। এই বিষয়টার প্রতি গুরুত্ব দেয়া জরুরি। স্ত্রীর কাজে প্রশংসা করতে হবে। তার প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করতে হবে। তাকে বুঝাতে হবে যে, তার স্বামী তাকে গুরুত্ব দিচ্ছে, কেয়ার করছে। তার সাথে বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ করতে হবে। সামান্য বিষয়গুলো তার সাথে শেয়ার করতে হবে। পারিবারিক যেকোনো সিদ্ধান্ত তার সাথে মাশওয়ারা ছাড়া করা যাবে না।

মোটকথা, স্বামীকে বিভিন্ন আচরণের দ্বারা একথা বুঝাতে হবে যে, সে তার স্ত্রীকে একজন রাঁধুনি বা দৈহিক আনন্দের উপকরণ ভাবছে না। বরং স্ত্রীকে সে তার জীবন-সংসার পরিচালনার ক্ষেত্রে তার প্রধান সহযোগী, সম্মানের ক্ষেত্রে তার বাচ্চাদের মা, বিপদাপদের ক্ষেত্রে জীবনসঙ্গিনী বা ঘনিষ্ঠ বন্ধু, আর ভালোবাসার ক্ষেত্রে প্রধান কেন্দ্রবিন্দু ভাবছে। এতে স্বামীর প্রতি তার ধারণা স্বচ্ছ হবে। স্বামীকে সে প্রাণ উজাড় করে ভালোবাসবে। তখনই সংসারে শান্তির সুবাতাস বইবে। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে বোঝার ও আমল করার তাওফিক দিন। আমীন।

আপনার মন্তব্য