শিশুদের মসজিদে গমন : কোরআন ও সুন্নাহ কী বলে?

নামায-দুয়া-মুনাজাত-জায়নামাজ-ইবাদত-মাফ-ক্ষমা-বাচ্চা- শিশু

মুফতী আতাউল কারীম মাকসুদ


 

আজকের শিশু আগামীর ভবিষ্যৎ। তাকে নিয়েই একটি সোসাইটি গড়ে উঠবে। দেশ ও জাতি তার হাত ধরেই পরিচালিত হতে পারে। এজন্য শিশু সন্তানের তরবিয়তকে ইসলাম গুরুত্বারোপ করেছে। তার চেতনা বিকাশের বিষয়ে ইসলাম দিয়েছে স্পষ্ট নির্দেশনা। কোরআনে কারীমে মহান আল্লাহ তাআলা বলেন, হে মুমিনগণ! নিজেদেরকে ও তোমাদের পরিবারবর্গকে রক্ষা কর সেই আগুন থেকে, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর।
(সুরা তাহরিম: আয়াত নং ৬)

অন্য আয়াতের নির্দেশ হলো, …এবং নিজ পরিবারবর্গকে নামাজের আদেশ কর এবং নিজেও তাতে অবিচল থাক।
(সুরা ত্বাহা: ১৩৩)

দুটি আয়াতের বক্তব্যের আলোকে আমরা অনুমান করতে পারি, অধীনস্থদের বিষয়ে ইসলাম কতটা স্পষ্ট নির্দেশ প্রদান করেছে।
রাসূলে কারীম সা. বলেন, পিতা সন্তানকে আদব ও শিষ্টাচার শিক্ষা দেওয়া থেকে উত্তম কোনো গিফট নেই।
(সুনানে তিরমিযি: ১৯৪৯)

আরেকটি হাদিসের বক্তব্য এমন, সন্তানকে আদব ও শিষ্টাচার শিক্ষা দেওয়া এক সা’ আল্লাহর রাস্তায় দান করা থেকে উত্তম।
(সুনানে তিরমিযি: ২/ ১৬)

কিছু বলার প্রয়োজনবোধ করছি না। হাদিস দুটির বক্তব্য স্পষ্ট ও পরিষ্কার। সন্তানের লালন পালনে ইসলাম কতটা সংবেদনশীল, এই দুটি হাদিস থেকে স্পষ্ট ম্যাসেজ পাওয়া যায়।

নামাজের বিষয়ে ইসলামের নির্দেশ গুরুত্ববহ। রহমতের নবী সাল্লাল্লাহু ওয়ালাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, সাত বছর বয়স হলে শিশুকে নামাজের আদেশ দাও, দশ বছর হলে চাপ সৃষ্টি করবে, প্রয়োজনে মৃদু প্রহার করবে।
(সুনানে আবু দাউদ: ১/৭০)

শিশুর চেতনা বিকাশে ইসলামের অবস্থান এ হাদিস থেকে দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট হয়। ইসলামি চেতনা ও রুচি-প্রকৃতি নিয়ে সন্তানের বেড়ে উঠার বিষয়ে ইসলাম সামান্যতম দুর্বলতা প্রকাশ করে নি।

আজকের সময়ে কিছু বন্ধুরা শিশুদের মসজিদে আসা, অথবা অভিভাবক কর্তৃক নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে সন্দিহান। হাদিসের পাতায় নজর বুলিয়ে কয়েকটি হাদিস উল্লেখ করছি-

১. কাতাদা রা. বলেন, মসজিদে বসে আমরা নামাজের অপেক্ষা করছিলাম। রাসূলে কারীম সা. তখন আপন নাতি হজরত উমামা বিনতে জয়নব রা.কে নিয়ে আসেন। তিনি নবী সা. এর কোলে ছিলেন। তাঁকে কাঁধে নিয়ে রাসূলে কারীম সা. নামাজের ইমামতি করেন। রুকুতে যাওয়ার সময় তাঁকে জমিনে রেখে দিতেন। সিজদা থেকে উঠে তাঁকে আবার কাঁধে নিয়ে নিতেন।
(সহিহ বুখারী: ১০৪)

আমরা শিশুদেরকে মসজিদে নিয়ে আসতে নিষেধ করছি, বাধা প্রদান করছি। কিন্তু রাসূল সা. শিশুকে মসজিদে নিয়ে এসে, তাও আবার মেয়ে শিশুকে , একেবারে কাঁধে নিয়ে নামাজ আদায় করছেন।

