Wednesday, April 24, 2019
Home Blog

এবার শবে বারাআত কবে? কোনদিন কী আমল করবো?

মুফতি আবুল হাসান শামসাবাদী


সরকারের জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি বলছে, আকাশ মেঘলা থাকায় শা‘বানের চাঁদ সেদিন দেখা যায়নি। তাই ২১ এপ্রিল দিবাগত রাতে শবে বারাআত।

অপরদিকে বেসরকারী উলামায়ে কিরাম নিয়ন্ত্রিত রু‘য়াতে হিলাল কমিটি বলছে, সেদিন খাগড়াছড়ি, মুন্সীগঞ্জ প্রভৃতি কয়েকটি এলাকায় অনেকেই চাঁদ দেখেছেন। তাই ২০ এপ্রিল দিবাগত রাতে শবে বারাআত।

তাহলে এবার আইয়ামে বীজ হিসেবে এবং শবে বারাআতেরও ফজীলত লাভের মানসে ২০, ২১ ও ২২ এপ্রিল ৩দিন রোযা রাখুন। পারলে সাথে ১৯ এপ্রিল নফল হিসেবে অতিরিক্ত রোযা রাখতে পারেন। (তাহলে উভয় কমিটির হিসেবে আইয়্যামে বীজ-এর রোযা আদায় হবে, আবার শা‘বান মাসে অতিরিক্ত নফল রোযা রাখার ফজীলত হাসিল হবে।)

তবে কম রাখতে চাইলে শবে বারাআতের রোযা হিসেবে ২২ এপ্রিল রোযা রাখুন এবং পারলে ২১ এপ্রিলও রোযা রাখুন। তাহলে ইখতিলাফ থেকে বাঁচা যাবে এবং রোযা বেশী আদায় করা ভাল কাজ।

আর শবে বারাআতের ফজীলত লাভের উদ্দেশ্যে ২০ ও ২১ এপ্রিল উভয় দিবাগত রাতে (এবং ইচ্ছা হলে আরো যত রাত ইচ্ছা নফল বন্দেগীর নিয়তে) ব্যক্তিগতভাবে অতিরিক্ত ইবাদত-বন্দেগী করুন, নফল নামায, জিকির-তাসবীহ ও কুরআন তিলাওয়াত করুন। তাহলে কোন ইখতিলাফ থাকবে না। আবার ইবাদতও বেশী হবে। নফল ইবাদত যত বেশী করা যায়, ততই ভাল এবং রামাজানের পূর্বে ২/১ দিন ছাড়া শা‘বান মাস পুরোটাই রোযা রাখা যায়।

বস্তুত এ মাহে শা‘বান পুরোটাই বিশেষ ফজীলতের মাস। এ মাসে রাসূলুল্লাহ (স): বেশী বেশী রোযা রাখতে ভাল বাসতেন। তিনি সাধারণত এ মাসের অধিকাংশ দিন একটানা রোযা পালন করতেন বলে বুখারী ও মুসলিম সংকলিত হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। এমনকি বুখারী ও মুসলিমের কোনো কোনো হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তিনি শা’বান মাস পুরোটাই নফল সিয়ামে কাটাতেন। তিনি এ মাসে কিছু সিয়াম পালন করতে সাহাবীগণকে উৎসাহ প্রদান করতেন। (সহীহ বুখারী, ২/৬৯৫, ৭০০; সহীহ মুসলিম, ২/৮১০-৮১১, ৮২০)

অপরদিকে মুসনাদে আহমদ, সুনানে নাসাঈ প্রভৃতি হাদীস গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে যে, শা‘বান মাসে বান্দার আমল আল্লাহর দরবারে পেশ করা হয়। এজন্য এই মাসে বেশী বেশী নফল রোযা পালন করা উচিত। (সুনানে নাসাঈ, ৪/২০১; মুসনানে আহমাদ, ৫/২০১)

তবে রামাজানের ২/১ আগে রোযা না রাখা বাঞ্ছনীয়। যাতে রামাজানকে আগে নিয়ে আসা না হয়। তবে যদি কারো এ সময়ে রোযা রাখার পূর্ব আদত চলে থাকে, সেটা ভিন্ন কথা। এ সম্পর্কে হযরত আবু হুরাইরা (রা.) বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, “তোমাদের কেউ রামাজানের একদিন বা দু’দিন পূর্বে নফল রোযা রাখবে না। তবে কেউ যদি প্রতিমাসে এ সময় রোযা রাখতে অভ্যস্ত হও, তাহলে রাখতে পার। (সহীহ বুখারী, ১/৩৩৪)

কাদিয়ানীদেরকে যারা অমুসলিম মনে করে না, তারাও অমুসলিম : আল্লামা শফী

আল্লামা শাহ আহমদ শফী allama shah ahmod shafi shofi ahmad shafi ahmad shofi

বাংলাদেশ সরকারের কাছে কাদিয়ানী সম্প্রদায়কে রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণার দাবি জানিয়ে হেফাজত ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফী বলেন- কাদিয়ানীদেরকে যারা অমুসলিম মনে করে না, তারাও অমুসলিম।

কাদিয়ানীদের রাষ্ট্রীয়ভাবে অমুসলিম ঘোষণার দাবিতে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জেলা পঞ্চগড় স্টেডিয়াম মাঠে আন্তর্জাতিক মজলিসে তাহাফফুজে খতমে নবুওয়তের উদ্যোগে আয়োজিত খতমে নবুওয়াত মহাসম্মেলন তিনি এ কথা বলেন।

আল্লামা শাহ আহমদ শফী আরো বলেন, সৌদি আরব, পাকিস্তানসহ অনেক রাষ্ট্রে এদেরকে (কাদিয়ানী) সরকারিভাবে অমুসলিম ঘোষণা করা হয়েছে। এ দেশের সারকারকেও আমরা বলব, কাদিয়ানীদের অমুসলিম ঘোষণা করা হোক।

তিনি বলেন, বহু শিক্ষিত সমাজ এদেরকে মুসলমান মনে করে। তারা বলে, এরা তো নামাজ কালাম পড়ে, কফের হবে কেন? কাদীয়ানীরা এ জন্য কাফের যে তারা আমাদের নবী মুহাম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে শেষ নবী মানে না। সেজন্য তারা কফের। যারা এদেরকে কাফের বলবে না তারাও কাফের। এ কথাও মনে রাখবেন।

এসময় তিনি কাদিয়ানী সম্প্রদায়কে পুনরায় ইসলাম ধর্মে ফিরিয়ে আনার জন্য আলেম-ওলামাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, আপনারদের সকলের কাছে অনুরোধ, আপনাদের যে সকল ভাইয়েরা টাকা পয়সা পেয়ে কাদিয়ানী হয়ে গেছে, তাদের আবার ইসলাম ধর্মে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করুন। আপনার ভাইয়েরা কাফের হয়ে গেছে, তাদের প্রথম মুসলমান বানানোর চেষ্টা করেন।

আল্লামা শফী বলেন, কাদিয়ানীদের মুসলমানের কবরস্থানে দাফন করা যাবে না। এদের টাকা পয়সার দিকে লক্ষ্য করে, তাদের মেয়েকে বিয়ে করা যাবে না। আপনাদের মেয়েকেও বিয়ে দিতে পারবেন না। এ কথা মনে রাখার চেষ্টা করবেন।

এতে দেশের শীর্ষ উলামায়ে কেরাম মধ্যে বিশেষ মেহমান হিসেবে উপস্থিত আছেন, ঢাকা খিলগাঁও চৌরাস্তা মাখজানুল উলুম মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল ও আন্তর্জাতিক মজলিসে তাহাফফুজে খতমে নবুওয়তের সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা হাফেজ নুরুল ইসলাম, মাওলানা আবদুল হামিদ পীর সাহেব মধুপুর, মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী মাওলানা মনজুরুল ইসলাম আফেন্দী, মাওলানা বাহাউদ্দীন জাকারিয়া, মাওলানা আবদুল হক আজাদ প্রমুখ।

মার্কেটের উপর মসজিদ করার হুকুম কী?

