Wednesday, July 24, 2019
Home Blog

তাওবাতুন নাসূহার আয়াতে নাসূহা দ্বারা কী উদ্দেশ্য?

তাওবাতুন নাসুহা, লুৎফুর রহমান ফরায়েজী, তওবা, কুয়াকাটা ব্যাখ্যা,

মুফতি লুৎফুর রহমান ফরায়েজী

কাউকে বলতে শোনা যায় যে, নাসূহা নামক এক ব্যক্তির তওবার কথা উল্লেখ করে কুরআনে আয়াত নাজিল হয়েছে। চলুন এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানা যাক –

কুরআনে নাসূহা নামে কোন ব্যক্তির কথা বা তার তওবার কথা উল্লেখ হয় নি। যারা এমনটি বলেন তারা না জেনে অজ্ঞতা হেতু এমনটি বলে থাকেন।

তবে কুরআনে তাওবাতুন নাসূহার কথা উল্লেখ আছে।

কুরআনে ইরশাদ হয়েছেঃ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا تُوبُوا إِلَى اللَّهِ تَوْبَةً نَّصُوحًا عَسَىٰ رَبُّكُمْ أَن يُكَفِّرَ عَنكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ وَيُدْخِلَكُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ [٦٦:٨]

মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহ তা’আলার কাছে তাওবাতুন নাসূহা তথা আন্তরিকভাবে খাঁটি তওবা কর। আশা করা যায়, তোমাদের পালনকর্তা তোমাদের মন্দ কর্মসমূহ মোচন করে দেবেন এবং তোমাদেরকে দাখিল করবেন জান্নাতে, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত। [সূরা তাহরীম-৮]

নাসূহা এর অর্থ হল, খাঁটি, আন্তরিক, দৃঢ় তওবা। নাসূহা হল এমন তওবা, যার পর তাওবাকারী আর গোনাহ করে না। এমন দৃঢ় ও ইখলাসপূর্ণ তওবার নাম হল তওবাতুন নাসূহা। এটা কোন ব্যক্তির নাম নয়। বা ব্যক্তিকেন্দ্রীক কোন ঘটনার উপর ভিত্তি করেও এ আয়াত নাজিল হয়নি।

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহঃ লিখেছেনঃ

قَالَ عُمَرُ بْنُ الْخَطَّابِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ وَغَيْرُهُ مِنْ الصَّحَابَةِ وَالتَّابِعِينَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ التَّوْبَةُ النَّصُوحُ: أَنْ يَتُوبَ مِنْ الذَّنْبِ ثُمَّ لَا يَعُودُ إلَيْهِ و ” نَصُوحٌ ” هِيَ صِفَةٌ لِلتَّوْبَةِ وَهِيَ مُشْتَقَّةٌ مِنْ النُّصْحِ وَالنَّصِيحَةِ. وَأَصْلُ ذَلِكَ هُوَ الْخُلُوصُ. يُقَالُ: فُلَانٌ يَنْصَحُ لِفُلَانِ إذَا كَانَ يُرِيدُ لَهُ الْخَيْرَ إرَادَةً خَالِصَةً لَا غِشَّ فِيهَا

হযরত উমর বিন খাত্তাব রাঃ এবং অন্যান্য সাহাবাগণ রাঃ ও তাবেয়ীগণ রহঃ বলেন, তাওবাতুন নাসূহ হল, গোনাহ থেকে এমন তওবা যার পর আর গোনাহ করা হয় না। আর ‘নাসূহ’ শব্দটি তাওবা এর সিফাত। যা নুসহুন এবং নসীহত শব্দ থেকে উদগত। যার আসল অর্থ হল ইখলাস বা খুলুসিয়্যাত। যেমন বলা হয় যে, ওমুক ব্যক্তি ওমুক ব্যক্তিকে নসিহা করেছে। এটি বলা হয়, যখন ব্যক্তি অন্যের জন্য খালিসভাবে কল্যাণ কামনা করে। যাতে কোন ধোঁকা নেই। [মাজমূআ ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়া-১৬/৫৭]

একটু পর ইবনে তাইমিয়া রহঃ লিখেছেনঃ

وَمَنْ قَالَ مِنْ الْجُهَّالِ: إنَّ ” نَصُوحَ ” اسْمُ رَجُلٍ كَانَ عَلَى عَهْدِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَمَرَ النَّاسَ أَنْ يَتُوبُوا كَتَوْبَتِهِ: فَهَذَا رَجُلٌ مُفْتَرٍ كَذَّابٌ جَاهِلٌ بِالْحَدِيثِ وَالتَّفْسِيرِ جَاهِلٌ بِاللُّغَةِ وَمَعَانِي الْقُرْآنِ؛ فَإِنَّ هَذَا امْرُؤٌ لَمْ يَخْلُقْهُ اللَّهُ تَعَالَى وَلَا كَانَ فِي الْمُتَقَدِّمِينَ أَحَدٌ اسْمُهُ نَصُوحٌ وَلَا ذَكَرَ هَذِهِ الْقِصَّةَ أَحَدٌ مِنْ أَهْلِ الْعِلْمِ وَلَوْ كَانَ كَمَا زَعَمَ الْجَاهِلُ لَقِيلَ تُوبُوا إلَى اللَّهِ تَوْبَةَ نَصُوحٍ وَإِنَّمَا قَالَ: {تَوْبَةً نَصُوحًا} وَالنَّصُوحُ هُوَ التَّائِبُ. وَمَنْ قَالَ: إنَّ الْمُرَادَ بِهَذِهِ الْآيَةِ رَجُلٌ أَوْ امْرَأَةٌ اسْمُهُ نَصُوحٌ وَإِنْ كَانَ عَلَى عَهْدِ عِيسَى أَوْ غَيْرِهِ فَإِنَّهُ كَاذِبٌ يَجِبُ أَنْ يَتُوبَ مِنْ هَذِهِ فَإِنْ لَمْ يَتُبْ وَجَبَتْ عُقُوبَتُهُ بِإِجْمَاعِ الْمُسْلِمِينَ

অর্থঃ আর যে মুর্খ ব্যক্তি বলে যে, নাসূহ হল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগের এক ব্যক্তির নাম। লোকদেরকে ঐ ব্যক্তির মত তওবা করতে আদেশ করা হয়েছে।

যে এমন কথা বলে, সে ব্যক্তি একজন অপবাদদাতা ও মিথ্যুক। হাদীস ও তাফসীর সম্পর্কে অজ্ঞ। সেই সাথে আরবী ভাষা ও কুরআনের অর্থ সম্পর্কে মুর্খ। কেননা সে এমন [এক কাল্পনিক] ব্যক্তি যাকে আল্লাহ সৃষ্টি করেননি। আর পূর্ব যুগে এমন কাউকে পাওয়া যায় না, যার নাম নাসূহ ছিল। আর এমন ঘটনা কোন আহলে ইলম বর্ণনা করেননি।

যদি তা’ই হতো, যা মুর্খ ব্যক্তিটা মনে করে, তাহলে কুরআনের আয়াতের শব্দ হতো تُوبُوا إلَى اللَّهِ تَوْبَةَ نَصُوحٍ অথচ কুরআনের শব্দ এসেছে تَوْبَةً نَصُوحًا।

নাসূহ সে হল তওবাকারী। আর যে বলে যে, এ আয়াত দ্বারা একজন পুরুষ বা নারীকে বুঝানো হয়েছে। যার নাম হল নাসূহ। যে হযরত ঈসা আলাহিস সালাম বা অন্য কোন নবীর জমানার ছিলেন। যে এমন বলে সে ব্যক্তি একজন মিথ্যুক। এ থেকে তার তাওবা করা ওয়াজিব। যদি সে তওবা না করে, তাহলে মুসলমানদের ইজমায়ী সিদ্ধান্ত অনুপাতে তাকে শাস্তি দেয়া আবশ্যক। [মাজমূআ ফাতওয়া ইবনে তাইমিয়া-১৬/৫৯]

লুৎফুর রহমান ফরায়েজী

কুরবানী ও এর পশু সংক্রান্ত বিস্তারিত মাসআলা-মাসায়েল (দলীল সহকারে)

কোরবানি- কোরবানির মাসআলা ঈদুল আযহা কোরবানির ঈদ

 মাওলানা মুহাম্মাদ ইয়াহইয়া

কুরবানী একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এটি আদায় করা ওয়াজিব।
সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি এই ইবাদত পালন করে না তার ব্যাপারে হাদীস শরীফে এসেছে, ‘যার কুরবানীর সামর্থ্য রয়েছে কিন্তু কুরবানী করে না সে যেন আমাদের ঈদগাহে না আসে।’-মুস্তাদরাকে হাকেম, হাদীস : ৩৫১৯; আত্তারগীব ওয়াত্তারহীব ২/১৫৫
ইবাদতের মূলকথা হল আল্লাহ তাআলার আনুগত্য এবং তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন। তাই যেকোনো ইবাদতের পূর্ণতার জন্য দুটি বিষয় জরুরি। ইখলাস তথা একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পালন করা এবং শরীয়তের নির্দেশনা মোতাবেক মাসায়েল অনুযায়ী সম্পাদন করা। এ উদ্দেশ্যে এখানে কুরবানীর কিছু জরুরি মাসায়েল উল্লেখ হল।

কার উপর কুরবানী ওয়াজিব
————————-
মাসআলা : ১. প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্ক সম্পন্ন প্রত্যেক মুসলিম নর-নারী, যে ১০ যিলহজ্ব ফজর থেকে ১২ যিলহজ্ব সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনের অতিরিক্ত নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হবে তার উপর কুরবানী করা ওয়াজিব। টাকা-পয়সা, সোনা-রূপা, অলঙ্কার, বসবাস ও খোরাকির প্রয়োজন আসে না এমন জমি, প্রয়োজন অতিরিক্ত বাড়ি, ব্যবসায়িক পণ্য ও অপ্রয়োজনীয় সকল আসবাবপত্র কুরবানীর নেসাবের ক্ষেত্রে হিসাবযোগ্য।
আর নিসাব হল স্বর্ণের ক্ষেত্রে সাড়ে সাত (৭.৫) ভরি, রূপার ক্ষেত্রে সাড়ে বায়ান্ন (৫২.৫) ভরি, টাকা-পয়সা ও অন্যান্য বস্তুর ক্ষেত্রে নিসাব হল এর মূল্য সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপার মূল্যের সমপরিমাণ হওয়া। আর সোনা বা রূপা কিংবা টাকা-পয়সা এগুলোর কোনো একটি যদি পৃথকভাবে নেসাব পরিমাণ না থাকে কিন্তু প্রয়োজন অতিরিক্ত একাধিক বস্তু মিলে সাড়ে বায়ান্ন তোলা রূপার মূল্যের সমপরিমাণ হয়ে যায় তাহলেও তার উপর কুরবানী করা ওয়াজিব।-আলমুহীতুল বুরহানী ৮/৪৫৫; ফাতাওয়া তাতারখানিয়া ১৭/৪০৫

নেসাবের মেয়াদ
—————
মাসআলা ২. কুরবানীর নেসাব পুরো বছর থাকা জরুরি নয়; বরং কুরবানীর তিন দিনের মধ্যে যে কোনো দিন থাকলেই কুরবানী ওয়াজিব হবে।-বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৬, রদ্দুল মুহতার ৬/৩১২

কুরবানীর সময়
————–
মাসআলা : ৩. মোট তিনদিন কুরবানী করা যায়। যিলহজ্বের ১০, ১১ ও ১২ তারিখ সূর্যাস্ত পর্যন্ত। তবে সম্ভব হলে যিলহজ্বের ১০ তারিখেই কুরবানী করা উত্তম। -মুয়াত্তা মালেক ১৮৮, বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৮, ২৩, ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/২৯৫

নাবালেগের কুরবানী
——————-
মাসআলা : ৪. নাবালেগ শিশু-কিশোর তদ্রূপ যে সুস্থমস্তিষ্ক সম্পন্ন নয়, নেসাবের মালিক হলেও তাদের উপর কুরবানী ওয়াজিব নয়। অবশ্য তার অভিভাবক নিজ সম্পদ দ্বারা তাদের পক্ষে কুরবানী করলে তা সহীহ হবে।-বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৬, রদ্দুল মুহতার ৬/৩১৬

মুসাফিরের জন্য কুরবানী
———————–
মাসআলা : ৫. যে ব্যক্তি কুরবানীর দিনগুলোতে মুসাফির থাকবে (অর্থাৎ ৪৮ মাইল বা প্রায় ৭৮ কিলোমিটার দূরে যাওয়ার নিয়তে নিজ এলাকা ত্যাগ করেছে) তার উপর কুরবানী ওয়াজিব নয়। -ফাতাওয়া কাযীখান ৩/৩৪৪, বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৫, আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩১৫

নাবালেগের পক্ষ থেকে কুরবানী
————————–
মাসআলা : ৬. নাবালেগের পক্ষ থেকে কুরবানী দেওয়া অভিভাবকের উপর ওয়াজিব নয়; বরং মুস্তাহাব।-রদ্দুল মুহতার ৬/৩১৫; ফাতাওয়া কাযীখান ৩/৩৪৫

দরিদ্র ব্যক্তির কুরবানীর হুকুম
————————–
মাসআলা : ৭. দরিদ্র ব্যক্তির উপর কুরবানী করা ওয়াজিব নয়; কিন্তু সে যদি কুরবানীর নিয়তে কোনো পশু কিনে তাহলে তা কুরবানী করা ওয়াজিব হয়ে যায়। -বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯২

কুরবানী করতে না পারলে
———————–
মাসআলা : ৮. কেউ যদি কুরবানীর দিনগুলোতে ওয়াজিব কুরবানী দিতে না পারে তাহলে কুরবানীর পশু ক্রয় না করে থাকলে তার উপর কুরবানীর উপযুক্ত একটি ছাগলের মূল্য সদকা করা ওয়াজিব। আর যদি পশু ক্রয় করে ছিল, কিন্তু কোনো কারণে কুরবানী দেওয়া হয়নি তাহলে ঐ পশু জীবিত সদকা করে দিবে।-বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৪, ফাতাওয়া কাযীখান ৩/৩৪৫

প্রথম দিন কখন থেকে কুরবানী করা যাবে
——————————
মাসআলা : ৯. যেসব এলাকার লোকদের উপর জুমা ও ঈদের নামায ওয়াজিব তাদের জন্য ঈদের নামাযের আগে কুরবানী করা জায়েয নয়। অবশ্য বৃষ্টিবাদল বা অন্য কোনো ওজরে যদি প্রথম দিন ঈদের নামায না হয় তাহলে ঈদের নামাযের সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর প্রথম দিনেও কুরবানী করা জায়েয।-সহীহ বুখারী ২/৮৩২, কাযীখান ৩/৩৪৪, আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩১৮

রাতে কুরবানী করা
—————–
মাসআলা : ১০. ১০ ও ১১ তারিখ দিবাগত রাতেও কুরবানী করা জায়েয। তবে দিনে কুরবানী করাই ভালো। -মুসনাদে আহমাদ, হাদীস : ১৪৯২৭; মাজমাউয যাওয়াইদ ৪/২২, আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩২০, কাযীখান ৩/৩৪৫, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৩

কুরবানীর উদ্দেশ্যে ক্রয়কৃত পশু সময়ের পর জবাই করলে
——————————
মাসআলা : ১১. কুরবানীর দিনগুলোতে যদি জবাই করতে না পারে তাহলে খরিদকৃত পশুই সদকা করে দিতে হবে। তবে যদি (সময়ের পরে) জবাই করে ফেলে তাহলে পুরো গোশত সদকা করে দিতে হবে। এক্ষেত্রে গোশতের মূল্য যদি জীবিত পশুর চেয়ে কমে যায় তাহলে যে পরিমাণ মূল্য হ্রাস পেল তা-ও সদকা করতে হবে।-বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০২, আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩২০-৩২১

কোন কোন পশু দ্বারা কুরবানী করা যাবে
—————————-
মাসআলা : ১২. উট, গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা দ্বারা কুরবানী করা জায়েয। এসব গৃহপালিত পশু ছাড়া অন্যান্য পশু যেমন হরিণ, বন্যগরু ইত্যাদি দ্বারা কুরবানী করা জায়েয নয়। -কাযীখান ৩/৩৪৮, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৫

নর ও মাদা পশুর কুরবানী
———————–
মাসআলা : ১৩. যেসব পশু কুরবানী করা জায়েয সেগুলোর নর-মাদা দুটোই কুরবানী করা যায়। -কাযীখান ৩/৩৪৮, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৫

কুরবানীর পশুর বয়সসীমা
————————
মাসআলা : ১৪. উট কমপক্ষে ৫ বছরের হতে হবে। গরু ও মহিষ কমপক্ষে ২ বছরের হতে হবে। আর ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা কমপক্ষে ১ বছরের হতে হবে। তবে ভেড়া ও দুম্বা যদি ১ বছরের কিছু কমও হয়, কিন্তু এমন হৃষ্টপুষ্ট হয় যে, দেখতে ১ বছরের মতো মনে হয় তাহলে তা দ্বারাও কুরবানী করা জায়েয। অবশ্য এক্ষেত্রে কমপক্ষে ৬ মাস বয়সের হতে হবে।
উল্লেখ্য, ছাগলের বয়স ১ বছরের কম হলে কোনো অবস্থাতেই তা দ্বারা কুরবানী জায়েয হবে না। -কাযীখান ৩/৩৪৮, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৫-২০৬

এক পশুতে শরীকের সংখ্যা
————————
মাসআলা : ১৫. একটি ছাগল, ভেড়া বা দুম্বা দ্বারা শুধু একজনই কুরবানী দিতে পারবে। এমন একটি পশু কয়েকজন মিলে কুরবানী করলে কারোটাই সহীহ হবে না। আর উট, গরু, মহিষে সর্বোচ্চ সাত জন শরীক হতে পারবে। সাতের অধিক শরীক হলে কারো কুরবানী সহীহ হবে না। -সহীহ মুসলিম ১৩১৮, মুয়াত্তা মালেক ১/৩১৯, কাযীখান ৩/৩৪৯, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৭-২০৮

সাত শরীকের কুরবানী
——————–
মাসআলা : ১৬. সাতজনে মিলে কুরবানী করলে সবার অংশ সমান হতে হবে। কারো অংশ এক সপ্তমাংশের কম হতে পারবে না। যেমন কারো আধা ভাগ, কারো দেড় ভাগ। এমন হলে কোনো শরীকের কুরবানীই সহীহ হবে না। -বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৭
মাসআলা : ১৭. উট, গরু, মহিষ সাত ভাগে এবং সাতের কমে যেকোনো সংখ্যা যেমন দুই, তিন, চার, পাঁচ ও ছয় ভাগে কুরবানী করা জায়েয। -সহীহ মুসলিম ১৩১৮, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৭

কোনো অংশীদারের গলদ নিয়ত হলে
—————————–
মাসআলা : ১৮. যদি কেউ আল্লাহ তাআলার হুকুম পালনের উদ্দেশ্যে কুরবানী না করে শুধু গোশত খাওয়ার নিয়তে কুরবানী করে তাহলে তার কুরবানী সহীহ হবে না। তাকে অংশীদার বানালে শরীকদের কারো কুরবানী হবে না। তাই অত্যন্ত সতর্কতার সাথে শরীক নির্বাচন করতে হবে। -বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৮, কাযীখান ৩/৩৪৯

কুরবানীর পশুতে আকীকার অংশ
—————————-
মাসআলা : ১৯. কুরবানীর গরু, মহিষ ও উটে আকীকার নিয়তে শরীক হতে পারবে। এতে কুরবানী ও আকীকা দুটোই সহীহ হবে।-তাহতাবী আলাদ্দুর ৪/১৬৬, রদ্দুল মুহতার ৬/৩৬২
মাসআলা : ২০. শরীকদের কারো পুরো বা অধিকাংশ উপার্জন যদি হারাম হয় তাহলে কারো কুরবানী সহীহ হবে না।
মাসআলা : ২১. যদি কেউ গরু, মহিষ বা উট একা কুরবানী দেওয়ার নিয়তে কিনে আর সে ধনী হয় তাহলে ইচ্ছা করলে অন্যকে শরীক করতে পারবে। তবে এক্ষেত্রে একা কুরবানী করাই শ্রেয়। শরীক করলে সে টাকা সদকা করে দেওয়া উত্তম। আর যদি ওই ব্যক্তি এমন গরীব হয়, যার উপর কুরবানী করা ওয়াজিব নয়, তাহলে সে অন্যকে শরীক করতে পারবে না। এমন গরীব ব্যক্তি যদি কাউকে শরীক করতে চায় তাহলে পশু ক্রয়ের সময়ই নিয়ত করে নিবে।-কাযীখান ৩/৩৫০-৩৫১, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১০

কুরবানীর উত্তম পশু
——————
মাসআলা : ২২. কুরবানীর পশু হৃষ্টপুষ্ট হওয়া উত্তম।-মুসনাদে আহমদ ৬/১৩৬, আলমগীরী ৫/৩০০, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৩

খোঁড়া পশুর কুরবানী
——————-
মাসআলা : ২৩. যে পশু তিন পায়ে চলে, এক পা মাটিতে রাখতে পারে না বা ভর করতে পারে না এমন পশুর কুরবানী জায়েয নয়। -জামে তিরমিযী ১/২৭৫, সুনানে আবু দাউদ ৩৮৭, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১৪, রদ্দুল মুহতার ৬/৩২৩, আলমগীরী ৫/২৯৭

রুগ্ন ও দুর্বল পশুর কুরবানী
———————–
মাসআলা : ২৪. এমন শুকনো দুর্বল পশু, যা জবাইয়ের স্থান পর্যন্ত হেঁটে যেতে পারে না তা দ্বারা কুরবানী করা জায়েয নয়। -জামে তিরমিযী ১/২৭৫, আলমগীরী ৫/২৯৭, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১৪

দাঁত নেই এমন পশুর কুরবানী
————————–
মাসআলা : ২৫. যে পশুর একটি দাঁতও নেই বা এত বেশি দাঁত পড়ে গেছে যে, ঘাস বা খাদ্য চিবাতে পারে না এমন পশু দ্বারাও কুরবানী করা জায়েয নয়। -বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১৫, আ লমগীরী ৫/২৯৮

যে পশুর শিং ভেঙ্গে বা ফেটে গেছে
——————————
মাসআলা : ২৬. যে পশুর শিং একেবারে গোঁড়া থেকে ভেঙ্গে গেছে, যে কারণে
মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সে পশুর কুরবানী জায়েয নয়। পক্ষান্তরে যে পশুর অর্ধেক শিং বা কিছু শিং ফেটে বা ভেঙ্গে গেছে বা শিং একেবারে উঠেইনি সে পশু কুরবানী করা জায়েয। -জামে তিরমিযী ১/২৭৬, সুনানে আবু দাউদ ৩৮৮, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১৬, রদ্দুল মুহতার ৬/৩২৪, আলমগীরী ৫/২৯৭