আরেকটি হাদিস দেখুন-

২. আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলে কারীম সা. নামাজ পড়তেন, হাসান ও হুসাইন তখন তার পিঠে চড়ে বসতেন। মানুষ তাদেরকে সরিয়ে দিতে চাইতেন। নবিজি সা. তখন বলেন, ‘তাদেরকে ছেড়ে দাও, আল্লাহর শপথ! আমাকে যে ভালোবাসার দাবী করে, সে যেন তাদেরকেও ভালোবাসে।
(আহাদিসু বিশানিস সিবতাইন: ২৯৩)

৩. আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, আমরা রাসূলে কারীম সা. এর সাথে নামাজ আদায় করছিলাম। সিজদায় গেলে হাসান ও হুসাইন রা. তার পিঠে উঠে যেতেন। নবিজি সা. সিজদা থেকে মাথা উঠানোর সময় তাঁদেরকে হাত ধরে জমিনে নামিয়ে দিতেন। পুনরায় সিজদায় গেলে তারা উভয় পুনরায় পিঠে চড়ে বসতেন।
(আশ শরিআ: ৫/ ৬১৬১)

৪. ইবনে বুরায়দা তার পিতার সূত্রে বর্ণনা করেন, ‘রাসূলে কারীম সা. একদা খুতবা দিচ্ছিলেন। ঠিক সে সময়ই হজরত হাসান ও হুসাইন রা. লাল জামা পরে মসজিদে চলে আসেন। তারা উভয় হোঁচট খেয়ে খেয়ে হেঁটে আসছিলেন। রাসূলে কারীম সা. তখন মিম্বর থেকে নেমে এসে তাদেরকে কোলে নিয়ে নেন। তারপর বলেন, আমি এই দুজন শিশুকে হোঁচট খেতে দেখে খুতবা বন্ধ করে দিয়ে তারেকে কোলে নিয়েছি।

হাদিসগুলো আমরা বারবার পড়ে নেই। বক্তব্যগুলোকে অনুধাবন করার চেষ্টা করি। তাহলে শিশুদের মসজিদে যাওয়ার বিষয়ে আমাদের কোনো সন্দেহ থাকবে না।

এবার একটু ভিন্ন হাদিস উল্লেখ করছি। আবু হুরায়রা রা. বলেন, রাসূল সা. মসজিদে নববীতে নামাজের ইমামতি করছিলেন। একজন শিশুর কান্নার আওয়াজ শুনতে পেয়ে তিনি সংক্ষিপ্ত সুরা দিয়ে নামাজ শেষ করে দেন।
(মুসনাদে আহমাদ: ৯৫৮১)

অন্য একটি হাদিসে উল্লেখ আছে, আয়শা রা. বলেন, কোনো একদিন এশার নামাজ পড়াতে আসতে নবী সা. একটু দেরি করেন। ফলে মসজিদে উপস্থিত শিশুরা ঘুমিয়ে পড়ে।
(সহিহ বুখারী: ১/ ৮০)

দুটি হাদিসের বক্তব্য স্পষ্ট ও নির্দেশক। রাসূলে কারীম সা. এর যুগে শিশুদের মসজিদে যাওয়ার বিষয়টি আমাদেরকে দিবালোকের মত স্পষ্ট করছে। আমাদেরকে বার্তা দিচ্ছে, আমরাও যেন শিশুদেরকে মসজিদে নিয়ে যাই, তাদেরকে মসজিদে যেতে বাধা প্রদান না করি।

তবে, অন্য হাদিসের আলোকে বুঝে আসে যে, কিছুটা বোধশক্তি হওয়ার আগে একদম শিশুকে মসজিদে নিয়ে আসার দরকার নেই। হাদিস শরিফে উল্লেখ আছে, রাসূল সা. বলেন, শিশুরা যখন ডান, বাম বুঝতে শুরু করে, তখন তাদেরকে নামাজের নির্দেশ প্রদান করবে।
(মাজমাউজ জাওয়ায়িদ: ১/ ৭৯৯)

তাই, আমরা শিশুদেরকে মসজিদে যেতে কোনোভাবেই যেন বাধা প্রদান না করি। তাদেরকে মসজিদে যেতে উদ্বুদ্ধ করি। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তাওফিক দান করুন।

_____________________________________

আমরা আরেকটি কাজ করতে পারি, নিজেদের ঘরে এক কোণে পার্টিশন দিয়ে বাচ্চা ও মহিলাদের জন্যে একটি পৃথক মিনি মসজিদ বানিয়ে নিতে পারি। এতে করে বাচ্চাদের মনে মসজিদের প্রতি ভালবাসা জন্ম নেবে। তারা বড় হয়েও মসজিদে নিয়মিত যাতায়াত করতে প্রয়াস পাবে। কারণ, ছোটকাল থেকেই তাদেরকে মিনি মসজিদে অভ্যস্ত করা হয়েছে। – সম্পাদক

আপনার মন্তব্য