স্বাস্থ্য রক্ষায় ইসলামের নির্দেশনা

ইসলাম মানব প্রকৃতির সহায়ক ও উপযোগী একটি ধর্ম। মানব জীবনের সামগ্রিক দিক পূর্ণাঙ্গ ও যথাযথভাবে আলোচিত হয়েছে ইসলামে। মানুষের জীবনের কোনো প্রয়োজনই ইসলামে উহ্য নেই। একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়গুলো সম্পর্কেও ইসলামের সুস্পষ্ট নির্দেশনা পাওয়া যায়। স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সম্পর্কেও ইসলামে রয়েছে বিশদ আলোচনা। স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও রোগ প্রতিরোধের বিষয়ে ইসলাম সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। সতর্কতা সত্ত্বেও কোনো রোগবালাইয়ে আক্রান্ত হয়ে গেলে এর সুচিকিৎসা নিশ্চিত করার প্রতিও রয়েছে জোরালো তাগিদ। কোরআন-সুন্নাহর আলোকে স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি অধিক গুরুত্ব পেয়েছে।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহপাক বলেন, ‘আমরা কোরআনে যা নাজিল করি, তা (রোগের) মহৌষধ এবং মুমিনদের জন্য বড় রহমত।’ (সূরা বনি ইসরাইল, আয়াত ৪২)। মূলত শক্তি ও সুস্থতাই ইসলামের কাম্য। আল্লাহপাক রাব্বুল আলামিনের সত্তা, শক্তির আধার। তার শক্তি অসীম ও অতুলনীয়। সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী মহান প্রতিপালক তার নিপুণ সৃষ্টিরাজিতেও শক্তির সঞ্চার করেছেন। তার ওহির বাহক হজরত জিবরাইল (আ.)-এর শক্তির প্রশংসা তিনি নিজেই করেছেন। যে নবীর ওপর তার পবিত্র কালাম অবতীর্ণ হয়েছে তাকেও দান করেছিলেন বিশাল শক্তি।

একশ পুরুষের যে শক্তি, এককভাবে আল্লাহতায়ালা তার নবী মুহাম্মদুর রসুলুল্লাহ (সা.)-কে তা দান করেছিলেন। এর দ্বারা আল্লাহপাক তার অন্যতম সিফাত শক্তির বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন। এ জন্য রসুল (সা.) হাদিসে ইরশাদ করেছেন— ‘যে ইমানদার ব্যক্তির শারীরিক শক্তি আছে, তিনি শ্রেষ্ঠ ও আল্লাহর কাছে প্রিয় সে মুমিন অপেক্ষায় যে দুর্বল, শক্তিহীন, যার শারীরিক শক্তি কম।’ কারণ, ইবাদত করার জন্য শারীরিক শক্তি প্রয়োজন। তার পথে সংগ্রাম করার জন্য শক্তি প্রয়োজন। শারীরিক শক্তি আল্লাহতায়ালার অন্যতম শ্রেষ্ঠ নেয়ামত। হাদিস শরিফে রসুল (সা.) পাঁচটি অমূল্য সম্পদ হারানোর আগে এগুলোর কদর করার কথা বলেছেন। এর অন্যতম হচ্ছে স্বাস্থ্য ও সুস্থতা। তিনি বলেন, হালাল এবং পরিমিত ভক্ষণ সুস্বাস্থ্য রক্ষার অন্যতম উপায়। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে— যারা এতিমের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করে তারা নিজের পেটে আগুন পুরে। আর পরকালে তারা হবে জাহান্নামের অধিবাসী। (সূরাহ নিসা, আয়াত নং-১০)।

স্বাস্থ্য সুরক্ষার আরেকটি অন্যতম উপায় হলো বিশ্রাম। অতিরিক্ত পরিশ্রম করলে এবং বিশ্রাম না নিলে মানবদেহ স্বভাবতই দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে বার্ধক্য আসার আগেই বার্ধক্যের কোলে ঢলে পড়তে হয় এবং বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে নিশ্চিত মৃৃত্যুমুখে পতিত হতে হয়। কারণ মানবদেহ একটি ইঞ্জিন বা যন্ত্রের মতো।

একটানা কোনো ইঞ্জিন চলতে থাকলে সেটা যেমন খুব দ্রুত অকার্যকর হয়ে পড়ে তেমনি মানবদেহের জন্য প্রয়োজনীয় বিশ্রাম না হলেও তা দ্রুত অকর্মণ্য হয়ে পড়ে। এক সাহাবি দিনভর রোজা রাখতেন আর রাতভর নামাজ পড়তেন। রসুল (সা.) তাকে সতর্ক করে দিয়ে বললেন— ‘নিশ্চয় তোমার ওপর তোমার শরীরের হক আছে। স্বাস্থ্য রক্ষা করা শরিয়তের তাগিদ। এটাকে যথেচ্ছ ব্যবহার করা যাবে না।

