Thursday, February 21, 2019
Home Blog

ইসলাম ও মওদূদীবাদ : সংক্ষেপে ১৫টি মন্তব্য ও খণ্ডন

ইসলাম-ও-মওদূদীবাদ

মুফতী মনসূরুল হক দা.বা.


যুগে যুগে আমাদের আকাবিরগণ নব্য বাতিলের মুকাবিলায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করে দ্বীনী দায়িত্ব পালনের এক উজ্জ্বল নমুনা জাতির সামনে রেখে গিয়েছেন । কিয়ামত যতই সন্নিকটে আসবে, বাতিলের সয়লাব ততই বৃদ্ধি পেতে থাকবে। তাই আকাবিরদের অনুসরণে দ্বীন ও ঈমানের হেফাযতের জন্য ও বাতিলের মুকাবিলার লক্ষে দ্বীনের খাদেমদের সর্বদা প্রস্তুত থাকা ঈমানী দায়িত্ব।

দীর্ঘদিন যাবত আবুল আলা মওদূদী সাহেবের প্রবর্তিত ফিতনা মহান আল্লাহ প্রদত্ত দ্বীন-ইসলামের উপর আঘাত হেনে চলেছে। নিরীহ ধর্মপ্রাণ সরল মুসলমানগণ দ্বীন অনুশীলনের ধোঁকায় পড়ে উক্ত ফিতনায় আক্রান্ত হয়ে শেষ পর্যন্ত নিজেদের দ্বীন ও ঈমান হারাতে বসেছে। আমাদের আকাবিররা উক্ত ফিতনা সম্পর্কে মুসলিম জাতিকে অবহিত করে গিয়েছেন। বর্তমানে ইসলামের খাদিমদেরও দায়িত্ব হচ্ছে, এই ফিতনার মূলোৎপাটনের জন্য যথাসম্ভব চেষ্টা চালানো। বলাবাহুল্য, এই ব্যাপারে হক্কানী উলামায়ে কিরামের ভূমিকা প্রশংসনীয়।

মওদূদী সাহেবের ভ্রান্ত মতবাদের দিকে জাস্ট ইঙ্গিত করতে গেলেও তা মাঝারী আকারের একটি স্বতন্ত্র বইয়ের আকার ধারণ করবে। কাজেই আমরা এখানে মওদূদী সাহেবের ঐ সমস্ত ভ্রান্তির মধ্য থেকে ১৫টি নিয়ে আলোচনা করব। আপনারা পড়লে বুঝতে পারবেন যে,  যাদের দ্বীনের সাথে সামান্যতম সম্পর্ক আছে, তারাও এমন কথা কখনই বলতে পারে না।

উল্লেখ্য যে, মওদূদী সাহেবের সাথে আমাদের বিরোধ রাজনৈতিক নয়, যেমনটি আজকাল প্রচার হচ্ছে। বরং, এটা আমাদের আদর্শিক দ্বন্দ্ব। এখানে প্রশ্ন ঈমান ও কুফরের, সত্য ও মিথ্যার।

নিম্নে মওদূদী সাহেবের ভ্রান্ত মতবাদের কিছু নমুনা পেশ করা হল:-

(১) আল্লাহ সম্পর্কে মন্তব্য:

ইসলাম ধর্ম বলে: মহান আল্লাহ কোনো ক্ষেত্রে জুলুমের আশঙ্কাজনিত কোনো বিধান দেননি। (সূরা ইউনুস- আয়াতঃ৪৪)

মওদূদী সাহেব বলেনঃ যেক্ষেত্রে নর- নারীর অবাধ মেলা-মেশার সুযোগ রয়েছে, সেক্ষেত্রে যিনার কারণে আল্লাহর আদেশকৃত রজমের শাস্তি প্রয়োগ করা নিঃসন্দেহে জুলুম। (তাফহীমাত ২-২৮১)

(২) ফেরেশতা সম্পর্কে মন্তব্য:

ইসলাম ধর্ম বলে: ফেরেশতাগণ নূরের তৈরী আল্লাহর মাখলূক। তাদেরকে মহিলা বা পুরুষ কোনোটাই বলা যাবে না। তাদের খানা-পিনার প্রয়োজন হয় না। তারা সর্বদা আল্লাহর ইবাদতে মশগুল থাকেন। (শরহুল আকাইদ-১৩৩)

মওদূদী সাহেব বলেনঃ ফেরেশতা প্রায় ঐ জিনিষ, যাকে গ্রীক,ভারত প্রভৃতি দেশের মুশরিকরা দেব-দেবী স্থির করেছে। (তাজদীদ ও এহইয়ায়ে দ্বীন-১০)

(৩) পবিত্র কুরআন সম্পর্কে মন্তব্য:

ইসলাম ধর্ম বলে: পবিত্র কুরআনের মনগড়া ব্যাখ্যা করা নাজায়িয ও হারাম। (তিরমিযী শরীফ,২/১১৯)

মওদূদী সাহেব বলেনঃ কুরআন শরীফের মনগড়া ব্যাখ্যা করা জায়িয। তিনি তাফহীমুল কুরআনের ভূমিকাতে লিখেন: কুরআনের এক একটি বাক্য পড়ার পর, তার যে অর্থ আমার মনে বাসা বেঁধেছে এবং মনের ওপর তার যে প্রভাব পড়েছে, তাকে যথাসম্ভব নির্ভুলভাবে নিজের ভাষায় লেখার চেষ্টা করেছি। (তাফহীমুল কুরআন,বাংলা ১/১০)

(৪) আম্বিয়ায়ে কেরাম (আলাইহিমুস্ সালাতু ওয়াসসালাম) সম্পর্কে মন্তব্য:

ইসলাম ধর্ম বলে: নবীগণ মাসূম তথা নিষ্পাপ, তারা যাবতীয় গুনাহ থেকে পবিত্র। (শরহুল আক্বাইদঃ১৫২)

মওদূদী সাহেব বলেনঃ নবীগণ মাসুম নন। প্রত্যেক নবীর দ্বারাই কোনো না কোনো গুনাহ সংঘটিত হয়েছে। (তাফহীমাত ২/৪৩)

(৫) ঈসা আ.কে আসমানে উত্তোলন সম্পর্কে মন্তব্য:

ইসলাম ধর্ম বলে: মহান আল্লাহ্ তা‘আলা হযরত ঈসা আ.কে জীবিতাবস্থায় সশরীরে আসমানে উঠিয়ে নিয়েছেন। (সূরা-আল ইমরান আয়াত ৫৫)

কিন্তু অমুসলিম ভ্রষ্ট কাদিয়ানী সম্প্রদায় এ সত্যকে স্বীকার করে না। মওদূদী সাহেবও তাদের অনুকরণ করে বলেনঃ ‘হযরত ঈসা আ.কে আল্লাহ তা‘আলা আসমানে উঠিয়ে নিয়েছেন এ কথা বলা যাবে না, আবার তিনি মারা গেছেন একথাও বলা যাবে না। বরং, বুঝতে হবে, এ ব্যাপারটি অস্পষ্ট। (তাফহীমূল কুরআন, উর্দূ, ১/৪২১)

(৬) মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সম্পর্কে মন্তব্য:

ইসলাম ধর্ম বলে: মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মানবিক দুর্বলতা থেকে মুক্ত ছিলেন। (তরজুমানুস্সুন্নাহ্-৩/৩৫০, শরহুল আকাইদ-১৩০)

মওদূদী সাহেব বলেনঃ মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মানবিক দুর্বলতা থেকে মুক্ত ছিলেন না। অর্থাৎ তিনি মানবিক দুর্বলতার বশবর্তী হয়ে গুনাহ করেছিলেন। যে কারণে ‘সূরা নাসর’ এর মধ্যে তাকে তাওবা ও ইস্তেগফার করতে বলা হয়েছে। (তাফহীমুল কুরআন বাংলা, ১৯/২৯০)

(৭) সুন্নাত সম্পর্কে মন্তব্য:

ইসলাম ধর্ম বলে: নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর আদত-আখলাক ও স্বভাব-চরিত্র আমাদের অনুকরণের জন্য উত্তম নমুনা বা আদর্শ। (সূরা আহযাব ২১, বুখারী শরীফ ২/১০৮৪)

মওদূদী সাহেব বলেনঃ নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর আদত-আখলাককে সুন্নাত বলা ও তা অনুকরণে জোর দেওয়া আমার মতে সাংঘাতিক ধরণের বিদ‘আত ও ধর্ম বিকৃতির নামান্তর। (রাসায়েলে মাসায়েল-১/২৪৮)

(৮) ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে মন্তব্য:

মহান আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন: নিশ্চয় আল্লাহর নিকট একমাত্র মনোনীত ধর্ম হল ইসলাম। (সূরা আল ইমরান- ১৯)

মওদূদী সাহেব বলেনঃ ইসলাম কোনো ধর্মের নাম নয় বরং এটি হলো একটি বিপ্লবী মতবাদ। (তাফহীমাত-১/৬২)

(৯) সাহাবায়ে কেরাম (রিযওয়ানুল্লাহি আলাইহিম আজমাইন) সম্পর্কে মন্তব্য:

ইসলাম ধর্ম বলে: সাহাবায়ে কেরাম (রিযওয়ানুল্লাহি আলাইহিম আজমাঈন) সত্যের মাপকাঠি। (সূরা বাক্বারা-আয়াত ১৩৭, বুখারী শরীফঃহা.৩৬৫১)

মওদূদী সাহেব বলেনঃ সাহাবায়ে কেরামকে সত্যের মাপকাঠি জানবে না। (দস্তুরে জামায়াতে ইসলামী-পৃঃ৭)

(১০) মাযহাব এর তাক্বলীদ (অনুসরণ) করা সম্পর্কে মন্তব্য:

ইসলাম বলে: চার ইমামের পরবর্তী যুগের মুসলমানদের, চাই তারা আলেম হোক বা মূর্খ হোক; হানাফী, শাফেয়ী, মালিকী, হাম্বলী, এই চার মাযহাবের কোনো এক নির্দিষ্ট মাযহাবকে অনুসরণ করা ওয়াজিব। এ চার মাযহাবের অনুসারী সকল মুসলমান ‘আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত’ নামে অভিহিত।

মওদূদী সাহেব বলেনঃ জ্ঞানী ব্যক্তির জন্য তাক্বলীদ করা, তথা চার মাযহাবের কোনো এক মাযহাবের অনুসরণ করা নাজায়িয ও গুনাহের চেয়েও জঘন্যতম। (রাসায়েলে মাসায়েল, ১/২৩৫)

(১১) নামায রোযা ইত্যাদি সম্পর্কে মন্তব্য:

ইসলাম ধর্ম বলে: দ্বীনের আসল মাকসাদ হচ্ছে; নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত ইত্যাদি কায়েম করা। আর ইসলামী হুকুমত উক্ত মাকসাদ অর্জনে সহায়ক। (বুখারী শরীফ-কিতাবুল ঈমান.হাদীস নং-৮)

মওদূদী সাহেব বলেনঃ দ্বীনের আসল মাকসাদ হচ্ছে, ইসলামী হুকুমত। আর নামায,রোযা,হজ্জ,যাকাত, প্রভৃতি ইবাদত হচ্ছে উক্ত মাকসাদ অর্জনের মাধ্যম মাত্র। (আকাবিরে উম্মত কি নযর মে মাওলানা মওদূদী পৃঃ ৬৪, জিহাদের হাক্বীকত-১৬)

মওদূদী সাহেবের উপরোক্ত বক্তব্যের ফল এই দাড়ায় যে, ইসলামী হুকুমত অর্জিত হলে নামাজ, রোযা, হজ্জ, যাকাত ইত্যাদি ইবাদতের কোনো প্রয়োজন থাকবে না। কেননা, মাকসাদ অর্জিত হয়ে গেলে মাধ্যমের আর প্রয়োজন থাকে না। অথচ ইসলামী হুকুমত কায়েম হোক বা না হোক, সকল মুসলমানের মৃত্যু পর্যন্ত নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত ইত্যাদি ইবাদত পালন করতে হবে।

(১২) ইফতার সম্পর্কে মন্তব্য:

ইসলাম ধর্ম বলে: রোযার শেষ সীমা সূর্যাস্ত পর্যন্ত, সূর্য অস্ত যাওয়ার পরে ইফতার করতে হবে, এর আগে ইফতার করলে রোযা হবে না। (ফাতাওয়ায়ে শামী-২/৩৭১এইচ এম সাঈদ)

মওদূদী সাহেব বলেনঃ ইফতারের জন্য কোনো সময়সীমা নির্ধারিত নেই। তাই কয়েক সেকেন্ড বা কয়েক মিনিট এদিক সেদিক হলে রোযা নষ্ট হবে না। যার অর্থ দাড়ায় যে, সূর্য ডোবার আগেও ইফতার করতে পারবে। (তাফহীমূল কুরআন উর্দূ ১/১৪৬)

(১৩) দাড়ি সম্পর্কে মন্তব্য:

ইসলাম ধর্ম বলে: দাড়ি রাখা ওয়াজিব এবং দাড়ি এক মুষ্টি পরিমাণ লম্বা রাখাও ওয়াজিব। (মুসলিম শরীফ-১২৯) ।

মওদূদী সাহেব বলেনঃ দাড়ি কাটা/ছাঁটা জায়িয। কেটে/ছেঁটে এক মুষ্টির কম হলেও ক্ষতি নেই। নবী কারীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যে পরিমাণ দাড়ি রেখেছিলেন, সে পরিমাণ দাড়ি রাখাকে সুন্নাত বলা এবং তার অনুসরণে জোর দেওয়া আমার মতে মারাত্মক অন্যায়। (রাসায়েলে মাসায়েল ১-২৪৭)

(১৪) সিনেমা দেখা সম্পর্কে মন্তব্য:

ইসলাম ধর্ম বলে: সিনেমা দেখা নাজায়িয ও হারাম। (তাকমিলা ফাতহুল মূলহিমঃ৪/৯৮, আহাম মাসায়েলঃ২২৬)

মওদূদী সাহেব বলেনঃ প্রকৃত পথে সিনেমা দেখা জায়িয। (রাসায়েলে মাসায়েল ১-২৬২)

(১৫) তাসাউফ (আত্মশুদ্ধি) সম্পর্কে মন্তব্য:

ইসলাম ধর্ম বলে: তাসাউফ কুরআন হাদীস দ্বারা সু-প্রমাণিত, তাযকিয়ায়ে নফস তথা আত্মশুদ্ধি ইসলামের অন্যতম উদ্দেশ্য, বরং একে ইসলামের প্রধানতম উদ্দেশ্য বলা হয়, কারণ, কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা তাযকিয়ায়ে নফসকে নবী প্রেরণের উদ্দেশ্য হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। আত্মশুদ্ধি অর্জনকে শরী‘আতের কোথাও ইসলামী হুকুমতের উপর নির্ভরশীল বলেনি। (সূরা বাক্বারা, আয়াত-১২৯; আল ইমরান, আয়াত-১১৪)

মওদূদী সাহেব বলেনঃ আত্মশুদ্ধির জন্য রাষ্ট্রক্ষমতা পূর্বশর্ত, অর্থাৎ রাষ্ট্র ক্ষমতা অর্জন করা ছাড়া ব্যক্তির আত্মশুদ্ধি অসম্ভব । (আত্মশুদ্ধির ইসলামি পদ্ধতি-৭)

তিনি আরও বলেনঃ তরিকত বা পিরালীর মাধ্যমে মুসলমানদেরকে আফিম দেওয়া হয়েছে, এর ফলে তাদেরকে অচেতন, অকর্মা ও অকেজো করে দেওয়া হয়েছে । (তাজদীদে ইহইয়ায়ে দ্বীন-২২)

এভাবে তিনি ইসলামের অনেক বিষয়ে এমন মন্তব্য করেছেন, যা পূর্ববর্তী সকল উলামায়ে কেরামের বিপরীত।

মওদূদী সাহেব বর্তমানে জীবিত নেই। কিন্তু তার রেখে যাওয়া ভ্রান্ত মতবাদ এখনও পুরোদমে চালু আছে। তার কিছু ভক্ত ও অন্ধ অনুসারী না বুঝে উক্ত ভ্রান্ত চিন্তাধারা সমাজে প্রচার করে যাচ্ছেন এবং মানুষকে ধোঁকায় ফেলার জন্য বাহ্যিকভাবে ইসলামের বুলি আওড়িয়ে বস্তুত ইসলামকে বিকৃত করে নতুন ধর্ম গড়ার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এহেন পরিস্থিতিতে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে মওদূদী মতবাদ প্রচারে গোপন সমর্থন প্রদান করা কোনো ধর্মপ্রাণ মুসলমানের জন্য জায়িয হবে না। তাই আপন জান-মালের মাধ্যমে এ ফিতনা মূলোৎপাটনের জন্য সঠিক চেষ্টা চালানো আজ সকল মুসলমানের উপর ফরজ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

যারা না বুঝে এ ভ্রান্ত মতবাদ গ্রহণ করেছেন বা এর শিকার হয়েছেন; তাদের প্রতি আমাদের আকুল আবেদন এই যে, আপনারা হক্কানী উলামায়ে কেরামের সোহবতে আসুন। উল্লেখিত কথাগুলো নিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করুন। কবরে ঈমানের পরীক্ষা একবারই হবে, ফেল করলে দ্বিতীয়বার পরীক্ষা দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। মওদূদী সাহেব এর সাথে উলামায়ে কেরাম এর কোনো ঝগড়া বা হিংসা নেই। শুধুমাত্র সাধারণ মুসলমানদের ঈমানের হেফাযতের জন্যই এই প্রচেষ্টা।

আল্লাহ তা‘আলা আমাদের সকলকে এই ঈমান বিধ্বংসী ফিতনা থেকে হিফাযত করে সঠিক ঈমান নিয়ে কবরে যাওয়ার তৌফিক দান করুন। আমীন।

তামিল সংগীত পরিচালক ও অভিনেতার ইসলাম গ্রহণ (ভিডিও)

ভারতের তামিল সংগীত পরিচালক ও অভিনয় শিল্পী কুরালারাসানর ইসলাম গ্রহণ

সম্প্রতি ভারতের তামিল সিনেমা শিল্পের সঙ্গীত পরিচালক ও অভিনেতা কুরালারাসান ইসলাম গ্রহণ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কুরালারাসানের ইসলাম গ্রহণের একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে।

ইন্ডিয়া টুডে জানায়, কুরালারাসান চেন্নাইয়ের আন্না সালাই মসজিদে বাবা থিসিংগু রাজেনদার ও মা ঊষা রাজেনদারের উপস্থিতিতে পবিত্র ধর্ম ইসলাম গ্রহণ করেছেন।

কুরালারাসানের ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে তার বাবা টি রাজেনদার জানান, তিনি সব ধর্মকেই সমান বলে মনে করেন। সব ধর্মের সহনশীলতাই তার নীতি।

তিনি আরো বলেন, আমার বড় ছেলে সিম্বু তামিল সিনেমা বিখ্যাত অভিনেতা। সে শিবভক্ত। তার মেয়ে খ্রিস্টান ধর্মে বিশ্বাসী। আর ছোট ছেলে কুরালারাসান ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে। তিনি তার ছেলের সিদ্ধান্তকে সম্মান জানান।

কুরালারাসান ছোট থেকেই তার বাবা টি রাজেনদার অভিনীত সিনেমায় শিশু চরিত্রে অভিনয় করতেন।

কুরালারাসান ইসলাম গ্রহণ করায় তার পরিবারের লোকজনসহ ভক্তবৃন্দ তাকে অভিনন্দন জানিয়েছে।


খ্রিস্টানদের চক্রান্ত ও অপব্যাখ্যা থেকে সাবধান : মিশনারিদের বক্তব্যের খণ্ডন

খ্রিস্টান-চক্রান্ত- মিশনারি খ্রিস্ট ধর্ম অপব্যাখ্যা

মুফতী মনসূরুল হক দা.বা.


বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকায় একদল কুচক্রী খ্রিস্টানদের অপপ্রচারে বিভ্রান্ত হয়ে চিরমুক্তির আশায় অনেকে খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণ করছে। অনেক মুসলমানও ঈসায়ী মুসলিম নামধারণ করে খ্রিস্টান হয়ে যাচ্ছে। আমাদের বিশ্বাস ঐ সরলমনা মুসলমানরা খ্রিস্টচক্রের অপপ্রচারে বিভ্রান্ত হয়েই ইসলাম ত্যাগ করে ঈসায়ী মুসলিম হয়েছে। কারণ, খাঁটি মুসলমান জীবন বিলিয়ে হলেও ঈমান হেফাজত করে থাকে। খ্রিস্টানদের অপপ্রচারে আর কোনো মুসলমান যেন বিভ্রান্ত না হয় এবং যারা ইতিমধ্যে খ্রিস্টানদের ফাঁদে পা দিয়েছে তারা যেন পুনরায় ইসলাম ধর্মে ফিরে আসতে পারে, সেজন্যই আমাদের এই ক্ষুদ্র প্রয়াস।

শেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম নবী হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার পরে ইসলাম ছাড়া অন্য সব ধর্ম রহিত হয়ে গেছে। তাই এখন তাঁর আনীত ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলেই পরকালে মুক্তি পাওয়া যাবে। ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো ধর্মে বিশ্বাস করলে পরকালে মুক্তি পাওয়া যাবে না; বরং ইসলাম ধর্ম না মানার অপরাধে চিরকাল তাকে জাহান্নামের কঠিন আগুনে জ্বলতে হবে। আল্লাহ তা‘আলা আল-কুরআনের সূরা আল ইমরানের ৮৫ নং আয়াতে স্পষ্টভাষায় বলে দিয়েছেন: ومن يبتغِ غير الاسْلاَم دينا فلن يقبل منه و هو فى الاخرة من الخسرين

যে ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো ধর্ম পালন করবে তা কখনো তার থেকে গ্রহণ করা হবে না, আর পরকালে সে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।’ এই সূরারই ১৯ নং আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, ان الدين عند الله الاسلام ‘নিশ্চয় ইসলামই আল্লাহর নিকট একমাত্র ধর্ম’

এই দুই আয়াত দ্বারা একথা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়ে গেল যে, কিয়ামত পর্যন্ত ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো ধর্ম আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্য নয়। অতএব, যারা পরকালে চিরমুক্তির আশায় ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো ধর্ম পালন করছেন তাদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান, আপনারা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে চিরমুক্তি ও শান্তির পথে প্রবেশ করুন। কুরআন শরীফের অনেক আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা খ্রিস্টান ও ইয়াহুদীদেরকে মুসলমান হতে বলেছেন। মুসলমান না হলে তাদের জন্য পরকালে কঠিন শাস্তির হুমকি দিয়েছেন।

নিম্নে এ বিষয়ের কয়েকটি আয়াত উল্লেখ করা হলোঃ

১. ولو امن اهل الكتب لكان خيرا لهم ‘ইয়াহুদী ও খ্রিস্টানরা যদি প্রকৃত মুসলমান হতো, তাহলে তা তাদের জন্য ভালো হতো’ (সূরা আল ইমরান ১১০)

২. ياهل الكتب لم تكفرون بايت الله وانتم تشهدون ‘হে ইয়াহুদী ও খ্রিস্টানগণ! তোমরা কেন আল্লাহর আয়াতসমূহকে অস্বীকার করো, যখন তোমরাই সাক্ষ্য বহন করো’ (আল ইমরানঃ ৭০) অর্থাৎ ইয়াহুদী-খ্রিস্টানগণ এই সাক্ষ্য দেয় যে তাওরাত ও ইঞ্জিল আল্লাহর কিতাব । আর ঐ উভয় কিতাবে হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নবুওয়াতের এবং তার উপর অবতীর্ণ কুরআনের সত্যতা ও তাঁর আগমন বার্তা বর্ণিত ছিল। মহানবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং কুরআনকে মানতে অস্বীকার করে তারা বস্তুত তাওরাত ও ইনজিলকে অস্বীকার করছে। তারা তাওরাত ও ইনজিলের পাঠ বিভিন্ন স্থানে পরিবর্তন ও বিকৃত করেছে। (আল-কুরআনুল কারীম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, পৃ.৮৮)

৩. قل ياهل الكتب لم تكفرون بايت الله والله شهيد على ما تعملون ‘হে ইয়াহুদী ও খ্রিস্টানগণ তোমরা আল্লাহর আয়াতসমূহকে কেন অস্বীকার করো? অথচ তোমরা যা করো আল্লাহ তার উপর সাক্ষী’ (আল ইমরানঃ ৯৮)

৪. ولو ان اهل الكتب امنوا واتقوا لكفرنا عنهم سياتهم… ‘ইয়াহুদী-খ্রিস্টানরা যদি প্রকৃত মুসলমান হতো এবং ভয় করতো, তাহলে আমি অবশ্যই তাদের পাপসমূহ মোচন করতাম এবং আমি অবশ্যই তাদেরকে সুখময় জান্নাতে প্রবেশ করাতাম’ (মায়িদাঃ ৬৫) উল্লেখ্য, এই আয়াতে স্পষ্টভাবে বলে দেওয়া হয়েছে যে, খ্রিস্টানদের জন্য পাপ মোচনের একমাত্র মাধ্যম হলো মুমিন-মুসলমান হওয়া। প্রকৃত মুসলমান না হলে পরকালে তারা মুক্তি পাবে না।

৫. ان الذين كفروا من اهل الكتب والمشركين فى نار جهنم… ‘ইয়াহুদী ও খ্রিস্টানদের মধ্য থেকে যারা কুফুরী করে (তথা মুসলমান হয় না) তারা এবং মুশরিকরা জাহান্নামের আগুনে স্থায়ীভাবে অবস্থান করবে, তারাই সৃষ্টির অধম।’ (বাইয়িনাতঃ ৬)

৬. وما امروا الا ليعبدوا الله مخلصين له الدين… ‘ইয়াহুদী ও খ্রিস্টানদেরকে আদেশ করা হয়েছিল যাতে তারা আল্লাহর আনুগত্যে বিশুদ্ধচিত্ত হয়ে একনিষ্ঠভাবে তার ইবাদত করে এবং সালাত কায়েম করে ও যাকাত দেয়, এটাই সঠিক দ্বীন।’ (বাইয়িনাতঃ ৫) উল্লেখ্য, এই সঠিক দ্বীনের নামই ইসলাম।

৭. يايها الذ ين اوتوا الكتب امنوا بما نزلنا مصدقا لما معكم… ‘হে ইয়াহুদী-খ্রিস্টানগণ! তোমাদের নিকট যা আছে তার সমর্থকরূপে আমি যা অবতীর্ণ করেছি (অর্থাৎ আল-কুরআন) তার প্রতি তোমরা ঈমান আনো।’ (নিসাঃ ৪৭)

৮. ইয়াহুদী-খ্রিস্টানদের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা মুসলমানদেরকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন,يا يها الذ ين امنوا ان تطيعوا فريقا من الذ ين اوتوا الكتب يردوكم بعد ايمانكم كفرين

‘হে মুমিনগণ! তোমরা যদি ইয়াহুদী-খ্রিস্টানদের দলবিশেষের আনুগত্য করো তাহলে তারা তোমাদেরকে ঈমান আনার পর আবার কাফের বানিয়ে ছাড়বে।’ (আল ইমরান ১০০)

উপরিউক্ত আয়াতসমূহ দ্বারা তিনটি বিষয় প্রমাণিত হলঃ

১. হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নবী হওয়ার পর থেকে কিয়ামত পর্যন্ত ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো ধর্ম আল্লাহ তা‘আলার নিকট গ্রহণযোগ্য নয় ।

২. অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের মত খ্রিস্টানদেরকেও মুসলমান হতে হবে। মুসলমান না হলে তারা পরকালে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি পাবে না; বরং চিরকাল জাহান্নামের আগুনে জ্বলতে হবে।

৩. খ্রিস্টানদের একটা দল কিয়ামত পর্যন্ত মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে থাকবে। মুসলমানদের মধ্য থেকে যারা তাদেরকে মানবে, তারা ঐ মুসলমানদেরকে বিভিন্নভাবে প্রতারিত করে কাফের বানিয়ে ছাড়বে।

অতএব, হে সরলমনা মুসলিম ভাই ও বোনেরা! আপনারা কুচক্রী খ্রিস্টানদের অপপ্রচারে বিভ্রান্ত হবেন না কিংবা সামান্য কিছু অর্থের বিনিময়ে নিজের অমূল্য ঈমান খ্রিস্টানদের হাতে বিলিয়ে দিবেন না। ‘ঈসায়ী মুসলিম’ হয়ে কিংবা ‘আহলে কুরআন’ হয়ে নিজের ঈমানকে ধ্বংস করবেন না। ঈমান অমূল্য সম্পদ। যারা মুসলমান অবস্থায় সামান্য ঈমান নিয়ে মৃত্যুবরণ করবে, তাদেরকেও আল্লাহ তা‘আলা এই পৃথিবীর ১১ টি পৃথিবীর সমান সুবিশাল জান্নাত দান করবেন। সেই জান্নাতে আপনি যা চাবেন তাই পাবেন। কিন্তু কেউ যদি ঈমান হারা হয়ে এই পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়, তাহলে তাকে জাহান্নামের ভয়ংকর আগুনে চিরকাল জ্বলতে হবে। সেই আগুনের জ্বলন সহ্য করার মতো ক্ষমতা কারো থাকবে না। কুরআনের শতশত আয়াত এ ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে।

অনুরোধ করছি, কুরআন বা ইসলাম সম্পর্কে কেউ কোনো নতুন কথা বললে তার কথা যাচাই না করেই বিশ্বাস করবেন না; বরং এ ধরণের কোনো কথা শুনলে কওমী মাদরাসার ভালো কোনো আলেমের কাছে জিজ্ঞেস করে নিবেন যে, কথাটি ঠিক না বেঠিক । যে কারো কথা বিশ্বাস করে নিজের ঈমানকে ধ্বংস করবেন না। মুসলমান না হলে যখন খ্রিস্টানরাই মুক্তি পাবে না তখন আপনি খ্রিস্টান হয়ে বা ঈসায়ী মুসলিম হয়ে কীভাবে মুক্তির আশা করতে পারেন? মনে রাখবেন, ঈসায়ী মুসলিম এবং আহলে কুরআন মূলত পাক্কা খ্রিস্টান।

নিম্নে এমন কয়েকটি আয়াত সম্পর্কে আলোচনা করা হচ্ছে, যার অপব্যাখ্যা করে খ্রিস্টানরা সরলমনা মুসলমানদেরকে ঈসায়ী মুসলিম বা আহলে কুরআন নামে খ্রিস্টান বানানোর অপচেষ্টা করে যাচ্ছে।

১. সূরা মায়েদার ৬৮ নং আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়ে খ্রিস্টান প্রতারক চক্র বলে থাকে, ‘এই আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা মুসলমানদেরকে তাওরাত ও ইনজীল প্রতিষ্ঠা ও অনুসরণ করতে বলেছেন। অতএব, তোমরা তাওরাত ও ইনজীল প্রতিষ্ঠা করো এবং ঈসায়ী মুসলিম হয়ে যাও। অন্যথায় তোমরা মুক্তি পাবে না।’

আমি সূরা মায়েদার ৬৮ নং আয়াতের মূলপাঠ নিম্নে উল্লেখ করে সরল অনুবাদ তুলে ধরছি:

قل ياهل الكتب لستم على شيء حتى تقيموا التوراة والانجيل وما انزل اليكم من ربكم وليزيدن كثيرا منهم ما انزل اليك من ربك طغيانا وكفرا فلا تأس على القوم الكفرين

‘হে নবী! আপনি বলুন, হে ইয়াহুদী- খ্রিস্টানগণ তাওরাত-ইনজীল ও যা তোমাদের প্রতিপালকের নিকট থেকে তোমাদের প্রতি অবতীর্ণ করা হয়েছে (তথা কুরআন) তোমরা তা প্রতিষ্ঠা না করা পর্যন্ত তোমাদের কোনো ভিত্তি নেই। আপনার প্রতিপালকের নিকট থেকে আপনার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে তা (কুরআন) তাদের অনেকের ধর্মদ্রোহিতা ও অবিশ্বাসই বাড়াবে। সুতরাং আপনি কাফের সম্প্রদায়ের জন্য দুঃখ করবেন না।’

সূরা মায়েদার ৬৮ নং আয়াতের মূলপাঠ ও অনুবাদ উল্লেখ করা হলো। প্রিয় পাঠক! আপনিই বলুন, এই আয়াতের কোন স্থানে আল্লাহ তা‘আলা মুসলমানদেরকে তাওরাত-ইনজীল অনুসরণ ও প্রতিষ্ঠা করতে বলেছেন? এই আয়াতে তো আল্লাহ তা‘আলা ইয়াহুদী-খ্রিস্টানদেরকে তাওরাত-ইনজীলের সাথে সাথে কুরআন মানতে বলেছেন (আর একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, কুরআন মানলে ও প্রতিষ্ঠা করলে তাদেরকে অবশ্যই মুসলমান হয়ে যেতে হবে।) এবং কুরআন না মানলে তাদের ধর্মদ্রোহিতা বৃদ্ধি পাবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন। তাহলে কোন যুক্তিতে তারা এই আয়াত বলে মুসলমানদেরকে ধোঁকা দিতে পারে? আর আমরাই বা কেমন মুসলমান যে, যে যা বলে তাই মেনে দুনিয়ার লোভে পড়ে ঈমান হারা হয়ে যাচ্ছি।

আসল মুসলমান কারো সাথে প্রতারণা করে না এবং প্রতারণার শিকারও হয় না। আমরা মুসলমানরাই দ্বীন-ইসলাম সম্পর্কে একেবারে অজ্ঞ রয়ে যাচ্ছি। আর এই অজ্ঞতার সুযোগে খ্রিস্টানরা আমাদের মুসলমান ভাই-বোনদের ঈমান ধ্বংস করছে। অথচ যথেষ্ট পরিমাণ দ্বীনের জ্ঞান অর্জন করা সকল মুসলমানের উপর ফরয । এই ফরযের প্রতি অবহেলার কারণেই খ্রিস্টানরা আমাদেরকে সহজেই বোকা বানাতে পারছে। বর্তমানে প্রতিদিন ইউরোপ-আমেরিকাতে শত শত খ্রিস্টান কুরআনের সত্যতা অনুধাবন করে মুসলমান হচ্ছে। আর বাংলাদেশের মত একটি মুসলিম দেশে মুসলমানরা খ্রিস্টান হয়ে যাচ্ছে, এর চেয়ে বড় আফসোসের কথা আর কী হতে পারে? আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে প্রয়োজন পরিমাণ দ্বীনের জ্ঞান অর্জন করার তাওফিক দান করুন এবং খ্রিস্টান প্রতারক চক্রের প্রতারণার শিকার হওয়া থেকে হেফাজত করুন।

২. দ্বিতীয় যে বিষয়টি বলে তারা বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করে তা এই যে, তারা কুরআনের বিভিন্ন আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়ে বলে, কুরআনে বলা হয়েছে ‘আল্লাহর বাণী কেউ পরিবর্তন করতে পারবে না।’ (সূরা ইউনুস: ৬৪, সূরা আনআমঃ১১৫,৩৪, সূরা কাহাফঃ ২৭) আর তাওরাত-ইনজীল যেহেতু আল্লাহর বাণী তাই এতেও কোনো পরিবর্তন হতে পারে না। অতএব সবাইকে তাওরাত ইনজীল মানতে হবে। তথা ইয়াহুদী বা খ্রিস্টান হতে হবে।

প্রিয় পাঠক! ‘আল্লাহর বাণী পরিবর্তন হওয়ার নয়’ এই আয়াতে আল্লাহর বাণী দ্বারা তাওরাত-ইনজীল উদ্দেশ্য নয়; বরং আল্লাহর বাণী দ্বারা একেক আয়াতে একেক অর্থ উদ্দেশ্য। তাফসীরের কিতাবের মধ্যে সবচেয়ে বিশুদ্ধ ও প্রসিদ্ধ তাফসীরের কিতাব ইবনে কাসীর রহ. কর্তৃক প্রণীত ‘তাফসীরুল কুরআনিল আযীম’ এর উদ্ধৃতিতে আমরা ‘আল্লাহর বাণী পরিবর্তন হওয়ার নয়’ এই আয়াতের মর্ম নিম্নে উল্লেখ করছি।

সূরা আনআমের ৩৪ নং আয়াতে বিভিন্ন বালা-মুসিবাতে আল্লাহ তা‘আলা নবী-রসূলগণকে সাহায্য করেছেন একথা উল্লেখ করে বলেন ‘কেউ আমার বাণী পরিবর্তন করতে পারবে না।’ ইবনে কাসীর রহ. এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন,

ولا مبدل لكلمات الله اى التى كتبها بالنصر فى الدنيا و الاخرة لعباده المؤمنين

‘মুমিন বান্দাদেরকে দুনিয়া ও আখিরাতে সাহায্য করা হবে বলে যে ওয়াদা আল্লাহ তা‘আলা করেছেন তা কেউ পরিবর্তন করতে পারবে না। যেমন আল্লাহ তা‘আলা সূরা সাফ্ফাত এর ১৭১-১৭৩ নং আয়াতে বলেছেন, ‘আল্লাহ তা‘আলা নবী-রাসূল ও মুমিন বান্দাদেরকে অবশ্যই সাহায্য করবেন’ এই ওয়াদা (বাণী) কেউ পরিবর্তন করতে পারবে না।’ এখানে বাণী দ্বারা কুরআনে মুমিন বান্দাদের জন্য কৃত আল্লাহর ওয়াদা উদ্দেশ্য।

আর সূরা আনআমের ১১৫ নং আয়াতের শুরুতে আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন ‘সত্য ও ন্যায়ের দিক দিয়ে তোমার প্রতিপালকের বাণী পরিপূর্ণ হয়েছে’ এরপর আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, ‘তাঁর বাণী কেউ পরিবর্তন করার নেই’ এই আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনে কাসীর রহ. বলেন, اى ليس احد يعقب حكمه تعالى لافى الدنيا ولا فى الاخرة

‘এমন কেউ নেই যে আল্লাহর হুকুম পাল্টাতে পারে- না দুনিয়াতে না আখিরাতে ।’ বুঝা গেল যে, এই আয়াতে আল্লাহর বাণী দ্বারা আল্লাহর হুকুম তথা কুরআন উদ্দেশ্য।

আর সূরা ইউনুসের ৬৪ নং আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা দুনিয়া ও আখিরাতে মুমিন মুত্তাকীদেরকে সুসংবাদের ঘোষণা দিয়ে বলেছেন ‘لاتبديل لكلمات الله’ ‘আল্লাহর বাণীসমূহের কোনো পরিবর্তন নেই।’ এই আয়াতের মর্ম সম্পর্কে তাফসীরে ইবনে কাসীরে বলা হয়েছে:

لاتبديل لكلمات الله اى هذا الوعد لايبدل ولايخلف ولايغير بل هو مقرر مثبت كائن لا محالة ‘আল্লাহর বাণীসমূহের কোনো পরিবর্তন নেই অর্থাৎ (মুমিনদের জন্য) আল্লাহ তা‘আলা যে ওয়াদা করেছেন তা পরিবর্তন করা হবে না, ভঙ্গ করা হবে না এবং তার বিপরীত কিছু করা হবে না; বরং এই ওয়াদা সুনির্ধারিত ও সুসাব্যস্ত এবং তা অনিবার্যভাবে সংগঠিত হবে।’ এই আয়াতেও আল্লাহর বাণী দ্বারা মুমিনদের সাথে কুরআন শরীফে কৃত আল্লাহ তা‘আলার ওয়াদা উদ্দেশ্য।

আর সূরা কাহাফের ২৭ নং আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে কুরআন তিলাওয়াতের নির্দেশ দিয়ে বলেন, لا مبدل لكلماته ‘তাঁর বাণীসমূহের কোনো পরিবর্তনকারী নেই’ তাফসীরে ইবনে কাসীরে এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে

يقول تعالى امرا رسوله صلى الله عليه وسلم بتلاوة كتابه العزيز وابلاغه الى الناس لامبدل لكلماته اى لامغير لها ولا محرف ولامزيل

‘আল্লাহ তা‘আলা স্বীয় রাসূলকে নিজের প্রিয় কিতাব তিলাওয়াতের নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, ‘তাঁর বাণীসমূহের কোনো পরিবর্তনকারী নেই’ অর্থাৎ এই কুরআনের মধ্যে কেউ কোনো ধরণের পরিবর্তন, বিকৃতি ও বিলুপ্তি ঘটাতে পারবে না।’ এই আয়াতে আল্লাহর বাণী দ্বারা কুরআন মাজীদ উদ্দেশ্য।

প্রিয় পাঠক! কুরআন শরীফ ও কুরআনের বিশুদ্ধ তাফসীর দ্বারা এ কথা প্রমাণিত হয়ে গেল যে, ‘আল্লাহর বাণী পরিবর্তন হওয়ার নয়’ এই আয়াতে আল্লাহর বাণী দ্বারা তাওরাত-ইনজীল উদ্দেশ্য নয়। তাছাড়া এই আয়াতে তাওরাত-ইনজীল উদ্দেশ্য হওয়ার প্রশ্নই উঠে না। কারণ, কুরআনের মধ্যে আল্লাহ তা‘আলা স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন যে, ইয়াহুদী-খ্রিস্টানরা তাদের কিতাব তাওরাত-ইনজীল নিজেদের ইচ্ছা মতো পরিবর্তন করেছে।

যেমন, সূরা বাকারার ৯ নং রুকুতে আল্লাহ তা‘আলা ইয়াহুদী-খ্রিস্টানদের বদকর্মের আলোচনা করতে গিয়ে ৭৯ নং আয়াতে বলেন, فويل للذين يكتبون الكتب بايديهم…… ‘সুতরাং দুর্ভোগ তাদের জন্য যারা নিজ হাতে কিতাব রচনা করে অতঃপর তুচ্ছ মূল্য প্রাপ্তির আশায় বলে, এটা আল্লাহর নিকট হতে এসেছে।’ অতএব, কুরআন দ্বারাই এ কথা প্রমাণিত হলো যে, ইয়াহুদী-খ্রিস্টানরা দুনিয়াবী স্বার্থে তাদের কিতাব পরিবর্তন করেছে। এখন আপনিই বলুন ‘আল্লাহর বাণী পরিবর্তন হওয়ার নয়’ এই আয়াতে আল্লাহর বাণী দ্বারা কীভাবে তাওরাত-ইনজীল উদ্দেশ্য হতে পারে?

খ্রিস্টানরা যদিও আরো কয়েকটি আয়াতের অপব্যাখ্যা করে মুসলমানদেরকে ঈমান হারা করার চেষ্টা করে যাচ্ছে, কিন্তু এই সংক্ষিপ্ত পরিচয় দীর্ঘ আলোচনা করা সম্ভব নয়। আমরা মনে করি খ্রিস্টচক্রকে প্রতিহত করার জন্য সূরা আল ইমরানের ৮৫ নং আয়াত মনে রাখাই মুসলমানদের জন্য যথেষ্ট। কারণ, এই আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন যে, ومن يبتغ غير الاسلام دينا فلن يقبل منه وهو فى الاخرة من الخسرين.

‘কেউ ইসলাম ব্যতীত অন্য কোনো ধর্ম গ্রহণ করতে চাইলে তা কখনো তার থেকে গ্রহণ করা হবে না এবং সে আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।’

অতএব, হে মুসলিম ভাই ও বোনেরা! কোনো প্রতারক যদি আপনাকে কুরআনের কথা বলে বা অন্য কোনো কিছুর কথা বলে নতুন কোনো মতবাদ গ্রহণ করার দাওয়াত দেয় তাহলে আপনি তা গ্রহণ করবেন না। আপনি সূরা আল ইমরানের ৮৫ নং আয়াত মনে রাখুন এবং যেকোনো মূল্যে মৃত্যু পর্যন্ত খাঁটি মুসলমান হিসেবে বেঁচে থাকার চেষ্টা করুন। ঈমান বাঁচানোর জন্য জান-মাল কুরবানী করার প্রয়োজন হলে জান-মাল কুরবানী করে দিবেন কিন্তু কোনো অবস্থাতেই ঈমান বিলিয়ে দিবেন না। আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে খাঁটি ঈমান ও ইসলাম নিয়ে দুনিয়া থেকে বিদায় হওয়ার তাওফিক দান করুন এবং আমাদের দেশকে খ্রিস্টচক্রের আগ্রাসী থাবা থেকে রক্ষা করুন। আমীন।

মাওলানা ইলিয়াসের (রঃ) রেখে যাওয়া উসুল ও তারতীব অনুসরণ করতে হবে: শায়েখ গাসসান

বিশ্ব-ইজতেমা- ijtema 2019

চলতি বিশ্ব ইজতেমায় সৌদি আরব থেকে আগত বিশিষ্ট আলেম ও দায়ী শায়েখ গাসসান বলেছেন, তাবলীগ জামাতের প্রবর্তক, জগদ্বিখ্যাত দায়ী হযরত মাওলানা ইলিয়াস রাহিমাহুল্লাহুর রেখে যাওয়া উসুল ও তারতীব অনুসরণ করে আমাদেরকে দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ করতে হবে। তাঁর রেখে যাওয়া নিয়ম পদ্ধতি অনুসরণ করা হলেই কেবল এই মেহনত আমাদের জন্য উপকারী হবে অন্যথায় এই মেহনত থেকে কোন ফায়দা হাসিল করা সম্ভব নয়।

আজ শুক্রবার (১৫ ফেব্রুয়ারি) বাদ জুমআ বয়ানে তিনি এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, মাওলানা ইলিয়াস রাহিমাহুল্লাহ আজীবন দ্বীনের ফিকির করেছেন। উনার দিলে আল্লাহ্ তাআ’লা এত পরিমান দ্বীনের ফিকির ঢেলেছিলেন যে, তিনি প্রায় রাতেই ঠিকমতো ঘুমাতে পারতেন না। ঘরের ভিতর পায়চারি করতেন আর ভাবতেন দ্বীন আজ ইয়াতীম হয়ে গেছে, দ্বীন মুসলমানের কাছে অপরিচিত হয়ে গেছে, দ্বীন থেকে মুসলমান আজ দূরে সরে গেছে। এমতাবস্থায় কি করা যায় এ উম্মতের জন্য!

একসময় মাওলানা ইলিয়াস রাহিমাহুল্লাহ্ হিন্দুস্থান থেকে হিজরত করে মদীনা গেলেন এই আশায় যে, আল্লাহ্ যদি এ উম্মতের ব্যাপারে আমাকে রাহবারি করেন! মদীনা যাওয়ার পর তিনি বিভিন্ন লাইনে অনেক মুজাহাদা করেছেন। অবশেষে একসময় আল্লাহ্ তাআ’লা তার দিলে দাওয়াতের মেহনতের এই নকশাকে খুললেন। এরপর তিনি এই মেহনত শুরু করেন। এই মেহনতের উসুলগুলো পবিত্র কুরআন ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সীরাত থেকে নেওয়া হয়েছে।

মাওলানা ইলিয়াস রাহিমাহুল্লাহ্ এই কাজ শুরু করার পর আল্লাহ্ তাআ’লা এই কাজের বরকত সারা বিশ্বে পৌঁছে দেন এবং এই কাজের বরকতে অসংখ্য অগণিত মানুষ হেদায়েত পেতে লাগলো। তাই যতদিন এই মেহনত মাওলানা ইলিয়াস রাহিমাহুল্লাহুর রেখে যাওয়া উসুল ও তারতীব মত করা হবে ততদিন আমরা এর থেকে উপকৃত হবো অন্যথায় এই মেহনত আমাদের কোন উপকারে আসবেনা।

তিনি আরো বলেন, এই কাজ মাওলানা ইলিয়াস রাহিমাহুল্লাহুর জামানায় শুরু হয়েছে এরপর মাওলানা ইনামুল হাসান রাহিমাহুল্লাহুর জামানায় আল্লাহ্ তা’আলা এ কাজকে বিশ্বের আনাচে কানাচে পৌঁছে দিয়েছেন।

মেহমান বলেন, আমরা বিশ বছর মাওলানা ইনামুল হাসান রাহিমাহুল্লাহুর সোহবত (সংস্পর্শ) পেয়েছি। তিনি বড় আল্লাহ্ ওয়ালা, পরহেজগার ও বুজুর্গ ছিলেন। তিনি দ্বীন ও দাওয়াতের ব্যাপারে খুব ফিকিরবান ছিলেন। তিনি একবার আমাদের বললেন, দেখ দ্বীন শুধু একটা জিনিসের নাম নয় বরং এর মধ্যে আরো অনেক বিষয় রয়েছে। দ্বীনের দাওয়াতের মেহনতের সাথে সাথে ইনফেরাদি (ব্যক্তিগত) আমলেরও এহতেমাম করতে হবে। তেলাওয়াত, তাসবিহাত ইত্যাদি আমলগুলো নিয়মিত গুরুত্ব সহকারে পুরা করতে হবে। এছাড়াও তাওয়াজু বা নম্রতা হাসিল করার জন্য দ্বীনের ছোটখাটো কাজেরও আঞ্জাম দিতে হবে। মাওলানা ইলিয়াস রাহিমাহুল্লাহ্ এবং মাওলানা সাঈদ খান সাহেব রাহিমাহুল্লাহ্ প্রমুখ বুজুর্গানে দ্বীন তাওয়াজু হাসিল করার জন্য প্রায় সময়ই টয়লেট পরিষ্কার করতেন। তাওয়াজু হলো বান্দার গুণ আর এর বিপরীতে তাকাব্বুরি বা বড়ত্ব হলো মহান আল্লাহ তা’আলার চাদর। আল্লাহ্ তাআলার চাদর নিয়ে যদি কেউ টানাটানি করে তাহলে আল্লাহ্ তার থেকে বদলা নিবেন।

শায়খ গাসসান আরো বলেন, হযরত আদম আলাইহিস সালামের পক্ষ থেকে একটি ভুল হয়ে গেলে তিনি তাওয়াজু এখতিয়ার করলেন এবং বললেন, হে আমার রব, আমি নিজের উপর জুলুম করেছি। এরপর আল্লাহ তা’আলা আদম আলাইহিস সালামের ভুলকে ক্ষমা করে দিলেন।
অপরদিকে ইবলিশ আদম আলাইহিস সালামকে সেজদা না করে ভুল করার পরওসে অহংকার করলো এবং বললো, আমি আগুনের তৈরি আর আদম মাটির তৈরি। ফলশ্রুতিতে ইবলিশ তার তাকাব্বুরি ও অহংকারের কারনে অভিশপ্ত ও বিতাড়িত হলো। এজন্য ভাই, আমাদেরকে সর্বাবস্থায় অহংকার থেকে বেঁচে তাওয়াজু এখতিয়ার করা উচিৎ।

পরিশেষে তিনি আলেম উলামাদের সাথে থেকে, তাদের অনুসরণ করে আজীবন দাওয়াত ও তাবলীগের মেহনত করার জন্য এবং নগদ আল্লাহর রাস্তায় বের হওয়ার জন্য উপস্থিত সকলকে উদ্বুদ্ধ করেন।

বিনা অজুতে কোরআনের আয়াত স্পর্শ করা যাবে কি?

প্রশ্ন : আমরা জানি যে, ওজু ছাড়া কোরআন শরিফ স্পর্শ করা জায়েজ নেই। কিন্তু জানার বিষয় হলোÑ পৃথক আয়াত কিংবা তাফসির এবং সিরাতের মতো কিতাবাদির ক্ষেত্রে এ হুকুম প্রজোয্য হবে কি না?
মো. আবদুল্লাহ, টাঙ্গাইল

উত্তর : পুরো কোরআন শরিফ যেমন ওজু ছাড়া স্পর্শ করা জায়েজ নেই, তেমিন পূর্ণ এক আয়াতও ওজু ছাড়া স্পর্শ করা জায়েজ নেই। তবে, পূর্ণ এক আয়াত না হয়ে আয়াতের অংশবিশেষ হলে ওজু ছাড়া স্পর্শ করা জায়েজ আছে। তদুপরি তাও ওজু অবস্থায় স্পর্শ করা উত্তম। আর তাফসিরের কিতাবে আয়াতের পরিমাণ বেশি ও তাফসিরের পরিমাণ কম হলে তা ওজু ছাড়া স্পর্শ করা মাকরুহ।

তবে যদি তাফসির বেশি হয়, আয়াত কম হয় তাহলে ওজু ছাড়া স্পর্শ করা জায়েজ। অবশ্য, যে স্থানে আয়াত লেখা থাকবে তা ওজু ছাড়া স্পর্শ করা যাবে না। আর সিরাত বা অন্যান্য কিতাবাদি ওজু ছাড়া স্পর্শ করা যাবে। তবে সে কিতাবে কোরআনের আয়াত থাকলে আয়াতের ওপর ওজু ছাড়া হাত লাগানো জায়েজ হবে না। (আদ্দুররুল মুখতার : ১/৩২০; তাহতাবি : ১৪৩-১৪৪)।

উত্তর দিয়েছেন- মুফতি হিফজুর রহমান, প্রধান মুফতি, জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া, ঢাকা

ওলামায়ে কেরামের কথামতই দ্বীনের কাজ করতে হবে : মাওলানা আহমদ লাট

আমরা তাবলীগের যে কাজ করছি সেটা দ্বীনের অংশ।  এটা নবীওয়ালা কাজ।  যে কাজে যে দক্ষ, তার কাছ থেকে সে কাজ শেখা বুদ্ধিমানের কাজ। ডাক্তারের কাছে ইঞ্জিনিয়ারিং এবং জেলের কাছ থেকে কামারের কাজ শেখা বুদ্ধিমানের কাজ নয়।  সুতরাং নবীওয়ালা কাজ শিখতে হবে নবীর ওয়ারিসদের কাছ থেকেই। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন ওলামায়ে কেরাম হলেন তাঁর ওয়ারিস। সুতরাং ওলামায়ে কেরাম যেভাবে বলবেন সেভাবেই দ্বীনের এই কাজ করতে হবে।

আজ বৃহস্পতিবার বাদ মাগরিব আম বয়ানে এসব কথা বলেন তাবলীগের বর্ষীয়ান মুরুব্বি মাওলানা আহমদ লাট সাহেব।

তিনি আরও বলেন, আমাদের সব সময় চেষ্টা করা উচিৎ ভালো কিছু করার জন্য। কারণ যাদের মাধ্যমে ভালো কিছু অস্তিত্ব লাভ করে নবীজি সা. তাদের জন্য কল্যাণের দোয়া করে গেছেন। বিপরীতে কারো মাধ্যমে যদি কোন অন্যায়, অনাচার বা অনিষ্ট অস্তিত্ব লাভ করে তাহলে সে নবীজির বদদোয়ার শিকার হবে।

মাওলানা আহমদ লাট বলেন, দ্বীন হলো ত্যাগ স্বীকারের নাম। সাহাবায়ে কেরাম ত্যাগ স্বীকার করেছেন ফলে এই দ্বীন মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে গেছে। মুহাজিররা নিজেদের বাড়িঘর ত্যাগ করেছেন, আনসাররা তাদের মেহমানদারি করতে করতে এক পর্যায়ে রান্নাই বন্ধ হয়ে গেছে। বিশ্বনবীর দৌহিত্রদ্বয় খাবার না পেয়ে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। যেই দ্বীনের জন্য তাঁরা এতো ত্যাগ স্বীকার করেছেন সেই দিনের জন্য যদি আমরা মাসে তিনটা দিন, বছরে চল্লিশটা দিন বের করতে না পারি তাহলে এর চেয়ে বদ কিসমত আর কিছু হতে পারে না।

তিনি অত্যন্ত জযবার সাথে বলেন, ত্যাগ শিকারের নাম হল দ্বীন। ত্যাগের মাধ্যমেই দ্বীন কায়েম হয়। টাকা পয়সা, বিলাসিতা এবং শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে কখনও দ্বীন কায়েম হয় না।

যে নিজের ভুল স্বীকার করে আল্লাহ তাকে আরো বড় বানিয়ে দেন। ভুল স্বীকার এর মধ্যে মান সম্মান কমে যাওয়ার ভয় নেই। হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু খলিফা থাকা অবস্থায় এক মহিলার ব্যাপারে পাথর নিক্ষেপে হত্যার ফয়সালা দিয়েছিলেন। কিন্তু হজরত মুয়াজ রা. প্রতিবাদ করেন এবং এটাকে ভুল হিসেবে প্রমাণ করেন। তখন হযরত ওমর রা. নিজের ভুল বুঝতে পারেন এবং সেই মহিলাকে হত্যার ফয়সালা বাতিল করে দেন।

এতে হযরত ওমরের কী সম্মান কমে গিয়েছে? আমরা কি এখন তাকে সম্মান দেই না? আমরা তো আজও হজরত ওমরকে কত ভক্তি ও শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি। তাঁর কথা ও কাজকে অনুসরণীয় মনে করি। সুতরাং কারো যদি ভুল হয়ে থাকে, তাহলে কোন কিছুর পরোয়া না করে তার উচিত নিজের ভুল স্বীকার করে নেয়া। এতেই পুরো উম্মাহর কল্যাণ নিহিত।

বয়ানের ভাষান্তর করেন কাকরাইলের মুরুব্বি মাওলানা ওমর ফারুক। বয়ানের শেষে আল্লাহর রাস্তায় বের হওয়ার জন্য পুরো ময়দানে তাশকিল (উদ্বুদ্ধকরণ ও নাম লেখা) করা হয়।

শ্রুতিলিখন: শাহ মুহাম্মদ খালিদ 

আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য লাভে কিছু আমল

মুফতি এনায়েতুল্লাহ । । 

আল্লাহতায়ালার নৈকট্য অর্জন ও সন্তুষ্টি লাভ প্রত্যেক মুমিন-মুসলমানের পরম কাঙ্খিত বিষয়। তাই মুমিনমাত্রই চেষ্টা করেন আল্লাহতায়ালার নৈকট্য লাভ করতে। নিয়মিত-ইবাদত-বন্দেগির পর এমন কিছু আমল রয়েছে যেগুলো পালন করলে আল্লাহতায়ালার নৈকট্য অর্জিত হয়। এমন কিছু আমল হলো-

সর্বাবস্থায় আল্লাহর ওপর ভরসা করা

সুখে-দুঃখে, বিপদ-মুসিবতে সর্বাবস্থায় আল্লাহর ওপরে ভরসা করে জীবন পরিচালনা করা মুমিন জীবনের অন্যতম দায়িত্ব। এ সম্পর্কে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আর কেবল আল্লাহর ওপরই মুমিনদের ভরসা করা উচিত।’ -সূরা ইবরাহিম: ১১

হজরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেন, ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার জন্যই আত্মসমর্পণ করেছি, আপনারই প্রতি ঈমান এনেছি, আপনারই ওপর নির্ভর করেছি, আপনারই দিকে মনোনিবেশ করেছি এবং আপনারই জন্য কলহ করেছি।’ –সহিহ বোখারি ও মুসলিম

মুসলমানদের মাঝে আপস-মীমাংসা করে দেওয়া

এই পৃথিবীর সবচেয়ে সহানুভূতিশীল মানবতার জন্য কল্যাণকামী জীবনব্যবস্থা হচ্ছে- ইসলাম। ইসলাম মুসলমানদের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক স্থাপন করে দিয়েছে। তাই মুসলমানদের মধ্যে বিবদমান সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব তাদের ওপরেই অর্পণ করা হয়েছে। এ সম্পর্কে কোরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয় মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই। কাজেই তোমরা তোমাদের ভাইদের মধ্যে আপস-মীমাংসা করে দাও। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, আশা করা যায় তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হবে।’ -সূরা আল হুজুরাত: ১০

এ বিষয়ে হাদিসে হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দ্বীন হচ্ছে কল্যাণকামিতা। আমরা বললাম, কার জন্য? তিনি বললেন, আল্লাহ, তার কিতাব, তার রাসূল, মুসলিমদের ইমাম (নেতা) এবং সকল মুসলিমের জন্য।’ –সহিহ মুসলিম

পাড়া-প্রতিবেশীর অধিকার আদায় করা

আল্লাহতায়ালা তার ইবাদত করার সঙ্গে সঙ্গে পিতা-মাতা, নিকটাত্মীয়, পাড়া-প্রতিবেশীর অধিকার আদায় করার ব্যাপারে নির্দেশ দিয়েছেন। যার মাধ্যমে একজনের সঙ্গে অন্য জনের সম্পর্ক অটুট হয়, সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীভূত হয়। এ সম্পর্কে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা ইবাদত করো আল্লাহর, তার সঙ্গে কোনো কিছুকে শরিক করো না। আর সদ্ব্যবহার করো মাতা-পিতার সঙ্গে, নিকটাত্মীয়ের সঙ্গে, এতিম-মিসকিন, নিকটাত্মীয়-প্রতিবেশী, অনাত্মীয়-প্রতিবেশী, পার্শ্ববর্তী সাথী, মুসাফির এবং তোমাদের মালিকানাভুক্ত দাস-দাসীদের সঙ্গে।’ -সূরা আন নিসা: ৩৬

এ সম্পর্কে হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘হজরত জিবরাইল আলাইহিস সালাম আগমন করে আমাকে পড়শির বিষয়ে অবিরত উপদেশ দিতে লাগলেন। এমনকি আমার মনে হলো- হয়ত তিনি অচিরেই পড়শিকে ওয়ারিশ করে দেবেন।’ -সহিহ বোখারি

মেহমানকে সম্মান করা ও আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা

ঈমানের সহায়ক ও ঈমান বৃদ্ধিকারী আর একটি গুরুত্বপূর্ণ আমল হচ্ছে মেহমানকে সম্মান করা ও আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা। এ সম্পর্কে হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখেরাতের ওপর ঈমান রাখে সে যেন অবশ্যই মেহমানকে সম্মান করে। যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি ঈমান রাখে সে অবশ্যই আত্মীয়তার সম্পর্ক বহাল রাখবে।’ –সহিহ বোখারি

নিজের হাতে হালাল জীবিকা উপার্জন করা

কোরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে, ‘অতঃপর যখন নামাজ সমাপ্ত হবে তখন তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ো, আর আল্লাহর অনুগ্রহ হতে অনুসন্ধান করো এবং আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করো, যাতে তোমরা সফল হতে পারো।’ -সূরা জুমা: ১০

বর্ণিত আয়াতে আল্লাহতায়ালা এখানে নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তিবিশেষকে উদ্দেশ্য করেননি বরং সব মানুষকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, নামাজ সমাপ্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তোমরা জমিনে জীবিকার সন্ধানে বেরিয়ে পড়ো এবং আল্লাহর অনুগ্রহ কামনা করো। নিজের হাতে উপার্জন করে জীবিকা নির্বাহ করা আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত ফরজ। হালাল রিজিক উপার্জন করা, হালাল রিজিক ভক্ষণ করা একজন মুমিনের ঈমানকে বৃদ্ধি করে। আর হারাম ভক্ষণ করলে বান্দার কোনো ইবাদতই আল্লাহর কাছে কবুল হবে না। তাই মুমিনের দায়িত্ব হালাল উপার্জন করা এবং হারাম উপার্জন পরিহার করা।

এ সম্পর্কে হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘হে মানব সকল! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং তার অবাধ্য হওয়া থেকে বিরত থাকো। জীবিকার সন্ধানে অবৈধ পন্থা অবলম্বন করো না। কোনো ব্যক্তি তার জন্য নির্ধারিত রিজিক না পাওয়া পর্যন্ত মরবে না। যদিও তা পেতে কিছু বিলম্ব হয়। সুতরাং আল্লাহকে ভয় করো এবং উপার্জনের উত্তম পন্থা অবলম্বন করো। হালাল পন্থায় উপার্জন করো এবং হারামের কাছেও যেয়ো না।’ -সুনানে ইবনে মাজা

ঋণগ্রস্তকে সহযোগিতা করা

সমাজের সচ্ছল মুসলমানদের দায়িত্ব হচ্ছে- সমাজের ঋণগ্রস্তদেরকে সাহায্য-সহযোগিতা করা। এটা ঈমানের জন্য সহায়ক একটি কাজ। এ সম্পর্কে হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহতায়ালা কিয়ামতের দুর্ভোগ থেকে রক্ষা করলে যার আনন্দ লাগে, সে যেন দরিদ্র ঋণগ্রস্ত ব্যক্তিকে ঋণ পরিশোধের মেয়াদ বাড়িয়ে দেয় অথবা তার ওপর থেকে ঋণের বোঝা একেবারেই নামিয়ে দেয়।’ –সহিহ মুসলিম

সন্দেহজনক কাজ বর্জন করা

সর্বোত্তম ঈমানের মানদণ্ড হচ্ছে সন্দেহজনক হালাল থেকেও নিজেকে বিরত রাখা। এ বিষয়ে হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘হালাল সুস্পষ্ট এবং হারাম সুস্পষ্ট। এ দুয়ের মাঝখানে সন্দেহজনক কিছু জিনিস রয়েছে। যে ব্যক্তি সন্দেহজনক গুনাহ বর্জন করবে, সে সুস্পষ্ট গুনাহ থেকে সহজেই রক্ষা পাবে। আর যে ব্যক্তি সন্দেহজনক গুনাহর কাজ করার দুঃসাহস দেখাবে, তার সুস্পষ্ট গুনাহর কাজে লিপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। গুনাহর কাজগুলো হচ্ছে- আল্লাহর নিষিদ্ধ এলাকা। যে জন্তু নিষিদ্ধ এলাকার আশপাশ দিয়ে বিচরণ করে, সে যে কোনো সময় নিষিদ্ধ এলাকার ভেতরে ঢুকে পড়তে পারে।’ –সহিহ বোখারি

সৎ পরামর্শ প্রদান করা

একজন মুমিন সব সময় মানুষকে ভালো পরামর্শ দেবে, ভালো কাজে উদ্বুদ্ধ করবে। এ সম্পর্কে হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো ব্যক্তি কাউকে ভালো কাজে উদ্বুদ্ধ করলে উদ্বুদ্ধকারী ব্যক্তি কাজটি সম্পন্নকারী ব্যক্তির তুল্য সওয়াব লাভ করবে। আর আল্লাহ বিপদগ্রস্তকে সাহায্য করা বড়ই পছন্দ করেন।’ -মুসনাদে আবি হানিফা

শেষ কথা

উপরোল্লেখিত আমলগুলো একজন মুমিনের ঈমান বৃদ্ধি করে। এ ছাড়া আরও কিছু আমল রয়েছে যা বিবেক-বুদ্ধির মাধ্যমে বিশ্লেষণ করে ভালো আমল না মন্দ আমল তা অনুধাবন করা যায়। এ সব আমলকে অন্তরের কষ্টিপাথরে বিচার করে যেটা ভালো সেটা গ্রহণ করা বা মেনে চলা এবং যেটা খারাপ সেটা পরিত্যাগ করা।

জ্বীন কি মানুষের উপর ভর করতে পারে?

মুহাম্মদ জাভেদ কায়সার । । 

জ্বীনের মানুষের উপর ভর করা কিংবা মানুষের যাদুগ্রস্থ হওয়াকে সাধারণভাবে আরবীতে ‘সাহর’ বলে। এটি এমন একটি অবস্থা যখন মানুষের নিজের উপর কোন নিয়ন্ত্রণ থাকে না। মানসিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায় এবং সাময়িক স্মৃতিভ্রম ঘটে। পবিত্র কুরআন এবং হাদীসের আলোকে ‘সাহর’ একটি নিশ্চিত বিষয়।

“যারা সুদ খায়, তারা কিয়ামতে দন্ডায়মান হবে, যেভাবে দন্ডায়মান হয় ঐ ব্যক্তি, যাকে শয়তান আসর করে মোহাবিষ্ট করে দেয়।” (সূরা বাক্বারা, ২৭৫)

শয়তানের আসরে মানুষ মোহাবিষ্ট হয়ে পড়ে- এই বিষয়টি নিশ্চিত। ইমাম কুরতুবী, তাবারী, ইবনে-কাসীর সহ অধিকাংশ তাফসীরবিদ এই আয়াতকে জ্বীনের মানুষের উপর ভর করার সুনির্দিষ্ট প্রমান হিসেবে উল্লেখ করেছেন। (তাফসীরে কুরতুবী ৩/৩৫৫, তাফসীরে তাবারী ৩/১০১, তাফসীরে ইবনে কাসীর ১/৩২৬)

সহীহ হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে- রাসুল (সা.) বলেছেন, “শয়তান আদম সন্তানের শরীরে প্রবাহিত হয়, যেমন রক্ত শরীরে প্রবাহিত।” (বুখারী, ৩৩/২৫১। মুসলিম, ২১৭৫)

ইমাম আহমদ (র.) এর ছেলে আব্দুল্লাহ থেকে বর্ণিত, “আমি আমার বাবা (ইমাম আহমাদ) কে বললাম- কিছু মানুষ মানুষের শরীরে জ্বীনের ভর করাকে বিশ্বাস করে না। তিনি বলেন- ও আমার সন্তান, তারা মিথ্যা বলছে। আসর করা অবস্থায় অসুস্থ লোকের মুখ দিয়ে জ্বীন কথাও বলতে পারে।” (মাজমুউল ফাতাওয়া- ইবনে তাইমিয়াহ ১৯/১২)

ইমাম আহমদ এবং ইমাম বায়হাকী কর্তৃক লিপিবদ্ধ সহীহ হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে, রাসুল (সা.) একবার একটি অসুস্থ বালকের সাক্ষাত পেয়েছিলেন যার উপর জ্বীনের ভর ছিল। রাসুল (সা.) ছেলেটির দিকে ফিরে জোরে বলেন- “ও আল্লাহর শত্রু, বের হয়ে আসো। ও আল্লাহর শত্রু, বের হয়ে আসো। ছেলেটি দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠে।” (সুনানে ইবনে মাজাহ, ৩৫৪৮; মুসনাদে আহমদ ৪/১৭১, ১৭২)

এছাড়াও বিভিন্ন সাহাবীদের থেকে অসংখ্য সহীহ হাদিস বর্ণনা করা হয়েছে এই প্রসঙ্গে যেখানে রাসুল (সা.) সাহরগ্রস্থ রোগীর ওপরে দুআ করে সাহর মুক্ত করেছেন। সাহাবীদের মধ্যে ইয়ালা ইবনে মুররাহ (রা.), জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.), আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.), আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.), আবু আল ইয়ুসর (রা.), সাফিয়া বিনতে হুয়াই (রা.), উবাই ইবনে কা’ব (রা.), উসমান বিন আল’আস (রা.) উল্লেখযোগ্য।

দাওয়াত ও তাবলীগ কী এবং কেন?

ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান ।। 

দেশের প্রতিটি মসজিদ থেকে একটি করে জামাত বের করার লক্ষ্য নিয়ে প্রতিবছর টঙ্গীর তুরাগ নদীর তীরে বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ‘কালেমা, নামাজ, রোজা, ইল্ম ও জিকির, ইকরামুল মুসলিমীন, সহী নিয়ত ও দাওয়াতে তাবলীগ’- এ ছয়টি উসূল বা মূলনীতিকে সামনে রেখে তাবলীগ জামাত বিশ্বব্যাপী ইসলাম প্রচার ও প্রসারের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। তারা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে বিভক্ত হয়ে ধর্মের দাওয়াত নিয়ে গ্রাম-গঞ্জ, শহরে-বন্দরে সারা বছর ঘুরে ঘুরে বেড়ান। এ কার্যক্রমে জড়িত রয়েছেন নানা বয়সের বিভিন শ্রেণী-পেশার হাজার হাজার ধর্মপ্রাণ মানুষ।

ইসলাম প্রচারের কাজে তারা একদিকে নিজেকে পরিশুদ্ধ ও উন্নত করার জন্য, অন্যদিকে যারা বেখেয়াল তাদের ধর্মের প্রতি আহ্বান করতে মেহনত করেন। বাংলাদেশের যে কোনো মসজিদ থেকে যে কেউ তাবলীগ জামাতের কাজে শামিল হতে পারেন। তিনদিন, সাতদিন, চল্লিশ দিন কিংবা সারা জীবনের জন্য, যার যেমন ইচ্ছা তাবলীগ জামাতে শামিল হয়ে আল্লাহর পথে বেরিয়ে পড়তে পারেন।

তাবলীগ জামাতের এসব নিরলস কর্মী কাফেলা বেঁধে মসজিদ থেকে মসজিদে সফর করেন। তারা লোকজনের বাড়ি বাড়ি গিয়ে সবিনয়ে আল্লাহর পথে উদাত্ত আহ্বান জানান। তারা নামাজ কায়েমের কথা বলেন, আল্লাহর প্রেমের কথা বলেন এবং পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত ও ধর্মীয় শিক্ষার কথা বলেন।

বাংলাদেশে শুধু নয়- আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপসহ প্রায় প্রত্যেক মহাদেশেই তাবলীগ অনুসারীদের এ দ্বীনি দাওয়াতের কার্যক্রম মুসলমানদের জাতীয় জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব সৃষ্টি করে চলেছে। বিশ্বব্যাপী তাবলীগ জামাতের দ্বীনী কার্যক্রম বিস্তৃত হওয়ার ফলে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ও বিশ্ববরেণ্য অনেক আলেম-উলামা, ইসলামী ধর্মবেত্তা বিশ্ব ইজতেমায় শরিক হয়ে ইসলামের চিরশাশ্বত মর্মবাণী বয়ান করেন এবং আল্লাহর পথে পরিচালিত হয়ে মানুষকে আদর্শ সমাজ গঠনের আহ্বান জানান।

পৃথিবীর বহু দেশ থেকে মুসলমানগণ উপমহাদেশের তিনটি দেশে প্রায়শ তাবলীগী জ্ঞানার্জন ও বাস্তব অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের জন্য আগমন করেন। আল্লাহর পথে মানুষকে আহ্বানের যে নিরন্তর প্রচেষ্টা, যে গভীর আন্তরিকতা এর একটি প্রাণবন্ত ও বিপুল বহিঃপ্রকাশ এই বিশ্ব ইজতেমা। যে লোক কখনো কোরআন শরিফ পাঠ করেনি, একটি সূরাও যার জানা নেই, নামাজ কিভাবে আদায় করতে হয় তাও যার অজানা, সেরকম একজন নিরক্ষর মানুষের পক্ষেও তাবলীগ জামাতে শামিল হয়ে দ্বীনদার হয়ে ওঠা মোটেও কঠিন ব্যাপার নয়। বাংলাদেশের গ্রাম-গ্রামান্তরে এমন অনেক মুসলমান আছেন, যারা তাবলীগ জামাতের মাধ্যমে সত্যিকারের পরহেজগারি অর্জন করেছেন এবং ধর্মীয় বিষয়াদি সম্পর্কে শিক্ষিত ও সচেতন হয়েছেন।

ইসলামী দাওয়াহ ও তাবলীগের লক্ষ্য হচ্ছে ‘ঈমানের আন্দোলন’- এটি আত্মসংশোধন তথা সমগ্র মানবজাতির মুক্তির আন্দোলন। ঈমানের আন্দোলনের উদ্দেশ্য হলো আল্ল­াহ প্রদত্ত জীবন, সম্পদ এবং সময় আল্ল­াহর রাস্তায় বের হয়ে এর সঠিক ব্যবহার শিক্ষা করা এবং বাস্তব জীবনে এর সঠিক প্রয়োগ করার পাশাপাশি স্রষ্টাভোলা মানুষকে আল্ল­াহর সঙ্গে সম্পর্ক করে দেওয়ার মেহনত করা। মানব জীবনে দাওয়াহ ও তাবলীগের ঈমানের আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। কারণ মানুষ আজ পবিত্র কোরআন ও হাদিসের অনুসৃত পথ ভুলে এমন বিপথ অনুসরণ করছে, যা মানুষকে জান্নাতের পথ থেকে দূরে সরিয়ে জাহান্নামের পথের দিকে ধাবিত করছে।

দাওয়াত ও তাবলীগ দ্বারা মানুষের ঈমান মজবুত হয়ে যায়। এ মজবুত ঈমান মানুষকে মদ খাওয়া, সুদ-ঘুষ দেওয়া-নেওয়া, মালে ভেজাল দেওয়া, অসত্ উপায়ে অর্থ উপার্জনের হীন মানসিকতাকে ফিরিয়ে রাখে। মানুষ যখন আল্ল­াহর রাস্তায় বের হয়ে কষ্ট আর মুজাহাদার সঙ্গে দ্বীন শিক্ষা করতে থাকে, তখন তার ভেতরের আমি নামক অস্তিত্বটা আল্ল­াহর পরিচয় লাভ করতে থাকে। আর যখনই মানুষ আল্ল­াহর পরিচয় লাভ করতে থাকে, তখন সে আল্ল­াহর গুণাবলী ও ক্ষমতার সামনে নিজের অস্তিত্বের সর্বস্ব লুটিয়ে দেয়।

নিজের দম্ভ আর অহমিকা যখন মিটতে শুরু করে তখনই মানুষের ভেতরের পশুত্বের মৃত্যুর পাশাপাশি মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটতে থাকে। মানুষ ভালো ও মন্দের মধ্যে প্রভেদ করতে শেখে। নফসের গোলামির শৃংখল ছিন্ন করে এক আল্ল­াহর দাসত্বকে মেনে নেয় আর বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণে জীবন গঠন করে সত্যিকারের মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে।

ইসলাহে নফসের চারটি অংশ ও চারটি পদ্ধতি রয়েছে যা তাবলীগ জামাতে রয়েছে। ‘সত্ লোকের সান্নিধ্য, জিকির ও ফিকির, আল্লাহর জন্য ভ্রাতৃত্ব বন্ধন এবং আত্মসমালোচনা’ – এ চারটি জিনিসের সমষ্টিই হল তাবলীগ জামাত। সাধারণ মানুষের ইসলাহে নফসের জন্য এর চেয়ে উত্তম কোনো পথ হতে পারে না।

তাই তাবলীগের এ অরাজনৈতিক আন্দোলন আশাতীত সার্থক ও সফল বলে বিবেচিত; যা পরিচালনার জন্যে গড়ে উঠেছে একটি সুশৃংখল সুবিস্তৃত সাংগঠনিক কাঠামো, তৈরী করেছে নিয়মিত ও নিবেদিতপ্রাণ বিপুলসংখ্যক প্রচারক বা মুসল্লিগ। তাবলীগ জামাতের বিশেষ কর্মসূচীর মধ্যে রয়েছে নিয়মিত ইজতেমা বা সম্মেলনের আয়োজন। তন্মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ হলো টঙ্গীর বার্ষিক বিশ্ব ইজতেমা। এ ইজতেমা শুধু তাবলীগ জামাতের কার্যক্রমের প্রসারের ক্ষেত্রেই নয়; বরং বাংলাদেশের জাতীয় জীবনেও এটি দিন দিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেছে।

লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসলমানের উপস্থিতিতে টঙ্গীর তুরাগ নদীর তীরবর্তী বিস্তীর্ণ প্রান্তর সমবেত মুসল্লি­দের ইবাদত-বন্দেগি, জিকির-আজকারে এক পুণ্যভূমির রূূপ ধারণ করে। তাই অনেকে আবেগকে চেপে রাখতে না পেরে বিশ্ব ইজতেমাকে হজ্বের সাথে তুলনা করে বসেন এটা কোনো মতেই শোভনীয় নয়। তাবলিগের বিশ্ব ইজতেমাকে হজ্বের সাথে তুলনা করা ঘোরতর অন্যায়। কারণ হজ্ব হলো ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের একটি অন্যতম ফরজ ইবাদত। যা না করলে গুনাহগার হতে হয়। কিন্তু তাবলীগের ইজতেমায় আসা ফরজ নয় এবং না আসলে গুনাহগারও হতে হবে না। দুটি বিষয় সম্পূর্ণ ভিন্ন। যার একটির সাথে অন্যটির কখনোই তুলনা করা চলে না।

হজ্বের মত লোক সমাগম হলেই সেটাকে দ্বিতীয় হজ্ব বলা কোনোমতেই সমীচীন নয়। সময়ের ব্যবধানে বিশ্ব ইজতেমায় মানুষের উপস্থিতি যেমন বেড়েছে, তেমনি এর গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা বেড়েছে। আমাদের দেশের ধর্ম, সমাজ, সংস্কৃতি, রাজনীতি, অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এর প্রভাব কম-বেশী অনুভূত হচ্ছে। মুসলিম ধর্মীয় জাগরণের ক্ষেত্রেও এর ইতিবাচক প্রভাব অস্বীকার করা যায় না।

লেখক: চেয়ারম্যান, ইসলামিক স্টাডিজ ও দাওয়াহ বিভাগ,
দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়, ধানমণ্ডি, ঢাকা।

দলিল প্রমাণের আলোকে কাদিয়ানী আকিদা ও খণ্ডন এবং তাদেরকে কাফের বলার কারণ

লেখক: মুফতী মনসূরুল হক দা.বা.


সূচনা-
এই দলের প্রতিষ্ঠাতা গোলাম আহমাদ কাদিয়ানী ১৮৩৯/৪০ খ্রিস্টাব্দে পাঞ্জাবের গুরুদাসপুর জেলার কাদিয়ান অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেন। প্রাথমিক শিক্ষা নিজ এলাকাতেই লাভ করেন। লেখা-পড়া সমাপ্ত করে পাঞ্জাবের এক অফিসে কেরানির চাকুরী গ্রহণ করেন। পূর্ব থেকেই তার পরিবার ইংরেজদের তল্পিবাহক হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিল।  গোলাম আহমাদ প্রাথমিক পর্যায়ে নিজেকে একজন ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি হিসেবে প্রকাশ করেন।

কিন্তু পরবর্তীতে ইংরেজদের প্রকাশ্য দালালী ও নিজেকে মূলহাক, (যার অন্তরে দৈব বাণী অবতীর্ণ হয়) মুহাদ্দাস (আল্লাহ যার সাথে অন্তরে অন্তরে কথা বলেন), প্রতিশ্রুত ঈসা মসীহ, নিজেকে প্রথমে নবী এবং পরিশেষে ‘আমিই সর্বশেষ নবী’ ইত্যাদি অসংখ্য জঘন্য ভ্রান্ত আকীদার দাবী করে বসলে তার আসল চেহারা ফাঁস হয়ে যায় এবং সমস্ত হক্কানী আলেম উলামা তাকে মুরতাদ ফাতাওয়া দেন।

তার কিছু ভ্রান্ত আকীদা ও তার খণ্ডন নিম্নে তুলে ধরা হলোঃ
(১) আল্লাহ সম্পর্কে তার আকিদাঃ মির্জা গোলাম আহমাদ কাদিয়ানী লিখেছেন, ‘আমি স্বপ্নে দেখেছি আমিই আল্লাহ’। (আয়েনায়ে কামালাতে মির্জা পৃ.৫৬৪,৫৬৫, কাদিয়ানী মাযহাব পৃ.৩২৮)

অথচ কুরআনে কারীমে ইরশাদ হয়েছে ‘আল্লাহ, তিনি ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই, তিনি চিরঞ্জীব, সর্বসত্তার ধারক, তাঁকে তন্দ্রা অথবা নিদ্রা স্পর্শ করে না। (সূরা বাকারা.২৫৫)

সুতরাং ঘুমের মধ্যে আল্লাহ হওয়ার স্বপ্ন দেখাটা তার মিথ্যুক হওয়ারই প্রমাণ বহন করে।

মির্জা কাদিয়ানীর বইতে আছে ‘আল্লাহ তাকে বলেছেন শুন! হে আমার ছেলে’। (গোলাম আল বুশরা ১/৪৯, ইসলামী আকীদা ও ভ্রান্ত মতবাদ পৃ.৩০৮)

অথচ আল্লাহ তা‘আলা বলেছেনঃ তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং কেউ তাকে জন্ম দেয়নি। (সূরা ইখলাসঃ৩) আরও দেখুন সূরা নিসাঃ১৭১, সূরা ইউনুসঃ৬৮)

হাদীসে কুদসীতে আছেঃ- আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ ‘বনী আদম আমাকে মিথ্যারোপ করেছে, অথচ তার এরূপ করার কোনো অধিকার নেই এবং সে আমাকে গালি দিয়েছে, অথচ তার এরূপ করার কোনো অধিকার নেই। আর আমাকে মিথ্যারোপ করাটা এভাবে যে, সে বলে তিনি আমাকে যেভাবে সৃষ্টি করেছেন সেভাবে কিছুতেই পুনরুত্থান করতে পারবেন না। আর আমাকে গালি দেওয়াটা এভাবে যে, সে বলে আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করেছেন অথচ আমি অমুখাপেক্ষী, আমার সন্তান নেই এবং আমি কারও সন্তান নই এবং আমার কোনো সমকক্ষ নেই। (বুখারী হাদীস নং ৪৯৭৪, নাসাঈ হাদীস নং ২০৭৮)

(২) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে তার আকীদাঃ মির্জা গোলাম আহমাদ কাদিয়ানী নিজ বইতে লিখেছেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম সর্বশেষ নবী নন, বরং গোলাম আহমাদ সর্বশেষ নবী। (হাকীকাতুন নবুয়ত পৃ.৮২, তিরইয়াকুল কুলূব পৃ.৩৭৯, আদইয়ানে বাতেলা আওর সিরাতে মুতাকীম পৃ.১৩২)

অথচ কুরআনে এসেছে ‘মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম তোমাদের কারো পিতা নন বরং তিনি আল্লাহর রাসূল এবং সর্বশেষ নবী, আল্লাহ সর্ব বিষয়ে সর্বজ্ঞ’। সূরা আহযাবঃ৪০

এক হাদীসে এসেছে, শীঘ্রই আমার উম্মতের মাঝে ৩০ জন মিথ্যুকের আবির্ভাব ঘটবে, তারা প্রত্যেকেই অমূলক দাবি করবে যে, সে আল্লাহর নবী, অথচ আমিই মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম সর্বশেষ নবী, আমার পরে কোনো নবী নেই। (আবূ দাউদ ২/২২৮, তিরমিযী ২/৪৫, বুখারী হাদীস নং ৩৫৩৫, মুসলিম হাদীস নং ২২৮৬)

সে আরো লিখেছে, ‘গোলাম আহমাদ কাদিয়ানী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে অধিক মর্যাদাবান’ (হাকীকুতুন নবুয়ত পৃ.২৭২, আরবাঈন পৃ.৩০৮, আদইয়ানে বাতেলা পৃ.১৩২, ইসলামী আকীদা পৃ. ৩০৮)

অথচ কুরআনে এসেছে, ‘সমস্ত নবীদের থেকে আল্লাহ তা‘আলা এ অঙ্গীকার নিয়েছেন যে, তোমরা যদি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যামানা পাও তাহলে তোমরা অবশ্যই তাঁর প্রতি ঈমান আনবে এবং তাঁকে সাহায্য করবে’ (আল ইমরানঃ৮১)

এই আয়াত দ্বারা বুঝা গেল নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম সকল নবীদের মাঝে শ্রেষ্ঠ আর গোলাম আহমাদ তো নবী নয় এমনকি একজন সাধারণ মুসলমানও নয় অতএব তার মর্যাদা একজন মুমিন থেকেও বহুগুণ নিচে, তাহলে তার মর্যাদা নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বেশি হয় কীভাবে?

আর কুরআনে বিশের অধিক জায়গায় রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে সম্বোধন করা হয়েছে কিন্তু মির্জা সাহেবের দাবি হলো এসব জায়গায় মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে নয় বরং তাকে সম্বোধন করা হয়েছে। (দাফেউল বালা পৃ.১৩, ইজাযে আহমাদীঃ ১১/২৯১)

এমন মিথ্যাবাদীদের সম্পর্কে কুরআনে এসেছে, ‘তোমরা আল্লাহর সম্বন্ধে মিথ্যা বলতে ও তার নির্দেশ সম্বন্ধে ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করতে, সে জন্য আজ তোমাদেরকে অবমাননাকর শাস্তি দেয়া হবে (সূরা আনআমঃ৯৩)

কুরআন শরীফে নবীজীকে সম্বোধন করাটা মির্জা গোলাম আহমাদ নিজের দিকে সম্পৃক্ত করে কত বড় ঔদ্ধত্য প্রকাশ করেছে!

(৩) ঈসা আ. ও অন্যান্য নবীদের ব্যাপারে তার আকিদাঃ

গোলাম আহমাদের বইতে আছে, ঈসা আ. এর তিনটি ভবিষ্যদ্বাণী মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। (ইজাযে আহমাদীঃ পৃ.১৪, আদইয়ানে বাতেলা পৃ.১৩৩)

অথচ কুরআনে এসেছে ‘আল্লাহ অপেক্ষা অধিক সত্যবাদী আর কে হতে পারে? (সূরা নিসাঃ৮৭) আর নবীগণ যা কিছু বলেন আল্লাহর হুকুমেই বলেন। অতএব নবীদের ভবিষ্যদ্বাণী কখনো মিথ্যা হতে পারে না। সুতরাং কাদিয়ানীর ঈসা আ. এর তিনটি ভবিষ্যৎবাণী মিথ্যা হওয়ার দাবি করা পরোক্ষভাবে একথারই দাবি করা যে, আল্লাহই মিথ্যা বলেছেন (না‘উযুবিল্লাহ)

কাদিয়ানীর বইতে আছে, হযরত ঈসা আ. মৃত্যু বরণ করেছেন, তিনি কিয়ামতের পূর্বে আগমন করবেন না। (ইযালায়ে কুলাঁ ২/৩১১, আদইয়ানে বাতেলা পৃ.১৩৪)

অথচ কুরআনে এসেছে ‘কাফিররা বলে থাকেঃ আমরা আল্লাহর রাসূল মারইয়াম তনয় ঈসা মাসীহকে হত্যা করেছি, অথচ তারা তাকে হত্যা করেনি, কিন্তু তাদের বিভ্রম হয়েছিল। তারা নিশ্চয় এই সম্বন্ধে সংশয়যুক্ত ছিল এ সম্বন্ধে অনুমানের অনুসরণ ব্যতীত তাদের কোনো জ্ঞানই ছিল না। এটা নিশ্চিত যে, তারা তাকে হত্যা করে নাই বরং আল্লাহ তাকে আসমানে নিজের কাছে উঠিয়ে নিয়েছেন এবং আল্লাহ যবরদস্ত শক্তিমান ও হিকমাতওয়ালা’। (সূরা নিসাঃ১৫৭)

হাদীসে এসেছে, নবীজী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, অচিরেই তোমাদের মধ্যে মারইয়াম তনয় ঈসা আ. আসবে ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ রূপে…. (বুখারী হাদীস নং ৩৪৪৮)

কাদিয়ানীর বইতে আছে, ‘মির্জা সাহেব বনী ইসরাইলের নবীদের চেয়ে উত্তম’ (দাফেউল বালা পৃ.২০)

অথচ সর্ব সম্মত আকীদা হলঃ কোন মুমিন চাই সে যত বড় বুযুর্গ হোক না কেন কোনো নবীর চেয়ে অধিক মর্যাদাবান হতে পারে না। (শরহে আকায়েদ পৃ.১৬১) তাহলে মির্জা সাহেব যিনি সাধারণ মুমিনের সমান নয়, তিনি কীভাবে বনী ইসরাঈলের নবীদের ঊর্ধ্বে মর্যাদা সম্পন্ন হতে পারেন?

(৪) ফেরেশতা সম্পর্কে আকীদাঃ

মির্জার বইতে আছে ‘ফেরেশতা বলতে কিছু নেই’ তাওযীহে মারাম পৃ. ২৯, আদইয়ানে বাতেলা পৃ. ১৩৩) অথচ কুরআনে এসেছে ‘আল্লাহ সাক্ষ্য দেন যে, নিশ্চয় তিনি ব্যতীত কোন ইলাহ নেই ফেরেশতাগণ এবং জ্ঞানীগণও….. (আল ইমরানঃ ১৮, সূরা বাকারা.৩০,১৬১, সূরা নিসাঃ৯৭) ঈমানে মুফাস্সালের মধ্যে দ্বিতীয় নাম্বারে ফেরেশতাদের উপর ঈমান আনার ঘোষণা করা হয়েছে। তাছাড়া চারজন বড় বড় ফেরেশতার নাম কার অজানা? সুতরাং একমাত্র বেঈমান ব্যতীত অন্য কেউই ফেরেশতাদেরকে অস্বীকার করতে পারে না।

কাদিয়ানীর বইতে আছে ‘জিহাদের হুকুম রহিত হয়ে গেছে।’ (হাশিয়ায়ে আরবাঈন পৃ.১৫৪, আদইয়ানে বাতেলা পৃ.১৩৩)

অথচ কুরআনে এসেছে ‘তোমরা তাদের (কাফিরদের) বিরুদ্ধে জিহাদ করতে থাকো যতক্ষণ না ফিৎনা (কুফুরী কর্মকান্ড) দূরীভূত না হয়..’ (সূরা আনফালঃ৩৯, আরো দেখুন, সূরা আন কাবূতঃ ৬৯, হুজুরাতঃ১৫, ফুরকানঃ৫২)

(৫) হাশর সম্বন্ধে কাদিয়ানীর বিশ্বাসঃ

মির্জা বলেন, ‘মৃত্যুর পর হাশরের ময়দানে কেউ একত্র হবে না। বরং সরাসরি জান্নাত বা জাহান্নামে প্রবেশ করবে।’ (ইযালায়ে আহকামে কুলাঁ পৃ.১৪৪, আদইয়ানে বাতেলা পৃ.১৩৩)

অথচ আল্লাহ বলেন, ‘স্মরণ করো যেদিন তাদের সকলকে একত্র করবো। মুশরিকদের বলবো, যাদেরকে তোমরা আমার শরীক মনে করতে তারা কোথায়? (সূরা আনআমঃ ২২, আরো দেখুন, কাহাফঃ৪৭, ফাতিহা আয়াতঃ ৩, এছাড়া বহু হাদীসে হাশরের ময়দানের আলোচনা আছে যেমন বুখারী শরীফ ১ম খণ্ড বাবুস সুজূদ)

মির্জার আরো কিছু ভ্রান্ত আকিদাঃ

১. মির্জার বইতে আছে, ‘যে ব্যক্তি মির্জার নবুওয়াত মানে না সে জাহান্নামী কাফের’ (রবয়ীন পৃ.৪. আদইয়ানে বাতেলা পৃ. ১৩২) অথচ সমগ্র দুনিয়ার উলামায়ে কেরামের ফাতাওয়া হলো যে, যে ব্যক্তি মির্জাকে নবী মানবে সে কাফের।

২. মির্জা নিজে মুজাদ্দিদ হওয়ার দাবি করেছেন। (আয়েনায়ে কামালাতে ইসলাম পৃ. ৪২৩/ (ইসলামী আকীদা ও ভ্রান্ত মতবাদঃ৩২৬) অথচ সে ব্যক্তি হেদায়াত ও ঈমান বঞ্চিত এক বদ নসীব ও হাজারো মানুষকে গোমরাহ করণেওয়ালা।

৩. তারা উপরন্তু ২০ পারার মত কুরআন নাযিল হওয়ার দাবী করেছে। (হাকীকাতুল ওহী পৃ.৩৯১/ইসলামী আকিদা ও ভ্রান্ত মতবাদঃ৩২৭) অথচ নবী বা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছাড়া কারো উপর আসমানী ওহী নাযিল হতে পারে না, হ্যাঁ, ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক হয়তো তার উপর কোন হুকুম হয়েছিল সেটাকে তিনি ওহী মনে করেছেন।

৪. তিনি নিজেকে হিন্দুদের শ্রী কৃষ্ণ অবতার হওয়ার দাবী করেছেন। (কাদিয়ানী মাযহাব পৃ.৪৩২/ ইসলামী আকিদা ও ভ্রান্ত মতবাদঃ৩২৮) নাঊজুবিল্লাহ, এর দ্বারা তার কাফির হওয়া স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়।

৫. তিনি নিজেকে যুলকারনাঈন হওয়ার হাস্যকর দাবি করেছেন। (বারাহীনে আহমদিয়া পৃ.৯৭/ ইসলামী আকিদা ও ভ্রান্ত মতবাদ পৃ.৩২৯) অথচ কুরআনে বর্ণিত জুলকারনাইন বহু পূর্বে তার উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করে ইন্তিকাল করেছেন। এছাড়াও তার আরও অসংখ্য ভ্রান্ত আক্বীদা রয়েছে।

উল্লেখ্য যে, তিনি মিথ্যা নবী না হলে বেইজ্জতির মৃত্যু কামনা করতেন না এবং সেটি তার জীবনে বাস্তবায়িতও হতো না। এটাও তার মিথ্যুক হওয়ার জ্বলন্ত প্রমাণ। এ ছাড়া মুহাম্মাদী বেগম সহ বিভিন্ন ব্যাপারে তিনি অসংখ্য ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন যার সবগুলি পরবর্তীতে মিথ্যা বলে প্রমাণিত হয়েছে। অথচ সত্য নবীদের কোন একটা ওয়াদা অঙ্গিকারও মিথ্যা প্রমাণিত হয় নাই।

কাদিয়ানীরা কাফের কেন?  

তার এসকল ভ্রান্ত আকীদার পরিপ্রেক্ষিতে সর্ব প্রথম ১৮৮৯ খৃ. লুধিয়ানার আলেমগণ তাকে কাফের বলে ফাতওয়া দেন। এর পর একে একে দারুল উলুম দেওবন্দ হতে ১৯৭৪ সালে, রাবেতা আলমে ইসলামীর সম্মেলনে ১৪৪টি মুসলিম রাষ্ট্রের সংগঠনের পথ হতে তাকে এবং তার অনুসারীদেরকে সর্বসম্মতভাবে কাফের ঘোষণা করা হয়। এবং ১৯৮৮ সালে ও. আই. সি. এর উদ্যোগে সকল মুসলিম দেশের ধর্ম মন্ত্রীদের এক সম্মেলনে তাকে ও তার অনুসারীদেরকে কাফের ঘোষণা করার লিখিত প্রতিশ্রুতি নেওয়া হয়। সেমতে প্রায় সকল মুসলিম দেশেই তাদেরকে অমুসলিম ঘোষণা করা হয়। (ইসলামী আকিদা ও ভ্রান্ত মতবাদ পৃ.৩৩২)