নামাজ সেজদা মসজিদ সেজদারত নামায রত

সুওয়াল


উপরে মসজিদ নিচে মার্কেট করার হুকুম কী? মার্কেটটি মসজিদের মালিকানাধীন থাকবে। মার্কেটের আমদানীটা মসজিদের উপকারে আসবে। এ বিষয়ে শরয়ী সমাধান জানতে চাই।


জাওয়াব


 

যদি নির্মাণের শুরুতেই নিচে মার্কেট আর উপরে মসজিদ করা হয়, তাহলে তা জায়েজ আছে। কিন্তু পুরানো মসজিদ ভেঙ্গে নতুন করে নির্মাণের সময় নিচে মার্কেট রেখে উপরে মসজিদ করা জায়েজ হবে না।

উল্লেখ্য,  মসজিদ যেখানে থাকে সেখান থেকে নিয়ে উপরে আসমান পর্যন্ত পুরোটা মসজিদের হুকুমে। নিচের জমিন পর্যন্ত অংশটুকু নয়। কাজেই মসজিদ বানিয়ে তার উপর মার্কেট বা এপার্টমেন্ট বা অন্য কিছু বানানো জায়েজ হবে না।

لو جعل تحته حانوتا وجعله وقفا على المسجد قيل لا يستحب ذلك، ولكنه لو جعل فى الإبتداء هكذا صار مسجدا وما تحته صار وقفا عليه، ويجوز المسجد والقف الذى تحته (حاشية چلپى على التبيين، كتاب الوقف، فصل فى احكام المسجد، زكريا-4\271، امدادية ملتتان-3\330)

وعن بعض المشائخ إذا كان العلو والسفل حوانيت موقوفة على المسجد أو على الأغلب لا بأس به لأن الكل منقطع عن حقوق العباد (بناية-7\455)

 


উত্তর লিখন
লুৎফুর রহমান ফরায়েজী

মঙ্গল শোভা-যাত্রা কি আসলেই মঙ্গলজনক? মাওলানা আব্দুল মালেক

আব্দুল মালেক (দা বা) maolana abdul malek\

মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক


হামদ ও ছানার পর :

وَ هُوَ الَّذِیْ جَعَلَ الَّیْلَ وَ النَّهَارَ خِلْفَةً لِّمَنْ اَرَادَ اَنْ یَّذَّكَّرَ اَوْ اَرَادَ شُكُوْرًا .

وقال عليه الصلاة والسلام : كُلُّ النَّاسِ يَغْدُو فَبَائِعٌ نَفْسَهُ فَمُعْتِقُهَا أَوْ مُوبِقُهَا.

[তিনিই সেই সত্তা, যিনি রাত ও দিনকে পরস্পরের অনুগামী বানিয়েছেন; তার জন্য, যে চিন্তা-ভাবনা করতে চায় বা শোকর করতে চায়। -সূরা ফুরকান (২৫) : ৬২

নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, প্রতিটি মানুষ প্রত্যুষে উপনীত হয়ে নিজেকে বিক্রয় করে। এরপর সে হয়ত নিজেকে মুক্ত করে অথবা ধ্বংস করে। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ২২৩]

হিজরী নববর্ষ শুরু হয়েছে এক দু’মাস আগে। তখন কিন্তু পয়লা মুহাররমের কোনো অনুষ্ঠান করেননি। আসলে ইসলামে থার্টি ফার্স্ট নাইট, পয়লা বৈশাখ বা নববর্ষ নামে কিছু নেই। কারণ এ ধরনের আনুষ্ঠানিকতায় যদি ভালো কিছু থাকে, তা বছরে একবার করার বিষয় নয়; তা হওয়া দরকার প্রতিদিন। ইসলাম শুধু নববর্ষের কদর করতে বলে না; বরং নব দিন, নব রাত, নব সকাল, নব দুপুর- সকল সময়েরই কদর করতে বলে; এ সবই তো নতুন। সবগুলোই তো আমার ইবাদতের অংশ। এ সবকিছুরই আমার কদর করতে হবে। এ সব কিছুর জন্য আমাকে মুহাসাবা করে ভালোর জন্যে শোকর আদায় করতে হবে, মন্দের জন্যে ইস্তিগফার করতে হবে।

সূরা ফুরকানের উক্ত আয়াতে ইরশাদ হয়েছে-

وَ هُوَ الَّذِیْ جَعَلَ الَّیْلَ وَ النَّهَارَ خِلْفَةً لِّمَنْ اَرَادَ اَنْ یَّذَّكَّرَ اَوْ اَرَادَ شُكُوْرًا.

তিনিই সেই সত্তা যিনি রাত ও দিনকে পরস্পরের অনুগামী বানিয়েছেন তার জন্যে যে চিন্তা-ভাবনা করতে চায় বা শোকর করতে চায়। -সূরা ফুরকান (২৫) : ৬২

তো এই যিকির ও ফিকির এবং হামদ ও শোকর সময়ের প্রতিটি পরিবর্তনের সময় কাম্য। এই যে দিন রাত আরবীতে কিন্তু এ দুটিকে একসঙ্গে ‘আলজাদীদান’ (দুই নতুন) বলা হয়। কারণ প্রতিটি দিনই নতুন, প্রতিটি রাতই নতুন। পেছনের কোনো দিন আবার কিন্তু ঘুরে আসছে না। তো যদি আমরা নতুন-এর জন্য কিছু করতে চাই- প্রতিটি দিনই নতুন, প্রতিটি রাতই নতুন; প্রতিটি সকাল নতুন, প্রতিটি সন্ধ্যা নতুন। শরীয়তে ইবাদতের বিধান, যিকির ও দুআর অযীফা সেভাবেই দেওয়া হয়েছে।

হাদীস শরীফে মুহাসাবার যে তাকীদ করা হয়েছে, তা বছরে একবার নয় সে মুহাসাবা হতে হবে প্রতি সকালে, প্রতি সন্ধ্যায়; ২৪ ঘণ্টায় একবার তো বটেই। শোয়ার সময় তুমি হিসাব লাগাও তোমার দিন কেমন কেটেছে। আজকে কার উপর যুলুম করেছ, কার হক নষ্ট করেছ। তোমার দায়িত্ব যথাযথ পালন করেছ কি না। আল্লাহর হকগুলো পালন করেছ কি না। বান্দার হকগুলো আদায় করেছ কি না। দৈনিক কমপক্ষে একবার তোমার হিসাব মিলাও। শুধু দোকানের খাতার হিসাব নয়, এটাও মিলাও। তোমার নিজের আমলের, নিজের আখলাকের, নিজের চরিত্রের, দিনরাত কার সাথে কী আচরণ করেছ- এরও হিসাব লাগাও। কোন্ আচরণে আল্লাহ খুশি হয়েছেন, কোন্ আচরণে আল্লাহ নারায হয়েছেন। এ হালখাতা বছরে একবার হয় না! এ হালখাতা দৈনিকের!

আলী রা.-এর ঘটনা কতবার শুনিয়েছি- আলী রা. কী বলেছিলেন? আমাদের মাযহাবের ইমামের কী নাম? হানাফী মাযহাবের ইমাম, ইমাম আবু হানীফা রহঃ.। ইমাম আবু হানীফা রহঃ.-এর আব্বার নাম ছাবিত। দাদার নাম যূতাহ। প্রথমে তিনি (দাদা) ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তাঁরা পারস্যের ছিলেন। অগ্নি পূজক ছিলেন। তাঁর সন্তান হলেন ছাবিত, ছাবিতের সন্তান হলেন ইমাম আবু হানীফা রহঃ.। ইমাম আবু হানীফা রহঃ.-এর পিতা ছাবিতকে তার আব্বা নিয়ে গিয়েছিলেন আলী রা.-এর কাছে। কুফাতে থাকতেন তাঁরা। আলী রা.ও তাঁর খেলাফতের সময় কুফায় ছিলেন। তিনি ছাবিতকে আলী রা.-এর কাছে নিয়ে বললেন- এ আমার ছেলে। ছাবিত রহঃ.-এর জন্য দুআ করে দিয়েছেন আলী রা.। দুআর সময় শুধু ছাবিতের জন্য দুআ করেন নি; ছাবিত এবং তার বংশধরের জন্য করেছেন। ওই দুআর সবচেয়ে বেশি ভাগ পেয়েছেন ইমাম আবু হানীফা রহঃ.। যেহেতু আলী রা.-এর সাথে ইমাম আবু হানীফা রহঃ.-এর দাদার সম্পর্ক ছিল, তাই বিভিন্ন উপলক্ষে যাতায়াত ছিল। তাঁরা যেহেতু পারস্য থেকে এসেছেন, নতুন নতুন ইসলাম গ্রহণ করেছেন, এখনও ইসলামের সব বিধিবিধান আয়ত্তে আসেনি। তাই আগের তালে তালে মনে হল যে, আজকে তো আমাদের নওরোয, এটা একটা সুযোগ, তিনি আলী রা.-এর জন্য কিছু হাদিয়া নিলেন। হাদিয়া নিলেন নববর্ষ উপলক্ষে। আলী রা. জিজ্ঞেস করলেন, এটা কী? তিনি বললেন, আজকে তো আমাদের ওখানে (পারস্যে) নওরোয, সে হিসেবে কিছু হাদিয়া আনলাম। এ কথা শুনে আলী রা. বললেন, ‘নওরোযুনা কুল্লা ইয়াওম’ (প্রতিটি দিনই আমাদের নববর্ষ)। তুমি তো মুসলিম, ইসলাম গ্রহণ করেছ; জান মুসলিমের নওরোয কী? প্রতিটি দিনই মুসলিমের নওরোয। এটা বছরে একবার আসে না, প্রতিদিন আসে।