শরয়ী আইন ও বিধানাবলির অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে মানুষের স্বাস্থ্য রক্ষা করা। কোরআন সুন্নাহ এবং ইসলামী শরিয়তে স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য যেমন গুরুত্ব দিয়েছে তেমনি তা কার্যকরের ফলপ্রসূ উপায় বাতলে দিয়েছে। যেমন নেশাজাতীয় দ্রব্য হারাম করা, পরিমিত আহার, সময়ানুগ খাবার গ্রহণ ইত্যাদি। কাজেই স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য সচেষ্ট হওয়া ইমান ও বিশ্বাসের দাবি।

স্বাস্থ্য সুরক্ষার পরপরই ইসলাম রোগ প্রতিরোধের প্রতি জোর তাগিদ দিয়েছে। রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে উৎসাহিত করেছে। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের স্লোগান হচ্ছে চিকিৎসার চেয়ে রোগ প্রতিরোধ উত্তম। এ জন্য আমরা দেখতে পাই যে জিনিসগুলোর কারণে মানুষের রোগ হয় ইসলাম আগেই সেগুলোকে নিষিদ্ধ করে দিয়েছে। হাদিসের প্রায় সব কিতাবেই একটি অধ্যায় আছে ‘কিতাবুত তিব’ বা চিকিৎসা অধ্যায়। সেগুলোতে চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যের ব্যাপারে সুস্পষ্ট নির্দেশনা আলোচিত হয়েছে।

মানুষের রোগ হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো মানুষের অলসতা ও কর্মবিমুখতা। রসুল (সা.) দোয়া করেছেন ‘হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে অলসতা হতে পানাহ চাই।’ উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, শ্বাসজনিত প্রদাহ এসব রোগের উৎস মূলত আলস্য ও কর্মবিমুখতা। তাছাড়া যেমনটি আগে উল্লেখ করা হয়েছে যে, অতি ভোজনও স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। পেটকে সব রোগের কেন্দ্রস্থল হিসেবে হাদিসে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। ইসলামের নির্দেশনা হচ্ছে— যখন ক্ষুধা পাবে কেবল তখনই খাবে। কোরআন মজিদে ইরশাদ হচ্ছে : ‘খাও, পান কর কিন্তু অতিরিক্ত কর না। (সূরাহ আরাফ, আয়াত নং-৩১)।

হাদিসে রসুল (সা.) ইরশাদ করেন— তোমরা উদর পূর্তি করে ভোজন কর না, কেননা তাতে তোমাদের অন্তরে আল্লাহপাকের আলো নিষ্প্রভ হয়ে যাবে। এ কথা সর্বস্বীকৃত যে, দেহের ক্ষয় পূরণের জন্য ও তার উন্নতির জন্যই আমরা আহার করে থাকি। তবে এ আহার করারও একটি স্বাস্থ্যসম্মত নীতি রয়েছে। যে নীতিমালা লঙ্ঘিত হলে সে আহারই শরীরের ক্ষয় পূরণের পরিবর্তে তাতে বরং ঘাটতি এনে দেবে।

শরীরে জন্ম নেবে নানা রোগের উপকরণ। মহানবী (সা.)-এর সবকটি সুন্নতই বিজ্ঞানভিত্তিক ও স্বাস্থ্যসম্মত। কেউ যদি ঘুম থেকে জাগা, পানাহার, চালচলন, মলমূত্র ত্যাগসহ যাবতীয় কার্য সুন্নত অনুযায়ী সম্পাদন করেন তাহলে জটিল রোগের ঝুঁকি থেকে তিনি মুক্ত থাকতে পারবেন। যেমন মাটির ঢিলা ব্যবহার, হাঁচি ও হাই তোলার সময় নাক ঢেকে রাখা, মেসওয়াক করা, রাগ নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য খুবই সহায়ক।

তাছাড়া রোগব্যাধি ছড়ানোর বড় কারণ হচ্ছে অপরিচ্ছন্ন ও নোংরা পরিবেশ। পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশের প্রতি ইসলাম বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। হাদিসে রসুল (সা.) ইরশাদ করেন— ‘পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ইমানের অঙ্গ।’ পরিবেশের ভারসাম্যতা নষ্ট হতে পারে এমন কোনো কার্যক্রমই ইসলামে স্বীকৃত নয়। এ জন্য ইসলামসম্মত পরিবেশ গড়ে তুলতে পারলে রোগবালাই থেকে রক্ষা পাওয়া সহজ হয়।

লেখক: মাওলানা মো. মিজানুর রহমান, সিনিয়র পেশ ইমাম, বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ

Leave a Reply

Your email address will not be published.

%d bloggers like this: