কুরআন ও হাদীসের আলোকে মেয়েদের পর্দার হুকুম

মুফতি লুৎফুর রহমান ফরায়েজী
————————————

অনেকে বলে থাকেন যে, নবীর দেশ সৌদি আরবের মেয়েরা তো মুখ ঢেকে পর্দা করে না। সেখানেই যদি না করে, আমরা কেন করব?

আমরা এর উত্তর দিয়ে থাকি যে, আমাদের কাছে দলীল আরব রাষ্ট্র নয়। দলীল কুরআন ও সুন্নাহ এবং কুরআন সুন্নাহ থেকে ইজতিহাদকৃত ফুক্বাহায়ে কেরামের ফিক্বহ।

সুতরাং কোন্‌ দেশের মানুষ কি আমল করে, কি করছে না করছে, সেটি কোন মুসলিমের কাছে বিবেচ্য বিষয় হতে পারে না। বিবেচ্য হল কুরআন-সুন্নাহ এবং কুরআন-সুন্নাহ থেকে নির্গত ফিক্বহে ইসলামী।

ইসলামী পর্দা

কুরআনে কারীমের সাত আয়াত এবং হাদীসের প্রায় ৭০টি বর্ণনা দ্বারা জানা যায় যে, ইসলামী শরীয়তে মূল মাকসাদ এমন পর্দা, যার দ্বারা মহিলাদের চলাফেরা, তার পোশাক, তার বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্যের কিছুই বেগানা পুরুষের দৃষ্টিগোচর না হবে না।

এমন পর্দা পর্দাবৃত বাড়ি এবং সংশ্লিষ্ট পর্দার দ্বারাই সম্ভব। এটাই মহিলাদের আসল স্থান। এটিই পর্দার প্রথম স্তর। যা পবিত্র কুরআনে স্পষ্ট ভাষায় বর্ণিত হয়েছে।

১ وَقَرْنَ فِي بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُولَى

আর তোমরা অবস্থান কর তোমার বসবাসের গৃহে। নিজেদের মুর্খতার যুগের মহিলাদের মত প্রকাশ করো না। {সূরা আহযাব-৩৩}

এ আয়াত কি প্রকাশ করছে?

শুধু কাপড় চোপড় দিয়ে নিজেকে ঢেকে রাখাকেই যথেষ্ট মনে করবে না, বরং এমনভাবে পর্দা করবে যে, শরীরসহ কাপড়ও যেন পরপুরুষের সামনে প্রকাশিত না হয়। যেন কোন পরপুরুষের নজরই নারীর উপর নিবদ্ধ না হতে পারে। তবে প্রয়োজনের বিষয়টি ভিন্ন। তখন প্রয়োজনে বাহিরে যেতে পারবে।

وَإِذَا سَأَلْتُمُوهُنَّ مَتَاعًا فَاسْأَلُوهُنَّ مِنْ وَرَاءِ حِجَابٍ ذَلِكُمْ أَطْهَرُ لِقُلُوبِكُمْ وَقُلُوبِهِنَّ

অর্থ : আর তোমরা তাঁর (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর স্ত্রীগণের কাছে কিছু চাইলে পর্দার আড়াল থেকে চাইবে। এটা তোমাদের অন্তরের জন্য এবং তাঁদের অন্তরের জন্য অধিকতর পবিত্রতার কারণ। {সূরা আহযাব-৫৩}

বিখ্যাত তাফসীরবিদ ইমাম কুরতুবী রাহ. উক্ত আয়াতের আলোচনায় বলেন, উক্ত আয়াতে আল্লাহ তাআলা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রীদের কাছে কোনো প্রয়োজনে পর্দার আড়াল থেকে কিছু চাওয়া বা কোনো মাসআলা জিজ্ঞাসা করার অনুমতি দিয়েছেন। সাধারণ নারীরাও উপরোক্ত হুকুমের অন্তর্ভুক্ত। (তাফসীরে কুরতুবী ১৪/১৪৬)

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্ত্রীগণ হলেন সকল মুমিনের মা। অথচ তাঁদের সাথেই লেনদেন বা কথা-বার্তা বলতে হলে পর্দার আড়াল থেকে করতে বলা হয়েছে। তাহলে অন্যান্য সাধারণ বেগানা নারীদের ক্ষেত্রে হুকুমটি কত গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত তা তো সহজেই অনুমেয়।

লক্ষ্য করুন!

