মা-বোনদের রমযানের কিছু আমল, যা পালন করলে পুরুষদের সমপরিমাণ সওয়াব লাভ করা যাবে

ঈদ রমযান চাঁদ হিলাল

মুফতী নূর মুহাম্মদ


মা-বোনদের জন্য রমযান মাসে সওয়াব অর্জনের সুযোগ বেশী। তারা যদি ঘর-সংসারের কাজ-কর্মে রোযাদারদের সহযোগিতার নিয়ত করেন, তাহলে রোযাদারদের সমপরিমাণ সওয়াব পেতে পারেন। এছাড়া পুরুষদেরকে বিভিন্ন নেকীর কাজে উৎসাহিত করেও তারা তাদের সমান সওয়াব পেতে পারেন। সুতরাং আমরা এখন রমযান মাসের আমলের যে তালিকা পেশ করবো তা যদি আমাদের মা-বোনেরা নিজে আমল করার সাথে সাথে পুরুষদেরকে তার প্রতি উৎসাহিত করেন তাহলে আশা করা যায়, তারা পুরুষদের সমপরিমাণ সওয়াবের ভাগি হবেন।

১. শেষরাত্রে মহিলাগণ আগে উঠার চেষ্টা করবেন এবং বাসায় পুরুষ ও বাচ্চাদেরকে জাগিয়ে দিবেন। শেষরাত্রে এতটুকু আগে উঠবেন যেন সাহরী তৈরির অবশিষ্ট কাজ সেরে, সাহরী পরিবেশন ও খাওয়ার আগে গুরুত্বের সাথে কয়েক রাকাত তাহাজ্জুদ পড়ে কিছুক্ষণ দুআ করা যায়।

২. শেষরাতেই সাহরী খাওয়া, মাঝরাতে নয়। একেবারে শেষসময়ের কাছাকাছি এসে সাহরী শেষ করা। সাহরী সম্পূর্ণ ভরপেট না খাওয়া। বরং সম্ভব হলে কিছুটা কম খাওয়ার চেষ্টা করা। সাহরীর পর নামাযের আগে না শোয়া।

৩. মহিলাগণ পুরুষদেরকে উৎসাহিত করবেন যেন তারা সাহরীর পর দেরি না করে মসজিদে চলে আসেন এবং এশরাক পর্যন্ত আমলে কাটিয়ে এশরাকের পর বাসায় ফিরেন।

৪. মহিলাগণ সাহরীর পর আযানের আগ পর্যন্ত দুআয় মশগুল থাকবেন। এরপর ফজরের আযান হলে মনোযোগের সাথে অর্থের প্রতি খেয়াল করে আযান শোনা, জবাব দেওয়া এবং আযানের দুআ বলা। আযানের পর দেরি না করে খুশু-খুযূর সাথে সুন্নত ও ফরয নামায আদায় করা।

৫. সালামের পর নামাযের স্থানেই বসে থাকা এবং তিনবার আসতাগফিরুল্লাহ বলে এই আমলগুলো করা :

  • ক. লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকালাহু লাহুল মুলকু ওয়ালাহুল হামদু ওয়াহুয়া আলা কুল্লি শাই ইন কাদীর ১০ বার।
  • খ. আয়াতুল কুরসী ১ বার।
  • গ. তাসবীহে ফাতেমী অর্থাৎ সুবহানাল্লাহ ৩৩ বার, আলহামদুলিল্লাহ ৩৩ বার এবং আল্লাহু আকবার ৩৪ বার।
  • ঘ. এরপর মুনাজাত করা।
  • ঙ. এরপর সূরা হাশরের শেষ তিন আয়াতসহ আযকারুস-সবাহ বা প্রাতঃকালীন দুআগুলো বলা।
  • চ. এরপর সম্ভব হলে কুরআনে কারীম তিলাওয়াত করা।
  • ছ. এরপর সুবহানাল্লাহ ১০০ বার, আলহামদুলিল্লাহ ১০০ বার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ১০০ বার, আল্লাহু আকবার ১০০ বার, দুরূদ শরীফ ১০০ বার এবং এস্তেগফার ১০০ বার, সুবহানাল্লাহি ওয়াবিহামদিহী সুবহানাল্লাহিল আযীম ১০০ বার। এভাবে তাসবীহ-তাহলীল, দুআ-মুনাজাত ও আমলে লেগে থাকা।
  • জ. সূর্য উঠার দশ মিনিট পর দু’ দু’ করে চার রাকাত এশরাকের নামায পড়ে অজুর সাথে বিশ্রাম নেয়া।

৬. ঘুম থেকে উঠে প্রথমে ৪/৮/১২ রাকাত চাশতের নামায পড়া। এরপর এখন যেহেতু দিন বড় তাই সাধারণভাবে ঘর-সংসারের কাজের জন্য যুহর থেকে আসর পর্যন্ত সময়ই যথেষ্ট হওয়ার কথা। সে হিসাবে ঘুম থেকে উঠার পর থেকে যুহর পর্যন্ত সময় পবিত্র কুরআন শিক্ষা করা, তিলাওয়াত করা, তিলাওয়াত শ্রবণ করা, অথবা কুরআনের নির্বাচিত তাফসীর পাঠ করা উচিত। মোটকথা এ সময়ে কুরআন নিয়ে ব্যস্ত থাকা চাই।

৭. এই রমযানে কত পারা তিলাওয়াত করবো একটা টার্গেট এখনই তৈরি করি। উত্তম হলো প্রতি রোজ ১০ পারা করে প্রতি ৩ দিনে এক খতম করা, যাতে এক মাসে দশ খতম হয়। এটা সম্ভব না হলে প্রতি রোজ কমপক্ষে ৩ পারা করে তিলাওয়াত করা যাতে ১০ দিনে এক খতম এবং মাসে তিন খতম হয়। তাও যদি সম্ভব না হয়, তাহলে প্রতিদিন কমপক্ষে একপারা পড়া, যাতে মাসে এক খতম হয়। এছাড়া যে যত খতম দিতে পারি ততই উত্তম।