এখন আমরা সেই ইসলামী শিক্ষা ভুলে গিয়েছি। যখন আমার প্রধান পরিচয় বানিয়ে দেওয়া হয়েছে ‘বাঙালী’, তো বাঙালী নববর্ষ আমি পালন করব। এখন প্রশ্ন হল, বাঙালী নববর্ষ কোনটা? ২০ বছর আগে আমরা যেটা দেখেছি ওটা? ৫০ বছর আগে যেটা দেখেছি ওটা, নাকি বছর বছর এর সাথে যুক্ত হওয়া সবকিছু? কোনটার নাম বাঙালী নববর্ষ? আপনারা মুরব্বিরা বলেন আমাদেরকে, কোনটার নাম? আমরা তো ছোট, কালো দাড়িওয়ালা, আপনারা যারা মুরুব্বী আপনারা বলেন, আপনারা কী নববর্ষ দেখেছেন? মুরুব্বীদের দায়িত্বে পড়ে নতুন প্রজন্মকে জানানো, বুঝানো- এটা কি আসলে নববর্ষ পালন, না ঈমান ও আখলাক নষ্ট করা। পশ্চিম বঙ্গে যারা আসা যাওয়া করেন, অনেকের তো বাড়িও আছে পশ্চিম বঙ্গে। এখানে থাকেন, জন্ম হয়েছে পশ্চিম বঙ্গে। কিছু দিন পশ্চিম বঙ্গে কাটিয়েছেন। পশ্চিম বঙ্গে নববর্ষের কথা বলুন। যে ভয়াবহ অবস্থা হয় এখানে, ওখানেও কি ঠিক এরকম?

শুভ নববর্ষ। মঙ্গল শোভাযাত্রা। আমার বছর শুভ হবে কীভাবে? মঙ্গল-কল্যাণ দান করবেন কে? আল্লাহ। আল্লাহ তাআলার বিধান কি আপনি শোনেন? মূর্তি-ভাস্কর্যের সাথে কি রহমত আছে, কল্যাণ-মঙ্গল আছে? এর সাথে কোনো রহমত নেই, কল্যাণ নেই। আমার নববর্ষ যদি মূর্তি-ভাস্কর্যের সাথে যুক্ত হয়, রহমত আসবে কোত্থেকে? মঙ্গল হবে কীভাবে? আমার বছর শুভ হবে কীভাবে?

যত অশ্লীলতা আছে, আল্লাহ তা অপছন্দ করেন। আল্লাহ কোনো ধরনের অশ্লীলতা পছন্দ করেন না। إِنَّ اللهَ لَا يُحِبُّ الْفُحْشَ، وَلَا التَّفَحُّشَ। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও পছন্দ করেন না। অশ্লীলতার প্রতি আল্লাহ তাআলার ক্রোধ অনেক বেশি। পৌত্তলিকতার সাথে, অশ্লীলতার সাথে, পর্দাহীনতার সাথে যে যাত্রা হবে সেই যাত্রায় মঙ্গল হবে কীভাবে? এর মাধ্যমে আমার বছর শুভ হবে কীভাবে? আর যদি আমাদের আক্বীদা হয় -নাউযুবিল্লাহ- হিন্দুদের মতো! এক একটা দেব-দেবী এক একটার মালিক। ওরা যেভাবে মঙ্গল কামনা করে আমরাও…। তাহলে তো আর ‘লা-ইলাহা ইল্লাহ’ থাকল না। শুভ-অশুভর মালিক যদি আল্লাহ হন, লাভ-ক্ষতির মালিক যদি আল্লাহ হন, কল্যাণ-অকল্যাণের মালিক যদি আল্লাহ হন, আমার বছর শুভ হবে কীভাবে তা আল্লাহর কাছ থেকে জানতে হবে। আল্লাহর দ্বীন থেকে আল্লাহর শরীয়ত থেকে জানতে হবে।

আমি মুরুব্বীদের কাছে অনুরোধ করব, সামনের প্রজন্মকে আমরা জানাই- এটা আসলে নববর্ষ নয়, এটা আমাদের ঈমান ও আখলাককে নষ্ট করা। একেকবার একেক ধরনের অশ্লীলতা যোগ হচ্ছে, একেক ধরনের পৌত্তলিকতা যোগ হচ্ছে, আর সব নববর্ষের নাম দিয়ে চালিয়ে দিতে চাচ্ছে। কেউ কিছু বলতে পারবে না; কারণ, বললেই তো শেষ। কিছু বললেই রাষ্ট্রদ্রোহী হয়ে যাবে। যে বলল, সে দেশের সভ্যতার বিরুদ্ধে বলল নববর্ষের বিরুদ্ধে বলল। আমরা তো ভয় পাই না। আমরা একমাত্র আল্লাহকে ভয় পাই। একমাত্র আল্লাহকে ভয় করি। আমরা এসব ফাঁক-ফোঁকর আল্লাহর রহমতে বুঝি। কোনটা বাঙালী সংস্কৃতি আর কোনটা হিন্দুয়ানী সংস্কৃতি। হিন্দুয়ানী সংস্কৃতিকে বাংলাদেশী সংস্কৃতি, বাংলার সভ্যতা বলে আমাদেরকে খাইয়ে দিবেন, খেয়ে খেয়ে আমাদের নতুন প্রজন্ম নষ্ট হবে, আমরা কিছু বলতেও পারব না, এই কি তাহলে আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশ? এটা কী স্বাধীনতা যে, হক কথা বলতে পারব না। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদেরকে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালামের সুন্নত মোতাবেক চলার তাওফিক দান করুন। মুমিনের সভ্যতা হল রাসূলের সুন্নাহ। বাংলার মুমিন হোক, হিন্দুস্তানের মুমিন হোক, পাকিস্তানের মুমিন হোক, আমেরিকার-লন্ডনের মুমিন হোক, যেই জায়গার মুমিন হোক, মুসলিম হোক; মুসলিম আর মুমিনের সভ্যতা হল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ।

لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ

রাসূলুল্লাহর কালচার যা, আমাদের কালচারও তা।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদেরকে সহীহ সমঝ নসীব করুন। আল্লাহ বলেছেন- إِنْ تَكُونُوا صَالِحِينَ

তোমরা যদি উপযুক্ত হয়ে যাও, ভালো হয়ে যাও। ভালো মানে? এমনি বলে দিলাম, সে ভালো মানুষ। এটাকে ভালো বলে না। ভালো মানে, সব দিক থেকে আল্লাহর বিচারে, আল্লাহর আদালতে আমি উপযুক্ত হই তাহলেই আমি ছালেহ-ভালো। ভালো হলে কী পাওয়া যাবে? আল্লাহ বলেন, তোমরা ছালেহ হও, আমি চাই তোমরা ছালেহ হয়ে যাও। ছালেহ হলে তোমাদের দোষত্রুটি যা হয়েছে তওবা করে ফেল, ক্ষমা করে দিব। কিন্তু হতে তো হবে! নিয়ত তো করতে হবে ছালেহ হওয়ার, উপযুক্ত হওয়ার, আমরা তো নিয়তই করছি না। হিম্মত করতে হবে, নিয়ত করতে হবে। আল্লাহ তাআলা তাওফিক নসীব করুন। আমীন!

وآخر دعوانا أن الحمد لله رب العالمين.

[ধারণ : মাওলানা যুবায়ের আহমাদ
অনুলিখন : খায়রুল বাশার]

মঙ্গল শোভাযাত্রা ইসলাম সমর্থন করে না -আল্লামা শাহ আহমদ শফী

মঙ্গল শোভাযাত্রা ইসলাম সমর্থন করে না -আল্লামা শাহ আহমদ শফী

পহেলা বৈশাখ উদযাপনের অন্যতম অনুষঙ্গ হিসেবে মঙ্গল শোভাযাত্রার যে আয়োজন করা হয় তা ইসলামী শরীয়ত সমর্থন করে না। কোন ঈমানদার মুসলমান মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করতে পারে না।

আজ (শুক্রবার) ১২এপ্রিল সন্ধ্যা ৬টায় জামেয়া দারুল উলূম হাটহাজারীর মহাপরিচালক, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ এর আমীর আল্লামা শাহ আহমদ শফী সংবাদ মাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে একথা জানান।

বিবৃতিতে আল্লামা আহমদ শফী বলেন, ষোড়শ শতকে মোঘল সম্রাট আকবরের সময়ে বর্তমানের যে বাংলা বর্ষপঞ্জি তৈরি হয় তা ফসল রোপণ এবং কর আদায় সহজ করার উদ্দেশ্যেই করা হয়। হালখাতা, পিঠা-পুলি বানানোর মাধ্যমে পহেলা বৈশাখ যেভাবে উদযাপন হয়ে আসছিলো তাতে নতুন নতুন যেসব আয়োজন যোগ হচ্ছে তাতে যেমন ধর্মীয় বিধানাবলীর বিপরীতে অবস্থান নেয়া হচ্ছে তদ্রূপ আমাদের সংস্কৃতি হুমকিতে পড়ছে। কারণ জাতীয়তার চেয়ে জাতিসত্তার পরিচয় বড়। আর আমরা লক্ষ্য করছি এসব আয়োজনে ধীরে ধীরে যেভাবে বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ঘটছে যা বাংলাদেশি মুসলমানদের জন্য কখনোই কল্যাণকর হবে না।

আল্লামা আহমদ শফী আরো বলেন, মানুষের জীবনের কল্যাণ ও মঙ্গল-অমঙ্গল সবকিছুই আমাদের সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ তাআলার হুকুমে হয়। পৃথিবীর সব বিশ্বাসীরা এটাই বিশ্বাস করেন। কোন মূর্তি,ভাস্কর্য,পোস্টার, ফেস্টুন ও মুখোশে মঙ্গল-অমঙ্গল থাকতে পারে না। বাঘ, কুমির, বানর, পেঁচা, কাকাতুয়া, ময়ূর, দোয়েলসহ বিভিন্ন পশুপাখি মঙ্গল আনতে পারে না।

এসব বিশ্বাস যেমন ইসলামী শরীয়তবিরোধি চেতনা তদ্রূপ এমন আধুনিক সময়ে মূর্তি-ভাস্কর্য ও জীবজন্তুর ছবিতে মঙ্গল-অমঙ্গল কামনা করা একটি কুসংস্কারাচ্ছন্ন ধ্যান-ধারণা।

আল্লামা আহমদ শফী প্রশ্ন রেখে বলেন, প্রতিবছর পহেলা বৈশাখের সকালে বাদ্যযন্ত্রের তালে নানা ধরণের বাঁশ-কাগজের তৈরি মূর্তি, পেঁচার আকৃতি ও মুখোশ হাতে মঙ্গল শোভাযাত্রা বের হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইন্সটিটিউট থেকে মাত্র ২৮বছর আগ থেকে শুরু হওয়া মঙ্গল শোভাযাত্রা কিভাবে সার্বজনীন বাঙালি উৎসব ও সংস্কৃতি হতে পারে?

তরুণ-তরুণীদের উদ্দেশ্যে আল্লামা আহমদ শফী বলেন, তোমরা যারা আবেগের বশবর্তী হয়ে, ভুল ধারণায় প্ররোচিত হয়ে কিংবা বয়সের কারণে মঙ্গল শোভাযাত্রা ও গানবাদ্যের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করো তারা নিজেদের বিরত রাখো। যৌবনকাল আল্লাহ তাআলার প্রদত্ত সবচে’ বড় নেয়ামত। তোমাদের মূল্যবান সম্পদ ‘তারুণ্য’ যিনি দান করেছেন তাঁর ইবাদতে ও তাঁর সন্তুষ্টিতে তা কাজ লাগাও। জীবন সুন্দর হবে, আত্মিক প্রশান্তি লাভ করবে।

আল্লামা আহমদ শফী সর্বস্তরের জনগণের উদ্দেশ্যে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের মাতৃভূমি বাংলাদেশে যেভাবে অগ্নিকাণ্ড, সড়ক দুর্ঘটনা, ধর্ষণ ও পাপাচার বেড়ে চলছে এর থেকে পরিত্রাণ পেতে আমাদের উচিত মহান আল্লাহ তাআলার কাছে তওবা ও ইস্তেগফারের মাধ্যমে ক্ষমা প্রার্থনা করা। তাঁর ইবাদাতে মগ্ন হওয়া। নিজেদের আত্মিক পরিশুদ্ধতা অর্জনে চেষ্টা-সাধনা করা। কারণ নৈতিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতি ও পরিশুদ্ধতা ছাড়া শুধু মানবরচিত আইনের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার গজব ও পাপাচার থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব না।

স্বাক্ষরিতমঙ্গল শোভাযাত্রা ইসলাম সমর্থন করে না
আল্লামা শাহ আহমদ শফী
মহাপরিচালক, দারুল উলূম হাটহাজারী
আমীর, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ


 

ইসলাম সম্পর্কে এতদিন ভুল ধারণার ওপর ছিলাম : নওমুসলিম হ্যাকি

নও মুসলিম মসজিদে গুলি

মুসলিমদের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে মসজিদে গুলি ছুড়েছিলেন এই ব্যক্তি। কিন্তু উক্ত কর্মকাণ্ডের পরপরই পাল্টে যায় তার মন। সম্প্রতি সংবাদ মাধ্যম বিবিসি একটি ভিডিও প্রকাশ করে, সেখানে দেখা যায়- কানেকটিকাট মসজিদের ভেতরে তার মুসলিম প্রতিবেশীদের পাশে টেড হ্যাকি হাঁটু পেতে ইবাদতে মগ্ন তথা সেজদায় অবনত।

প্যারিসে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় ক্ষিপ্ত হয়ে কানেটিকাটে নিজের বাড়ির কাছের মসজিদে গুলি ছুঁড়েছিলেন সাবেক মার্কিন সেনা টেড হ্যাকি নামের এই ব্যক্তি। ২০১৫ সালে এই কাজ করার পরই পাল্টে যায় তাঁর জীবন।

২০১৫ সালের ১৩ তারিখ শুক্রবার রাতে প্যারিসে সন্ত্রাসী হামলার রাতে, ৪৮ বছর বয়সী হ্যাকি স্থানীয় বারে ড্রিংক করে। সকালে তিনি বাড়িতে গিয়ে রাইফেল লোড করেন। তার বাগানে গিয়ে মসজিদের পাশে কয়েক রাউন্ড রাউন্ড গুলি ছুড়েন।

তাকে ঘৃণা করার পরিবর্তে বায়তুল আমান মসজিদের সভাপতি ডঃ মোহাম্মদ কুরআরী হ্যাকি ও তার স্ত্রীর কাছে কি ঘটেছিল সে সম্পর্কে জানতে চান। হামলার পাঁচ মাস পর, কুরেশি তাকে মসজিদে আয়োজিত ‘সঠিক ইসলাম ও উগ্রবাদ’ শীর্ষক সেমিনারে আমন্ত্রণ জানায়।

হ্যাকি এসে হাজির হলে মুসলিমরা স্বাগত জানালেন। হামলার কথা স্মরণ করে সে অনুতপ্ত হয়, অনুশোচনা জন্ম নেয় হ্যাকির অন্তরে। দুই পক্ষের আন্তরিকতা ছিল বিস্মিত হওয়ার মত। সকল ধর্মের মানুষ এই সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন। সেখানে প্রকৃত ইসলাম ও উগ্রবাদ সম্পর্কে আলোচনা হয়। সে তার ভুল বুঝতে পারে এবং সবার কাছে ক্ষমা চায়। সবাই তাকে আন্তরিকভাবে ক্ষমা করে দেয়।

হ্যাকি বলেন, আমি আসলে ইসলাম সম্পর্কে এতদিন ভুল ধারণার ওপর ছিলাম। ইসলাম কখনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করতে পারে না। পরবর্তীতে ছয় মাসের কারাদণ্ড হয় তার। জেলে থাকার সময় নিয়মিত দেখতে যেতেন মান্নান। এভাবেই তার জীবন পাল্টে যায়।

পয়লা বৈশাখ : অর্থহীন কাজে লিপ্ত হওয়া মুমিনের শান নয়

পহেলা বৈশাখ নববর্ষ বর্ষবরণ

মুফতি আবুল হাসান আব্দুল্লাহ


কুরআন মাজীদের একটি সূরার নাম ‘আলমুমিনূন’। এ সূরার প্রথম আয়াতটি হচ্ছে- قَدْ اَفْلَحَ الْمُؤْمِنُوْنَ ‘অবশ্যই সফলকাম হয়েছে মুমিনগণ’। এরপরের আয়াতগুলোতে আছে এই মুমিনগণের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের বর্ণনা, যার একটি হচ্ছে- وَ الَّذِیْنَ هُمْ عَنِ اللَّغْوِ مُعْرِضُوْنَ যারা অসার কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকে। -সূরা মুমিনূন ২৩ : ৩

সুতরাং মুমিন কখনো অর্থহীন কাজে লিপ্ত হতে পারে না। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন- من حسن إسلام المرء تركه ما لا يعنيه অর্থাৎ ‘ব্যক্তির সুন্দর মুসলিম হওয়ার এক নিদর্শন, অর্থহীন কাজ ত্যাগ করা।’ মুমিন তো আল্লাহর ঐ বান্দা, আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহে যার বিশ্বাস, পৃথিবীতে তার আগমন অর্থহীন ও তাৎপর্যহীন নয়। তাঁর জীবনও উদ্দেশ্যহীন পরিণামবিহীন নয়। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তার ¯্রষ্টা ও প্রভু এবং তার সৃষ্টির উদ্দেশ্য আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের ইবাদত ও ইতাআত-উপাসনা ও আনুগত্য। আর এ তার জীবনের খণ্ডিত বিষয় নয়, জীবনের সকল ক্ষেত্রে তাকে আল্লাহ তাআলার হুকুম মোতাবেকই চলতে হবে। এই যে জীবনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য এর সাথে যা কিছু সাংঘর্ষিক এবং যা কিছু অপ্রাসঙ্গিক মুমিনের তাতে কোনো আগ্রহ নেই। সুতরাং সে তা বর্জন করে এবং এড়িয়ে চলে।

ইসলামের এ গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা সম্পর্কে সচেতনতা ও অনুশীলন এবং এ পরম গুণ অর্জনের আন্তরিক প্রচেষ্টা এখন খুব প্রয়োজন। কারণ ইসলামী জীবন-দর্শন ও মুমিন-বৈশিষ্ট্যের সম্পূর্ণ বিপরীত যে ‘অসার-অর্থহীন কার্যকলাপ’, এখন চারদিকে তারই স্রোত-প্রবাহ। সুতরাং প্রজ্ঞা, সচেতনতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের শক্তি এখন খুব বেশি প্রয়োজন। নতুবা জীবনের মূল্যবান সময়ের অপচয় হবে এবং জীবন লক্ষ্যভ্রষ্ট হবে।

এর অতিসাম্প্রতিক উদাহরণটি হল ‘বিশ্বকাপ ক্রিকেট’। সাধারণ হুজুগ ও ক্রীড়ামত্ততা ছাড়াও যেহেতু বাংলাদেশ দল এ আসরে অংশগ্রহণ করেছিল এজন্য এটা ‘দেশপ্রেমের’ও এক অনিবার্য অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছিল! একেই বলে চিন্তার ভ্রান্তি। চিন্তার গতিধারাই যখন বদলে যায় তখন সঠিক কর্মের আশা নির্বুদ্ধিতামাত্র। এ-ও আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের এক প্রকারের শাস্তি। যারা আল্লাহকে ভুলে যায় আল্লাহ তাদের আত্মবিস্মৃত করে দেন। ফলে নিজের ভালো-মন্দ, কল্যাণ-অকল্যাণের উপলব্ধি ও আগ্রহ তার থাকে না। আরবের এক কবি বলেছেন- إذا لم يكن عون من الله للفتى + فأول ما يجنى عليه اجتهاده

যখন ব্যক্তির উপর থেকে আল্লাহর সাহায্য উঠে যায় তখন সবার আগে যা তাকে আক্রমণ করে তা তার নিজের চিন্তা।

সময়ের গুরুত্ব সম্পর্কে তো কারো দ্বিমত নেই। শুধু ইসলামই নয়, পৃথিবীর সকল ধর্ম, এমনকি নাস্তিক ও বস্তুবাদী দার্শনিকেরাও সময়ের গুরুত্ব সম্পর্কে একমত। কিন্তু এইসব খেলাধুলার সময়ের অবস্থা দেখে মনে হয়, এ জাতির কাছে সবচেয়ে মূল্যহীন ও অপ্রয়োজনীয় জিনিসের নাম সময়। এখন মিডিয়ার কল্যাণে ও পর্দার ভিতরের-বাইরের নানা কারণে খেলাধুলার প্রতি আকর্ষণ বাড়ছে। কিন্তু একে কেন্দ্র করে যে উন্মাদনা আমাদের দেশে দেখা যায় তা বোধ হয় আর কোথাও নেই। এরপর এবারের বিশ্বকাপে ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ ম্যাচে আম্পায়ারিংয়ের যে বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচিত হল তা থেকেও বাস্তবতার উপলব্ধি আমাদের কতটুকু হল তা ভবিষ্যতই বলে দিবে।

আমাদের আত্মবিস্মৃতি ও অসার কার্যকলাপে লিপ্ততার আরেক উদাহরণ থার্টিফাস্ট নাইট ও পয়লা বৈশাখ। মিডিয়ার কল্যাণে ‘পয়লা বৈশাখ’ উদযাপনও যেন এখন জাতীয় ঐতিহ্যের ব্যাপার! পয়লা বৈশাখে যেভাবে ও যেসব উপায়ে ‘বাঙালিয়ানা’র প্রকাশ দেখা যাচ্ছে একে অনাচার-উচ্ছৃঙ্খলা বললে বোধ হয় সবটা বলা হয় না। ধীরে ধীরে এটি বাঙালী মুসলিম মানসে ব্রাহ্মণ্যবাদী সংস্কৃতির প্রভুত্ব বিস্তারের এক বড় অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কারণ, এখন পয়লা বৈশাখ পান্তা-ইলিশে সীমাবদ্ধ নয়, এখন পৈতা-ধুতিতে এর ‘উত্তরণ’ ঘটছে। ছেলে-মেয়ে নির্বিশেষে ধুতি-পায়জামা পরিধান এখন পয়লা বৈশাখের পরিচয়-চিহ্ন।

প্রথম কথায় ফিরে আসি। অর্থহীন কাজে লিপ্ত হওয়া মুমিনের বৈশিষ্ট্য নয়।

আসুন, আমরা আমাদের ঈমানকে পুনরুজ্জীবিত করি এবং যে কোনো পর্যায়ে যা কিছু ঈমানের সাথে সাংঘর্ষিক তা বর্জন করি।

আল্লাহ আমাদের তাওফীক দান করুন। আমীন 

বর্ষবরণের নামে পহেলা বৈশাখে হিন্দুয়ানী কালচার পালন করা সম্পূর্ণ হারাম ও কুফরী!

পহেলা বৈশাখ নববর্ষ বর্ষবরণ

মুফতী আবুল হাসান শামসাবাদী |  সম্পাদক, মাসিক আদর্শ নারী


পহেলা বৈশাখ উদ্ভাবনের ইতিহাস

১৪ এপ্রিল ফসলী বাংলা সন শুরু হয়। বাংলা সনের প্রথম মাস বৈশাখের প্রথম দিন বৈশাখের ১ তারিখ বা পহেলা বৈশাখ।

আমাদের দেশে প্রচলিত বঙ্গাব্দ বা বাংলা সন মূলত ইসলামী হিজরী সনেরই একটি রূপ। ভারতে ইসলামী শাসনামলে হিজরী পঞ্জিকা অনুসারেই সকল কাজ-কর্ম পরিচালিত হতো। মূল হিজরী সন চান্দ্র মাস হিসেবে প্রবর্তিত। চান্দ্র বৎসর সৌর বৎসরর চেয়ে ১১/১২ দিন কম হয়। কারণ, সৌর বৎসর ৩৬৫ দিনে, আর চান্দ্র বৎসর ৩৫৪ দিনে হয়। একারণে চান্দ্র বৎসরে ঋতুগুলো ঠিক থাকে না। অথচ চাষাবাদ ও এ জাতীয় অনেক কাজ ঋতুনির্ভর। এজন্য ভারতের মোগল সম্রাট আকবারের সময়ে প্রচলিত হিজরী চান্দ্র পঞ্জিকাকে সৌর পঞ্জিকায় রূপান্তরিত করে বাংলা সনের প্রবর্তন করা হয়।

৯৯২ হিজরী মোতাবেক ১৫৮৪ খৃস্টাব্দে সম্রাট আকবার এ হিজরী সৌর বর্ষপঞ্জীর প্রচলন করেন। তবে তিনি ঊনত্রিশ বছর পূর্বে তার সিংহাসন আরোহণের বছর থেকে এ পঞ্জিকা প্রচলনের নির্দেশ দেন। এজন্য ৯৬৩ হিজরী সাল থেকে বঙ্গাব্দ গণনা শুরু হয়। ইতোপূর্বে বঙ্গে প্রচলিত শকাব্দ বা শক বর্ষপঞ্চির প্রথম মাস ছিল চৈত্র মাস। কিন্তু ৯৬৩ হিজরী সালের মুহাররাম মাস ছিল বাংলা বৈশাখ মাস। এজন্য বৈশাখ মাসকেই বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস এবং ১লা বৈশাখকে বাংলা সনের প্রথম দিন ধার্য করা হয়েছে।

পহেলা বৈশাখে উৎসব পালনের রীতির প্রবর্তন

উপরের আলোচনা দ্বারা বুঝা গিয়েছে—বাংলা সন মূলত হিজরী সন অর্থাৎ তা হিজরী চান্দ্র সনের সৌর রূপ। যদ্দরুণ হিজরী সনের ন্যায় বাংলা সনের গণনা রাসূলুল্লাহ-এর হিজরত থেকেই শুরু করা হয়েছে। ১৪১৫ বঙ্গাব্দ অর্থ রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর হিজরতের পর ১৪১৫ বৎসর। ৯৬২ চান্দ্র বৎসর ও পরবর্তী ৪৫৩ বৎসর সৌর বৎসর। সৌর বৎসর চান্দ্র বৎসরের চেয়ে ১১/১২ দিন বেশী এবং প্রতি ৩০ বৎসরে চান্দ্র বৎসর এক বৎসর বেড়ে যায়। এ হিসেবেই বর্তমানে ১৪৩৭ হিজরী সন মোতাবেক বাংলা ১৪২২-১৪২৩ সন হয়েছে।

অতএব, বাংলা সন মুসলমানদেরই সন এবং এটা ইসলামী হিজরী সনেরই উপর প্রতিষ্ঠিত ইসলামী সন—যা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর হিজরতের স্মারক। তাই এ সনের সাথে সংশ্লিষ্ট কৃষ্টি-কালচার ইসলামী কৃষ্টি-কালচারের বাইরে যেতে পারে না।

তাই তো মোগল আমলে পহেলা বৈশাখে বাংলা নববর্ষ আরম্ভের প্রাক্কালে প্রজারা চৈত্রমাসের শেষ পর্যন্ত খাজনা পরিশোধ করতেন এবং পহেলা বৈশাখে সেই খুশীতে জমিদারগণ প্রজাদেরকে মিষ্টিমুখ করাতেন। এছাড়া বাংলার ব্যবসায়ী ও দোকানদার পহেলা বৈশাখে নতুন সনের হিসাবের জন্য ‘হালখাতা’ করতেন। পহেলা বৈশাখ এসব কর্মকাণ্ডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। এভাবে এটি মূলতঃ রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিভিন্ন নিয়ম-কানুনকে সুন্দরভাবে সাজিয়ে সুষ্ঠুভাবে কাজ-কর্ম পরিচালনার জন্য নির্ধারিত ছিল। এভাবে তার কার্যক্রম ইসলামসম্মতই ছিলো।

কিন্তু পরবর্তীতে পুরাতন বর্ষ বিদায় ও নববর্ষ বরণের নামে চৈত্রের শেষ দিন ও পহেলা বৈশাখে হিন্দুরা নানারকম পূর্জা-অর্চনার উদ্ভব ঘটায় এবং তাদের দেবী-দেবীর বিভিন্ন প্রতীক ব্যবহার করে এ দিনকে তারা তাদের ধর্মীয় কায়দায় উদযাপন শুরু করে। হিন্দুদের ঘটপূজা, গণেশ পূজা, সিদ্ধেশ্বরী পূজা, চৈত্রক্রান্তি পূজা-অর্চনা, হিন্দুদের চড়ক বা নীল পূজা ও সংশ্লিষ্ট মেলা, গম্ভীরা পূজা, কুমীরের পূজা, অগ্নিনৃত্য, ত্রিপুরাদের বৈশুখ, মারমাদের সাংগ্রাই ও পানি উৎসব, চাকমাদের বিজু উৎসব (ত্রিপুরা, মারমা ও চাকমাদের পূজা উৎসবগুলোর সম্মিলিত নাম বৈসাবি), হিন্দু ও বৌদ্ধদের উল্কিপূজা, মজুসি তথা অগ্নিপূজকদের নওরোজ, হিন্দুদের মঙ্গলযাত্রা, সূর্যপূজা প্রভৃতি একে উপলক্ষ করেই উদযাপন করা হয়।

এক্ষেত্রে গণেশ পুজার ‘মঙ্গল যাত্রা’ থেকে নেয়া হয়েছে মঙ্গল শোভাযাত্রা, ‘চৈত্র সংক্রান্তি পুজা’ থেকে নেয়া হয়েছে চৈত্রসংক্রান্তি, হিন্দু-বৌদ্ধদের ‘উল্কিপূজা’ থেকে নেয়া উল্কি উৎসব, বিভিন্ন হিংস্র-অহিংস্র জীব-জন্তু পুজা থেকে নেয়া হয়েছে রাক্ষস-খোক্ষসের মুখোশ, পেঁচা, ময়ূর, বাঘ-ভাল্লুক, সাপ, বিচ্ছু, কুমির ও বিভিন্ন দেব-দেবীর বড় বড় মূর্তি, ছবি ও মুখোশ প্রভৃতির উৎসব, হিন্দুদের ‘আশ্বিনে রান্না কার্তিকে খাওয়া’ প্রথার আদলে চৈত্রের শেষদিনে রান্না করা অন্নে পানি ঢেলে পহেলা বৈশাখের সকালে পান্তা খাওয়ার প্রথা এবং পুজোর অপরিহার্য আইটেম ঢোল-তবলা, কুলা ও হিন্দু রমনীর লাল সিঁদুরের অবিকল লালটিপ এবং পুজোর লেবাস সাদা শাড়ী ইত্যাদি হলো পহেলা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষ উদযাপনের প্রধান উপাদান! যার মাধ্যমে পহেলা বৈশাখকে হিন্দুরা তাদের পূজার আদলে উদযাপন করে।

কিন্তু দুঃখের বিষয়, মুসলমানগণ না বুঝে হিন্দুদের সেই পূর্জা-অর্চনার কুফরী কালচারে অংশগ্রহণ করে তাদের ঈমানকে নষ্ট করছেন। হিন্দুদের বিভিন্ন দেব-দেবী থেকে বিভিন্ন বিষয় পাওয়ার নামে তারা শিরক মহাপাপে লিপ্ত হচ্ছেন।

পহেলা বৈশাখে প্রচলিত উৎসব পালনের হুকুম
———————————————-

বস্তুত সকল কিছুর মালিক আল্লাহ তা‘আলা। তাই সব ব্যাপারে আল্লাহর কাছেই প্রার্থনা করতে হবে এবং তারই ইবাদত করতে হবে। তার স্থলে বা সহযোগী ভেবে কোন দেবী-দেবতার কাছে এসব কামনা করলে কিংবা যারা তা করে তাদের সাথে শামিল হলে, ঈমান নষ্ট হয়ে যাবে। এ সবই কুফরী কালচার। অথচ মঙ্গল শোভা যাত্রার নামে যে র‌্যালি বের করা হয়, এখানে গাইরুল্লাহর কাছে নতুন বছরের মঙ্গল ও কল্যাণ কামনা করা হয়। ইসলামের বিশ্বাস মতে, কোন জীবজন্তু, বন্যপ্রাণী ও দেবদেবীর কাছে কল্যাণ ও মঙ্গল কামনা করলে তার ঈমান থাকবে না। সে ঈমানহারা কাফের হয়ে যাবে।

সেই সাথে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা ও অশ্লীলতা-বেলেল্লাপনার মহড়া এবং বাঙালী কালচারের নামে গরীবদের প্রতি উপহাসমূলক পান্তা খাওয়ার অপসংস্কৃতি একে কদার্যতায় পর্যবসিত করেছে। অপরদিকে শরীরে ‍উল্কি আঁকা, বিভিন্ন জানোয়ারের মুখোশ পরা প্রভৃতি কুকালচার মুসলমানদের ইসলামী মূল্যবোধকে বিনষ্ট করে চলেছে। (নাউযুবিল্লাহ)

বস্তুত কোন মুসলমানের জন্য শরীরে উল্কী অঙ্কন করা জায়িয নয়। তা সম্পূর্ণ হারাম। আর বেগানা নারী-পুরুষ একে অপরকে উল্কি এঁকে দেয়া তো আরো মারাত্মক গর্হিত কাজ। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, “যে ব্যক্তি উল্কি আঁকে এবং যার গায়ে আঁকে, আল্লাহ তা‘আলা তাদের উপর লা‘নত করেন।”(সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৫৪৭৭)

তেমনি জীব-জন্তুর ছবি আঁকা ও মুখোশ পরাও হারাম। ইসলামে প্রতিকৃতি কিংবা জীবন্ত বস্তুর ছবি তৈরী করাকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ(সা.) বলেন : “কিয়ামতের দিন সবচেয়ে কঠিন শাস্তি ভোগ করবে (জীবন্ত বস্তুর) ছবি বা প্রতীমা তৈরীকারীরা।” (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৫৯৫০/ সহীহ মুসলিম. হাদীস নং ২১০৯)
অনুরূপ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন : “যে কেউ ছবি বা প্রতীমা তৈরী করবে, আল্লাহ তাকে (কিয়ামতের দিন) ততক্ষণ শাস্তি দিতে থাকবেন যতক্ষণ না সে এতে প্রাণ সঞ্চার করে, আর সে কখনোই তা করতে সমর্থ হবে না।” (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২২২৫/ সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২১১০)

অপরদিকে মঙ্গল শোভা যাত্রা, পূজার প্রদীপ প্রজ্জ্বলন, গান বাজনা, বিভিন্ন পাখির ছবি, মুখোশ বা প্রতীমা তৈরি এসবই স্পষ্ট বিজাতীয় কালচার–যা পালন করা মুসলমানদের জন্য হারাম। মুশরিকদের এসব কালচারে মুসলমানদের শামিল হওয়া কিয়ামতের আলামত বৈকি। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, “ততক্ষণ পর্যন্ত কিয়ামত ঘটবে না যতক্ষণ পর্যন্ত আমার উম্মতের একদল লোক মুশরিকদের সাথে মিলিত হবে এবং যতক্ষণ না তারা মূর্তি পূজা করবে।” (জামি‘ তিরমিযী, হাদীস নং ২২১৯)

মুসলমানদের উৎসবের স্বরূপ

হযরত আনাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন :
قَدِمَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْمَدِينَةَ وَلَهُمْ يَوْمَانِ يَلْعَبُونَ فِيهِمَا، فَقَالَ: مَا هَذَانِ الْيَوْمَانِ؟ قَالُوا: كُنَّا نَلْعَبُ فِيهِمَا فِي الْجَاهِلِيَّةِ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِنَّ اللَّهَ قَدْ أَبْدَلَكُمْ بِهِمَا خَيْرًا مِنْهُمَا يَوْمَ الْأَضْحَى وَيَوْمَ الْفِطْرِ
“রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন মদীনায় আগমন করলেন, তখন মদীনাবাসীদের দু’টি দিবস ছিল, যে সময় তারা খেলাধুলা, রঙ-তামাশা ইত্যাদি উৎসব করতেন। তা দেখে রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন : এ দু’টি দিবস কী? তারা বললেন : আমরা এতে জাহিলী যুগে খেলতামাশা উৎসব করতাম। রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন : “নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা তার পরিবর্তে তার চেয়ে উত্তম দু’টি দিন দিয়েছেন : ঈদুল আজহা ও ঈদুল ফিতর।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ১১৩৪, মুসনাদে আহমাদ, হাদীস নং ১৩২১০ প্রভৃতি)

এ হাদীসের প্রেক্ষিতে আল্লামা ইব্‌ন তাইমিয়াহ (রহ.) বলেন : “এ হাদীস প্রমাণ করে—এ দুই ঈদ ব্যতীত অন্য কোনদিন কোন উৎসব পালন করা মুসলমানদের জন্য জায়িয হবে না, তা হারাম হবে। কারণ, রাসূলুল্লাহ (সা.) মদীনায় পূর্বপ্রচলিত উৎসব বাতিল করে আল্লাহর কর্তৃক দুই ঈদ প্রদানের কথা বলেছেন। তিনি জাহিলী রীতি মোতাবেক তাতে খেলতামাশার উৎসব করার অনুমতি দেননি। এর দাবী হলো, পূর্বের আমল ত্যাগ করা। কারণ, বদল করার পর উভয় বস্তুকে জমা করা যায় না। বদল শব্দের অর্থ হলো–একটি ত্যাগ করে অপরটি গ্রহণ করা।” (ফাইজুল কাদীর, ৪র্থ খণ্ড, ৫১১ পৃষ্ঠা)

তেমনিভাবে সূরাহ ফুরকানে আল্লাহ তা‘আলা বিশেষ বান্দাদের গুণাবলী উল্লেখ করেছেন, যাদেরকে তিনি রহমানের বান্দা বলে সম্বোধন করেছেন। তাদের একটি বিশেষ গুণ এই বর্ণনা করেছেন যে, তারা কখনো বিধর্মীদের উৎসবে যোগ দেন না। এ সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন :
وَٱلَّذِينَ لَا يَشۡهَدُونَ ٱلزُّورَ وَإِذَا مَرُّواْ بِٱللَّغۡوِ مَرُّواْ كِرَامٗ
“আর যারা অমূলক উৎসবে উপস্থিত হয় না এবং যখন তারা অনর্থক বিষয়ের পাশ দিয়ে পথ অতিক্রম করে, তখন নিজেদের সকীয়-সম্মান বজায় রেখে পথ অতিক্রম করে।” (সূরাহ ফুরকান, আয়াত নং ৭২)

এ আয়াতের ব্যাখ্যায় তাবিয়ী মুহাম্মদ ইব্‌নে সিরীন, মুজাহিদ, রাবী ইবনে আনাস, ইকরিমা ও জাহহাক (রহ.) বলেন : “আয়াতে বর্ণিত ٱلزُّورَ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো বিধর্মীদের উৎসব। উক্ত আয়াতে মুসলমানদেরকে বিধর্মীদের উৎসবে অংশগ্রহণ করতে নিষেধ করা হয়েছে।”

হযরত আমর ইবনে মুররাহ (রহ.) বলেন : “এ আয়াতে বলা হয়েছে–“আল্লাহ-রাহমানের বান্দারা মুশরিকদের শিরকী কাজে শামিল হয় না এবং তাদের সাথে তাদের কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করে না।” (সুনানে সায়ীদ ইব্‌ন মানসুর, ২৭৯১ পৃষ্ঠা)

এমনকি আল্লামা ইব্‌নুল কায়্যিম জাওযী (রহ.) বলেন : “বিধর্মীদেরকে তাদের কুফরী উৎসব উপলক্ষে শুভেচ্ছা জানানোও হারাম। যেমন বলা যে, “অমুক পূজা সফল হোক”, “শুভ বড় দিন” অথবা এ জাতীয় অন্যান্য শব্দ ব্যবহার করা নাজায়িয়। এভাবে কারো কুফরী উৎসবে শুভেচ্ছা জানানো প্রকারান্তরে এসব কাজকে সমর্থন করার নামান্তর—যা ঈমানধ্বংসী কাজ। (আহকামু আহলিয যিম্মাহ, ১৩২ পৃষ্ঠা)

তেমনিভাবে বিধর্মীদের সাদৃশ্য কোনকিছু পালনও ইসলামে নিষিদ্ধ। এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, “যে ব্যক্তি কোন সম্প্রদায়ের সাথে সাদৃশ্য অবলম্বন করবে, সে তাদের অন্তর্ভুক্ত হবে (তাদের সাথে তার হাশর হবে)।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ৩৫১৪)

এ হাদীসের ব্যাখ্যা করে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) বলেন :
مَنْ تَنَافَى أَرْضَ الأَعَاجِمِ فَصَنَعَ نَيْرُوزَهُمْ وَمَهْرِجَانِهِمْ حُشِرَ مَعَهُمْ
“যে ব্যক্তি বিজাতীয় দেশের অনুকরণ করে, অতঃপর তাদের নওরোজ ও মেহেরজান (নববর্ষ) উদযাপন করে, কিয়ামতের দিন তাকে তাদের সাথে উঠানো হবে।” (সুনানে বাইহাকী, ৩১৫ পৃষ্ঠা)

তাই মুসলমানদের কর্তব্য হচ্ছে–ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহায় ইসলামের নির্দেশিত পন্থায় জাতীয়ভাবে আনন্দ-উৎসব পালন করা। এ ছাড়া কোন বিজাতীয় ও বিধর্মী কালচারের উৎসব পালন ‍করা মুসলমানদের জন্য জায়িয নয়। কারণ, তা দ্বীন ও ঈমানের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।

আসুন, কাফের-বেদ্বীনদের অপসংস্কৃতির অনুসরণ ত্যাগ করে আমরা পূর্ণরূপে ইসলামে প্রবেশ করি। এ ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলা নির্দেশ দিচ্ছেন :
يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ ٱدۡخُلُواْ فِي ٱلسِّلۡمِ كَآفَّةٗ وَلَا تَتَّبِعُواْ خُطُوَٰتِ ٱلشَّيۡطَٰنِۚ إِنَّهُۥ لَكُمۡ عَدُوّٞ مُّبِينٞ
“হে মুমিনগণ! তোমরা ইসলামে পূর্ণরূপে প্রবেশ কর এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।” ( সূরাহ বাকারা, আয়াত নং ২০৮)

রাসূল (সা.) যেভাবে খাবার খেতেন

Muhammad nobiji নবী রাসুল মুহাম্মাদ

মানুষের একটি মৌলিক চাহিদা হল খাদ্য। জীবন ধারণের জন্যই মানুষকে খাদ্য গ্রহণ করতে হয়। তবে খাদ্য গ্রহণের নির্দিষ্ট নিয়ম লঙ্ঘন করে অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণ করলে ঐ খাবার শরীরের জন্য উপকারী না হয়ে বরং তা ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

মানুষ হিসেবে রাসূল (সা.) এরও খাবার গ্রহণের প্রয়োজন ছিল। জীবনের অন্যান্য দিকের মতই রাসূল (সা.) আমাদেরকে খাবার গ্রহণের সুন্দরতম পদ্ধতি শিখিয়ে গেছেন। এখানে রাসূল (সা.) এর খাবার গ্রহণের কিছু পদ্ধতি সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করা হল।

১. প্রয়োজনের অতিরিক্ত না খাওয়া

রাসূল (সা.) খাবার গ্রহণের জন্য পেটকে তিনভাগে ভাগ করার উপদেশ দিয়েছেন। প্রথম একভাগ খাবার, দ্বিতীয় একভাগ পানি ও তৃতীয় একভাগ শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য তিনি খালি রাখতে বলেছেন। প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণ শরীরের হজম প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্থ করে এবং বিভিন্ন প্রকার রোগের সৃষ্টি করে।

২. সকল প্রকার খাদ্যগ্রহণ

রাসূল (সা.) আমিষ ও উদ্ভিদজাত উভয় প্রকার খাবারই গ্রহণ করতেন। তিনি কখনোই শুধু আমিষ বা শুধু উদ্ভিদজাত খাদ্য খেতেন না। শরীরের সুস্থতার জন্য আমাদের উভয় প্রকার খাদ্যেরই প্রয়োজন আছে। কোন এক প্রকার খাবার অধিক গ্রহণ করে অন্যটি সম্পূর্ণ বর্জন শরীরের জন্য কোনক্রমেই উপকারী নয়।

৩. প্লেট পরিষ্কার করে খাওয়া

প্লেটে পরিবেশিত খাদ্যের শেষ কণাটি পর্যন্ত মুছে খেয়ে নেওয়া রাসূল (সা.) এর সুন্নাহ। রাসূল (সা.) তার সামনে পরিবেশিত আহারের শেষ কণাটি পর্যন্ত মুছে আহার করতেন। বর্তমানে বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, খাবারের মূল পুষ্টিগত নির্যাস পাত্রের তলায় এসে জমা হয়। পাশাপাশি খাবার পর আঙ্গুল চেটে নেওয়াও সুন্নাহর অংশ। খাবার শেষে আঙ্গুল চেটে নেওয়ার মাধ্যমে হজম ক্রিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পাচক রসের অধিক নিঃসরণ ঘটে।

৪. হাতে করে খাওয়া

কোন প্রকার চামচ ব্যবহার না করে হাতে করে খাওয়া রাসূল (সা.) এর সুন্নাহ। হাতে করে খাওয়ার মাধ্যমে খাবারের সাথে সংযোগ স্থাপিত হয়। ফলে যত্নের সাথে পরিষ্কার করে খাবার খাওয়া সম্ভব হয় এবং তা সহজেই হজম হয়। অন্যদিকে, চামচের মাধ্যমে খাবারের সাথে কোন প্রকার সংযোগ ঘটেনা এবং ফলে অনেকাংশে অবহেলায় অপরিচ্ছন্নভাবে খাবার গ্রহণ করা হয়। মনোসংযোগ ছাড়া অবহেলায় খাবার গ্রহণের কারণে এই খাবার হজমের জন্য অধিক সময়ের প্রয়োজন হয়।

৫. আল্লাহর নাম নিয়ে খাবার গ্রহণ করা

খাবার গ্রহণের পূর্বে রাসূল (সা.) আমাদের আল্লাহর নাম নেওয়ার জন্য তথা ‘বিসমিল্লাহ’ বলার নির্দেশ দিয়েছেন। এই পৃথিবীতে আমাদের খাবারের জন্য যা কিছু রয়েছে, তার সকল কিছুই আল্লাহর নেয়ামত। সুতরাং, ‘বিসমিল্লাহ’ বলার মাধ্যমে আমরা যেমন আমাদের সামনে পরিবেশিত খাবারের জন্য আল্লাহর শোকর আদায় করি, যার মাধ্যমে আল্লাহ আমাদের উপর সন্তুষ্ট হন, ঠিক তেমনি আমাদের আহারের উপর আল্লাহ বরকত দেন, যা আমাদের জন্য কল্যাণকর হয়।

খাবার গ্রহণের সময় রাসূল (সা.) প্রদর্শিত এই পদ্ধতি সমূহ স্মরণে রেখে বাস্তবায়ন করার মাধ্যমে আমরা আমাদের খাবারকে আমাদের জন্য উপকারী করে নিতে পারি।

মুসলিম ভাইব অবলম্বনে লিখেছেন মুহাম্মদ আল-বাহলুল। 

২৭ রজব কি আসলেই শবে মেরাজ?!

প্রশ্ন:

আমাদের দেশে রজবের ২৭ তারিখ দিবাগত রাতে শবে মেরাজ পালন করা হয়। বইপুস্তুকেও ২৭ তারিখকেই মেরাজ রজনী বলে উল্লেখ করা হয়ে থাকে। কিন্তু ইদানীং কিছু মৌলভী সাহেব থেকে এ ব্যাপারে কিছু সংশয়ের কথা শুনলাম। বাস্তব বিষয়টি কি?

উত্তর
মেরাজের ঘটনা রজবের ২৭ তারিখে হয়েছিল-একথা প্রমাণিত নয়। এই তারিখটি শুধু এমন একটি রেওয়ায়েতে পাওয়া যায়, যার সনদ সহীহ নয়। কোনো নির্ভরযোগ্য দলীল দ্বারা এটি প্রমাণিত নয়।

মেরাজ কখন হয়েছিল সে সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য সনদে শুধু এটুকু পাওয়া যায় যে, তা হিজরতের এক বা দেড় বছর আগে সংঘটিত হয়েছিল। কিন্তু কোন দিন, মাস বা তারিখে সংঘটিত হয়েছে এ ব্যাপারে নির্ভরযোগ্য সূত্রে কিছুই নেই।

তাই এই তারিখকে মেরাজ-রজনী হিসাবে ধরে নেওয়া যেমন ভুল তেমনি তা উদযাপন করাও ভুল। সাহাবা, তাবেয়ীন, তাবে তাবেয়ীন কেউ কখনো মেরাজ রজনী উদযাপন করেছেন এমন কোনো প্রমাণ নেই। এটি একটি কুসংস্কারও বিদআত।

আলমাওয়াহিবুল লাদুননিয়্যাহ ও শরহুল মাওয়াহিব ৮/১৮-১৯; আলবিদায়া ওয়াননিহায়া ২/৪৭১; লাতায়িফুল মাআরিফ পৃ. ১৩৪