প্রথম আয়াতের মাঝে মহিলাদের ঘর থেকে বের হতেই নিষেধ করা হয়েছে প্রয়োজন ছাড়া। আর দ্বিতীয় আয়াতে যদি কোন পরপুরুষের মহিলাদের কাছে কোন চাওয়ার প্রয়োজন হয়, তাহলে পর্দার আড়াল থেকে চাওয়ার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

এই হল পর্দা বিষয়ক প্রথম নির্দেশনামূলক আয়াত।

দ্বিতীয় নির্দেশনামূলক আয়াত ও হুকুম

প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হওয়ার অনুমোদন দেয়া হয়েছে পর্দার সাথে।

পর্দার পরিমাণ কতটুকু?

ঘরে যেভাবে থাকতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে ঠিক সেভাবেই বাহিরে বের হতে চেষ্টা করবে এমন নির্দেশনা থাকাই কি যৌক্তিক নয়? যেখানে ঘর থেকে বের হতেই নিষেধ করা হয়েছে, সেখানে বাহিরে চেহারার সৌন্দর্য প্রকাশ করে বের হওয়ার অনুমতি কিভাবে দেয়া হতে পারে?

এ কারণেই নির্দেশনা এসেছে যে, এমন বড় কাপড় সারা শরীরে আবৃত করে বের হবে যে, শরীরের কোন অংশ বাহিরে প্রকাশিত না হয়। চেহারা, হাত-পা, মোটকথা, শরীরের কোন অংশ ও সাজগোজের সরঞ্জাম প্রকাশিত যেন না হয়।

রাস্তা দেখার জন্য শুধু চোখ খোলা রাখবে। বা চোখের সামনে নেট লাগিয়ে নিবে। যাতে করে রাস্তা দেখা যায়। এটাই শরয়ী পর্দা।

পর্দার প্রথম স্তরের মতই দ্বিতীয় স্তরের ব্যাপারেও সকল বিজ্ঞ ফুক্বাহায়ে কেরাম একমত পোষণ করেছেন।

দ্বিতীয় স্তরের নির্দেশনা সম্বলিত আয়াত-

يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُلْ لِأَزْوَاجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَاءِ الْمُؤْمِنِينَ يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِنْ جَلَابِيبِهِنَّ ذَلِكَ أَدْنَى أَنْ يُعْرَفْنَ فَلَا يُؤْذَيْنَ وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَحِيمًا (59

হে নবী! আপনি আপনার পতœীগণকে ও কন্যাগণকে এবং মুমিনদের স্ত্রীগণকে বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ নিজেদের উপর টেনে নেয়। [মাথার দিক থেকে] এতে তাদেরকে চেনা সহজ হবে। ফলে তাদেরকে উত্যক্ত করা হবে না। আল্লাহ ক্ষমাশীল পরম দয়ালু। {সূরা আহযাব-৫৯}

এ আয়াতে মহিলাদের জন্য ঘর থেকে বের হওয়ার পদ্ধতি শিখানো হয়েছে। কোন প্রয়োজনীয় কারণে ঘর থেকে বের হওয়ার সময়ও পর্দাহীন হবে না। বরং সে সময়ও স্বীয় চেহারার উপর পর্দা টেনে নিবে। যাতে করে চেহারা কারো দৃষ্টিগোচর না হয়।

কুরআনে কারীমে এমন স্পষ্ট শব্দে চেহারার উপর চাদর টেনে নেয়ার নির্দেশ থাকা সত্বেও ভিন্ন বক্তব্য দেয়ার কি সুযোগ আছে? যেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, চেহারার উপর চাদর টেনে নিবে। যাতে করে কেউ তার চেহারা দেখতে না পারে। সেখানে মুখ খুলে রাখার সুযোগ থাকার কথা কিভাবে বলা যায়? এটি কি কুরআনের আয়াতের সরাসরি খেলাফ হচ্ছে না?

উক্ত আয়াতের কারণেই মুখ ঢেকে রাখা মুসলিম নারীদের উপর ফরজ হয়েছে। এর বিপরীত করা জায়েজ নয়।

এই পর্দাই ইসলামের শুরু যুগ থেকে নিয়ে আজো পর্যন্ত দ্বীনদার মুসলিমদের মাঝে জারি আছে।

কয়েকটি হাদীস দেখা যেতে পারে-

عَنْ عَبْدِ الْخَبِيرِ بْنِ ثَابِتِ بْنِ قَيْسِ بْنِ شَمَّاسٍ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ جَدِّهِ، قَالَ: جَاءَتِ امْرَأَةٌ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُقَالُ لَهَا أُمُّ خَلَّادٍ وَهِيَ مُنْتَقِبَةٌ، تَسْأَلُ عَنِ ابْنِهَا، وَهُوَ مَقْتُولٌ، فَقَالَ لَهَا بَعْضُ أَصْحَابِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: جِئْتِ تَسْأَلِينَ عَنِ ابْنِكِ وَأَنْتِ مُنْتَقِبَةٌ؟ فَقَالَتْ: إِنْ أُرْزَأَ ابْنِي فَلَنْ أُرْزَأَ حَيَائِي،

হযরত আব্দুল খায়ের বিন সাবেত বিন কায়েস বিন শাম্মাস তার পিতা, তিনি তার দাদা থেকে বর্ণনা করেন যে, একদা এক মহিলা রাসূল সাঃ এর কাছে এলেন। যাকে উম্মে খাল্লাদ বলা হয়। তিনি এমতাবস্থায় এলেন যে, তার চেহারা পর্দাবৃত ছিল। সে এসে তার নিহত সন্তানের ব্যাপারে অভিযোগ জানায়। তখন কতিপয় সাহাবী তাকে বলেন, “তুমি তোমার ছেলের ব্যাপারে অভিযোগ দাখিল করতে এসেছে, তারপরও তুমি পর্দাবৃত হয়ে এলে?” তখন উম্মে খাল্লাদ বলেন, যদিও আমার ছেলের উপর বিপদ এসেছে, এর মানেতো আমার লজ্জা শরমেরও বিপদ আসেনি। {সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং-২৪৮৮}

عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ، قَالَتْ: ” لَمَّا نَزَلَتْ: {يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِنْ جَلَابِيبِهِنَّ} [الأحزاب: 59]، خَرَجَ نِسَاءُ الْأَنْصَارِ كَأَنَّ عَلَى رُءُوسِهِنَّ الْغِرْبَانَ مِنَ الأَكْسِيَةِ “

إسناده قوي. ابن خثيم -وهو عبد الله بن عثمان- لا بأس به. ابن ثور: هو محمد بن ثور الصنعاني، ومحمد بن عُبيد: هو ابن حِساب الغُبَري.

وأخرجه ابن أبي حاتم في “تفسيره” كما في “تفسير ابن كثير” 6/ 48 – 49 من طريق الزنجي مسلم بن خالد، عن عبد الله بن عثمان بن خثيم، به مطولاً.

 

হযরত উম্মে সালামা রাঃ বলেন, যখন কুরআনে কারীমের এ আয়াত

يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِنْ جَلَابِيبِهِنَّ

তথা “তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ নিজেদের উপর টেনে নেয়। [মাথার দিক থেকে]” -সূরা আহযাব-৫৯} নাজিল হয়, তখন আনসারী মহিলারা স্বীয় ঘর থেকে এমনভাবে বের হতো যেন তাদের মাথায় কাক বসে আছে। {সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং-৪১০১}

হযরত মুফতী শফী রহঃ “আহকামুল কুরআন”গ্রন্থে লিখেন যে,

فى هذه الآية دلالة على أن المرأة الشابة مأمورة بستر وجهها من الأجنبيين

এ আয়াত একথা বুঝাচ্ছে যে, যুবতী মেয়েরা ঘর থেকে বের হওয়ার সময় এমনভাবে বের হবে যেন তাদের চেহারা পরপুরুষের সামনে প্রকাশিত না হয়। {আহকামুল কুরআন-৩/১৪৫৮}

عَنْ عَبْدِ اللهِ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ: الْمَرْأَةُ عَوْرَةٌ، فَإِذَا خَرَجَتْ اسْتَشْرَفَهَا الشَّيْطَانُ.

হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসঈদ রাঃ থেকে বর্ণিত। রাসূল রাসূল সাঃ ইরশাদ করেছেন, নারী জাতি হল আপাদমস্তক সতর। যখনি সে বের হয়, তখনি শয়তান তাকে চমৎকৃত করে তোলে। {সুনানে তিরমিজী, হাদীস নং-১১৭৩, মুসনাদুল বাজ্জার, হাদীস নং-২০৬৫, সহীহ ইবনে খুজাইমা, হাদীস নং-১৬৮৫, সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস নং-৫৫৯৮}

عَنْ عَائِشَةَ: «أَنَّهَا كَانَتْ تَطُوفُ بِالْبَيْتِ وَهِيَ مُنْتَقِبَةً»

হযরত আয়শা সিদ্দিকা রাঃ বাইতুল্লাহ তওয়াফ করতেন পর্দাবৃত অবস্থায়। {মুসন্নাফ আব্দুর রাজ্জাক, হাদীস নং-৮৮৫৯}

পর্দা পরপুরুষের সাথে হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে সৌন্দর্যমন্ডিত বস্তুও লুকানোও ফরজ।

কুরআনে কারীমে নির্দেশ এসেছে-

وَقُلْ لِلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا ۖ وَلْيَضْرِبْنَ بِخُمُرِهِنَّ عَلَىٰ جُيُوبِهِنَّ ۖ [٢٤:٣١

ঈমানদার নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে নত রাখে এবং তাদের যৌন অঙ্গের হেফাযত করে। তারা যেন যা সাধারণতঃ প্রকাশমান, তা ছাড়া তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে এবং তারা যেন তাদের মাথার ওড়না বক্ষ দেশে ফেলে রাখে {সূরা নূর-৩১}

এ আয়াতে স্পষ্টভাষায় সৌন্দর্যকে লুকাতে আদেশ দেয়া হয়েছে। যেটা হল পর্দা করার মূল হাকীকত।

কিন্তু যা “সাধারণতঃ প্রকাশমান”বলে চেহারা ও হাত উদ্দেশ্য নেয়া হয়েছে। যা তীব্র প্রয়োজনের সময় যেমন প্রচন্ড ভীর, আদালতে সাক্ষ্য প্রদান ইত্যাদি প্রয়োজনে খোলা জায়েজ আছে।

এ দুটি বিষয়কে পৃথক করা হয়েছে সতর থেকে। পর্দা থেকে নয়। অর্থাৎ এ দুটি অংশ সতরের অন্তর্ভূক্ত নয়। কিন্তু পর্দার অন্তর্ভূক্ত। এ কারণেই নামাযরত অবস্থায় হাত ও মুখ এবং পা ঢাকতে হয় না। এসব খোলা রেখেই নামায হয়ে যায়। কারণ এসব সতর নয়। আর নামাযে সতর ঢাকা ফরজ।

কিন্তু বাহিরে বের হওয়ার সময় যেহেতু সতরের সাথে সাথে পর্দা রক্ষা করাও ফরজ, এসব ঢেকে রাখা ফরজ।

মোটকথা হল এই যে, মহিলাদের জন্য এটি কিছুতেই জায়েজ নয় যে, খোলা বাজারে তারা মুখ খুলে ঘুরে বেড়াবে। নিজের সৌন্দর্য মানুষকে দেখিয়ে বেড়াবে। যেহেতু সৌন্দর্যের মূলই হল চেহারা। চেহারা দেখেই মূলত সৌন্দর্যের মাপকাঠি নির্ধারণ হয়ে থাকে। সুতরাং এটি প্রদর্শন কিভাবে জায়েজ হতে পারে?

এ কারণেই ইসলামী শরীয়ত জিনার দরজা বন্ধ করার জন্য পরপুরুষের সামনে চেহারা খোলাকে হারাম সাব্যস্ত করেছে।

আল্লামা ইবনে কাসীর রহঃ আয়াতাংশের অধীনে লেখেনঃ

{وَلا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلا مَا ظَهَرَ مِنْهَا} أَيْ: لَا يُظهرْنَ شَيْئًا مِنَ الزِّينَةِ لِلْأَجَانِبِ، إِلَّا مَا لَا يُمْكِنُ إِخْفَاؤُهُ.

“যা সাধারণতঃ প্রকাশমান, তা ছাড়া তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে”মানে হল, পরপুরুষের সামনে সৌন্দর্যের কোন কিছুই প্রকাশ করবে না, তবে যা লুকানো সম্ভব হয় না তা ভিন্ন। {তাফসীরে ইবনে কাসীর-৬/৪১}

উপরোক্ত বিস্তারিত আলোচনা জানা যাচ্ছে যে, মহিলাদের পর্দার যে হুকুম দেয়া হয়েছে, তাতে চেহারাও দাখিল। শুধু তাই নয়, মূলত আসল হুকুম চেহারা ঢাকার উপরই। কারণ চেহারাই সৌন্দর্যতার মূল। সেই সাথে মহিলাদের উত্তম পোশাক, পরিহিত সাজ সরঞ্জামও দাখিল।

আর চেহারা ও পোশাক-আশাকের পর্দা রক্ষা প্রচলিত বোরকা বা এজাতীয় কাপড় দ্বারা অর্জিত হয়ে থাকে।

এ কারণে মুসলিম নারীদের জন্য পর্দার ফরজিয়্যাত আদায় করার জন্য বোরকা বা এ জাতীয় শরীর ঢেকে থাকে এমন পর্দাযুক্ত কাপড় পরিধান করা জরুরী।