৮. মহিলাদের জন্য আযানের অপেক্ষা না করে ওয়াক্ত হওয়ার পরপরই নামায পড়ে নেওয়া উত্তম। তাই আওয়াল ওয়াক্তেই যুহর আদায় করা। এরপর রান্নার কাজ শেষ করে আসরের আগে অল্প হলেও বিশ্রাম নেওয়া। কারণ, এই সময়ের নিদ্রা তারাবীর নামাযে তন্দ্রা ও ক্লান্তি থেকে হেফাযত করে।

৯. আসরের নামাযের পর ইফতার তৈরির অবশিষ্ট কাজ শেষ করে ইফতার পরিবেশন করা। তারপর কমপক্ষে ১০/১৫ মিনিট ইফতার সামনে নিয়ে দুআয় মশগুল থাকা। আরও বেশি সময় পেলে কুরআন তিলাওয়াত অথবা যিকির করতে থাকা।

১০. কী দিয়ে ইফতার করা? উত্তম হলো তাজা খেজুর। তা না হলে শুকনো খেজুর। তাও না হলে পানি। এরপর অন্য খাবার।

১১. ইফতার তৃপ্তিসহ খাওয়া যায়। তবে একেবারে উদরপূর্তি করে না খাওয়া। যেন রোযার উদ্দেশ্য ব্যাহত না হয়। বস্তুত সকল ক্ষেত্রে মধ্যমপন্থা অবলম্বন করলে কোনো সমস্যা হয় না। মহিলাগণ ইচ্ছা করলে ইফতার ও প্রথম রাতের খাবার একসাথে খেয়ে নিতে পারেন, এতে আশা করি ঝামেলা কমবে।

১২. ইফতারের পর মুখ ভালোভাবে পরিষ্কার করে মাগরিবের নামায আদায় করা। কেননা খাবারের অংশ মুখে থাকলে তা গিলে ফেললে নামায মাকরূহ হয়। আর তা একটি চনাবুট পরিমাণ হলে নামায ভেঙ্গে যায়।

১৩. মাগরিবের পর ছয় রাকাত আওয়াবীন পড়ে সন্ধ্যাকালীন দুআসমূহ আদায় করা। এরপর কিছুক্ষণ যিকির করা যেমন, সুবহানাল্লাহ ১০০ বার, আলহামদুলিল্লাহ ১০০ বার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, আল্লাহু আকবার ১০০ বার, এস্তেগফার ১০০ বার, সুবহানাল্লাহি ওয়াবিহামদিহী সুবহানাল্লাহিল আযীম ১০০ বার, দুরূদ শরীফ ১০০ বার। এরপর দুআ করা।

১৪. ইফতারের সময় মহিলাগণ পুরুষদেরকে উৎসাহিত করবেন, যেন তারা মসজিদে তাকবীরে উলা ধরতে পারেন এবং আওয়াবীন ও উপরোল্লিখিত আমলগুলো আদায় করে বাসায় ফিরেন। তাহলে এগুলোর সওয়াব তারাও পাবেন।

১৫. আওয়াল ওয়াক্তে এশা ও তারাবীর নামাজ পড়ে নেওয়া। ঘুম ঘুমভাব নিয়ে তারাবী না পড়া। প্রয়োজনে চা-কফি পান করে অথবা দীনী মুজাকারা করে ঘুমভাব দূর করে তারাবী পড়া। অনুরূপভাবে রান্না বসিয়ে তারাবী পড়লে বারবার চুলার দিকে মন যেতে পারে। তাই এটাও উচিত নয়।

১৬. তারাবীর পর সাহরীর রান্না শেষ করে যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি শোয়া উচিত। যেন শেষরাত্রে উঠতে কষ্ট না হয়।

১৭. উযূর সাথে সুন্নত তরীকায় শেষরাত্রে তাহাজ্জুদ, দু‘আ ও সাহরী খাওয়ার নিয়তে শোয়া। যাদের ঘুম ভারি তারা এলার্মের ব্যবস্থা করতে পারেন অথবা অন্য কাউকে বলে রাখতে পারেন।

১৮. এছাড়া পবিত্র মাহে রমযানের দিনে-রাতে চলাফেরা, উঠাবসা এবং একটু সুযোগ পেলেই যিকির ও মনে মনে দুআর এহতেমাম করা।

১৯. রমযানকে কেন্দ্র করে সত্তর হাজার বার কালিমায়ে তায়্যিবার একটি নেসাব নিজের জন্য পড়ে রাখা যায়। এছাড়া এস্তেগফারও অধিক পরিমাণে পড়া।

২০. সত্যিকারের রোযার জন্য কয়েকটি জিনিসের হেফাযত জরুরী। নযরের হেফাযত, যবানের হেফাযত, মনের চাহিদার হেফাযত।

২১. বাচ্চাদের মধ্যে যাদের পক্ষে রোযা রাখা সম্ভব তারা রোযাই রাখবে। বাকিরা যতটুকু রাখতে পারে ততটুকুই রাখার চেষ্টা করবে।


লেখক – মুদাররিস- দারুল উলূম মাদানীনগর মাদরাসা, সিদ্ধিরগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ,

খতীব- ধানমন্ডি জামে মসজিদ, ১ নর্থ সার্কুলার রোড, ধানমন্ডি, ঢাকা-১২০৫)

আপনার মন্তব্য