কান বা লেজ কাটা পশুর কুরবানী
——————————
মাসআলা : ২৭. যে পশুর লেজ বা কোনো কান অর্ধেক বা তারও বেশি কাটা সে পশুর কুরবানী জায়েয নয়। আর যদি অর্ধেকের বেশি থাকে তাহলে তার কুরবানী জায়েয। তবে জন্মগতভাবেই যদি কান ছোট হয় তাহলে অসুবিধা নেই। -জামে তিরমিযী ১/২৭৫, মুসনাদে আহমদ ১/৬১০, ইলাউস সুনান ১৭/২৩৮, কাযীখান ৩/৩৫২, আলমগীরী ৫/২৯৭-২৯৮

অন্ধ পশুর কুরবানী
—————–
মাসআলা : ২৮. যে পশুর দুটি চোখই অন্ধ বা এক চোখ পুরো নষ্ট সে পশু কুরবানী করা জায়েয নয়। -জামে তিরমিযী ১/২৭৫, কাযীখান ৩/৩৫২, আলমগীরী ২৯৭, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১৪

নতুন পশু ক্রয়ের পর হারানোটা পাওয়া গেলে
————————————-
মাসআলা : ২৯. কুরবানীর পশু হারিয়ে যাওয়ার পরে যদি আরেকটি কেনা হয় এবং পরে হারানোটিও পাওয়া যায় তাহলে কুরবানীদাতা গরীব হলে (যার উপর কুরবানী ওয়াজিব নয়) দুটি পশুই কুরবানী করা ওয়াজিব। আর ধনী হলে কোনো একটি কুরবানী করলেই হবে। তবে দুটি কুরবানী করাই উত্তম। -সুনানে বায়হাকী ৫/২৪৪, ইলাউস সুনান ১৭/২৮০, বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৯, কাযীখান ৩/৩৪৭

গর্ভবতী পশুর কুরবানী
———————
মাসআলা : ৩০. গর্ভবতী পশু কুরবানী করা জায়েয। জবাইয়ের পর যদি বাচ্চা জীবিত পাওয়া যায় তাহলে সেটাও জবাই করতে হবে। তবে প্রসবের সময় আসন্ন হলে সে পশু কুরবানী করা মাকরূহ। -কাযীখান ৩/৩৫০

পশু কেনার পর দোষ দেখা দিলে
—————————-
মাসআলা : ৩১. কুরবানীর নিয়তে ভালো পশু কেনার পর যদি তাতে এমন কোনো দোষ দেখা দেয় যে কারণে কুরবানী জায়েয হয় না তাহলে ওই পশুর কুরবানী সহীহ হবে না। এর স্থলে আরেকটি পশু কুরবানী করতে হবে। তবে ক্রেতা গরীব হলে ত্রুটিযুক্ত পশু দ্বারাই কুরবানী করতে পারবে। -খুলাসাতুল ফাতাওয়া ৪/৩১৯, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১৬, ফাতাওয়া নাওয়াযেল ২৩৯, রদ্দুল মুহতার ৬/৩২৫

পশুর বয়সের ব্যাপারে বিক্রেতার কথা
———————————
মাসআলা : ৩২. যদি বিক্রেতা কুরবানীর পশুর বয়স পূর্ণ হয়েছে বলে স্বীকার করে আর পশুর শরীরের অবস্থা দেখেও তাই মনে হয় তাহলে বিক্রেতার কথার উপর নির্ভর করে পশু কেনা এবং তা দ্বারা কুরবানী করা যাবে। -আহকামে ঈদুল আযহা, মুফতী মুহাম্মাদ শফী রহ. ৫

বন্ধ্যা পশুর কুরবানী
——————
মাসআলা : ৩৩. বন্ধ্যা পশুর কুরবানী জায়েয। -রদ্দুল মুহতার ৬/৩২৫

নিজের কুরবানীর পশু নিজে জবাই করা
———————————-
মাসআলা : ৩৪. কুরবানীর পশু নিজে জবাই করা উত্তম। নিজে না পারলে অন্যকে দিয়েও জবাই করাতে পারবে। এক্ষেত্রে কুরবানীদাতা পুরুষ হলে জবাইস্থলে তার উপস্থিত থাকা ভালো। -মুসনাদে আহমদ ২২৬৫৭, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২২-২২৩, আলমগীরী ৫/৩০০, ইলাউস সুনান ১৭/২৭১-২৭৪

জবাইয়ে একাধিক ব্যক্তি শরীক হলে
——————————–
মাসআলা : ৩৫. অনেক সময় জবাইকারীর জবাই সম্পন্ন হয় না, তখন কসাই বা অন্য কেউ জবাই সম্পন্ন করে থাকে। এক্ষেত্রে অবশ্যই উভয়কেই নিজ নিজ যবাইয়ের আগে ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’পড়তে হবে। যদি কোনো একজন না পড়ে তবে ওই কুরবানী সহীহ হবে না এবং জবাইকৃত পশুও হালাল হবে না। -রদ্দুল মুহতার ৬/৩৩৪

কুরবানীর পশু থেকে জবাইয়ের আগে উপকৃত হওয়া
—————————————–
মাসআলা : ৩৬. কুরবানীর পশু কেনার পর বা নির্দিষ্ট করার পর তা থেকে উপকৃত হওয়া জায়েয নয়। যেমন হালচাষ করা, আরোহণ করা, পশম কাটা ইত্যাদি।সুতরাং কুরবানীর পশু দ্বারা এসব করা যাবে না। যদি করে তবে পশমের মূল্য, হালচাষের মূল্য ইত্যাদি সদকা করে দিবে।-মুসনাদে আহমদ ২/১৪৬, নায়লুল আওতার ৩/১৭২, ইলাউস সুনান ১৭/২৭৭, কাযীখান ৩/৩৫৪, আলমগীরী ৫/৩০০

কুরবানীর পশুর দুধ পান করা
————————–
মাসআলা : ৩৭. কুরবানীর পশুর দুধ পান করা যাবে না। যদি জবাইয়ের সময় আসন্ন হয় আর দুধ দোহন না করলে পশুর
কষ্ট হবে না বলে মনে হয় তাহলে দোহন করবে না। প্রয়োজনে ওলানে ঠাণ্ডা পানি ছিটিয়ে দেবে। এতে দুধের চাপ কমে যাবে। যদি দুধ দোহন করে ফেলে তাহলে তা সদকা করে দিতে হবে। নিজে পান করে থাকলে মূল্য সদকা করে দিবে। -মুসনাদে আহমদ ২/১৪৬, ইলাউস সুনান ১৭/২৭৭,
রদ্দুল মুহতার ৬/৩২৯, কাযীখান ৩/৩৫৪, আলমগীরী ৫/৩০১

কোনো শরীকের মৃত্যু ঘটলে
————————-
মাসআলা : ৩৮. কয়েকজন মিলে কুরবানী করার ক্ষেত্রে জবাইয়ের আগে কোনো শরীকের মৃত্যু হলে তার ওয়ারিশরা যদি মৃতের পক্ষ থেকে কুরবানী করার অনুমতি দেয় তবে তা জায়েয হবে। নতুবা ওই শরীকের টাকা ফেরত দিতে হবে। অবশ্য তার
স্থলে অন্যকে শরীক করা যাবে। -বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৯, আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩২৬, কাযীখান ৩/৩৫১

কুরবানীর পশুর বাচ্চা হলে
————————
মাসআলা : ৩৯. কুরবানীর পশু বাচ্চা দিলে ওই বাচ্চা জবাই না করে জীবিত সদকা করে দেওয়া উত্তম। যদি সদকা না করে তবে কুরবানীর পশুর সাথে বাচ্চাকেও জবাই করবে এবং গোশত সদকা করে দিবে।-কাযীখান ৩/৩৪৯, আলমগীরী ৫/৩০১, রদ্দুল মুহতার ৬/৩২৩

মৃতের পক্ষ থেকে কুরবানী
————————
মাসআলা : ৪০. মৃতের পক্ষ থেকে কুরবানী করা জায়েয। মৃত ব্যক্তি যদি ওসিয়্যত না করে থাকে তবে সেটি নফল কুরবানী হিসেবে গণ্য হবে। কুরবানীর স্বাভাবিক গোশতের মতো তা নিজেরাও খেতে পারবে এবং আত্মীয়-স্বজনকেও দিতে পারবে। আর যদি মৃত ব্যক্তি কুরবানীর ওসিয়্যত করে গিয়ে থাকে তবে এর গোশত নিজেরা খেতে পারবে না। গরীব-মিসকীনদের মাঝে সদকা করে দিতে হবে। -মুসনাদে আহমদ ১/১০৭, হাদীস ৮৪৫, ইলাউস সুনান ১৭/২৬৮, রদ্দুল মুহতার ৬/৩২৬, কাযীখান ৩/৩৫২

কুরবানীর গোশত জমিয়ে রাখা
————————
মাসআলা : ৪১. কুরবানীর গোশত তিনদিনেরও অধিক জমিয়ে রেখে খাওয়া জায়েয।-বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৪, সহীহ মুসলিম ২/১৫৯, মুয়াত্তা মালেক ১/৩১৮, ইলাউস সুনান ১৭/২৭০

কুরবানীর গোশত বণ্টন
———————-
মাসআলা : ৪২. শরীকে কুরবানী করলে ওজন করে গোশত বণ্টন করতে হবে। অনুমান করে ভাগ করা জায়েয নয়।-আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩১৭, কাযীখান ৩/৩৫১
মাসআলা : ৪৩. কুরবানীর গোশতের এক তৃতীয়াংশ গরীব-মিসকিনকে এবং এক তৃতীয়াংশ আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীকে দেওয়া উত্তম। অবশ্য পুরো গোশত যদি নিজে রেখে দেয় তাতেও কোনো অসুবিধা নেই। -বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৪, আলমগীরী ৫/৩০০

গোশত, চর্বি বিক্রি করা
———————
মাসআলা : ৪৪. কুরবানীর গোশত, চর্বি ইত্যাদি বিক্রি করা জায়েয নয়। বিক্রি করলে পূর্ণ মূল্য সদকা করে দিতে হবে। -ইলাউস সুনান ১৭/২৫৯, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৫, কাযীখান ৩/৩৫৪, আলমগীরী ৫/৩০১

জবাইকারীকে চামড়া, গোশত দেওয়া
————————
মাসআলা : ৪৫. জবাইকারী, কসাই বা কাজে সহযোগিতাকারীকে চামড়া, গোশত বা কুরবানীর পশুর কোনো কিছু পারিশ্রমিক হিসেবে দেওয়া জায়েয হবে না। অবশ্য পূর্ণ পারিশ্রমিক দেওয়ার পর পূর্বচুক্তি ছাড়া হাদিয়া হিসাবে গোশত বা তরকারী দেওয়া যাবে।

জবাইয়ের অস্ত্র
————-
মাসআলা : ৪৬. ধারালো অস্ত্র দ্বারা জবাই করা উত্তম।-বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৩

পশু নিস্তেজ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা
————————
মাসআলা : ৪৭. জবাইয়ের পর পশু
নিস্তেজ হওয়ার আগে চামড়া খসানো বা অন্য কোনো অঙ্গ কাটা মাকরূহ। -বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৩

অন্য পশুর সামনে জবাই করা
————————
মাসআলা : ৪৮. এক পশুকে অন্য পশুর সামনে জবাই করবে না। জবাইয়ের সময় প্রাণীকে অধিক কষ্ট না দেওয়া।

কুরবানীর গোশত বিধর্মীকে দেওয়া
————————
মাসআলা : ৪৯. কুরবানীর গোশত হিন্দু ও অন্য ধর্মাবলম্বীকে দেওয়া জায়েয।-ইলাউস সুনান ৭/২৮৩, ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/৩০০

অন্য কারো ওয়াজিব কুরবানী আদায় করতে চাইলে
————————
মাসআলা : ৫০. অন্যের ওয়াজিব কুরবানী দিতে চাইলে ওই ব্যক্তির অনুমতি নিতে হবে। নতুবা ওই ব্যক্তির কুরবানী আদায় হবে না। অবশ্য স্বামী বা পিতা যদি স্ত্রী বা সন্তানের বিনা অনুমতিতে তার পক্ষ থেকে কুরবানী করে তাহলে তাদের কুরবানী আদায় হয়ে যাবে। তবে অনুমতি নিয়ে আদায় করা ভালো।

কুরবানীর পশু চুরি হয়ে গেলে বা মরে গেলে
————————
মাসআলা : ৫১. কুরবানীর পশু যদি চুরি হয়ে যায় বা মরে যায় আর কুরবানীদাতার উপর পূর্ব থেকে কুরবানী ওয়াজিব থাকে তাহলে আরেকটি পশু কুরবানী করতে হবে। গরীব হলে (যার উপর কুরবানী ওয়াজিব নয়) তার জন্য আরেকটি পশু কুরবানী করা ওয়াজিব নয়।-বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১৬, খুলাসাতুল ফাতাওয়া ৪/৩১৯

পাগল পশুর কুরবানী
——————-
মাসআলা : ৫২. পাগল পশু কুরবানী করা জায়েয। তবে যদি এমন পাগল হয় যে, ঘাস পানি দিলে খায় না এবং মাঠেও চরে না তাহলে সেটার কুরবানী জায়েয হবে না। -আননিহায়া ফী গরীবিল হাদীস ১/২৩০, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২১৬, ইলাউস সুনান ১৭/২৫২

নিজের কুরবানীর গোশত খাওয়া
————————
মাসআলা : ৫৩. কুরবানীদাতার জন্য নিজ কুরবানীর গোশত খাওয়া মুস্তাহাব। -সূরা হজ্ব ২৮, সহীহ মুসলিম ২২/১৫৯, মুসনাদে আহমদ, হাদীস ৯০৭৮, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৪

ঋণ করে কুরবানী করা
———————
মাসআলা : ৫৪. কুরবানী ওয়াজিব এমন ব্যক্তিও ঋণের টাকা দিয়ে কুরবানী করলে ওয়াজিব আদায় হয়ে যাবে। তবে সুদের উপর ঋণ নিয়ে কুরবানী করা যাবে না।

হাজীদের উপর ঈদুল আযহার কুরবানী
————————
মাসআলা : ৫৫. যেসকল হাজী কুরবানীর দিনগুলোতে মুসাফির থাকবে তাদের উপর ঈদুল আযহার কুরবানী ওয়াজিব নয়। কিন্তু যে হাজী কুরবানীর কোনো দিন মুকীম থাকবে সামর্থ্যবান হলে তার উপর ঈদুল আযহার কুরবানী করা জরুরি হবে। -ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/২৯৩, আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩১৫, বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৫, ইমদাদুল ফাতাওয়া ২/১৬৬

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকে কুরবানী করা
————————
মাসআলা : ৫৬. সামর্থ্যবান ব্যক্তির রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকে কুরবানী করা উত্তম। এটি বড় সৌভাগ্যের বিষয়ও বটে। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলী রা.কে তার পক্ষ থেকে কুরবানী করার ওসিয়্যত করেছিলেন। তাই তিনি প্রতি বছর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকেও কুরবানী দিতেন। -সুনানে আবু দাউদ ২/২৯, জামে তিরমিযী ১/২৭৫, ইলাউস সুনান ১৭/২৬৮, মিশকাত ৩/৩০৯

কোন দিন কুরবানী করা উত্তম
————————
মাসআলা : ৫৭. ১০, ১১ ও ১২ এ তিন দিনের মধ্যে প্রথম দিন কুরবানী করা অধিক উত্তম। এরপর দ্বিতীয় দিন, এরপর তৃতীয় দিন। -রদ্দুল মুহতার ৬/৩১৬

খাসীকৃত ছাগল দ্বারা কুরবানী
————————
মাসআলা : ৫৮. খাসিকৃত ছাগল দ্বারা কুরবানী করা উত্তম। -ফাতহুল কাদীর ৮/৪৯৮, মাজমাউল আনহুর ৪/২২৪, ইলাউস সুনান ১৭/৪৫৩

জীবিত ব্যক্তির নামে কুরবানী
————————
মাসআলা : ৫৯. যেমনিভাবে মৃতের পক্ষ থেকে ঈসালে সওয়াবের উদ্দেশ্যে কুরবানী করা জায়েয তদ্রূপ জীবিত ব্যক্তির পক্ষ থেকে তার ঈসালে সওয়াবের জন্য নফল কুরবানী করা জায়েয। এ কুরবানীর গোশত দাতা ও তার পরিবারও খেতে পারবে।

বিদেশে অবস্থানরত ব্যক্তির কুরবানী অন্যত্রে করা
————————
মাসআলা : ৬০. বিদেশে অবস্থানরত ব্যক্তির জন্য নিজ দেশে বা অন্য কোথাও কুরবানী করা জায়েয।

কুরবানীদাতা ভিন্ন স্থানে থাকলে কখন জবাই করব
————————
মাসআলা : ৬১. কুরবানীদাতা এক স্থানে আর কুরবানীর পশু ভিন্ন স্থানে থাকলে কুরবানীদাতার ঈদের নামায পড়া বা না পড়া ধর্তব্য নয়; বরং পশু যে এলাকায় আছে ওই এলাকায় ঈদের জামাত হয়ে গেলে পশু জবাই করা যাবে। -আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩১৮

কুরবানীর চামড়া বিক্রির অর্থ সাদকা করা
————————
মাসআলা : ৬২. কুরবানীর চামড়া কুরবানীদাতা নিজেও ব্যবহার করতে পারবে। তবে কেউ যদি নিজে ব্যবহার না করে বিক্রি করে তবে বিক্রিলব্ধ মূল্য পুরোটা সদকা করা জরুরি। -আদ্দুররুল মুখতার, ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/৩০১

কুরবানীর চামড়া বিক্রির নিয়ত
————————
মাসআলা : ৬৩. কুরবানীর পশুর চামড়া বিক্রি করলে মূল্য সদকা করে দেওয়ার নিয়তে বিক্রি করবে। সদকার নিয়ত না করে নিজের খরচের নিয়ত করা নাজায়েয ও গুনাহ। নিয়ত যা-ই হোক বিক্রিলব্ধ অর্থ পুরোটাই সদকা করে দেওয়া জরুরি। -ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/৩০১, কাযীখান ৩/৩৫৪

কুরবানীর শেষ সময়ে মুকীম হলে
————————
মাসআলা : ৬৪. কুরবানীর সময়ের প্রথম দিকে মুসাফির থাকার পরে ৩য় দিন কুরবানীর সময় শেষ হওয়ার পূর্বে মুকীম হয়ে গেলে তার উপর কুরবানী ওয়াজিব হবে। পক্ষান্তরে প্রথম দিনে মুকীম ছিল অতঃপর তৃতীয় দিনে মুসাফির হয়ে গেছে তাহলেও তার উপর কুরবানী ওয়াজিব থাকবে না। অর্থাৎ সে কুরবানী না দিলে গুনাহগার হবে না। -বাদায়েউস সানায়ে ৪/১৯৬, ফাতাওয়া খানিয়া ৩/৩৪৬, আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩১৯

কুরবানীর পশুতে ভিন্ন ইবাদতের নিয়তে শরীক হওয়া
————————
মাসআলা : ৬৫. এক কুরবানীর পশুতে আকীকা, হজ্বের কুরবানীর নিয়ত করা যাবে। এতে প্রত্যেকের নিয়তকৃত ইবাদত আদায় হয়ে যাবে।-বাদায়েউস সানায়ে ৪/২০৯, রদ্দুল মুহতার ৬/৩২৬, আলমাবসূত সারাখছী ৪/১৪৪, আলইনায়া ৮/৪৩৫-৩৪৬, আলমুগনী ৫/৪৫৯

কুরবানীর গোশত দিয়ে খানা শুরু করা
————————
মাসআলা : ৬৬. ঈদুল আযহার দিন সর্বপ্রথম নিজ কুরবানীর গোশত দিয়ে খানা শুরু করা সুন্নত। অর্থাৎ সকাল থেকে কিছু না খেয়ে প্রথমে কুরবানীর গোশত খাওয়া সুন্নত। এই সুন্নত শুধু ১০ যিলহজ্বের জন্য। ১১ বা ১২ তারিখের গোশত দিয়ে খানা শুরু করা সুন্নত নয়। -জামে তিরমিযী ১/১২০, শরহুল মুনয়া ৫৬৬, আদ্দুররুল মুখতার ২/১৭৬, আলবাহরুর রায়েক ২/১৬৩

কুরবানীর পশুর হাড় বিক্রি
————————
মাসআলা : ৬৭. কুরবানীর মৌসুমে অনেক মহাজন কুরবানীর হাড় ক্রয় করে থাকে। টোকাইরা বাড়ি বাড়ি থেকে হাড় সংগ্রহ করে তাদের কাছে বিক্রি করে। এদের ক্রয়-বিক্রয় জায়েয। এতে কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু কোনো কুরবানীদাতার জন্য নিজ কুরবানীর কোনো কিছু এমনকি হাড্ডিও বিক্রি করা জায়েয হবে না। করলে মূল্য সদকা করে দিতে হবে। আর জেনে শুনে মহাজনদের জন্য এদের কাছ থেকে ক্রয় করাও বৈধ হবে না। -বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৫, কাযীখান ৩/৩৫৪, ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/৩০১

রাতে কুরবানী করা
——————
মাসআলা : ৬৮. ১০ ও ১১ তারিখ দিবাগত রাতে কুরবানী করা জায়েয। তবে রাতে আলো স্বল্পতার দরুন জবাইয়ে ত্রুটি হতে পারে বিধায় রাতে জবাই করা অনুত্তম। অবশ্য পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা থাকলে রাতে জবাই করতে কোনো অসুবিধা নেই। -ফাতাওয়া খানিয়া ৩/৩৪৫, আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩২০, ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/২৯৬, আহসানুল ফাতাওয়া ৭/৫১০

কাজের লোককে কুরবানীর গোশত খাওয়ানো
————————
মাসআলা : ৬৯. কুরবানীর পশুর কোনো কিছু পারিশ্রমিক হিসাবে দেওয়া জায়েয নয়। গোশতও পারিশ্রমিক হিসেবে কাজের লোককে দেওয়া যাবে না। অবশ্য এ সময় ঘরের অন্যান্য সদস্যদের মতো কাজের লোকদেরকেও গোশত খাওয়ানো যাবে।-আহকামুল কুরআন জাসসাস ৩/২৩৭, বাদায়েউস সানায়ে ৪/২২৪, আলবাহরুর রায়েক ৮/৩২৬, ইমদাদুল মুফতীন

জবাইকারীকে পারিশ্রমিক দেওয়া
————————
মাসআলা : ৭০. কুরবানী পশু জবাই করে পারিশ্রমিক দেওয়া-নেওয়া জায়েয। তবে কুরবানীর পশুর কোনো কিছু পারিশ্রমিক হিসাবে দেওয়া যাবে না। -কিফায়াতুল মুফতী ৮/২৬৫

মোরগ কুরবানী করা
——————-
মাসআলা : ৭১. কোনো কোনো এলাকায় দরিদ্রদের মাঝে মোরগ কুরবানী করার প্রচলন আছে। এটি না জায়েয। কুরবানীর দিনে মোরগ জবাই করা নিষেধ নয়, তবে কুরবানীর নিয়তে করা যাবে না। -খুলাসাতুল ফাতাওয়া ৪/৩১৪, ফাতাওয়া বাযযাযিয়া ৬/২৯০, আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩১৩, ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৫/২০০

হজ্বের তাৎপর্য : হজ্ব কী ও কেন?

মক্কা কাবা বাইতুল্লাহ হজ ওমরা

এখন হজ্বের মওসুম। মিম্বরে মিম্বরে হজ্বের আলোচনা। চারদিকে সাজ সাজ রব। কারো মুখে তালবিয়া, কারো মনে আগামীর স্বপ্ন, আর কারো হৃদয় জুড়ে মক্কা-মদীনার স্মৃতি ও হাহাকার। এভাবেই হজ্বের মওসুম আসে আর গোটা মুসলিম জাহানের হৃদয় ও আত্মাকে মথিত আলোড়িত করে যায়। যতদিন থাকবে মুমিনের দেহে এক বিন্দু প্রাণ, থাকবে উম্মাহর হৃদয়ে কিছুমাত্র ঈমানের স্পন্দন ততদিন মক্কা-মদীনা, মীনা-আরাফা আমাদের আলোড়িত করবেই। জ্বী, আলোড়িত করবেই, এতে যতই বাড়–ক মুনাফিকজনের মর্মজ্বালা।

হজ্ব কী? কেন মুমিন-হৃদয়ে হজ্বের এই আকুতি?

হজ্ব পরম করুণাময় আল্লাহর ইবাদত। বান্দার প্রতি স্রষ্টার হক্ব। ঈমানের আলোকিত নিদর্শন। কুরআন মজীদের ইরশাদÑ
وَ لِلّٰهِ عَلَی النَّاسِ حِجُّ الْبَیْتِ مَنِ اسْتَطَاعَ اِلَیْهِ سَبِیْلًا ؕ وَ مَنْ كَفَرَ فَاِنَّ اللّٰهَ غَنِیٌّ عَنِ الْعٰلَمِیْنَ
মানুষের উপর আল্লাহর বিধান ঐ ঘরের হজ্ব করা, যার আছে সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য। আর কেউ কুফর করলে আল্লাহ তো বিশ্বজগতের মুখাপেক্ষী নন। সূরা আলে ইমরান (৩) : ৯৭
সুতরাং হজ্ব আল্লাহর বিধান, আল্লাহর হক্ব।

মেহেরবান আল্লাহ এ বিধান কত সহজ করে দিয়েছেন! শুধু সামর্থ্যবানদের জন্য তা ফরয। এরপর সারা জীবনে একবারমাত্র করা। বিখ্যাত সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত একটি দীর্ঘ হাদীসে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন
الحج مرة فمن زاد فهو تطوع
‘হজ্ব একবার। এরপর যে বেশি করে তা ঐচ্ছিক।’Ñমুসনাদে আহমদ, হাদীস ১২০৪
সুতরাং সামর্থ্য থাকার পরও যে হজ্ব করে না কে আছে তার মতো বদ নসীব?

উপরের আয়াতের وَ مَنْ كَفَرَ ‘আর কেউ কুফর করলে…’কথাটি অতি ভয়াবহ। এতে এই ইঙ্গিতও আছে যে, সামর্থ্য থাকা সত্ত্বে¡ও হজ্ব না করা একপ্রকারের কুফর। কর্মগত কুফর তো বটেই, কারণ হজ্ব ইসলামের এক রোকন। সুতরাং বিনা ওজরে তা পালন না করা কুফরের এক শাখা। নেক আমলগুলো যেমন ইমানের শাখা তেমনি বাদ আমল ও গুনাহের কাজগুলো কুফরের শাখা। আর কুফরের শাখা-প্রশাখায় বিচরণকারীর ইমান যে ঝুঁকিগ্রস্ত তা তো বলা অপেক্ষা রাখে না।

হযরত ওমর ইবনুল খাত্তাব রা. থেকে সহীহ সনদে বর্ণিত
مَنْ أَطَاقَ الْحَجَّ وَلَمْ يَحُجَّ حَتَّى مَاتَ فَسواء عَلَيْهِ أَنَّهُ مَاتَ يَهُودِيًّا أَوْ نَصْرَانِيًّا
‘হজ্বের সামর্থ্য থাকা সত্ত্বে¡ও যে হজ্ব করল না, এরপর সে ইহুদি অবস্থায় মারা যাক কি নাসরানী অবস্থায় সবই তার জন্য সমান!’তাফসীরে ইবনে কাসীর ১/৫৭৮
* * *

হজ্ব একটি ইবাদত এবং হজ্বের সফর একটি ইবাদতের সফর। এ নিছক ভ্রমণ বা পর্যটন নয়। ইসলামে তো ভ্রমণ-পর্যটনেরও রয়েছে আলাদা নীতি ও বিধান, যা রক্ষা করা ও পালন করা কর্তব্য। সুতরাং ইবাদতের সফরে আদব রক্ষা করা এবং প্রচলিত ভ্রমণ-পর্যটনের স্বেচ্ছাচার থেকে পবিত্র রাখা তো অতি জরুরি। এরপর যে সময়টুকু ইহরামের হালতে থাকা হয় ঐ সময়ের জন্য তো বিশেষ কুরআনী নির্দেশ
فَلَا رَفَثَ وَ لَا فُسُوْقَ ۙ وَ لَا جِدَالَ فِی الْحَجِّ
‘হজ্বে কামাচার, পাপাচার ও ঝগড়া-বিবাদের অবকাশ নেই।’সুরা বাকারা (২) : ১৯৭

আর এ নির্দেশ পালনের প্রতিদান কী তা সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইরশাদ
مَنْ حَجَّ لله فَلَمْ يَرْفُثْ، وَلَمْ يَفْسُقْ رَجَعَ كَيَوْمِ وَلَدَتْهُ أُمُّهُ
যে আল্লাহর জন্য হজ্ব করল অতঃপর তাতে অশ্লীল কর্ম ও গোনাহের কাজ থেকে বিরত থাকল সে ঐ দিনের মতো (নিষ্পাপ) হয়ে যায় যেদিন সে ভ‚মিষ্ট হয়েছিল। Ñসহীহ বুখারী, হাদীস ১৫২১; সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৩৫০

অন্য হাদীসে বলেছেনÑ
الْحَجُّ الْمَبْرُورُ لَيْسَ لَهُ جَزَاءٌ إِلَّا الْجَنَّة
মাবরূর হজ্বের প্রতিদান তো জান্নাত ছাড়া আর কিছু নয়। সহীহ বুখারী, হাদীস ১৭৭৩; সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৩৪৯
মাবরূর হজ্ব ঐ হজ্ব যা শরীয়তের নিয়ম মোতাবেক গুনাহ থেকে বেঁচে আদায় করা হয়।
* * *

হজ্ব একটি ইবাদত। আর ইবাদতের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তাওহীদ ও সুন্নাহ। এই দুই বৈশিষ্ট্যের কারণে ইসলামের ইবাদত অন্য সকল ধর্মের ইবাদত-উপাসনা থেকে আলাদা। ইবাদত একমাত্র আল্লাহর, যিনি বিশ্বজগতের সৃষ্টিকর্তা এবং যাঁর ইচ্ছায় সৃজন-বর্ধন, লয়-ক্ষয়, উপকার-অপকার। তিনিই একমাত্র উপাস্য ও মাবুদ। তিনি ছাড়া ইবাদত-উপাসনার উপযুক্ত আর কেউ নেই। এই তাওহীদই হচ্ছে জগত-স্রষ্টার শাশ্বত বিধান। এই বিধান দিয়েই তিনি যুগে যুগে নবী রাসূলগণকে পাঠিয়েছেন।

وَ لَقَدْ بَعَثْنَا فِیْ كُلِّ اُمَّةٍ رَّسُوْلًا اَنِ اعْبُدُوا اللّٰهَ وَ اجْتَنِبُوا الطَّاغُوْتَ
আমি তো প্রত্যেক জাতির মাঝেই রাসূল পাঠিয়েছি (এ পয়গাম দিয়ে যে,) তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং তাগূতকে বর্জন কর। সুরা নাহল (১৬) : ৩৬

وَ مَاۤ اَرْسَلْنَا مِنْ قَبْلِكَ مِنْ رَّسُوْلٍ اِلَّا نُوْحِیْۤ اِلَیْهِ اَنَّهٗ لَاۤ اِلٰهَ اِلَّاۤ اَنَا فَاعْبُدُوْنِ
অর্থাৎ আপনার আগে আমি যে রাসূলই পাঠিয়েছি তাঁর প্রতি এই ওহী করেছি যে, আমি ছাড়া আর কোনো মাবুদ নেই। সুতরাং আমার ইবাদত কর। সূরা আম্বিয়া (২১) : ২৫
সবশেষে আখেরী নবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকেও এ বিধান দিয়েই পাঠানো হয়েছে এবং সমগ্র মানবজাতির জন্য পাঠানো হয়েছে।

قُلْ یٰۤاَیُّهَا النَّاسُ اِنِّیْ رَسُوْلُ اللّٰهِ اِلَیْكُمْ جَمِیْعَا ِ۟الَّذِیْ لَهٗ مُلْكُ السَّمٰوٰتِ وَ الْاَرْضِ ۚ لَاۤ اِلٰهَ اِلَّا هُوَ یُحْیٖ وَ یُمِیْتُ ۪ فَاٰمِنُوْا بِاللّٰهِ وَ رَسُوْلِهِ النَّبِیِّ الْاُمِّیِّ الَّذِیْ یُؤْمِنُ بِاللّٰهِ وَ كَلِمٰتِهٖ وَ اتَّبِعُوْهُ لَعَلَّكُمْ تَهْتَدُوْنَ
বলুন, হে মানুষ! আমি তোমাদের সকলের জন্য আল্লাহর রাসূল, যিনি আকাশমÐলী ও পৃথিবীর সার্বভৌমত্বের অধিকারী। তিনি ছাড়া কোনো মাবুদ নেই, তিনি জীবিত করেন ও মৃত্যু ঘটান। সুতরাং তোমরা ঈমান আন আল্লাহর প্রতি ও তাঁর প্রেরিত উম্মী নবীর প্রতি, যিনি ঈমান আনেন আল্লাহ ও তাঁর বাণীতে এবং তাঁর অনুসরণ কর, যাতে তোমরা সঠিক পথ পাও। সুরা আরাফ (৭) : ১৫৮
সুতরাং‘তাওহীদ’ও‘ইত্তিবায়ে রাসূল’ এ দুই হচ্ছে আসমানী দ্বীন তথা স্রষ্টাকর্তৃক প্রেরিত ধর্মের প্রাণসত্তা এবং স্রষ্টার ইবাদত-উপাসনা ও সকল ধর্ম-কর্মের প্রধান বৈশিষ্ট্য।

সূরা মুলকের বিখ্যাত আয়াত
الَّذِیْ خَلَقَ الْمَوْتَ وَ الْحَیٰوةَ لِیَبْلُوَكُمْ اَیُّكُمْ اَحْسَنُ عَمَلًا
..যিনি সৃষ্টি করেছেন মৃত্যু ও জীবন তোমাদের পরীক্ষা করার জন্যÑ কে তোমাদের মধ্যে কর্মে উত্তম। Ñসূরা মুলক (৬৭) : ২
পরম করুণাময় চান ‘উত্তম’কর্ম; অধিক কর্ম নয়। আর উত্তম কর্ম তা-ই যা তাঁর প্রেরিত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ মোতাবেক সম্পন্ন হয়। মনগড়া পদ্ধতির ধর্ম-কর্ম তা পরিমাণে যতই হোক এবং যতই ত্যাগ-তিতিক্ষাপূর্ণ হোক আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।

হায়! এ দুই মৌলিক বৈশিষ্ট্য থেকে বিচ্যুত হওয়ার কারণে কত জাতি ও সম্প্রদায়ের ইবাদত-উপাসনা ব্যর্থ হয়ে গেল! কত অশ্রু, কতভক্তি, কত ত্যাগ-তিতিক্ষা, সবইঅসার, অর্থহীন, শিরকের কারণে এবং বিদআর কারণে, যা সৃষ্টিকর্তার মহা-অবমাননা ও চরম অবাধ্যতা। তো এরপর এই জপ্-তপ্, এই অশ্রু-ভক্তি, এই সমর্পণ-বিসর্জন কীভাবে তাঁর কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারে?
একারণে ইসলামের হজ্ব ও অন্যান্য ইবাদত অপরাপর জাতি-গোষ্ঠীর তীর্থ-যাত্রা ও ধর্ম-কর্ম থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।
* * *

আল্লাহ তাআলা আপন করুণায় যাদের ইমান নসীব করেছেন তাদের কর্তব্য, ইবাদতের স্বরূপ সঠিকভাবে উপলব্ধি করা এবং ইবাদতের গুণ ও প্রাণ রক্ষার সর্বোত চেষ্টা করা যেন কোনোভাবেই তাতে শিরকের মিশ্রণ না ঘটে যায়, আর কোনো প্রকারেই তা সুন্নাহ থেকে বিচ্যুত না হয়।

শিরকের এক প্রকার শিরকে আসগর বা ছোট শিরক। ‘রিয়া’বা লোক দেখানো ধর্ম-কর্ম এই শিরক-পরিবারেরই সদস্য। হজ্বের মতো ইবাদতে রিয়ার মিশ্রণ ঘটে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকে। কাজেই হজ্বের আগে নিয়ত খালিস করে নেওয়া কর্তব্য।

আর হজ্বের সকল কাজ যেন সুন্নাহ মোতাবেক হয় এজন্য প্রয়োজন ইলমের। আর তা হাসিল হয় আলিমগণের সান্নিধ্যে। এজন্য হজ্বের আগে ও হজ্বের সফরে হক্কানী আলিমের সান্নিধ্য গ্রহণ এবং হজ্বের আদব ও মাসায়িলের নিয়মিত চর্চা অতি প্রয়োজন।
হজ্বের মূল্যবান সময় অপ্রয়োজনীয় কাজে ব্যয় না করে ইবাদত-বন্দেগী ও দ্বীনী ইলম অর্জনে মশগুল থাকা কর্তব্য। এভাবে আমাদের হজ্ব, যা এক মহান ইবাদত ও ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ রোকন, সুসম্পন্ন হওয়ার আশা করা যায়।
পরম করুণাময় আল্লাহ আমাদের তাওফীক দান করুন। আমীন।

হজের প্রস্তুতি ও গুরুত্বপূর্ণ ৭টি দিকনির্দেশনা

মক্কা কাবা বাইতুল্লাহ হজ ওমরা

মহিউদ্দীন ফারুকী
গবেষক আলেম

আগামী দু’এক সপ্তাহের মধ্যেই শুরু হচ্ছে হাজিদের হজ যাত্রা। তাই যারা হজে যাওয়ার নিয়ত করেছেন তাদের সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে এখন থেকেই। হজ যেহেতু একটি ঈমানী সফর, একটি নূরানী সফর, তাই এর প্রস্তুতির ধরণও ভিন্ন।

শারীরিক প্রস্তুতির সাথে নিতে হবে আত্মিক ও জ্ঞানের প্রস্তুতি। আপনার হজ যেন সঠিক ও সুন্দর হয়, সহীহ ও বিশুদ্ধ হয় সে দিকে নজর দিতে হবে এখন থেকেই। কিভাবে আপনি প্রস্তুতি গ্রহণ করবেন সে বিষয়ে কিছু দিকনির্দেশনা প্রদান করা হলো।

এক. নিয়তকে পরিশুদ্ধ করুন। সমস্ত আমলই নিয়তের উপর নির্ভর করে। তাই যেকোন আমলের জন্য বিশুদ্ধ নিয়ত একান্ত প্রয়োজন। তবে হজের ক্ষেত্রে সে বিষয়টি আরো গুরুত্ব বহন করে।

সে জন্য রাসূল স. হজের সময় বার বার বলতেন “আল্লহুম্মা হাজিহি হাজ্জাতান লা রিয়াআন ওয়ালা সুমআহ” “হে আল্লাহ এই হজ কে এমন হজ হিসেবে কবুল কর যেখানে লৌকিকতা প্রদর্শন ও খ্যাতির ইচ্ছা নেই।” তাই এখন থেকেই আপনি আপনার নিয়তকে পরিশুদ্ধ করুন।

লোক দেখানো বা শোনানোর ইচ্ছে থাকলে, প্রদর্শন বা খ্যাতির নিয়ত থাকলে তা মন থেকে এখনই ঝেড়ে ফেলুন। হজ সহ সকল ইবাদত একমাত্র আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য করুন। এছাড়া আল্লাহ তায়ালা কারো ইবাদত কবুল করবেন না।

আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘কাজেই আল্লাহর ইবাদত করুন তাঁর আনুগত্যে একনিষ্ঠ হয়ে।’ (সূরা যুমার : ২)।

হাদিছে কুদছিতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যে আমলের ক্ষেত্রে আমার সাথে অন্যকে অংশীদার সাব্যস্ত করে। আমি তাকে এবং তার অংশীদারকে ত্যাগ করি।’

দুই. প্রয়োজনীয় জ্ঞান অর্জন করুন। হজের হুকুম আহকাম, হজের প্রকার এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অধ্যয়ন শুরু করুন। আপনার হজ যেন কোরআন সুন্নাহ অনুযায়ী হয় সে লক্ষ্যে বিজ্ঞ আলেম ওলামার কাছে প্রশ্ন করে বিষয়গুলো ভাল করে আত্মস্থ করুন। কোরআন সুন্নাহ অনুযায়ী আপনার হজ না হলে সে হজ কবুল হওয়ার প্রত্যাশাও করা যায় না।

আমাদের দেশ থেকে এমন অনেক ব্যক্তি হজে আসেন যিনি কোন হজ করতে এসেছেন তা বলতে পারেন না। কোথায় কি করতে হবে তিনি জানেন না। মুআল্লিম নির্ভর হাজির সংখ্যা খুঁজে পাওয়া যায় অনেক। কিন্তু সত্যি কথা হচ্ছে আপনি মুআল্লিম নির্ভর হয়ে আসছেন ঠিক, কিন্তু সময় ও প্রয়োজনীয় স্থানে আপনি মুআল্লিমকে নাও পেতে পারেন।

অথবা লক্ষ লক্ষ মানুষের ভিড়ে তাকে হারিয়ে ফেলতে পারেন। আর জেনে রাখা ভাল যে হজ হচ্ছে সময় ও স্থান নির্ভর একটি ইবাদত। সময় চলে গেলে অথবা সঠিক স্থানে না পৌঁছালে আপনার হজ হবেনা। তাই আপনি বই পড়ে ও আলেমদের নিকট থেকে এখনই এবিষয়ে সকল মাসআলা ও হুকুম আহকাম জেনে নিন।

তিন. নির্দিষ্ট দোআ ও জিকির মুখস্থ করুন। হজের চার ভাগের তিন ভাগই নির্দিষ্ট দোআ। তাওয়াফে, সায়ীতে, আরাফায়। তাই কখন কোন দোআ কিভাবে পড়তে হবে তা আপনি এখনই জেনে নিন। সময় নিয়ে তা মুখস্থ করুন। এমন যেন না হয় যে হজ করিয়ে দেয়ার সাথে সাথে দোআও আরেকজনকে পড়িয়ে দিতে হয়। এটি দ্বীনের ক্ষেত্রে অসচেতনতা ও অবহেলা ছাড়া কিছু নয়। আর এধরনের অবহেলা করে আপনি কিভাবে হজ কবুল হওয়ার প্রত্যাশা করেন?

চার. ঋণ পরিশোধ ও ওসিয়্যত লিখুন। হজে সফরে বের হওয়ার পূর্বে আপনার কোন ঋণ থেকে থাকলে তা পরিশোধ করতে চেষ্টা করুন। কারো কোন অধিকার থাকলে তার পূরণ করুন। আল্লাহর অধিকার হলে তার নীরবে পরিশোধ করুন। মানুষের হলেও তা পরিশোধ করুন, অন্যথায় তাদের নিকট অনুমতি নিয়ে আসুন। হজের সফর যেহেতু দীর্ঘ তাই ওলামায়ে কেরাম ওসিয়্যত লিখে যেতেও পরামর্শ দিয়ে থাকেন। অতএব আপনি পরিবারের সদস্যদের নিকট প্রয়োজনীয় ওসিয়্যত লিখে রাখুন। এক্ষেত্রে পরিবারের সকলকে ঈমান, ইখলাস ও তাকওয়ার ওসিয়্যত করুন। দ্বীনের সাথে লেগে থাকার নির্দেশ দিয়ে আসুন।

পাঁচ. ডাক্তারের পরামর্শ নিন। হজের সফরে যেহেতু থাকতে হবে দীর্ঘদিন, তাই আপনার নিজস্ব ডাক্তারের নিকট থেকে কিছু পরামর্শ নিন। কিভাবে চললে, কি খেলে আপনার শরীর সুস্থ থাকবে সে বিষয়ে ধারণা নিন। অখাদ্য ও ক্ষতিকর কোন খাবার গ্রহণ থেকে এখনই বিরত থাকুন। মন্দ অভ্যাস থেকে থাকলে তা এখনই পরিহার করুন। নির্দিষ্ট কোন সমস্যার ঔষধ ছাড়াও হরহামেশা লাগতে পারে এমন কিছু ঔষধ সাথে নিয়ে নিন।

ছয়. আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করুন। হজের সফর শুরু করা থেকে শেষ পর্যন্ত যেন সুস্থ ও সুন্দরভাবে হজ সম্পাদন করতে পারেন সেজন্য আল্লাহর নিকট প্রার্থনা ও দোআ করুন। তিনিই একমাত্র সাহায্যকারী। সব কিছু তিনিই সহজ করে দিতে পারেন। সাথে সাথে হজ কবুল ও শিরক মুক্ত হওয়ার দোআও করতে থাকুন। আপনার হজ যেন হজ্বে মাবরুর হয় সেই প্রার্থনা করুন।

সাত. প্রতিজ্ঞা করুন। হজ মানুষকে পুত পবিত্র করে দেয়। গোনাহ মুক্ত এক নতুন জীবন দান করে। পাপাচার, মন্দ কাজ মুক্ত হজ মানুষকে নব্য ভূমিষ্ঠ সন্তানের মত গোনাহ মুক্ত করে দেয়। তার আমলনামা হয়ে যায় কালিমা মুক্ত। তাই সকল মন্দাভ্যাস, গোনাহের কাজ ও মন্দ কাজ ছেড়ে দিয়ে জীবনের নতুন অধ্যায় এখন থেকেই সাজাতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হোন। ভবিষ্যৎ যেন হয় আলো ঝলমলে সুন্দর সে দোআ করতে থাকুন।

লেখক: পরিচালক, মারকাজুল লুগাতিল আরাবিয়া বাংলাদেশ

ডিজিটাল গেম রোগ : ভয়াবহ ক্ষতি ও নতুন প্রজন্মের ভবিষ্যৎ

মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম

মাঠে গিয়ে ধুলো কাদা মেখে, ঘেমে নেয়ে, রোজ বিকেলে খেলা শেষে বাড়ি ফেরা- এ দৃশ্য আজকাল যেন হারিয়ে যাচ্ছে। পাড়ায় পাড়ায় খেলার জায়গার অভাব, পড়ার চাপ, যেমন তেমন ছেলে-পিলেদের সাথে মিশে খারাপ হবার ভয়- কত না অভিযোগ অভিভাবকদের! তার পরিবর্তে আমাদের অভিভাবকরা বিনোদনের নামে যা তুলে দিচ্ছেন ছেলে-মেয়েদের হাতে, তার ক্ষতির পরিমাণটা তাদের ধারণারও বাইরে।

পশ্চিমা বিশ্বের মতো আমাদের অনেক পরিবারে বাবা-মা দুজনই কর্মব্যস্ত। উভয়েই ছুটছেন ‘ক্যারিয়ার ও সফলতা’ নামক সোনার হরিণের পিছনে। এদিকে সন্তান বড় হচ্ছে কাজের বুয়ার কাছে। অনেক অপরিণামদর্শী মায়েরাই শিশুকে খাবার খাওয়াতে, তার কান্না থামাতে- টিভি, কম্পিউটার ও ভিডিও গেমসের অভ্যাস করাচ্ছেন।

অন্যদিকে শহরের ইট, পাথর আর কংক্রিটের আড়ালে আটকা পড়ছে শিশুদের বর্ণিল শৈশব। গ্রামের শিশুরা খেলাধুলার কিছুটা সুযোগ পেলেও শহরের শিশুদের সে সুযোগ কম। বড়দের মতো শিশুদের মধ্যেও ভর করছে শহুরে যান্ত্রিকতা। ফলে তারা খেলাধুলার আনন্দ খুঁজে ফিরছে মাউসের বাটন টিপে, কম্পিউটারের পর্দায় গেমস খেলে। অনেক সময় তাদের এ আকর্ষণটা চলে যাচ্ছে আসক্তির পর্যায়ে। ধীরে ধীরে তারা নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে কম্পিউটার-মোবাইল-ট্যাব গেমসের উপর। এজন্য প্রথমেই বলা যায়, ভিডিও গেমস আমাদের শিশু-কিশোরদের প্রকৃত শৈশব-কৈশোর কেড়ে নিচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত হল, অল্পবয়সী অর্থাৎ ১৬ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের মধ্যেই ইন্টারনেটে ডুবে থাকার প্রবণতা লক্ষ করা যায়। যুক্তরাজ্যে এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ১৩-১৭ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে অর্ধেকের বেশি শিশু সপ্তাহে ৩০ ঘণ্টার চেয়ে বেশি সময় ব্যয় করে ভিডিও গেমস, কম্পিউটার, ই-রিডার্স, মোবাইল ফোন ও অন্যান্য স্ক্রিনভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহারের পিছনে।

বাংলাদেশের শিশু কিশোরদের মধ্যেও প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে। ২০১৫ সালের এপ্রিলে একটি গবেষণা সংস্থার প্রতিবেদনে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম ফেসবুক ব্যবহারকারী হিসেবে ঢাকা শহরের নাম উঠে এসেছে। বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, আট বছরের শিশুরাও ব্যবহার করছে ফেসবুক।

মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট ভিত্তিক বিনোদনের ভয়াবহ পরিণতির চিত্র পাওয়া গেছে ‘মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন’-এর এক জরিপে। এতে দেখা যায়, ঢাকায় স্কুলগামী শিশুদের প্রায় ৭৭ ভাগ পর্নোগ্রাফি দেখে। প্রতিষ্ঠানের কর্মসূচি সমন্বয়ক আবদুল্লাহ আলমামুন বলেন, ৮ম শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত ঢাকার ৫০০ (পাঁচ শ) স্কুলগামী শিক্ষার্থীর ওপর জরিপ চালিয়ে দেখা গেছে, ছেলে শিশুরা সবসময় যৌন মনোভাবসম্পন্ন থাকে, যা শিশুর মানসিক বিকৃতির পাশাপাশি বাড়িয়ে দিচ্ছে মারাত্মক যৌন সহিংসতার ঝুঁকি। শিশু কিশোরদের এ অবস্থা এখন বিশ্বব্যাপী মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। [সূত্র : দৈনিক সংগ্রাম (অনলাইন) ২৩-৩-২০১৭ ঈ.]

উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী ভিডিও গেমসের আবিষ্কার হয় ১৯৪০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রে। তারপর সত্তর-আশির দশকের মধ্যে এটি জনপ্রিয়তায় পোঁছে। সর্বপ্রথম বাণিজ্যিকভাবে নির্মিত আর্কেড টাইপের ভিডিও গেম-এর নাম ছিল কম্পিউটার স্পেস। এরপর আটারি কোম্পানি বাজারে আনে বিখ্যাত গেম পং। তারপর ধীরে ধীরে আটারি, কোলেকো, নিনটেনডো, সেগা ও সনির মতো ব্যবসায়ী কোম্পানিগুলো নানা উদ্ভাবন ও প্রচারণা চালিয়ে কয়েক দশকের মধ্যে পৃথিবীর আনাচে-কানাচে মানুষের ঘরে পোঁছে দেয় পুঁজিবাদী সভ্যতার এ বিনোদনপণ্য।

২০০০ সনে সনি কোম্পানি জরিপ করে দেখেছিল যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি চারটি বাড়ির একটিতে একটি করে সনি প্লে স্টেশন আছে। ২০০৯ সালের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, শতকরা ৬৮ ভাগ আমেরিকানের বাড়ির সব সদস্যই ভিডিও গেম খেলে।

তারপর সময় বদলেছে। কম্পিউটার এবং ভিডিও গেমস ক্রমান্বয়ে হয়ে উঠেছে বিশ্বের অন্যতম লাভজনক ও দ্রুত বর্ধনশীল শিল্প ইন্ড্রাস্ট্রি। বিশ্বজুড়ে আজ মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়েছে ভিডিও গেম এবং গেমাররা। সাম্প্রতিক এক সমীক্ষা অনুযায়ী সারা পৃথিবীতে প্রায় ২২০ কোটি মানুষ নিয়মিত বা অনিয়মিতভাবে ভিডিও গেম খেলে থাকে। যাদের অধিকাংশই হচ্ছে অল্প বয়সী শিশু-কিশোর ও তরুণ-তরুণী। এদের বদৌলতে গ্লোবাল ভিডিও গেম বাজারের আর্থিক মূল্য দাঁড়িয়েছে ১০৮.৯০ মিলিয়ন ডলার! এর মধ্যে ‘মোবাইল গেমিং’ই হচ্ছে সবচে বেশি পয়সা আয় করা সেক্টর। স্মার্টফোন ও ট্যাবলেটে গেমিং প্রতি বছর ১৯শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। (সূত্র : উইকিপিডিয়া; মাসিক সি নিউজ- www.cnewsvoice.com; bengalinews..)

কী থাকে এসব ভিডিও গেমসে?
প্রশ্ন হচ্ছে, কী থাকে এসব ভিডিও গেমসে? কেন তাতে এত আসক্তি? খোঁজ করলে জানা যায়, জনপ্রিয় গেমগুলোর মধ্যে কিছু আছে ক্রিকেট ফুটবলের মতো। নানা রকম দল তৈরি করে এসব খেলা খেলতে হয়। খেলায় হারজিত হয়। এক ম্যাচ খেললে আরেক ম্যাচ খেলতে ইচ্ছে করে। এর কোনও শেষ নেই। ছেলে মেয়েদেরকে কম্পিউটারের সামনে থেকে টেনে তোলা যায় না। এতে চট করে এক ঘেয়েমিও আসে না। পড়াশুনা শিকেয় তুলে ছেলে মেয়েরা একটার পর একটা ক্রিকেট ও ফুটবল ম্যাচ খেলে যায়। অনলাইনভিত্তিক দাবা এবং তাসও এসবের অন্তর্ভুক্ত। এসব আবার সাধারণত খেলে অবসর বুড়ো খোকারা।

বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে জানা যায়-
এক ধরনের গেম আছে, তাতে প্রচণ্ড গতিসম্পন্ন গাড়ি নিয়ে রাস্তা, মাঠ-ঘাট পেরিয়ে ছুটে চলতে হয়। বিপজ্জনক ব্যাপার হল, এই ছুটে চলার পথে অন্য প্রতিযোগীকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয়া, গাড়ির নিচে মানুষ পিষে ফেলা, পথচারীর কাছ থেকে মোটর সাইকেল বা গাড়ি কেড়ে নিয়ে পালিয়ে যাওয়া, ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করে ফুটপাতে উঠে পড়া, রাস্তার স্থাপনা ও বাড়িঘর ভাঙচুর করা, পুলিশ ধাওয়া করলে পুলিশের সঙ্গে যুদ্ধ করে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকা- এসব নাকি গেমের সবচে আকর্ষণীয় বিষয়! এ অনৈতিক কাজগুলো করে যে যত পয়েন্ট অর্জন করতে পারে সেই বিজয়ী হয়!

আর এক ধরনের গেম আছে, যার পুরোটা জুড়েই থাকে হিংস্রতা, মারামারি, যুদ্ধ, দখল এবং রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। যত বেশি সহিংসতা তত বেশি পয়েন্ট! হিংসার উদ্দাম আনন্দ নিয়ে দুর্গম গিরিপর্বত, নদীনালা, জঙ্গল ও সমুদ্রের উপর দিয়ে শত্রু খুঁজে বেড়ানো। বাংকার খনন করে ওঁত পেতে থাকা। প্রতি মুহূর্তে শত্রুর আক্রমণের টেনশন। আরো দ্রুত চলতে হবে! যত আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে সম্ভব প্রতিপক্ষকে শেষ করতে হবে!

কোমলমতি শিশু কিশোররা নিজেরাও জানে না, কেন তারা এ মারণখেলা খেলছে! একের পর এক মানুষ খতম করছে। কখনো হাতুড়িপেটা করে মাথা থেতলে দিচ্ছে। মুহূর্তে রক্তে ভেসে যাচ্ছে মেঝে। কখনো গ্রেনেড ছুঁড়ে প্রতিপক্ষের পা জখম করছে। এরপর খোঁড়াতে খোঁড়াতে পলায়নপর মানুষটির উপর মারছে দ্বিতীয় গ্রেনেড। বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে তার হাত পা। তারপর রক্তমাখা দেহটা লুটিয়ে পড়ছে খেলোয়াড়ের পায়ের উপর!

চোখের সামনে ভাসছে জীবন্ত যুদ্ধক্ষেত্র। কানে আসছে অস্ত্র ও গোলাবারুদ ব্যবহারের বাস্তব আওয়াজ। এমনকি আহত শত্রুসেনার রক্তমুখের গর্গর শব্দটাও শুনতে পাচ্ছে আপনার সন্তান! এতে কিন্তু তার আনন্দ, উৎসাহ এবং উত্তেজনা কেবল বৃদ্ধিই পাচ্ছে। কোনো কোনো খেলায় রাস্তায় পড়ে থাকা লাশের পকেট এবং ব্যাগ থেকে মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করতে পারলে পাওয়া যাচ্ছে বাড়তি পয়েন্ট! এমনকি রাস্তায় ড্রাগ বিক্রেতার কাছ থেকে ড্রাগও কেনা যাচ্ছে!

এখানে একটুও বাড়িয়ে বলা হচ্ছে না। এই গেমগুলিই এখন সবচে জনপ্রিয়। এসব ধ্বংসাত্মক গেমসের মধ্যে এ যাবতকালের পৃথিবীর সবচে জনপ্রিয় গেমটির নাম ‘পাবজি’ (PUBG)। দক্ষিণ কোরিয়ার ভিডিও গেম নির্মাতা প্রতিষ্ঠান পিইউবিজি কর্পোরেশন ২০১৭-এর মার্চে এ অনলাইন মাল্টিপ্লেয়ার গেমটি বাজারে আনে।

এর নির্মাতা ব্লু হোয়েল কোম্পানি আর পরিচালক আইরিশ ওয়েব ডিজাইনার ব্রান্ডন গ্রিন। রিলিজের মাত্র তিন দিনের মাথায় ‘প্লেয়ার আননউনস ব্যাটেলগ্রাউন্ডস’ সংক্ষেপে ‘পাবজি’ নামক এ গেম প্রায় ১১ মিলিয়ন ডলার আয় করে। আপনি জানলে অবাক হবেন, পাবজি গেম নির্মাণকারী সংস্থা প্রতিদিন ৬,৮৯০০০ ডলার আয় করে থাকে গেমারদের থেকে। প্রথম ৬মাসেই তারা লাভ করেছে ৩৯০ মিলিয়ন ডলার।

রিপোর্ট অনুযায়ী সারা পৃথিবীতে এখন প্রতি মাসে প্রায় ২২৭ মিলিয়ন মানুষ এ গেম খেলে। আর প্রতিদিন খেলে প্রায় ৮৭ মিলিয়ন লোক। লাখো গরিবের দেশ বাংলাদেশেও প্রতিদিন এ গেম খেলছেন ১ কোটি ৪০ লাখ মানুষ! [সূত্র: ধষশন সবফরধ ১৯-১-১৯ঈ.; বাংলাদেশ প্রতিদিন (অনলাইন) ১৫-৩-২০১৯ঈ.; প্রবাস সংবাদ নিউজ পেইজ ২০-৩-১৯ঈ.)

অনলাইনভিত্তিক এই ভিডিও গেমটিতে একসাথে ১০০জন মানুষ একটি পরিত্যাক্ত দ্বীপে থাকে। খেলোয়াড়কে প্রথমে প্যারাসুটের মাধ্যমে সেখানে নামিয়ে দেয়া হয়। সেখানে একে অপরকে হত্যা করে টিকে থাকতে হয়। ভয়ংকর সব গোলাবারুদ ও আগ্নেয়াস্ত্র সংগ্রহ করে খতম করতে হয় একে একে সবাইকে। এক্ষেত্রে বিশ্বাসঘাতকতারও আশ্রয় নেয়া হয়। চলে হত্যার ষড়যন্ত্র-পরিকল্পনা। অনলাইনে বন্ধুরা পরস্পরে কথাবার্তা বলে এ হত্যাযজ্ঞের বিষয়ে শলা-পরামর্শ করে। কয় পয়েন্ট পাওয়া গেল, কতজন নিহত হল, বাকিদেরকে কীভাবে হত্যা করা যায়- এসবই এ ভয়ংকর গেমের বিষয়। হত্যাযজ্ঞ শেষে যে ব্যক্তি বা যে গ্রুপ বেঁচে থাকে, তারাই হয় বিজয়ী।

সব মিলিয়ে মোবাইল কিংবা কম্পিউটারের পর্দায় কিশোর-তরুণেরা ‘পাবজি’তে এতটাই মগ্ন থাকছে যে, বাস্তব পৃথিবী ভুলে তারা এক বিপজ্জনক নেশায় আক্রান্ত হয়ে পড়ছে। ভিডিও গেমসের এ নিধনযজ্ঞ অনেক বাস্তব অনুভব হচ্ছে তাদের কাছে।
‘গেমিং রোগ’!

সারাদেশে এখন এসএসসি পরীক্ষার বিরতি চলছে। দিনরাত এক করে মোবাইল-কম্পিউটারে মুখ গুঁজে এ সহিংস গেম খেলছে শিশু কিশোররা। পাবজি নিয়ে মাতামাতি এখন অধিকাংশ ছেলে মেয়ের। এ গেমের নেশা এতটাই চরম যে, কিছুদিন পূর্বে ভারতের মহারাষ্ট্রে পাবজি খেলায় মত্ত দুই তরুণকে চলন্ত ট্রেন এসে পিষে দিয়েছিল। স্থানীয় সূত্রের খবর, মৃত দুই যুবক নাগেশ গোরে (২৪) এবং স্বপ্নিল অন্নপূর্ণে (২২) রেললাইনের ধারে দাঁড়িয়েই পাবজি খেলছিল। চলন্ত ট্রেন আসার খেয়ালও হয়নি তাদের। যার ফলে হায়দারাবাদ-আজমের দূরপাল্লার ট্রেনটির নিচে মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারায় তারা। (দ্যা ওয়াল নিউজ পোর্টাল)

সম্প্রতি মধ্যপ্রদেশের এক যুবক নিজের বাড়িতে পাবজি খেলতে এতটাই ব্যস্ত ছিলেন যে, চোখ সরিয়ে দেখার সময়টুকু পাননি যে কী পান করছেন তিনি! পানির পরিবর্তে তিনি ভুল করে এ্যাসিড পান করে ফেলেন। সঙ্গে সঙ্গে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় এবং তার অন্ত্রে অপারেশন করতে হয়। (বাংলা লাইন ২৪ ডট কম ৭-৩-২০১৯ঈ. )

মন দিয়ে পাবজি খেলতে পারছেন না- এ অভিযোগ তুলে অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে ডিভোর্স দিয়েছিলেন এক ব্যক্তি। পাবজি খেলার জন্য দামি ফোন কিনে না দেয়ায় মুম্বাইয়ের এক কিশোরের আত্মঘাতী হওয়ার সংবাদও এসেছিল সামনে।

ভারতীয় গণমাধ্যম জিনিউজের খবরে বলা হয়, জম্মুর এক যুবক দশদিন পাবজি খেলে অস্বাভাবিক আচরণ করতে শুরু করে। তিনি নিজেই নিজেকে নানাভাবে আঘাত করতে থাকেন। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালের সূত্র জানিয়েছে, যুবকের অবস্থা স্থিতিশীল নয়। পাবজি গেমের প্রভাবে আংশিক মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছেন তিনি। চিকিৎসকরা তাকে কড়া পর্যবেক্ষণে রেখেছেন। তার জন্য একজন স্নায়ু বিশেষজ্ঞ নিয়োগ করা হয়েছে। হাসপাতাল সূত্রের খবর, এ নিয়ে কয়েকদিনের মধ্যে পাবজি খেলে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ৬জন ভর্তি হয়েছেন। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, আরো অনেকে এ সমস্যায় ভুগছেন। কিন্তু তাদের পরিবার এর গুরুত্ব বুঝতে পারছে না। (বাংলা নিউজ অনলাইন পেইজ ১২-১-১৯ঈ.; খবর মেদিনীপুর)

বিশেষজ্ঞদের মতে এ গেম যারা খেলে, তারা চরম নেশায় আক্রান্ত হয়। হিংস্র মনোভাবাপন্ন একটা প্রবণতা পেয়ে বসে তাদের। মনোরোগ চিকিৎসকরা বলেন, মানুষের মধ্যে লুকিয়ে থাকা ধ্বংসাত্মক মনোভাবকে টেনে বের করে আনে এ গেম। খেলার ছলে প্রশ্রয় দেয় রক্ত, মৃত্যু, খুন এবং জয়।

সম্প্রতি গত ১৫ মার্চ নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের আননূর মসজিদে আধুনিক মারণাস্ত্র দিয়ে এক খ্রিস্টান সন্ত্রাসীর হত্যাযজ্ঞের ঘটনার পর আবারো আলোচনায় এসেছে পাবজি গেম। প্রায় তিন মিনিটের এ হামলায় শাহাদাত বরণ করেন অর্ধশত মুসল্লি। এ নির্মম হামলার ভিডিওটির সঙ্গে সহিংস পাবজি গেমের ভয়ানক সাদৃশ্য বেরিয়ে এসেছে।

ঐ মসজিদে হামলাকারী সন্ত্রাসী তার মাথায় লাগানো ক্যামেরা দিয়ে নৃশংস হত্যাকান্ড নিজেই সম্প্রচার করেছে। সেই ভিডিও ফুটেজ দেখলে পাবজি গেম বলে ভ্রম হবে। হত্যাকারী গাড়ি থেকে অস্ত্র বের করে গুলি ছুঁড়ছে। গুলি ফুরিয়ে গেলে ভরে নিচ্ছে ম্যাগাজিন। মসজিদের দরজা, বারান্দা পেরিয়ে মুসল্লিদের হত্যা করে এগিয়ে যাচ্ছে। শহরে হেঁটে হেঁটে, রাস্তায় গাড়িতে বসে গুলি ছুঁড়ে একের পর এক অস্ত্র পাল্টে মানুষ হত্যার এ বীভৎস ভিডিওকে কেবল পাবজি গেম বলে বিভ্রম হতে পারে।

এসবের প্রেক্ষিতে জোর দাবি উঠেছে এ ধ্বংসাত্মক গেমটি নিষিদ্ধ করার জন্য। ইতিপূর্বে ভারতের গুজরাটসহ কয়েকটি রাজ্যে পাবজি গেম নিষিদ্ধ করা হয়। চীন দক্ষিণ কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশে নেয়া হয় নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপ। কিন্তু দুঃখজনকভাবে বাংলাদেশের প্রশাসনের কেউ কেউ এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর কোন পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।

বিশ্বব্যাপী গেমসের প্রতি তীব্র নেশা যে পাবজি গেম থেকে শুরু হয়েছে তা নয়। ইতিপূর্বে ক্ল্যাশ অফ ক্ল্যান, মনস্টার হান্টার ওয়ার্ল্ড, ডটা টু, ভাইস সিটি এবং হাঙ্গারগেমসহ নাম না জানা অসংখ্য গেমে মানুষের ভীষণ আসক্তি ছিল।

‘কল্পনার জগতে গিয়ে গেমের প্রিয় চরিত্রের নায়কের সাক্ষাতলাভের জন্য ২৪তলা ভবনের ছাদ থেকে কিশোরের লাফিয়ে আত্মহত্যা করা; অতিরিক্ত গেম খেলায় বাবার বকুনি খেয়ে অভিমানী তাইওয়ানী কিশোরের নিজেকে আগুনে পুড়িয়ে দেয়া; একটানা ২৪ ঘণ্টার লাইভ ভিডিও গেম খেলতে খেলতে ২২ ঘণ্টার মাথায় যুবকের মৃত্যুবরণ; অন লাইন ভিডিও গেমের জন্য টাকা জোগাড় করতে ১৩ বছরের ভিয়েতনামী কিশোরের ৮১ বছরের বৃদ্ধাকে রাস্তায় শ্বাসরোধ করে হত্যা করে তার মানিব্যাগ চুরি এবং লাশ মাটিতে পুঁতে ফেলা; চায়না দম্পতির কম্পিউটার গেমের অর্থের জন্য নিজেদের তিন সন্তানকে ৯হাজার ডলারে বেচে দেয়া’- এরূপ হৃদয়বিদারক গেমাসক্তির ঘটনা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রচুর ঘটেছে।

এর বাইরে গেমসের কারণে বিশ্বব্যাপী বিবাহ বিচ্ছেদ, চাকুরী হারানো, মারমুখী ক্ষ্যাপাটে আচরণ, বাবা-মার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার, অল্পতেই ধৈর্যহারা হয়ে পড়া, ইন্টারনেট না থাকলে অথবা মোবাইল বা কম্পিউটারের চার্জ ফুরিয়ে গেলে অস্থির-আতংকগ্রস্ত হয়ে পড়ার ঘটনা তো অহরহই ঘটছে।

এসব দৃষ্টান্ত প্রমাণ করে দিয়েছে যে, নেশা মানেই শুধু মদ বা মাদক নয়। নেশা বা মাদকাসক্তি কেবল মদ-গাঁজা, আফিম-হেরোইন ও বিড়ি-সিগারেটের সেকেলে পরিসরে আবদ্ধ নেই। কালের পরিক্রমায় প্রযুক্তির কল্যাণে (?) এবং পুঁজিবাদী সভ্যতার বদান্যতায় (!) নেশার পতিত অঙ্গনেও লেগেছে ডিজিটালের ছোঁয়া! ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্মার্টফোন, ইন্টারনেট ও ধ্বংসাত্মক ভিডিও গেমসে বুঁদ হয়ে থাকার ফলে বিশ্বব্যাপী মানুষ এমন নেশায় আক্রান্ত হচ্ছে, যা থেকে নিস্তার পাওয়া কঠিন।

ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস ঘটিত এ আসক্তিকে মনোবিজ্ঞানীরা নাম দিয়েছেন ‘ডিজিটাল মাদক’! সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (World Health Organization) ভিডিও গেমসের প্রতি তীব্র আসক্তিকে বিশেষ এক ধরনের মানসিক অসুস্থতা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এ অসুখের নাম দেয়া হয়েছে ‘গেমিং ডিসঅর্ডার’ বা ‘গেমিং রোগ’। সংস্থার খসড়া একটি নথিতে ভিডিও গেমে আসক্তিকে একটি আচরণগত সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, এ আচরণে আসক্তির সব লক্ষণ রয়েছে অর্থাৎ, বারবার এ খেলার প্রবণতা দেখা দেয় এবং এ থেকে সরে আসা কঠিন বলেও দেখা যায়। এছাড়াও জীবনের অন্য সব কিছু ছাপিয়ে প্রাধান্য পায় এ গেমিং-এর নেশা। [সূত্র : বিবিসি বাংলা (অনলাইন) ৩-১-২০১৮ঈ.]

উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যেমন বৃটেন, জার্মানি এবং চীনে ভিডিও গেমের আসক্তি থেকে মুক্ত হবার জন্য আলাদা চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কেন্দ্র রয়েছে। সেখানে এধরনের আসক্তদেরকে মানসিক রোগীর মতোই চিকিৎসা দেয়া হয়। থেরাপিসহ বিভিন্ন চিকিৎসার মাধ্যমে তাদেরকে স্বাভাবিক সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা করা হয়। কিন্তু পরিস্থিতি এখন যে পর্যায়ে যাচ্ছে, তাতে আল্লাহ না করুন, সকল দেশেই এরূপ চিকিৎসাকেন্দ্র খুলতে হতে পারে। কারণ, এধরনের আসক্ত মানুষের সংখ্যা সব দেশেই বেড়ে চলেছে।

শারীরিক ক্ষতি

অনেক সরলমনা অভিভাবক হয়ত ভাবতে পারছেন না যে, এই তুচ্ছ বিনোদনটি এত মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। বস্তুত এ হচ্ছে পুঁজিবাদী সভ্যতার বিনোদন। যা শুধু টাকার বিনিময়ে কথিত আনন্দ দিয়েই ছাড়ে না। উপরি পাওনা স্বরূপ কেড়ে নেয় সময়, সম্পদ, মেধা, সুস্থতাসহ অনেক কিছু! এখানে তার সামান্য উল্লেখ করা হচ্ছে।

* আজকাল ছোটদের অনেকের চোখেই পাওয়ারি চশমা ঝুলতে দেখা যায়। চশমা ছাড়া শিশুরা চোখে ঝাপসা দেখে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এর কারণ হল ডিজিটাল মাদকাসক্তি। দিনরাতের একটা দীর্ঘ সময় স্মার্টফোন, ট্যাব ও কম্পিউটারের স্ক্রীনে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ক্ষীণ দৃষ্টিতে আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা। চিকিৎসকদের ভাষায় এ রোগের নাম ‘মায়োপিয়া’। ২-৩ বছরের শিশুরাও এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।
জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের কনসালট্যান্ট ডা. খায়ের আহমেদ চৌধুরী দৈনিক ইত্তেফাককে বলেন, এ প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন গড়ে আমরা ২৫০ জন রোগী দেখি। এর মধ্যে ক্ষীণ দৃষ্টি বা মায়োপিয়ার আক্রান্ত শিশু আসে গড়ে ৫০জন। (দৈনিক নেত্রকোণা নিউজ ডেস্ক ২৬-১- ২০১৯ঈ.)

ঢাকার ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতালের শিশু বিভাগের তথ্য অনুযায়ী ৮-১৪ বছরের শিশুদের চোখের সমস্যা বাড়ছে। ডাক্তারের পরীক্ষা, রোগী ও অভিভাবকদের কথায় জানা গেছে, মোবাইল-কম্পিউটারে অতিরিক্ত গেমস খেলা এবং টিভি দেখার কারণে শিশুর চোখের সমস্যার সৃষ্টি হয়। বেশ কয়েকজন অভিভাবক ও শিশুদের দেয়া তথ্য থেকে জানা গেছে, তারা গড়ে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা ডিজিটাল ডিভাইসের পেছনে ব্যয় করে, যার বড় অংশই একাডেমিক বা ব্যবসায়িক প্রয়োজনের বাইরে। [দৈনিক সংগ্রাম (অনলাইন) ২৩-৩-১৭ঈ.]

বাংলাদেশ আই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, প্রতিদিন চিকিৎসা নিতে আসা শিশুদের মধ্যে ৮০ শতাংশ শিশু মায়োপিয়া সমস্যায় ভুগছে। তাদের এখনই রোধ করা না গেলে ৫ বছরের নিচে শিশুদের দূরদৃষ্টিজনিত সমস্যা বেড়ে যাবে এবং তা ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে উন্নীত হবে। যা গোটা জাতির জন্য এক ভয়াবহ বার্তা বহন করছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞজনেরা। [দৈনিক ইত্তেফাক (অনলাইন) ২৯-৫-১৭ঈ.]

ভিডিও গেমসের কারণে দৃষ্টিশক্তির দুর্বলতা এখন একটি আন্তর্জাতিক সমস্যা। বর্তমান বিশ্বে ভিডিও গেমসের সবচে বড় বাজার হচ্ছে চীন। গেম উদ্ভাবন এবং বাজারজাতকরণেও প্রথম সারিতে দেশটি। কিন্তু ভয়াবহ ব্যাপার হচ্ছে, ১০০ কোটি মানুষের দেশ চীনের অর্ধেক মানে ৫০ কোটির ব বেশি মানুষ ভুগছে চোখের সমস্যায়! যেকারণে দোটানায় পড়ে গেছে চায়না সরকার। একদিকে গেমিং ব্যবসা অন্যদিকে মানুষের চোখ! এজন্য তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছে, বয়সের ভিত্তিতে কে কতক্ষণ ভিডিও গেম খেলতে পারবে তা নিয়ন্ত্রণ করা হবে। অন্যদিকে আবার সরকারি এ নতুন সিদ্ধান্তের ফলে চায়না পুঁজিবাজারে নিবন্ধিত গেমস কোম্পানির দর কমে গেছে। চীনের মোবাইল ভিডিও গেমস বাজারের ৪২ শতাংশের বেশি অংশের মালিক ‘টেনসেন্ট’ কোম্পানিকে এ কারণে কয়েকশ’ কোটি ডলারের ক্ষতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। (নয়া দিগন্ত অনলাইন ২-৯-২০১৮ঈ.)

* যেসব কিশোর-কিশোরী স্মার্টফোন বা ইন্টারনেটে বেশি সময় কাটায়, তাদের মস্তিষ্কে রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটে। ফলে তাদের মধ্যে হতাশা ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়। দক্ষিণ কোরিয়ার রেডিওলজি’র অধ্যাপক ইয়ুং সুক-এর নেতৃত্বে একটি গবেষক দল কিশোর কিশোরীদের মস্তিষ্ক পরীক্ষা করে এর প্রমাণ পেয়েছেন। (সূত্র ডি ডাব্লিউ ডট কম)

সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৪৫০০ জনের মস্তিষ্ক স্ক্যান করে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে যে, যেসব শিশু দিনে সাত ঘণ্টারও বেশি সময় স্মার্টফোন, ট্যাবলেট ও ভিডিও গেমস খেলে, তাদের মস্তিষ্কের শ্বেত পদার্থের বহিরাবরণ পাতলা হয়ে যায়। (women news24.com ১৩-১২-১৮ঈ.)
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরোসার্জারি বিভাগের অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া বলেন, বিরতীহীনভাবে প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে শিশুদের চোখ ও মস্তিষ্কের মধ্যে চাপ পড়ে। ধীরে ধীরে দৃষ্টিশক্তি কমে যায়। মস্তিষ্ক সঠিকভাবে কাজ করে না। তারা হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। (Hawkerbd.com)

* রাতে ঘুমানোর সময় একটা ডিভাইস হাতে নিয়ে শুতে গিয়ে অনেকেই নির্দিষ্ট সময়ের অনেক পরে ঘুমায়। এ অভ্যাস আস্তে আস্তে ঘুম না আসার কারণে পরিণত হচ্ছে। এখন তো রাতের ঢাকার চিত্রই বদলে গেছে। অসংখ্য পরিবারে গভীর রাত অবধি জেগে থেকে সকাল দশটা এগারটা পর্যন্ত ঘুমিয়ে থাকাটা মামুলি ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটা কোন মুসলিম জনপদের চিত্র হওয়া তো দূরে থাক, কোন স্বাস্থ্য সচেতন নগরীরও চিত্র হতে পারে না। দেখা যাচ্ছে, এ আসক্তির কারণে ছেলে মেয়েরা ঠিকমতো ঘুম, খাওয়া-দাওয়া করতে চাইছে না।

* শারীরিক পরিশ্রম ছাড়া দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার ফলে বড়দের মতো মুটিয়ে যাচ্ছে শিশুরাও। অল্প বয়সে তারা হাঁটু ও কোমর ব্যথায় আক্রান্ত হচ্ছে। শারীরিক অনুশীলন ও খেলাধুলার মাধ্যমে সুস্থ ও স্বাভাবিক শরীর গঠন বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে তাদের। জরিপে দেখা যায়, ভীষণ মোটা বা স্থ’ূলকায় শিশুদের মধ্যে প্রায় ৩০% শিশুর আয়ু কম হয়। ডায়াবেটিস, স্ট্রোক ও হৃদরোগেও আক্রান্ত হতে পারে তারা। এছাড়া মাথাব্যথাসহ আরো কিছু রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটতে পারে। (champs21.com ২৬-৪-২০১৫ঈ.)

* প্রাপ্ত বয়স্কদের ক্ষেত্রে সড়ক দুর্ঘটনার একটি বড় কারণ হল মোবাইল ব্যবহার। গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ থাকলেও অনেকে তা দিব্যি করে চলেছেন। দেখা যাচ্ছে, গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন যারা বেশি ব্যবহার করছে, তাদের ছয় ভাগ বেশি দুর্ঘটনা হচ্ছে। (এন টিভি অনলাইন ২৭-৮-১৭ঈ.)

* এছাড়াও চিকিৎসকদের মতে, মোবাইল ফোন পকেটে রাখলে ভ্রুণের কোয়ালিটি কমে যাওয়া, বুক পকেটে রাখলে হার্টের সমস্যা দেখা দেয়া, আঙ্গুলে ও ঘাড়ে ব্যথা, কানে কম শোনা এবং ডিসপ্লে থেকে জিবাণু ব্যাকটরিয়ার সংক্রমণসহ অসংখ্য শারীরিক ঝুঁকির আশংকা রয়েছে।

মানসিক ও আচরণগত সমস্যা

* এ প্রজন্মের শিশু কিশোররা আগের মতো বাইরে খেলাধুলা করে না। গল্পের বই পড়ে না। এমনকি কারো সঙ্গে মন খুলে কথাবার্তাও তেমন বলে না। এ দৃশ্য ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। সারাদিন দরজা বন্ধ করে কম্পিউটার ও স্মার্টফোন নিয়ে পড়ে থাকে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেই নিজের একটা জগত তৈরি করে নেয়। ফলে মা বাবা আত্মীয়-স্বজন থেকে তাদের দূরত্ব সৃষ্টি হচ্ছে এবং ভীষণ একাকীত্বের শিকার হয়ে পড়ছে তারা। দেখা যায়, সবার মাঝে থেকেও সে একা। তার সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না সবই হয়ে যাচ্ছে যন্ত্রকেন্দ্রিক।

* এ ধরনের ছেলে মেয়েরা বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ডিজিটাল এক কল্পজগতে বাস করতে শুরু করে। বদলে যায় তাদের মানসিক গঠন। তাদের চিন্তা ভাবনার মধ্যেও যান্ত্রিকতার একটা ছাপ দেখা যায়। কম্পিউটার আর ইন্টারনেটের মাঝেই তারা জীবনের সাফল্য-ব্যর্থতা ও সমস্যার সমাধান খুঁজে বেড়ায়। ফলে তাদের সঠিক মানসিক বিকাশ হয় না। শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, স্নেহ ও সহমর্মিতার অনুভূতিগুলো ধীরে ধীরে তাদের দুর্বল হতে থাকে। নিজেকে ছাড়া কারো প্রতি তাদের দায়িত্ববোধ জাগে না। নিজের অজান্তেই স্বার্থপরতা ও আত্মকেন্দ্রিকতায় আক্রান্ত হয় তারা।

* অনুকরণপ্রিয় স্বভাবের কারণে ছোটরা যা-ই দেখে, তা-ই অনুকরণ করতে পছন্দ করে। দেখা যায়, গেমের সুপারম্যান চরিত্র দেখে সে ছাদ থেকে লাফ দেয়ার চেষ্টা করে। কারো উপর রাগ হলে হাতকেই বন্দুক বানিয়ে গুলি করা শুরু করে। সারাদিন বিভিন্ন ধ্বংসাত্মক খেলা খেলতে খেলতে তাদের আচরণও ক্রমশ আক্রমণাত্মক ও মারমুখী হয়ে উঠে। দিনের একটা বড় সময় এসব খেলায় কাটানোর ফলে তাদের কাছে ঐ জগতটাই বাস্তব বলে মনে হয়। সাম্প্রতিককালে ব্লু হোয়েলসহ বিভিন্ন গেম খেলে বহু কম বয়সী শিশু কিশোরের মৃত্যু পর্যন্ত ঘটেছে। ভিডিও গেমসে বিদ্যমান রক্তাক্ত হামলা, সহিংসতা, চুরি, যৌনতা ও প্রতারণা শিশুদেরকে অন্যায় ও অপরাধকর্মে মারাত্মকভাবে উৎসাহিত করছে।

* ভিডিও গেমসের মধ্যে শিশুরা এতই সময় ব্যয় করছে যে, তাদের পড়াশুনা, খাওয়া-দাওয়া সবই শিকেয় উঠেছে। বর্তমানে দেশ-বিদেশের হাজার হাজার শিক্ষার্থীর পড়াশুনায় ধ্বস নেমেছে পাবজি খেলায় আসক্তির কারণে। শিক্ষক অভিভাবকরা এ নিয়ে এখন পেরেশান। সম্প্রতি ভারতের এক মন্ত্রী এ গেমকে ‘ঘরে ঘরে শয়তান’ হিসেবে আখ্যা দিলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমের দেশ বাংলাদেশে এ ব্যাপারে তেমন সচেতনতা দেখা যাচ্ছে না। খুব কম মানুষই বর্তমানে গেমিং রোগের বিষয়টি সম্পর্কে অবগত।

* ভিডিও গেমসের মধ্যে প্রতি মুহূর্তে রঙ-বেরঙের দৃশ্যপট পরিবর্তন, সারাক্ষণ অবিশ্বাস্য গতিতে ছোটাছুটি, জয়ের জন্য মরিয়া হয়ে থাকা- এসব শিশুদের মানসিকতায় মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। দেখা যাচ্ছে, কোন কিছুতেই তাদের স্থিরতা থাকছে না। সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে তারা তাড়াহুড়ো করছে। অযথা সন্দেহ-অবিশ্বাস তাদের মধ্যে জেঁকে বসছে। ইসলামের চিরন্তন আকীদা-বিশ্বাস তাদের নিকট সেকেলে ও আধুনিকতা বিরোধী মনে হচ্ছে। অল্পতেই তারা ধৈর্যহারা হয়ে পড়ছে। বাস্তব জীবনেও নিজের পরাজয়কে তারা মেনে নিতে পারছে না।

ইসলামী দৃষ্টিকোণ

ইসলামের এক দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে, যে কোনো অনর্থক কাজকে বর্জন করা। হাদীস শরীফে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
إِنَّ مِنْ حُسْنِ إِسْلَامِ الْمَرْءِ تَرْكُهُ مَا لَا يَعْنِيهِ.
ব্যক্তির ইসলামের সৌন্দর্য হচ্ছে, যা কিছু অনর্থক তা বর্জন করা। -সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস ২২৯; জামে তিরমিযী, হাদীস ২৩১৮

ভিডিও গেমসগুলো আক্ষরিক অর্থেই অর্থহীন কাজ। লক্ষ্য করলে দেখবেন, এগুলো আমাদের দুনিয়া-আখেরাতের কোন উপকারেই আসে না। বরং বাস্তবতা তো হচ্ছে, এগুলো অর্থহীন হয়েই শেষ নয়। দুনিয়া-আখেরাতে আমাদের অসংখ্য ক্ষতিও টেনে আনছে।
সর্বপ্রথম কথা হচ্ছে, এসব খেলা মানুষকে আল্লাহর ইবাদত থেকে গাফেল করছে। দেখা যায়, গেমের নেশায় জামাত ছেড়ে দিচ্ছে। নামাযও কাযা করছে অবলীলায়। জরুরি কাজ ছেড়ে পড়ে থাকছে এ নেশা নিয়ে। মা বাবার অবাধ্যতা, স্ত্রী সন্তানের প্রতি অবহেলা- এসব তো অহরহই ঘটছে।

এদেশে এমনও ঘটনা ঘটেছে যে, অসুস্থ মাকে হাসপাতালে ভর্তি করে ছেলে চলে গেছে কয়েক মাইল দূরে গেম খেলতে। তাহলে কীভাবে ইসলামে এ জিনিস বৈধ হতে পারে? পবিত্র কুরআনের একটি আয়াত এখানে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। লক্ষ্য করুন, আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَشْتَرِي لَهْوَ الْحَدِيثِ لِيُضِلَّ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ بِغَيْرِ عِلْمٍ وَيَتَّخِذَهَا هُزُوًا أُولَئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ مُهِينٌ.
কতক মানুষ এমন, যারা অজ্ঞতাবশত আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে বিচ্যুত করার জন্য এমন সব কথা খরিদ করে, যা আল্লাহ সম্পর্কে উদাসীন করে দেয় এবং তারা আল্লাহর পথ নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করে। তাদের জন্য আছে এমন শাস্তি, যা লাঞ্ছিত করে ছাড়বে। -সূরা লোকমান (৩১) : ৬

দ্বিতীয়ত, এ গেমগুলো চোখের ক্ষতি করছে। ব্রেনের ক্ষতি করছে। স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। অস্থির, অশান্ত ও নেশাগ্রস্ত করে তুলছে। মানুষকে পাগল ও পঙ্গুত্বের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিপুল পরিমাণে সময় ও কর্মশক্তির অপচয় করছে। কল্পনাতীত অর্থ-সম্পদ ধ্বংস করছে। মানুষকে নির্মমতা ও পাশবিকতা শেখাচ্ছে। সন্ত্রাস ও উগ্রবাদের পাঠ দিচ্ছে। অন্যকে মেরে নিজে জেতার হিংস্র মনোভাব শিক্ষা দিচ্ছে। ইসলাম কেমন করে এমন ধ্বংসাত্মক বিনোদন অনুমোদন করতে পারে?

প্রতিটি গেমসে গান-বাজনা বা মিউজিক্যাল সাউন্ড থাকে, যা সম্পূর্ণ হারাম। অসংখ্য ভিডিও গেমসে নগ্নতা ও অশ্লীলতার ব্যাপক ছড়াছড়ি থাকে, যার জঘন্যতা খুলে বলার প্রয়োজন নেই। কুরআনে কারীমে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
إِنَّ الَّذِينَ يُحِبُّونَ أَنْ تَشِيعَ الْفَاحِشَةُ فِي الَّذِينَ آمَنُوا لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ.
নিশ্চয় যারা মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রসার হোক- কামনা করে, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখেরাতে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। -সূরা নূর (২৪) : ২৯

দেখা যাচ্ছে, মুসলিম শিশুরা এসব গান-বাজনা ও বেহায়াপনা ভর্তি গেম খেলে শৈশব থেকেই এ কবীরা গুনাহগুলোকে হালকা মনে করছে। অনেকে তো এসবকে হারামই ভাবছে না; বরং এই ইসলামী বিধানসমূহের ব্যাপারে বিদ্রোহের মানসিকতা তৈরি হচ্ছে। বলাবাহুল্য, কারো ঈমান ধ্বংসের জন্য এ মনোভাবই যথেষ্ট।
অনেক গেমসে সরাসরি কুফুরি আকীদা শিক্ষা দেয়া হয়। শিশু কিশোরদের অন্তরে শিরকী প্রতীকের প্রতি সম্মান-শ্রদ্ধা এবং ইসলামী বেশভূষার প্রতি বিদ্বেষ ঢালা হয়। যেমন, গেম খেলতে খেলতে পথের মাঝে ক্রুশ চিহ্ন বা মূর্তি চলে আসে, আর তাতে ক্লিক করলে পাওয়া যায় লাইক এবং বাড়তি জীবনীশক্তি। বিভিন্ন গেমসে দেখা যায়, মূর্তি ভয় দেখাচ্ছে। আর গেমার ভয় ও সম্ভ্রমের সাথে দাঁড়িয়ে থাকছে। ভারত থেকে নির্মিত কোন কোন গেমের ভেতর মৃত্যুর পর মূর্তির স্পর্শে গেমার পুনর্জীবন লাভ করছে। এর মধ্য দিয়ে মুসলিম মানসে বিশেষত শিশুদের অন্তরে সঞ্চারিত হচ্ছে পুনর্জন্ম, মূর্তিপূজা এবং মূর্তির ক্ষমতা থাকার মতো শিরকি বিশ্বাস।

এভাবে গেমের মাধ্যমে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে কুফর-শিরকের প্রতি মুসলিম মানসে শ্রদ্ধাবোধ জাগিয়ে তাওহীদের ভিত্তিকে নড়বড়ে করে ফেলা হচ্ছে। ইহুদী-খ্রিস্টানদের এটাই লক্ষ্য। কুরআন মাজীদে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
وَلَنْ تَرْضَى عَنْكَ الْيَهُودُ وَلَا النَّصَارَى حَتَّى تَتَّبِعَ مِلَّتَهُمْ.
ইহুদী খ্রিস্টানরা তোমার প্রতি কিছুতেই খুশি হবে না, যতক্ষণ না তুমি তাদের ধর্মের অনুসরণ করবে। -সূরা বাকারা (২) : ১২০

কিছু কিছু গেমসে পরিকল্পিতভাবে প্রতিপক্ষের বেশভূষা রাখা হয় সম্পূর্ণ ইসলামী। দাড়ি, টুপি, আরবি রূমাল এবং জোব্বা পরিহিত মানুষদেরকে শত্রু বানিয়ে ইচ্ছামতো তাদেরকে মারার প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। কিছু ভিডিও গেমের দৃশ্যপট দেখলে চোখে ধাঁধা লেগে যায়। অবিকল সিরিয়া ফিলিস্তিনের মতো এলাকা। সেই যুদ্ধবিধ্বস্ত মুসলিম বসতবাড়ি! সেই পরিত্যক্ত মরুঅঞ্চল! রাস্তাঘাট ও দোকানপাটের নামগুলিও পর্যন্ত আরবিতে লেখা। সেখানে ঘুরে ঘুরে আপনার সন্তান শত্রু মারার খেলা খেলছে।

ইসরাইলে তো এ ধরনের প্রায়-বাস্তব অ্যাডভেঞ্চারের অভিজ্ঞতা দিতে একাধিক থিম পার্কই গড়ে তোলা হয়েছে। সেখানে টিকিট কেটে হত্যা করার ব্যবস্থা রয়েছে আরব অথবা ফিলিস্তিনি সন্ত্রাসী(!)। পর্যটকদের আনন্দ দিতে নাকি এ ব্যবস্থা। এসব পার্কে খুঁজে খুঁজে মুসলিম বেশভূষার ছবি বা ডামিকে মারা, বসতিতে জ্বালাও-পোড়াও করার খেলায় মেতে উঠে পর্যটকরা।

একজন কলামিস্টের ভাষায়-
(ইসরায়েলি বিনোদন : টিকিট কাটুন, ‘ফিলিস্তিনি’ মারুন! নামক নিবন্ধে তিনি লিখেছেন,) “…ওয়েস্টওয়ার্ল্ডের সঙ্গে ইসরায়েলি বিনোদনকেন্দ্রের মিলটা বাস্তবতায় নয়, গুণে নয়, কেবল লক্ষণে। রোবটের বদলে তারা ব্যবহার করে মানুষের ছবি বা ডামি; যাদের গায়ে পরানো থাকে ফিলিস্তিনি কেফায়াহ কিংবা আরবদের গলায় পরার স্কার্ফ-ইয়াসির আরাফাত যেমনটা পরতেন। ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেম আন্তর্জাতিক আইনে ইসরায়েলের দখলীকৃত এলাকা। ওই জমিতে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর সাবেক কমান্ডো ও অফিসাররা সন্ত্রাস দমনের টার্গেট হিসেবে যাদের নকল বা ছবি সাজিয়েছে, তারাই ওই জমির ঐতিহাসিক ও আইনসংগত মালিক। প্রশিক্ষণের পাশাপাশি পর্যটকদের জন্য একটা বিনোদন পার্কও চালানো হয়। সেখানে সাজানো পরিস্থিতিতে আপনি আরব অথবা ফিলিস্তিনি সন্ত্রাসী (!) ‘হত্যা’ করতে পারবেন। …আপনাকে এমন একটি রাস্তায় নিয়ে যাওয়া হবে, যেখানকার আরব অধিবাসীদের মধ্যে আপনি সন্ত্রাসী খুঁজবেন।
…শিশুরাও সব খেলায় অংশ নিতে পারলেও সত্যিকার বন্দুক তাদের দেওয়া হয় না।
ইসরায়েলজুড়ে এ রকম ছয়টি বিনোদনকেন্দ্র আছে, নতুন আরেকটি খোলা হচ্ছে আমেরিকায়।…
…ইসরায়েলের বিনোদন পার্কের খবর পড়ে আশ্বাস ভেঙে গিয়ে আতঙ্ক জেগেছে। মনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল, ভিডিও গেমের আদলে এই ধরনের প্রায়-বাস্তব অ্যাডভেঞ্চার কি মানুষের মধ্যে বিকৃত ভোগ ও খুনপিপাসা জাগায় না?…
…ইসরায়েলি বিনোদনকেন্দ্রে আরব ও ফিলিস্তিনিদের সন্ত্রাসী হিসেবে দেখা এবং তাদের হত্যায় মন মজানো কেউ যদি বন্দুক হাতে আরব পোশাক পরা মানুষ হত্যায় নেমে পড়ে, তার দায় কি এই ইসরায়েলিরা নেবে? মোদ্দাকথা, এটা কতটা বিনোদন পার্ক আর কতটা ঘৃণার কারখানা?
শিশুদের এমন বিনোদনে মাতানোই-বা কতটা সুস্থ কাজ? কিন্তু বর্ণবাদীদের কাছে এসবই স্বাভাবিক।” [দৈনিক প্রথম আলো (অনলাইন), ১৯ জুলাই, ২০১৭]

ক্যালিবার থ্রি নামের এ বিনোদনকেন্দ্র প্রতি বছর ২২ থেকে ২৫ হাজার পর্যটককে এরূপ বিকৃত বিনোদন সরবরাহ করে থাকে। এভাবে তারা টাকার বিনিময়ে মানুষের মধ্যে বিকৃত ভোগ, খুনপিপাসা ও কল্পনার শয়তানি সাধ মেটাবার আয়োজন করে জাগিয়ে তুলছে তার শয়তানি প্রবৃত্তিকে। তারপরও তারা নাকি সভ্য, প্রগতিশীল ও বিশ্বশান্তির অগ্রদূত!

ভাবুন তাহলে, কীসের প্রশিক্ষণ পাচ্ছে আপনার সন্তান! একদিকে বছরের পর বছর ইহুদী-খ্রিস্টান শক্তি সিরিয়া-ফিলিস্তিনে মুসলমানদের জীবন নিয়ে খেলছে। অন্যদিকে তারাই বিশ্বব্যাপী মুসলিম প্রজন্মকে খেলার ছলে তাদের মানসিকতায় গড়ে তুলছে। (তা-ও বিনা পয়সায় নয়, রীতিমতো মোটা অংকের টাকা নিয়ে।) আমাদের অভিভাবকরা সন্তানকে এসব ক্রুসেড খেলা খেলতেও দিচ্ছেন নিশ্চিন্তে। এ যেন ভাইয়ের হাতে ভাইয়ের খুনের মহড়া চলছে ঘরে ঘরে। চোখের সামনে ঘটলেও আমরা তা ধরতে পারছি না বা গুরুত্ব দিচ্ছি না।

আভিভাবকদের প্রতি

সবশেষে অভিভাবকদের প্রতি প্রশ্ন, আমরা তাহলে কোন প্রজন্ম গড়ে তুলছি? কোন চেতনায় বেড়ে ওঠছে আমাদের সন্তানেরা? কম্পিউটার, মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের কতটুকু ভালো, কতটুকু মন্দ, খেলাধুলা ও বিনোদনের জায়েয-নাজায়েযের সীমারেখা কী- সে আলোচনার আগে জিজ্ঞাসা হচ্ছে, সন্তানের ঈমান-আকীদা ধ্বংস করে, চোখ ও মস্তিষ্ক নষ্ট করে, শারীরিক ও মানসিক অসংখ্য রোগের পথ খুলে দিয়ে আমরা কোন্ বিনোদনের ব্যবস্থা করছি তাদের জন্য? শিশু কিশোরদের হাতে এসব যান্ত্রিক বিনোদন তুলে দিয়ে আমরা একটি অপরিনামদর্শী প্রজন্ম তৈরি করছি না তো?

যারা একথা বলে যে, ‘ভিডিও গেমস মানসিক চাপ কমায়। ইতিবাচক চিন্তা জন্মায়। একাগ্রতা, দ্রুততা ও সমস্যা সমাধানের যোগ্যতা তৈরি করে’- তাদের কাছে জানতে চাই, চুরি, ডাকাতি, প্রতারণা, অপচয়, নগ্নতা, হিংস্রতা, হত্যা ও রক্তারক্তি শিখিয়ে কোন্ ইতিবাচক চিন্তা জন্মানো আর কোন্ মানসিক চাপ কমানোর কথা বলছেন আপনারা? শিশুদের পড়াশুনার বারোটা বাজিয়ে, তাদেরকে অস্থির-অসহিষ্ণু বানিয়ে কোন্ একাগ্রতা ও দ্রুততার পাঠ দিতে চাইছেন?

যে মানুষগুলো আজকে গেম খেলতে খেলতে মানসিক রোগী হয়ে যাচ্ছে, বাবা -মার সঙ্গে রাগারাগি করছে, স্বার্থপর ও আত্মকেন্দ্রিক হয়ে একসময় আত্মঘাতী পর্যন্ত হয়ে উঠছে, তাদেরকে আর কোন্ সমস্যার সমাধান শেখাবেন গেম খেলিয়ে?

এ জীবন, সময়, সম্পদ এবং সন্তান কোনোটিরই আমরা মালিক নই। এর প্রত্যেকটিই আল্লাহপ্রদত্ত মূল্যবান আমানত, যার হেফাযত ও সদ্ব্যবহার না করা হলে আমাদেরকে একদিন আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। মুসলমানের জীবন তো কখনো এমন হবে না যে, তার সময়কে কাটানোর প্রশ্ন আসবে! জীবনের প্রতিটি মুহূর্তই মহামূল্যবান। আমাদের কি এতই উদ্বৃত্ত সময় থাকে যে তাকে কাজে লাগানোর খাত খুঁজে না পেয়ে আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা মোবাইল-কম্পিউটারে উড়িয়ে দিচ্ছি! দেশের পাঁচ কোটি ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সবাই কি জরুরি কাজে তা ব্যবহার করছে?
আমাদের অর্থ-সম্পদ কি এতই হয়ে গেছে যে, ১ কোটি ৪০ লাখ মানুষ প্রতিদিন পরিশ্রম করে পাবজি খেলে পশ্চিমাদের পকেট ভারি করছি! আজও এদেশে অসংখ্য মানুষ প্রতিদিন না খেয়ে থাকে। লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গা কক্সবাজারে ক্ষুধা, কষ্ট ও দারিদ্র্যের মাঝে মানবেতর জীবন যাপন করছে।
বিনোদনের নামে সম্পদের এত বিপুল অপচয়ের সময় কি আমাদের তাদের কথা একটুও মনে পড়ে না? আমরা আমাদের সময় ব্যয় করছি, সম্পদ ব্যয় করছি, ঘণ্টার পর ঘণ্টা খাটুনি করে পশ্চিমাদের আরো আরো অর্থের যোগান দিচ্ছি। বিনিময়ে কী পাচ্ছি? ক্ষণিকের সস্তা বিনোদন আর শরীর ও মনের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি!

আজ থেকে দশ পনের বছর পূর্বেও শিশুদের খেলাধুলা ছিল স্বাস্থ্যকর ও প্রকৃতিবান্ধব। সেখানে ধ্বংসাত্মক ও ঈমানবিরোধী বিনোদনের কোন অস্তিত্বই ছিল না বলতে গেলে। কিন্তু এখন বিনোদন মানেই শুধু পিস্তল, মারামারি, অশ্লীলতা ইত্যাদি! এসব খেলে আপনার সন্তান শুধুই যে মজা পাচ্ছে তা নয়, তার মগজও ধোলাই হচ্ছে পরিকল্পিতভাবে। ফলে এ প্রজন্ম বেড়ে ওঠছে হিংসা, বেহায়াপনা, নির্মমতা ও বস্তুবাদের ভয়ংকর মানসিকতা নিয়ে।

বর্তমানে যেসকল বুদ্ধিজীবী দাড়ি, টুপি, মাদরাসা ও ইসলামী পোষাকের ভেতর জঙ্গিবাদের গন্ধ খুঁজে বেড়ান, তারা কি কখনো ভেবে দেখেছেন যে, এখন ঘরে ঘরে কীসের প্রশিক্ষণ চলছে? যুদ্ধ, রক্তপাত, সহিংসতা ও ধ্বংসাত্মক ভিডিও গেম খেলে কোমলমতি শিশুরা কোন্ মানসিকতায় বেড়ে উঠছে? পুঁজিবাদী পশ্চিমের যান্ত্রিক উৎকর্ষের কল্যাণে কীসের মহড়া চলছে শিশু-কিশোরদের হৃদয় ও মনে? কেন এত যুদ্ধ? কেন এত রক্ত? কেন এত নির্মমতার পাঠদান ভিডিও গেমসে? কোন্ অতলে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের নতুন প্রজন্ম? একটু ভেবে দেখব কি!?!?!?

(অবিবাহিতদের উদ্দেশে) সঙ্গিনী পছন্দ করার গাইডলাইন ও আমার অভিজ্ঞতা

ফয়সাল আহমদ

বিবাহের ক্ষেত্রে ইস্তেখারার কোনও বিকল্প নেই। আপাতদৃষ্টিতে ধনসম্পদ, সৌন্দর্য, বংশ ইত্যাদির চাকচিক্য দৃশ্যমান হলেও দ্বীনদারিত্বের ব্যাপারটা সম্পূর্ণ-ই আলাদা। এক্ষেত্রে মহান রবের থেকে সাহায্য কামনার বিকল্প নেই।

এক্ষেত্রে শুধু ৫ ওয়াক্ত সালাত আদায় করে, কুরআন তেলাওয়াত নিয়মিত করে, এতটুকুতে-ই আশ্বস্ত হওয়াটা মারাত্মক বোকামি। কন্যার শিক্ষাঙ্গন ও বন্ধুসার্কেল সম্পর্কিত তথ্য নেওয়াটাও মার্ক করে রাখার মতো।

যাবতীয় খোঁজখবর নেওয়ার পাশাপাশি আল্লাহ’র কাছে প্রার্থনাও চালিয়ে যেতে হবে যথারীতি, সবিশেষ মেয়ের ব্যাকগ্রাউন্ডের চারিত্রিক সকল সাইড পরিচ্ছন্ন হলে কল্যাণ-অকল্যাণের ফায়সালার দায়িত্ব একমাত্র আল্লাহ’র উপরে-ই ন্যস্ত করতে হবে ও বেশি বেশি ইস্তেখারা করতে হবে।

আরও পড়ুন

শারীরিক কোনও খুঁত রয়েছে বা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধশালী নয়, এমন অগণিত চরিত্রবান নারী রয়েছে যারা স্বামীর সংসারে শান্তির সুবাতাস বইয়ে দিতে নিজেকে তিলেতিলে ক্ষয় করছে । অপরদিকে একজন দুশ্চরিত্রা নারীর সংসার দিনদিন পরিণত হয় কেবল জ্বলন্ত অঙ্গারে।

পৃথিবীর অনেক সফল ব্যক্তি এখানে এসে হোঁচট খায়, বহু পণ্ডিত পা পিছলে পড়ে, পরীক্ষার সম্মুখীন হয়ে ধৈর্যশীলদের তালিকায় নাম লেখিয়ে নিতান্তই বেচারা বনে যায়।

এবার আসি নিজের বিষয়ে:-

কর্মজীবনে পা দেওয়ার পরে কালক্ষেপণ না করেই আমার পরিবার আমার বিয়ের বিষয়ে ভাবনা শুরু করে দেয়। একে একে চলতে থাকে মেয়ে দেখার বিড়ম্বনা, এটা মিলে তো ওটা অমিল থাকে। অবশেষে পরিবারের সবাই একটি মেয়েকে দেখে পছন্দ করলেন।
বিবাহের ক্ষেত্রে আমার শর্ত ছিলো দ্বীনদারিত্ব, হোক সে মাদরাসার কিংবা স্কুল-কলেজপড়ুয়া।

আমার ফ্যামিলির পছন্দ করা মেয়ে ছিলো জেনারেল শিক্ষিতা, অর্থাৎ কলেজপড়ুয়া। তার বাবা একজন ইমাম। যতটুকু তারা বলেছে, সে অনুযায়ী মেয়ে পর্দা করে কিছুটা শিথিলতার সাথে, কুরআন তেলাওয়াত পারে ইত্যাদি….।

এমন আশা বুকে নিয়ে এগুচ্ছিলাম যে, ভালো ফ্যামিলির মেয়ে যেহেতু! তাকে পুরোপুরি দ্বীনের সাথে সেটআপ দেওয়াটা সহজ-ই হবে। উভয় পরিবার একে অপরের সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্যাদি সংগ্রহ করেছে, আমার পরিবারও তাদের বাড়িতে গিয়েছে, তারাও এসেছে, সব ঠিকঠাক। এবার কনফার্ম করার পালা।

আমরা দু’জনও একে অপরের সাথে মুঠোফোনে জীবনপথে চলার প্রয়োজনীয় শর্তাদি আরোপ করলাম, উভয়-উভয়ের সরলপথে চলার সহজ কল্যাণময় শর্তগুলো একবাক্যেই মেনে নিলাম এবং যেহেতু আমি অনেক দূরে ছিলাম, তাই তাকে (ওজরের হালতে) যেভাবে দেখা যায়, সেভাবে দেখেও নিলাম। আলহামদুলিল্লাহ! মোটকথা সবাই সবাইকে পছন্দ করেছে। কারো দৃষ্টিতে আর কোনও প্রতিবন্ধকতা-ই রইলো না।

সময়টা অক্টোবর এর শুরুর দিকে, আর আমার দেশে যাওয়ার সময় হলো ২৫-এ অক্টোবর। সময় খুবই স্বল্প। তাই যাবতীয় বিষয়াদি সমূলে আল্লাহ’র উপর ন্যস্ত করে দিলাম। নিশ্চয়ই তিনি উত্তম ফায়সালাকারী। মাঝেমাঝে ইস্তেখারা-সহ ছোটছোট কিছু ওজীফা নিয়মিত করতে থাকলাম।

ধীরেধীরে আমার অন্তরে চিঁর ধরতে শুরু করে, আমি বুঝতেই পারিনা, কেন যেন তার প্রতি আমার একটা অনাগ্রহ কাজ করছে, আবার মাঝেমাঝে এমন মনে হয় যে, মেয়ের বিষয়ে যা শুনেছি ভালোই শুনেছি, যা দেখেছি বাহ্যদৃষ্টিতে ভালোই দেখেছি। এটা অন্তরের কুমন্ত্রণা কি না, সেটাও বুঝতে পারছি না।

পুনরায় ইস্তেখারাসহ দোয়া করতে থাকি, আর দোয়াতে এমন বলতাম:- আল্লাহ! যদি এখানে কল্যাণ থাকে, তাহলে আমার অন্তরকে দৃঢ় করে দাও, আর অকল্যাণের যদি কোনও আভাস থাকে, তাহলে হে মাওলা! আমি ইঙ্গিত-ইশারা বুঝি না, তুমি এমন করে দিয়ো-যাতে আমার সামনে সবকিছু দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট হয়ে যায়।

দোয়া আল্লাহ কবুল করলেন। মেয়ের অন্তরে উদ্ভট কিছু দাবির উদ্ভাবন ঘটলো। সেগুলো আমার কাছে আস্তে আস্তে প্রকাশিত হওয়ার পর-ই আমি একটু নড়েচড়ে বসলাম। আমার মন কিছুতেই টানছিলো না, বুঝতে পারলাম যে এটাই রাব্বে-কারীমের ফায়সালা।
মাঝখানে অনে–ক কিছু হয়ে গেলো।

…….. অবশেষে দেশে যাওয়ার ১৭ দিন আগে সবাইকে অবাক করে দিয়ে বিয়েটা নাকচ করে দিলাম। মেনে নিতে কষ্ট হলেও আল্লাহ’র উপর ভরসা ছিলো যে, তিনি যা করেন বান্দার কল্যাণের জন্য-ই করেন।

আল্লাহ’র উপরে অগাধ বিশ্বাস তো রয়েছেই, তারপরও অন্তরকে আশ্বস্ত করাতে পারছি না। তবে হ্যাঁ- এটা জানতাম যে আজ না হোক কাল, আমার সামনে ফলাফল প্রকাশিত হবেই ইনশাআল্লাহ।

দুদিন আগে দুপরে খাবার খেতে বসবো, এমন সময় একটু ফেসবুকে নিউজ ফিডে গেলাম, হঠাৎ একটি আইডির ফ্রেন্ড সাজেশন চোখে পড়লো, একটু অনুসন্ধিৎসু চোখে দেখলাম, কেমন চেনা চেনা লাগছে! ক্লিক করতেই ইয়া মারহাবা..!

ইমাম সাহেবের সেই পর্দানশীন মেয়েটি কিভাবে মুখ খুলে প্রোফাইলে ছবি দিয়ে রেখেছে। (তার চেহারা দেখার ইচ্ছে না হলেও আল্লাহ আমাকে যেটা থেকে রক্ষা করেছেন সেটা দেখার উদ্দেশ্যে নিচের দিকে গেলাম) কী বীভৎসতা!

২০১৭ সালের শুরুর থেকেই তিনি নিয়মিত ফেসবুকের পর্দা কাঁপান। অথচ আমাকে সদ্যভূমিষ্ট একটা আইডি দিয়ে বলেছিলো যে, এটাই তার আইডি। কি মিথ্যাচার!!

তারপর যেটা শুনলে চোখ কপালে তোলার মতো, সেটা হলো ম্যাডামের ছবি ব্যবহার করে ফেইক আইডিও ব্যবহৃত হচ্ছে, আর তিনি সেই ফেইক আইডির স্ক্রিনশট তার ওয়ালে আপলোড করে চেঁচিয়ে বলছেন যে,- এটা ফেইক আইডি, এটা ফেইক আইডি।
একটা পিকে এক ভদ্রলোকের কমেন্ট ছিলো এমন-হুজুরের মেয়ের যদি শরীর দেখা যায়, তাহলে অন্য মেয়েরা কী করবে? ইন্নালিল্লাহ।

এগুলো তো সিম্পল ছিলো, এক ছেলে তো এক ফটোতে অকথ্য ভাষায় গালিও দিলো একটা, অন্য এক আশেকের কভার ফটোতে আবার দেখি মুহতারামার সাথে তার তোলা ছবিও বেশ সুভাস(!) ছড়াচ্ছে।

পরে বের হয়ে গেলাম আইডি থেকে আর মহান আল্লাহ’র দরবারে শুকরিয়ার আর ভাষা পেলাম না, তিনিই উত্তম ফায়সালাকারী, তিনিই বান্দাকে বিপদ থেকে উদ্ধারকারী।

এতক্ষণ যার বিষয়ে কথা বললাম, সে একটা কলেজপড়ুয়া মেয়ে। কলেজপড়ুয়া মেয়ে বিবাহ করার জন্য আমি নিরুৎসাহ প্রদান করছি না। কারণ মাদরাসাপড়ুয়া মেয়ে দেখার ক্ষেত্রেও তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছে। তবে হ্যাঁ, মাদরাসাপড়ুয়া মেয়েদের অন্য বিষয়াদির সার্টিফিকেট তো দিতে পারি না, কিন্তু তাদেরকে স্বাভাবিকভাবে পর্দানশীন হিসেবেই দেখা যায়।

আসলে যার যার দ্বীন-তাক্বওয়া তার মনের ভেতর। বহু স্কুল-কলেজপড়ুয়া মেয়ে আছে যারা পর্দা ও চরিত্রের ক্ষেত্রে অনেক মাদরাসাপড়ুয়া মেয়েকে ছাড়িয়ে যায়। আবার মাদরাসায় পড়ে এমন কতশত মেয়ে আছে, যারা চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে গুণান্বিত।

সর্বশেষে প্রথম অংশের কথাগুলো আবারো এড করে দিচ্ছি, বিবাহের ক্ষেত্রে ইস্তেখারার কোনও বিকল্প নেই। আপাতদৃষ্টিতে ধনসম্পদ, সৌন্দর্য, বংশ ইত্যাদির চাকচিক্য দৃশ্যমান হলেও দ্বীনদারিত্বের ব্যাপারটা সম্পূর্ণ-ই আলাদা। এক্ষেত্রে মহান রবের থেকে সাহায্য কামনার বিকল্প নেই। ওয়াল্লাহু আ’লাম।

বৃষ্টি আল্লাহ তায়ালার এক অমূল্য নেয়ামত

বৃষ্টি

মেহেদী হাসান সাকিফ

তাপদগ্ধ আকাশে হঠাৎ মেঘ আসে কোথা থেকে?
মেঘের জল কোথা থেকে বৃষ্টির ধারা নিয়ে আসে?

পবিত্র কুরআনে এই প্রশ্নের উত্তর স্বয়ং ই আল্লাহই দিয়েছেন-
আর তিনিই সে সত্তা; যিনি তাঁর রহমত বৃষ্টির আগে বায়ু প্রবাহিত করেন সুসংবাদ হিসেবে, অবশেষে যখন সেটা ভারী মেঘমালা বয়ে আনে, তখন আমরা সেটাকে মৃত জনপদের দিকে চালিয়ে দেই, অতঃপর আমরা তার দ্বারা বৃষ্টি বর্ষণ করি, তারপর তা দিয়ে সব রকমের ফল উৎপাদন করি। এভাবেই আমরা মৃতদেরকে বের করব, যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর (সুরা আরাফ আয়াত ৫৭)

এই আয়াতে মূলত বলা হয়েছে যে,
কোন বিশেষ দিক কিংবা বিশেষ ভূখণ্ডের দিকে মেঘমালা ধাবিত হওয়া সরাসরি আল্লাহর নির্দেশের সাথে সম্পর্কযুক্ত। তিনি যখন যেখানে ইচ্ছা এবং যে পরিমাণ ইচ্ছা বৃষ্টি বর্ষণের নির্দেশ দান করেন। মেঘমালা আল্লাহর সে নির্দেশই পালন করে মাত্র। (তাফসীরে কুরআনুল কারীম বাংলা)

প্রচণ্ড গরমের দাবদাহে যখন অতিষ্ঠ হয়ে উঠে মানুষ ও প্রকৃতি। আল্লাহর নির্দেশে পরম শান্তির পরশ নিয়ে হাজির হয় বৃষ্টি। দিনরাত অবিরাম বৃষ্টির ধারা মানব মনকে করে দোলায়িত। বাংলা সাহিত্যের এমন কোন কবি সাহিত্যিক নেই যিনি মুগ্ধ হয়ে কাব্য সংগীত রচনা করেন নি।

আমাদের দেশের পানির সত্তুরভাগ চাহিদা পূরণ হয় বৃষ্টির পানির মাধ্যমে। আকাশ থেকে এই তরল ধারা না বইলে পাখি গান গাইত না। প্রাণ ও প্রকৃতি যেত মরে। বৃষ্টির মাধ্যমে প্রকৃতি সতেজ ও নির্মল হয়ে উঠে। মৃত জলাধার প্রাণ ফিরে পায়। জমিতে কৃষি কাজের উৎপাদন ভালো হয়। প্রকৃতি ও পরিবেশের ময়লা আবর্জনা পরিষ্কার হয়।

পবিত্র কুরআনে বৃষ্টি, বৃষ্টির কারণ, বৃষ্টির দান, বৃষ্টির শিক্ষা ও বৃষ্টির স্রস্টার কথা বারবার তুলে ধরা হয়েছে।
আল্লাহ বলেন- আর আল্লাহ্ আকাশ হতে বারি বর্ষণ করেন এবং তা দিয়ে তিনি ভূমিকে তার মৃত্যুর পর পুনর্জীবিত করেন। নিশ্চয় এতে নিদর্শন রয়েছে এমন সম্প্রদায়ের জন্য যারা কথা শোনে ( সুরা নাহল আয়াত ৬৫)

গেল শতাব্দীতে তেল নিয়ে যুদ্ধ হয়েছে দেশে দেশে। সাম্প্রতিক সময়ে জাতিসংঘসহ বিশ্বের বড় বড় সংগঠনগুলোকে বেশ সরব দেখা যাচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুতে। বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে পৃথিবীর বরফ ভাণ্ডার গলতে শুরু করেছে। এতে হুমকিতে রয়েছে উপকূলীয় অঞ্চলের প্রকৃতি।

ভূতত্ত্ববিদ ও গবেষকদের মতে আগামী শতাব্দীতে যুদ্ধ ও হানাহানি হতে পারে পানি নিয়ে। বছর দুয়েক আগে বাংলাদেশে এক বিরল ঘটনা ঘটে। সারাদেশে একযোগে বিদ্যুৎ চলে যায়। দেশজুড়ে নেমে আসে এক অন্ধকার জাগানিয়া ভীতি। জেনারেটরের মতো বিকল্প ব্যবস্থাগুলোও প্রায় বিকল হয়ে যায়। আমরা স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেছি, পানির এই নিয়ামত স্বল্প সময়ের জন্য কেড়ে নিলে আমাদের পরিণতি কতটা করুণ হতে পারে।

পবিত্র কুরআনে প্রায় জায়গায় আল্লাহ পানির এই নেয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে তার মারফত লাভ ও কৃতজ্ঞতা আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন। অন্যথায় এই নেয়ামত কেড়ে নেয়ার ও হুমকি দিয়েছেন।
আল্লাহ বলেন- আর আমরা আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করি পরিমিতভাবে অতঃপর আমরা তা মাটিতে সংরক্ষিত করি; আর অবশ্যই আমরা তা নিয়ে যেতেও সম্পূর্ণ সক্ষম [ সুরা মুমিনুন আয়াত- ১৮)

রাসূল (স.) বৃষ্টিতে ভিজতেন। আর সাহাবীদের ও ভিজতে বলতেন। নবীজী যা করেছেন, ভালোবেসে তা করা সুন্নাত।
আল্লাহ বলেন -তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও পরকালকে ভয় করে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে। তাদের জন্য রাসূলুল্লাহর (চরিত্রের) মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে। [আহযাব -২১)

বৃষ্টির সময় দুয়া কবুলের এক সুবর্ণ সুযোগ রয়েছে। সাহল বিন সাদ (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন ‘দুই সময়ের দোয়া ফেরত দেওয়া হয় না কিংবা (তিনি বলেছেন) খুব কমই ফেরত দেওয়া হয়।  আজানের সময় দোয়া এবং যুদ্ধক্ষেত্রের দোয়া যখন একে অপরের মুখোমুখি হয়। অন্য বর্ণনা মতে, বৃষ্টির সময়ের দোয়া।’ (আবু দাউদ : ২৫৪০)।

সুতরাং আমাদের সকলের উচিত বৃষ্টির এই অফুরান নেয়ামতকে বেশী বেশী স্মরণ করা ও আল্লাহর শোকরিয়া আদায় করা।

শান্তি প্রতিষ্ঠায় ইসলামী জিহাদই একমাত্র মুক্তির পথ : আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী

আল্লামা-জুনাইদ-বাবুনগরী-

সন্ত্রাস দমনে, শান্তি প্রতিষ্ঠায় ও তাগুতের মোকাবেলায় ইসলামী জিহাদই আমাদের একমাত্র মুক্তির পথ বলে মন্তব্য করেছেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব ও হাটহাজারী মাদরাসার সহযোগী পরিচালক আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী।

২১ জুন শুক্রবার গাজীপুর চৌরাস্তায় অবস্থিত জামিয়াতুর রাহমায় ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের ছাত্রদের হাদীসের সর্বোচ্চ কিতাব বোখারী শরীফের উদ্বোধনী সবক পাঠদান কালে তিনি এ কথা বলেন।

হাদীসের গুরুত্ব, হাদীস সংকলনের ইতিহাস ও ইমাম বোখারীর জীবন বৃত্তান্ত আলোচনা করে নবীন আলেম ও যুবকদের উদ্দেশ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি  ম্যাসেজ দিতে গিয়ে আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী বলেন, আমাদের মনে রাখতে হবে আল্লাহ তা’য়ালা আমাদের প্রতিপালক, মহাগ্রন্থ আল কুরআন ও নবী করীম সা. এর সুন্নাতই আমাদের সংবিধান, শাশ্বত  ধর্ম ইসলাম আমাদের পূৰ্ণাঙ্গ জীবন বিধান এবং রাসূল সা. আমাদের রাহবার।

সন্ত্ৰাস দমনে, শান্তি প্রতিষ্ঠায়, তাগুতের মোকাবেলায় ইসলামী জিহাদই আমাদের মুক্তির পথ, আল্লাহ তা’য়ালার রাস্তায় মৃত্যুবরণ আমাদের জীবনের মূল্যবান স্বপ্ন এবং কুরআন সুন্নাহ’র গভীর জ্ঞান অর্জন করে সৎ চরিত্রের অধিকারী হয়ে আল্লাহর জমিনে আল্লাহর হুকুমত প্রতিষ্ঠা, বিশ্ব নবী সা.এর  আদর্শ বাস্তবায়ন এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করে সর্বক্ষেত্রে শান্তি, ন্যায় ও সত্যের পরিবেশ সৃষ্টি করা আমাদের অপরিহার্য দায়িত্ব ও কর্তব্য।

জামিয়ার দারুল হাদীস মিলনায়তনে মাদরাসার প্ৰতিষ্ঠাতা পরিচালক মাওলানা গাজী আল মাহমুদের সভাপতিত্বে এ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়।

উক্ত অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন কলকাতার বিশিষ্ট মুহাদ্দিস মাওলানা সোহরাব আলী খান কাসেমী, মুফতি মিজানুর রহমান সাঈদ, মাওলানা খালেদ সাইফুল্লাহ আইয়ুবী, মাওলানা আশেকে মোস্তফা, মুফতি হাবীবুর রহমান মিয়াজী, মুফতি মুনির কাসেমী, মুফতি ইরশাদুল্লাহ কাসেমী প্রমুখ।

 

  • আরও পড়ুন 
  • পর্দা নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্যে মুসলমানদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়েছে : আল্লামা বাবুনগরী https://adarshanari.com/news/national/7501/
  • কেয়ামত পর্যন্ত আপনাদের মাধ্যমেই ইসলাম জিন্দা থাকবে : কওমী ছাত্রদের উদ্দেশ্যে আল্লামা বাবুনগরী https://adarshanari.com/news/national/7496/
  • আল্লামা বাবুনগরীর হুংকারে যেভাবে দখলমুক্ত হল ওমর ফারুক মাদরাসা https://adarshanari.com/news/national/7330/
  • আল্লামা বাবুনগরীর হাতে ইসলাম গ্রহণ করলেন বৌদ্ধ যুবক https://adarshanari.com/news/bangladesh/7294/
  • এলেম পেতে হলে উস্তাদকে সম্মান করতে হবে, বেয়াদব বঞ্চিত হয় : আল্লামা শফী https://adarshanari.com/news/national/7492/

পর্দা নর-নারীর দুনিয়া আখিরাতে সম্মানের প্রতীক

বোরকা-হিজাব-নারী-মুস্লিমা-রমণী

মেহেদী হাসান সাকিফ

সাবিহা ও মালিহা দুইজন আপন চাচাতো বোন। সাবিহার বাবা তাদের এলাকার মসজিদের ইমাম ও খতিব। সাবিহার প্রাথমিক শিক্ষার হাতেখড়ি গ্রামের ইবতেদায়ী মাদ্রাসায়। গ্রামের মাদ্রাসা থেকেই গোল্ডেন জিপিএ নিয়ে দাখিল, আলিম পাশ করে।

অন্যদিকে তার চাচাতো বোন মালিহার বাবা একজন ব্যবসায়ী। তার আরো বড় দুই ভাই দেশের স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত। তাই, মালিহারও লক্ষ্য তার দুই ভাইয়ের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া। সাবিহা মালিহার সমবয়সী হওয়ায় পড়াশুনাসহ সাবিহার দিনের একটা বড় অংশ কাটত মালিহার সাথে। আলিম পাশের পর সাবিহারও মালিহার মতো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন জাগে। প্রথমে পরিবার থেকে রাজি না হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের যাবতীয় কার্যাদিতে পরিপূর্ণ পর্দা মেনে চলার আশ্বাসে সম্মতি দেওয়া হয়। ছোটবেলা থেকে মেধাবী হওয়ায় সাবিহা ও মালিহা দুজনই বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পায়। গ্রাম থেকে এসে তারা সরাসরি আবাসিক হলে ওঠে।

আরও পড়ুন

    • ——————————————————-

একেবারে ক্লাস সিক্স থেকেই যেকোন প্রয়োজনে বাইরে বের হলেও মুখে নিকাব হাতে মোজা ছাড়া কখনই বাইরে বের হতো না। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিকেও এই ধারাবাহিকতা বজায় ছিলো। প্রথম দিকে সাবিহা যখন হাতে মোজা আর মুখে নেকাব পড়ে ক্লাসে যেতো তার অধিকাংশ মেয়ে সহপাঠীদের গায়ে শোভা পেত আঁটসাঁট পোশাক। ইসলামের পর্দার ন্যূনতম ফরজ বিধানের ধার ধারত না তারা। আলিম পড়াকালীন ফেসবুক আইডি থাকলেও কখনো কোন ছেলেদের ফ্রেন্ডরিকোয়েস্ট গ্রহণ করতো না সে।

আমাদের দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়গুলোই সহশিক্ষা অধ্যুষিত বিষয়টি অজানা নয় কারো। সাবিহার বিশ্ববিদ্যালয় ও এর ব্যতিক্রম নয়। প্রথমদিকে কোন ছেলের সাথে প্রয়োজন ছাড়া কথা বলাটাও ভীষণ পাপ মনে করতো। সহশিক্ষার এই কুপ্রভাবে মাত্র কয়েকমাস না যেতেই কয়েকজন ছেলের সাথে বন্ধুত্ব হয়ে যায়। এর মধ্যে একজন ছিল রনি হাসান। ক্লাসের তুখোড় মেধাবী ছাত্র। পড়াশুনোর সূত্র ধরে পরিচয় হলেও একসময় রনির সাথে তার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে।

যেই সাবিহা একসময় হাতে মোজা ছাড়া বাইরে বের হতো না। সে এখন মাথায় নামেমাত্র স্কার্ফ পরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে ছেলে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয়। বয়ফ্রেন্ডের সাথে ঘুরে বেড়ায়। শুধু ঘুরাঘুরিতেই সীমাবদ্ধ নয়, রনির সাথে তার সম্পর্ক শারীরিক সম্পর্ক অবধি গড়ায়। তার প্রেগন্যান্ট হওয়ার খবরটি রনিকে জানানো হলে কোন কারণ ছাড়াই রনি যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। তাদের দীর্ঘ পাঁচ বছরের সম্পর্কটা ভেঙ্গে যায়। রনি বিষয়টা খুব সহজে মেনে নিলেও সাবিহা মানতে পারে না। এই ক্ষোভ হতাশায় একদিন
সে আত্মহত্যা করে।

এই ঘটনা থেকে খুব সহজেই আমরা পর্দার বিধান লঙ্ঘন করার দুনিয়াবি পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারি তা বুঝতে পারি।

ইসলাম মানবজাতির কল্যাণকামী এক শাশ্বত জীবনব্যবস্থা। আল্লাহতালা মানবজাতির কল্যাণের জন্য বহুবিধ বিধান দান করেছেন।
মানুষ যখন আল্লাহতায়ালার দেওয়া বিধান মেনে চলে, তখন সে তার প্রভুর নৈকট্য অর্জন তো করেই, সেই সঙ্গে লাভ করে পার্থিব নানাবিধ কল্যাণ। আল্লাহতায়ালা মানুষের জন্য তাই নির্ধারণ করেন যা তার জন্য কল্যাণকর। সেটা সে বুঝবার মতো জ্ঞান রাখুক বা না রাখুক।

নামাজ, রোজা, হজ যাকাত যেমন ইসলামের একটা ফরজ বিধান। ঠিক তেমনিভাবে পর্দাও তেমন ফরজ একটি বিধান।
পর্দা শব্দের আরবি প্রতিশব্দ হচ্ছে ‘হিজাব’। এর শাব্দিক অর্থ প্রতিহত করা, বাধা দান করা, গোপন করা, আড়াল করা, ঢেকে রাখা ইত্যাদি। ইসলামের পরিভাষায় প্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের আপাদমস্তক গায়ের মাহরাম পুরুষ থেকে ঢেকে রাখাকে ‘হিজাব’ বা পর্দা বলে।

ইসলামী শরিয়তে নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই পর্দা ফরজ করা হয়েছে। পর্দাব্যবস্থা আল্লাহর এমন এক উত্তম বিধান, যা নারী পুরুষ উভয়কেই পাশবিক উচ্ছৃঙ্খলতা থেকে হিফাজত করে এবং মানবিক মর্যাদার উচ্চাসনে অধিষ্ঠিত করে। পবিত্র কুরআনের অনেক গুলো আয়াতে পর্দার বিধানের কথা আলোচনা করা হয়েছে।

কোন মুমিন নর-নারীর ক্ষেত্রেই পর্দার বিধানকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। ইসলাম নারী এবং পুরুষের জন্য আলাদা আলাদা পোশাকের বিধান দিয়েছে। দিয়েছে পর্দার হুকুম। আমাদের চারপাশে অসংখ্য মানুষ আছে, যারা পর্দা সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা রাখে না। পুরুষরা মনে করে পর্দা শুধু নারীর জন্য, আর নারীরা মনে করে পর্দা তাকে পিছিয়ে দিচ্ছে অথবা পর্দা করার যৌক্তিকতা তারা খুঁজে পায় না। অথচ পর্দা নারী পুরুষ উভয়ের জন্য অবশ্য পালনীয় একটি বিধান। যেমনটি আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনের সূরা নুরে ইরশাদ করেছেন,

“মুমিনদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গের হেফাজত করে। এতে তাদের জন্য খুব পবিত্রতা রয়েছে। নিশ্চয়ই তারা যা করে, আল্লাহ তা অবহিত আছেন। আর ঈমানদার নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে নত রাখে এবং তাদের যৌনাঙ্গের হেফাজত করে। তারা যেন যা সাধারণত প্রকাশমান- তাছাড়া তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন না করে এবং তারা যেন তাদের ওড়না বক্ষদেশে দিয়ে রাখে এবং তারা যেন তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভ্রাতা, ভ্রাতুষ্পুত্র, ভগ্নিপুত্র, স্ত্রীলোক, অধিকারভুক্তবাদী, যৌনকামনামুক্ত পুরুষ ও বালক- যারা নারীদের গোপন অঙ্গ সম্পর্কে অজ্ঞ তাদের ব্যতীত কারও কাছে তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে। তারা যেন তাদের গোপন সাজ-সজ্জা প্রকাশ করার জন্য জোরে পদচারণা না করে।” –(সূরা নুর: ৩০-৩১)

এ আয়াতের শুরুতে মুমিন পুরুষদের উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে। জারির ইবনে আবদিল্লাহ বাজালি (রা.) থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে কোনো নারীর প্রতি হঠাৎ দৃষ্টি পড়ে যাওয়ার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, সাথে সাথেই দৃষ্টি সরিয়ে নেবে (সহিহ মুসলিম)।

বুরাইদা (রা.) থেকে বর্ণিত- তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) আলী (রা.)-কে বললেন, হে আলী! দৃষ্টির ওপর দৃষ্টি ফেলো না। হঠাৎ যে দৃষ্টি পড়ে ওটা তোমার ক্ষমার্হ; কিন্তু পরবর্তী দৃষ্টি তোমার জন্য ক্ষমাহীন পাপ (হাদিসটি বর্ণনা করেছেন ইমাম আবু দাউদ (রহ.)।

বিশ্বনবী রাসূলে আকরাম (সা.) বলেন- তোমরা (মুমিনরা) নবীপত্নীদের কাছে কিছু চাইলে পর্দার আড়াল থেকে চাইবে। এটা পর্দার (পর্দার বিধান) তোমাদের এবং তাদের অন্তরসমূহের জন্য পবিত্র থাকার উত্তম পন্থা (সূরা আহজাব: ৫৩)।

রাসূল (সা.) আরো বলেন, সাবধান! কোনো (পর) পুরুষ যেন কোনো (পর) নারীর সাথে নির্জনে অবস্থান না করে। কেননা যখনই তারা (নিরিবিলিতে) মিলিত হয়, শয়তান তাদের তৃতীয়জন হয় এবং (উভয়কে) কুকর্মে লিপ্ত করানোর প্রচেষ্টায় সে তাদের পিছু লেগে যায় ( তিরমিযী শরিফ)।

ইচ্ছাকৃত দৃষ্টিপাত কিংবা তাকানোই হচ্ছে- যৌন প্রবৃত্তির প্রারম্ভিক কারণ, যার শেষ পরিণতি নানা রকম পাপ ও ফেতনাসহ ব্যভিচার পর্যন্ত গড়ায়।
একই সূরার ২৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, অনুমতি ব্যতীত কারও ঘরে প্রবেশ যেন না করা হয় (যদিও তা প্রয়োজনে হোক)।
হাদিসে প্রয়োজনে পর্দার আড়ালে থেকে কোনো জিনিষ আদান-প্রদান, শিক্ষা গ্রহণের মতো কাজগুলো করার উপদেশ দেওয়া হয়েছে। তেমনিভাবে সূরা নুর, সূরা আহজাবে পূর্ণভাবে বলা হয়েছে নারীদের পর্দা সম্পর্কে। হাদিসে যা আরও ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
পারিবারিক ব্যবস্থাই হচ্ছে সুখ-সমৃদ্ধশালী রাষ্ট্র গঠনের আগাম শর্ত। কেননা পরিবার ব্যবস্থাপনাই হচ্ছে মূল বুনিয়াদ। যে সমাজ বা রাষ্ট্র ইসলামের পর্দার বিধানকে দূরে ঠেলে দিয়েছে সুখ-সমৃদ্ধ সমাজ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রয়াস ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে।

মোটকথা, ইসলামের পর্দা বিধান শুধু নারীর জন্য নয়, নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য। তেমনি পর্দা-বিধান শুধু ব্যক্তিজীবনের বিষয় নয়। পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনেরও বিষয়।

ইসলামের পর্দা-ব্যবস্থা যদি পূর্ণাঙ্গরূপে বাস্তবায়িত হয় তাহলে মুসলিম নর-নারীর ব্যক্তি জীবনের সাথে সাথে পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনও সুস্থ ও পবিত্র হবে। পক্ষান্তরে পর্দা-বিধান কার্যকর না থাকলে যেখানে তা অনুপস্থিত সেখানেই পঙ্কিলতা ও অস্থিরতার অনুপ্রবেশ ঘটবে।

আজ সকল মুসলিমের ঈমানী কর্তব্য, পর্দার বিধানের দিকে ফিরে আসা। ব্যক্তি ও পরিবার এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের শান্তি-শৃঙ্খলা এবং স্বস্তি ও পবিত্রতা রক্ষার এ ছাড়া দুসরা কোনো পথ নেই।

টিভি, সিনেমা (হিন্দি সিরিয়াল, খেলা ইত্যাদি) দেখার ক্ষতিসমূহ

মুফতী মনসূরুল হক (দা.বা.)

মানুষের জীবন দু’ধরনের। নববী জীবন আর পাশবিক জীবন। প্রথমটার পরিণাম জান্নাত আর দ্বিতীয়টার পরিণাম জাহান্নাম। আধুনিক যুগের সিনেমা, টিভি এবং ভি সি আর ইসলাম ও মুসলমানদের চির শত্রু ইহুদী-খৃষ্টানদের আবিষ্কার, মুসলমানদেরকে পাশবিক জীবনে উদ্বুদ্ধ করার এক অত্যাধুনিক যন্ত্র। মুসলমানদেরকে তাদের, কৃষ্টি-কালচার, তাহযীব-তামাদ্দুন, শিক্ষা-দীক্ষা, সমাজ, নামায, অর্থ, চরিত্র এবং মানবতা থেকে দূরে সরিয়ে বিজাতিদের কৃষ্টি-কালচারে অভ্যস্ত করত: তাদেরকে গোলাম বানানোর এক সুদূর প্রসারী ষড়যন্ত্র।

কিন্তু আফসোস! আজ মুসলমান চোখ থাকতেও অন্ধ। বিবেক থাকতেও তাদের এ ষড়যন্ত্র উপলব্ধি করতে না পেরে শত্রুদের প্রেরিত বিষাক্ত সাপকে শুধুমাত্র বাহ্যিক রূপ এবং সৌন্দর্যের প্রতি বিস্মিত হয়ে অবুঝ শিশুর মত সেটাকে স্বাগত জানিয়ে সযত্নে নিজের ঘরে স্থান করে দিচ্ছে। ফলে চারিত্রিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক সকল দিক দিয়ে মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে তারা। যিনা-ব্যভিচার, অন্যায়-অত্যাচার, হত্যা-লুণ্ঠন, রাহাজানি-ধর্ষণ ইত্যাকার বহুবিধ ফিতনা-ফ্যাসাদ দিন দিন বেড়েই চলছে। এহেন পরিস্থিতিতে সমাজে জীবন যাপনই বড় মুশকিল এবং কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এজন্য নিম্নে মুভি, সিনেমা, টিভি, খেলাধুলা, বিশেষ করে হিন্দি সিরিয়াল এবং ভি সি আর ইত্যাদি দেখার দুনিয়া ও আখিরাতের ক্ষতিসমূহ সংক্ষিপ্তভাবে তুলে ধরা হল, যাতে তার ভয়াবহ পরিণাম দেখে আমরা তা থেকে বেঁচে থাকতে পারি।

১। চোখের যিনা: সিনেমা টিভি দেখার সর্ব প্রধান উদ্দেশ্য হল মহিলাদের সৌন্দর্য দ্বারা পুরুষদের মনোরঞ্জন করা। নারীদেরকে অশ্লীল আর নির্লজ্জভাবে উলঙ্গ বা অর্ধ উলঙ্গ করে উপস্থাপন করা হয়। যা দেখার কারণে চোখের যিনা হতে থাকে। তদ্রূপ পুরুষদের দেখে মহিলারাও চোখের যিনায় লিপ্ত হয়ে গুনাহগার হচ্ছে। হাদীসে এসেছে চোখও যিনা করে, আর তার যিনা হচ্ছে বেগানা মহিলাদেরকে দেখা। (বুখারী শরীফ হা: নং ৬২৪৩)

২। কানের যিনা: সিনেমা ও টিভির পর্দায় গান-বাজনা, কাওয়ালী, যুবতী মেয়েদের উলঙ্গ নাচ আর নায়িকাদের মনোহারিণী আওয়াজ। ঢোল-তবলা, সেতারা বেহালার মনোমুগ্ধকর ঝংকার। গানের সুরলহরী, প্রেম ভালবাসার অশ্লীল ডায়ালগ ইত্যাদি সব কানের যিনা। হাদীসে এসেছে কানও যিনা করে, আর যিনা হচ্ছে গায়রে মাহরামের আওয়াজ শ্রবণ করা। (বুখারী শরীফ হা: নং ৬২৪৩)

৩। অন্তরের যিনা: সিনেমা টি ভির পর্দায় উলঙ্গ, অর্ধ উলঙ্গ, টাইটফিট পোশাক বেগানা মহিলাদেরকে দর্শন করা আর গান-বাজনার বিভিন্ন আকর্ষণীয় আওয়াজে পুলকিত হওয়া, আগ্রহ-উদ্দীপনার সাথে অন্তরের সেদিকে আকৃষ্ট হওয়া, তার যৌনতা আর চিত্তাকর্ষকতা কল্পনা করে মনে মনে শিহরিত হওয়া এবং মজা অনুভব করা ইত্যাদি সবই অন্তরের যিনা। হাদীসে এসেছে অন্তরও যিনা করে, আর তার যিনা হচ্ছে কল্পনা আর কামভাব পূরণের আশা করা। (বুখারী শরীফ হা: নং ৬২৪৩)

৪। লজ্জা-শরমের বিলুপ্তি: পরিবারের সকল সদস্য; পিতা-মাতা, ছেলে-মেয়ে, ভাই-বোন সকলে একত্র বসে উলঙ্গ বা অর্ধ উলঙ্গ ছবি দেখতে থাকে। যার দ্বারা হায়া-শরম খতম হতে থাকে। অথচ লজ্জা ঈমানের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। (বুখারী শরীফ হা: নং ৯)

৫। অশ্লীলতা ও উলঙ্গপনার ব্যাপকতা: যে সকল লোকেরা সিনেমা ও টিভি দেখায় অভ্যস্ত হতে থাকে, চরিত্রগত দিক দিয়ে তাদের মন ও মস্তিষ্ক সব নিম্নস্তরে নেমে আসে। তাদের নির্লজ্জতা এবং অশ্লীলতার মাপকাঠি পরিবর্তন হয়ে যায়। গতকাল পর্যন্ত যে বিষয়টিকে সে উলঙ্গপনা আর অশ্লীলতা বলে জানতো আজ সেটাকে নিতান্তই সাধারণ বা এটাকেই মডার্ন মনে করছে। অথচ অশ্লীলতা আল্লাহ তা‘আলার নিকট মারাত্মক ঘৃণিত। (সূরায়ে আনআম১৫১)

৬। অসৎ সঙ্গতা: সিনেমা ও টিভি দেখার কারণে অসৎ বন্ধু তথা সিগারেট ও মাদক দ্রব্যে অভ্যস্ত ব্যক্তি, মাতা-পিতার অবাধ্য, স্কুল-কলেজের অসৎ চরিত্রের ছাত্র-ছাত্রী এবং মেয়েদের সাথে চলাফেরা আরম্ভ করে এবং সৎ লোকদের সংশ্রব থেকে দূরে সরে থাকে। (সূরায়ে তাওবাঃ১১৯, সূরায়ে আনআমঃ৬৮)

৭। খারাপ অভ্যাসের জন্ম: ছেলে-মেয়ের সমকামিতা পুংমৈথুন, হস্তমৈথুন এবং ব্যভিচারের মত নানা অভিশপ্ত বদ অভ্যাসে লিপ্ত হয়ে নিজের জীবনকে নষ্ট করে দেয়। অথচ আল্লাহ তা‘আলা সৎ লোকদের সংশ্রবে থাকার আদেশ করেছেন এবং কুরআন হাদীসে সকল হারাম কাজের প্রতি মারাত্মক ধমকি এসেছে। (সূরায়ে আনকাবূত: ২৮, তিরমিযী হা: নং ১১৬৭, শামী: ২/৩৯৯)

৮। যৌন কামিতার শিক্ষা: প্রায় সকল চলচ্চিত্রের বিষয়ই থাকে অবৈধ প্রেম-প্রীতি, ভালবাসা, যৌন চাহিদা পূরণ করার নানা কৌশল শিক্ষা দেয়া। অথচ কুরআনের স্পষ্ট নিষেধ যে, তোমরা প্রকাশ্যে কিংবা গোপনে কোন ভাবেই অশ্লীল কাজের নিকটবর্তী হইওনা এবং এগুলোর প্রচার করো না। (সূরায়ে আনআম: ১৫১, সূরায়ে নূর: ১৯)

৯। চরিত্রের অবনতি: চরিত্র বিনষ্টকারী কথা-বার্তা, অনর্থক কল্পকাহিনী, গীবত, মিথ্যা, পরশ্রীকাতরতা, ঠাট্টা-বিদ্রূপ, কুদৃষ্টি ইত্যাদি ধ্বংসাত্মক অভ্যাস সৃষ্টি হয়ে মারাত্মকভাবে চরিত্রের অবনতি ঘটে। অথচ চরিত্র মানব জীবনে অতি মূল্যবান সম্পদ এবং হাশরের ময়দানে সবচেয়ে ওজনদার হবে তার উত্তম চরিত্র। (সূরায়ে হুজরাত:১১-১২, আবূ দাউদ হা: নং ৪৭৯৯)

১০। অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ব্যাপকতা: চুরি, ডাকাতি, অপহরণ, ব্যভিচার, ছিনতাই, হত্যা-লুণ্ঠন, রাহাজানি-ধর্ষণ ইত্যাদি মারাত্মক অপরাধ বিভিন্ন পদ্ধতিতে অত্যন্ত আকর্ষণীয় ভাবে সিনেমা টিভির পর্দায় দেখানো হয়। পরবর্তীতে দর্শকরা এগুলোকে সাধারণ মনে করতে করতে নিজেরাও এগুলোর সাথে জড়িত হয়ে পড়ে। অথচ এগুলো সবই হারাম এবং কবীরাহ গুনাহ। (সূরায়ে মুমতাহিনা: ১২)

১১। পর্দাহীনতার ব্যাপকতা: বর্তমান সমাজের নারীরা চলচ্চিত্রের পর্দাহীনতা দেখে নিজেরাও পর্দাহীনতা শিখছে। নায়িকাদের অনুসরণে নিজেরা অর্ধ উলঙ্গ অবস্থায় রাস্তা-ঘাটে ঘুরে বেড়াচ্ছে। অথচ ইসলামী শরী‘আতে মহিলাদের জন্য পর্দাবিধান পালন করা ফরয। এটা না থাকলে সংসারের সমস্ত শান্তিই বিনষ্ট হয়ে যায়। (সূরায়ে আহযাব: ৩৩,৫৯)

১২। অবৈধ বিবাহ: সিনেমা ও টিভি দেখার কারণে ধর্মীয় অনুভূতি অবশিষ্ট থাকে না। পরকালের চিন্তাও থাকে না। মাসআলা-মাসাইলের গুরুত্বও শেষ হয়ে যায়। এমনকি একজন মুসলিম ছেলে অমুসলিম মেয়েকে বিবাহ করতে অথবা মুসলিম মেয়ে অমুসলিম ছেলের সাথে বিবাহ বসতে কোন দ্বিধাবোধ করে না। বরং এটাকে উদারপন্থী সংস্কৃতি ও আধুনিকতা মনে করে। অথচ এ সূরতদ্বয়ের কোনটাতেই বিবাহ সহীহ হবে না। এর পরেও ঘর-সংসার করলে যিনা হবে এবং তাদের থেকে যে সন্তান হবে সবই হারামজাদা হবে। (সূরায়ে বাকারা: ২২১)

১৩। ফ্যাশন পূজা: সিনেমা টিভি দেখার কারণে পুরুষেরা দাঁড়ি মুণ্ডানো, টাখনুর নীচে কাপড় পরা, টাইট পোশাক পরা আর মহিলারা মাথার চুল খাটো করা, চুলে বিভিন্ন কালার করা, নেল পালিশ, লিপস্টিক ইত্যাদি শরী‘আত বিবর্জিত ফ্যাশনে লিপ্ত হয়। অথচ এসব নাজায়িয। (সূরায়ে আ‘রাফ ২৫-২৬, মায়িদা:৬, বুখারী হা: নং ৬৮৯২,৫৭৯৫, শামী:৬/৪০৭)

১৪। স্বাস্থ্য ও সুস্থতার ক্ষতি: সিনেমা টিভি দেখার কারণে যুবক ছেলে মেয়েরা ধীরে ধীরে হৃদকম্পন, ক্যান্সার, ব্লাড প্রেশার, স্বপ্নদোষ, দুর্বলতা ও শরীরের ব্যথাসহ বহুরোগে আক্রান্ত হয়। অথচ স্বাস্থ্যের হেফাযত করাকে আল্লাহ তা‘আলা জরুরী করেছেন। এর ব্যতিক্রম করলে এগুলোর ব্যাপারে আল্লাহর আদালতে জিজ্ঞাসিত হতে হবে। (তিরমিযী হা: নং ২৪১৬)

১৫। চোখের ক্ষতি: চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতে এ কথাটি পরীক্ষিত যে, যত অধিক পরিমাণ সিনেমা ও টিভি দেখা হবে তত দ্রুত চক্ষু খারাপ হয়ে যাবে এবং দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হতে থাকবে। (সাঈদ মুহাম্মদ লিখিত সিনেমা টিভি দেখার ভয়াবহ পরিণতি: ৬১)

১৬। সিনেমা ও টিভি দেখা একটি আত্মার ব্যাধি: যখন কোন ব্যক্তির সিনেমা ও টিভি দেখার অভ্যাস মাত্রাতীত হয়ে যায় এবং সেটা ব্যতীত জীবন চলা কঠিন হয়ে পড়ে তখন সে হয়ে যায় একজন আত্মিক রোগী। তখন ঐ ব্যক্তির কাছে চিত্র জগতের প্রত্যেকটি বিষয় খুব ভাল লাগে। সিনেমা ও টিভি দর্শন তার সবচেয়ে প্রিয় কাজ হয়ে যায়। এ মারাত্মক ক্ষতির কারণে এ লোক ধর্মের কোন কাজ পছন্দই করতে পারে না। দুনিয়ার কাজের জন্যও সে নিষ্কর্মা। আর হারামকে মনে প্রাণে ভালবাসার কারণে তার ঈমান যে কোন মুহূর্তে চলে যেতে পারে। (সাঈদ মুহাম্মদ লিখিত সিনেমা টিভি দেখার ভয়াবহ পরিণতি: ৬১)

১৭। আল্লাহ ও রাসূলের অসন্তুষ্টি: আল্লাহ পাক ও তাঁর রাসূল ও দীনদার লোকদের মুহাব্বাত ও শ্রেষ্ঠত্ববোধ (যা তার জন্য জরুরী) পরিবর্তে অভিশপ্ত নায়ক নায়িকাদের মুহাব্বাত ও শ্রেষ্ঠত্ব অন্তরে পয়দা হয়। যার ফলে তাদের মুহাব্বাতে দুনিয়াতে অনেক সময় আত্মহত্যার মত মহাপাপ করতেও কুণ্ঠাবোধ করে না। আখিরাতে তাদের সাথী হয়ে জাহান্নামী হওয়ার আশংকা থাকে, যদি সে তাওবা না করে নেয়। (সূরায়ে আনফাল:৪৬)

১৮। পিতা-মাতার অবাধ্যতা: শিশুরা পিতা-মাতার অবাধ্য হয়ে যায়। যে সকল শিশু অনবরত সিনেমা ও টিভি দেখতে থাকে তারা আস্তে আস্তে পিতা-মাতার অবাধ্য হয়ে যায়। বরং কতক সময় তাদের সাথে অশ্লীল কথা-বার্তা বলে ফেলে এবং অসামাজিক আচরণ করে বসে। সিনেমা দেখা ও সিডি ক্রয় করার জন্য টাকা পয়সার প্রয়োজন হয়। যদি পিতা-মাতা পয়সা দিতে অস্বীকৃতি জানায় তবে বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করে। এমনকি চুরি-ডাকাতিও শুরু করে, আবার কখনো মায়ের উপর হামলা করে বসে। অথচ পিতা-মাতার বাধ্য হওয়া এবং তাদের কথামত চলা সন্তানদের জন্য ওয়াজিব। (সূরায়ে বনী ইসরাইল:২৩-২৪)

১৯। পড়া-লেখার বিঘ্ন সৃষ্টি: এগুলোর আসক্তির কারণে ছাত্র-ছাত্রীদের পড়া-লেখার দারুণ ব্যাঘাত ঘটে এবং অনেক ক্ষেত্রে পড়া-লেখাই নষ্ট হয়ে যায়। যার ফলে পড়া-লেখা, কাজ-কর্ম সবকিছু উপেক্ষা করে সিনেমা টিভি দেখে দীন-দুনিয়া বরবাদ করে দেয়। অনেক সময় এ কারণে পরীক্ষায় ফেল করে আত্মহননের পথ বেছে নেয়।

২০। নামায বিনষ্ট হয়: টিভি দেখতে গিয়ে বেনামাযীর কথা তো বাদই, নামাযী লোকদেরও নামায ছুটে যায় অথবা কমপক্ষে জামা‘আত ছুটে যায়। অথচ নামায আল্লাহ তা‘আলার গুরুত্বপূর্ণ বিধান। যা তিনি বান্দার উপর ওয়াক্তমত ফরয করেছেন এবং তার জন্য জামা‘আঁতকে করেছেন অতীব জরুরী এবং ওয়াজিব। (সূরায়ে নিসা: ১০৩, বাকারা:৪৩)

২১। টাকা পয়সার অপব্যয়: সিনেমা ও টিভি সকল মন্দ ও অশ্লীল কর্ম-কাণ্ড প্রশিক্ষণ দেয়ার এক ট্রেনিং স্কুল। অতএব তা দেখা অবৈধ ও হারাম। সুতরাং এ হারাম কাজে টাকা-পয়সা ব্যয় করা অপব্যয়। আর অপব্যয়কারীকে কুরআনে শয়তানের ভাই বলা হয়েছে। (সূরায়ে বনী ইসরাঈল:২৭)

২২। সময়ের অপচয়: এ অবৈধ এবং হারাম কাজে টাকা-পয়সা খরচ করা যেমন অপব্যয় তেমন তার জন্য মূল্যবান হায়াত থেকে মূল্যবান সময় দেয়া সময় অপচয় করারই নামান্তর। অথচ এ ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলা কিয়ামতের দিন জিজ্ঞাসা করবেন। (তিরমিযী হা: নং ২৪১৬ )

২৩। হারাম কাজের প্রশিক্ষণ গ্রহণ: সিনেমা এবং টিভি দেখলে পর্দাহীনতা, মহিলা-পুরুষের স্বাধীনভাবে মেলা-মেশা, অবৈধ প্রেম ও ভালবাসা, ব্যভিচার, মদ্য পান, ফ্যাশন পূজা, চুরি, ডাকাতি, হত্যা, ধোঁকাবাজি ইত্যাদি হারাম ও অবৈধ কর্ম-কাণ্ডের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করা হয়। এজন্য বর্তমানে টিভির কারণে ঘরে ঘরে চোর-ডাকাত, হাইজ্যাকার, ছিনতাইকারী সৃষ্টি হচ্ছে এবং সরকারের সন্ত্রাস বিরোধী সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হচ্ছে। (সাঈদ মুহাম্মদ লিখিত সিনেমা টিভি দেখার ভয়াবহ পরিণতি: ৬১)

২৪। বিপদ ও মুসীবতের কারণ: সিনেমা টিভির কারণে বহু কবীরাহ গুনাহ ব্যাপক হয়। আর হাদীসে এসেছে: যখন গুনাহ ব্যাপক হয় তখন আল্লাহ তা‘আলার আযাব ও শাস্তিও ব্যাপকভাবে হয়। (মাজমাউয যাওয়ায়িদ:৪/২৬৮)

সর্বোপরি সিনেমা টিভি দেখার মধ্যে কমপক্ষে ২১টি হারাম কাজ পাওয়া যায়। সুতরাং এতগুলো হারাম কাজ পাওয়া যাওয়ার পরেও সেটা দেখা মানে নিজের মূল্যবান হায়াতকে ধ্বংস করা ও আখিরাতকে বরবাদ করা।

সারকথা:

টিভি, ভিসিআর এবং সিনেমার দুনিয়াবী এবং আখিরাতী বহুবিধ ক্ষতি এবং অনেক হারামের সমষ্টি ও কেন্দ্রবিন্দু হওয়ায় সেখানে মন্দ ছাড়া ভাল কোন দিকই নেই। সেখান থেকে কোন ভাল ফলাফলের আশা করা মানে ম্যানহোল থেকে স্বচ্ছ পানি তালাশ করা। সুতরাং সেখানে অনৈসলামিক প্রোগাম করা এবং দেখা যেমন নাজায়িয তদ্রূপ ইসলামিক প্রোগ্রাম করা এবং দেখাও জায়িয এ কথা ঠিক নয়। বরং সে ক্ষেত্রে গুমরাহীর আশংকা আছে। বর্তমান সমাজে এর অনেক প্রমাণ রয়েছে। হক্বানী উলামায়ে কেরাম এ ধরনের আলেমদের থেকে নিজের দীন, ঈমান রক্ষার খাতিরে দূরে থাকার উপদেশ দিয়ে থাকেন।

আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে আমাদের ছেলে মেয়ে, আত্মীয়-স্বজন ও সকল মুসলমানকে চলমান এ ফিতনা থেকে বেঁচে থেকে সঠিক পন্থায় আখিরাতের পাথেয় সংগ্রহে সচেষ্ট হওয়ার তাওফীক দান করুন। আমীন।