এ কারণেই পবিত্র কুরআনে প্রথমে মহিলাদের ঘরে থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হতে নিষেধ করা হয়েছে। তবে যদি কোন প্রয়োজনে বের হয়ও, তাহলে বোরকা বা এ জাতীয় কাপড় দিয়ে নিজেকে আবৃত করে নিতে বলা হয়েছে।

তবে ৩টি সূরত এ নির্দেশনা থেকে পৃথক। যথা-

১- এমন প্রয়োজন যাতে করে চেহারা ঢাকলে নিজের ক্ষতি হবে। যেমন চেহারা পুড়ে গেছে। ঢেকে রাখলে ঘা শুকাবে না।

২- এমন প্রয়োজন যাতে চেহারা ঢাকা থাকলে অন্যের ক্ষতি হবে। যেমন সাক্ষ্য প্রদান করার সময়। হতে পারে বোরকার আড়ালে কোন পুরুষ রয়েছে। তাই সন্দেহ দূর করতে।

৩- কাজ করা, বা কর্মক্ষেত্রে ডিউটি করার সময় অনিচ্ছায় চেহারা খুলে গেলে। এতে গোনাহ হবে না। তবে ইচ্ছাকৃত খুলার অনুমতি নেই।

তবে এ তিন সূরতের ক্ষেত্রেই পুরুষদের জন্য বিধান হল, তারা নিজেদের চোখকে নিচু করে রাখবে। মহিলাটির দিকে তাকিয়ে থাকবে না। মহিলার দিকে দেখা তার জন্য হারাম।

চেহারা ঢেকে রাখার বিধানটি যুবতী নারীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। নতুবা অশীতিপর বৃদ্ধ নারীদের জন্য চেহারা বা হাত খোলার সুযোগ সম্বলিত অন্য আয়াতে বিদ্যমান রয়েছে।

উল্লেখিত আলোচনা দ্বারা আশা করি একথা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, মহিলাদের জন্য পরপুরুষের সামনে মুখ হাত খোলা রাখা আমভাবে জায়েজ বলা শরীয়ত সম্মত নয়। বরং চেহারা ও হাত খোলার সুযোগ নির্দিষ্ট কিছু সূরতের সাথে খাস। সেসব বিশেষ সূরত ছাড়া বেগানা পুরুষদের সামনে হাত মুখ খোলা কিছুতেই জায়েজ নয়।

ব্যক্তি বা এলাকার আমল পালনীয় নয়। পালনীয় আল্লাহ ও তার রাসূল সাঃ এর নির্দেশনা।

সুতরাং যারা কুরআনে স্পষ্ট এ নির্দেশনার অপব্যাখ্যা করছে তাদের জন্য হেদায়াতের দুআ। এসব অপ্রচারকারীদের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করা প্রতিটি মুসলমানের সাধ্যানুযায়ী চেষ্টা করা উচিত। এক হল দ্বীন না মানা, আরেক হল দ্বীনের বিধানটিই অস্বিকার করা। দু’টি দুই জিনিস।

দ্বীন না মানার গোনাহ থেকে দ্বীনী বিষয়কে অস্বিকার করা মারাত্মক গোনাহ। ক্ষেত্রে বিশেষে তা কুফরী পর্যন্ত পৌঁছে দেয়। তাই এসব অপপ্রচারের ব্যাপারে সতর্ক থাকা উচিত সকল মুসলমানদের।

আল্লাহ তাআলা আমাদের হককে হক বুঝার, এবং বাতিলকে বাতিল বুঝার তৌফিক দান করুন। আমীন।

One thought on “কুরআন ও হাদীসের আলোকে মেয়েদের পর্দার হুকুম

  1. মূলত ‘হিজাব বা পর্দা’ নারীর সৌন্দর্য ও মর্যাদার প্রতীক। নারীর সতীত্ব ও ইজ্জত-আবরুর রক্ষাকবচ। নারী-পুরুষ উভয়ের চারিত্রিক পবিত্রতা রক্ষার অতি সহজ ও কার্যকর উপায়। ইসলাম পর্দা পালনের যে বিধান আরোপ করেছে তা মূলত অশ্লীলতা ও ব্যভিচার নিরসনের লক্ষ্যে এবং সামাজিক অনিষ্টতা ও ফেতনা-ফাসাদ থেকে বাঁচার নিমিত্তেই করেছে। নারীদের প্রতি কোনো প্রকার অবিচার কিংবা বৈষম্য সৃষ্টির জন্য করেনি। বন্ধন মিডিয়া মুসলিম নারীদের পর্দা প্রথার সমর্থক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

%d bloggers like this: